ঘুম-ভাঙা রাতের শেষ প্রহরে কানে এলো নতুন দিনের আজান। দুয়ারে উঁকি দিলো পল্লী বাংলার নতুন ভোর। দু চোখে অপার মুগ্ধতায় একে একে সবাই প্রবেশ করলো গ্লোবাল ভিলেজ নামে নতুন এক জগতে। পৃথিবী চলে এলো হাতের মুঠোয়। মুহূর্তে পৌঁছে যায় প্রান্ত থেকে প্রান্তে। কত সহজ হয়েছে জীবন। কত কিছু আজ হাতের নাগালে যা এক সময় কল্পনা করাও ছিল দুষ্কর! সেকাল-একাল ভেবে আজ হয়তো তুমি নিজেও বিস্মিত। তুমি এবং তোমার পূর্বপুরুষেরা যা চেয়েছে তা পেয়েছে। যা চায়নি, ভাবেনি তাও এখন তোমার দোরগোড়ায়। এই মুহূর্তে তুমি আদৌও কী চাও তা হয়তো স্থির করতে পারছ না। তবে তোমার আকাঙ্ক্ষার কোনো শেষ নাই। আজ তুমি এতোকিছু পেয়ে এতো উপকরণের ভীড়ে কতোটা সুখী হয়েছ? কৃত্রিমতা দিয়ে পারছ কি তোমার মনের হাহাকার ঘুচাতে? তোমার ভেতরে আজ কেন শূন্যতার খা খা আর সীমাহীন হাহাকার? মনে আনমনে কোন সুখস্মৃতি খুঁজে ফেরো বারবার? জীবনের কোন প্রাণবন্ত ছবির দিকে তাকিয়ে তুমি হারিয়ে যাও নির্বিকার ভাবনায়? কোথায় তোমার বাঁশের বাঁশি আর সবুজ পাতার ‘পুতপুতি’, নারকেল পাতার চশমা আর হাত ঘড়ি? নিজের অজান্তেও কখনো কেন তোমার ঠোঁট নড়ে ওঠে ভাটির বাউলের উদার সুর আর দারাজ কণ্ঠে—আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম!
তুমি হারিয়ে এসেছ এক বিস্ময়কর অতীত। যেখানে পারস্পরিক ভাবাবেগ ছিল। ছিল হৃদ্যতা, আন্তরিকতা। সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সদ্ভাব। সহজ এবং সাবলীল জীবনের সুর ও ছন্দ। ঘরে যদিও অভাব ছিল কিন্তু মন ছিল অঢেল প্রাচুর্য্যে ভরপুর। কোথায় আজ হারিয়ে ফেললে তোমার সোনারগাঁয়ের সোনার মানুষ?
আজ তুমি নিজেকে যতই আড়াল করো, যতই তুমি রঙচঙ বাহারি পোশাকের তলে লুকিয়ে রাখো, তোমার উদাম গা শুঁকে দেখো এখনো লেগে আছে পলিমাটির সৌরভ। তুমি গেরামের ধূলি-ওড়া মেঠোপথে, কাদামাখা নরম আইলে রেখে এসেছ তোমার পদচিহ্ন। দূর্বা বিছানো পথে শিশির ধুয়েছে তোমার পদযুগল। তুমার হৈ-হুল্লোড় আর বাঁশির সুরে ভেঙে খান খান হয়েছে উদাস দুপুরের নীরবতা। ডুব আর সাঁতারে ভেঙেছে পদ্মপুকুরের মৌনতা। আছে বৃষ্টিতে ভেজা আর রোদে পুড়ার অভিজ্ঞতা। মার্বেল, ডাঙ্গুলি, গোল্লাছুট আর বউ-বউ কানামাছির স্মৃতি। মক্তব কামানো আর স্কুল পালানোর দুষ্টুমি। আম, জাম আর লিচু, পেয়ারার শাখে ঢিল ছুঁড়েছো কত। মনে আছে তোমার পৌষের বিকেলে নাড়ার আগুনে আলুপোড়ানোর সুখ? পুরো গেরাম ছিল তোমার নিজস্ব একখণ্ড উঠান। না ছিল বাধা-ভেদাভেদ ,না ছিল কোনো প্রাচীর। দু হাত ভরে লুটে এনেছিলে স্নেহ আর প্রীতি। রাতের আকাশে তোমারও ছিল নিজস্ব একটা চাঁদ! তাকে নিয়ে তুমি কত দৌড়েছো। ছায়া সুনিবিড় গাছগাছালি, ঘন পত্র-পল্লব আর বন-বাদাড়ে এখনো লুকানো আছে তোমার শৈশব। তুমি চাষাভুষার সন্তান। তোমার চোখে আজও ভাসে লাঙ্গল- জোয়াল, গরু আর গোয়ালের ছবি।
কথায় কথায় এমন অনেক কথা আজ বলতে পারি। আউলাইয়া বের করতে পারি অনেক অনেক স্মৃতি। আর হ্যাঁ, তোমাকে আজ এতো কথা আরও বলছি এ জন্য যে, তুমি হয়তো সেই প্রজন্মের একজন, যে এককালের মানুষের হারিয়ে যাওয়া জীবন-সংস্কৃতি ও অনুষঙ্গের শেষ সাক্ষী!
এসো, হাত ধরে তোমাকে নিয়ে দেখে আসি সেকালের গেরামের কিছু ছবি!
গ্রীষ্মের তাপদাহ। খাঁ খাঁ রোদ্দুর। জমিন ফেটে চৌচির প্রায়। আকাশে নেই মেঘের দেখা। তাতানো মাঠ-ঘাট। জনজীবনে অস্বস্তি। কৃষক তাকায় আকাশের দিকে, রোদের তীব্রতায় চোখ নেমে আসে আবার জমিনের ওপর। গাছতলায় গরুগুলো অলস জাবর কাটে। লাঙলে ধরেছে মরিচা। আউশের দিন যায় যায়। জমিনে নেই পানি। মেঘ মাঙ্গে আল্লাহর কাছে। ছেলে-মেয়েরা দেয় ব্যঙের বিয়ে। কুলা-পানি নিয়ে গান গেয়ে গেয়ে বাড়ি বাড়ি যায়, চাল তোলে। তেমন তাতানো দুপুরে পুকুরের পাড়ে শীতল ছায়ার নিচে কেউ কেউ বসে বসে গুটি বা লুডু খেলে। কেউ-বা ব্যস্ত বেতের কাজ নিয়ে। কেউ-বা ঠিক করছে তার লাঙ্গল-জোয়াল, কোদালের হাতল। আবার কেউ দেখো গাছের নিচে শীতলপাটি পেতে গড়াগড়িতে জুড়াচ্ছে দেহ-প্রাণ।
ঘরের ভেতরে বউ-ঝিয়েরা বসে নেই। কেউ বুনছে শীতলপাটি, কেউ-বা পাখা, কেউ বানাচ্ছে সিঁকা কেউ দেখো ঠিক করছে লাউ-কদুর মাচা। দহলিজে একসাথে কয়েকজন বসে উঁকুন বাছতে বাছতে করছে বারো বাজার আর তেরো গল্লির গল্প। আর ওদিকে ঐ ঘরে সদ্য বিবাহিত পল্লী বধূ স্বামীর গায়ে হাতপাখা ঘুরাতে ঘুরাতে চলছে গুনগুন প্রীতিলাপ। দেখলে লাজে মরে যাবে, চুপিচুপি তাকাও পল্লীবালার দিকে—জানালার পাশে রুমালে ফুল তুলতে তুলতে কান পেতে আছে দূর থেকে ভেসে আসা বাঁশির সুরে। ক্ষণে ক্ষণে চোখ তুলে তাকায় সে কোন সুদূরের পথে। না জানি কখন সুঁই ফুটে যায় তার কোমল আঙুলে।
আবার ওদিকে কোনো এক বাড়ির পাশে গাছগাছালির আড়ালে আকুপাকু মনে ইতস্তত পদে খুব সন্তর্পণে বারবার তাকায় কোনো এক প্রেমিক। পকেটে তার কাগজের ভাঁজে জমে আছে কত কথা, কত প্রেম। চিঠি কেমনে পৌঁছায় প্রিয়তমার কাছে এ ভেবে সে ব্যাকুল।
দক্ষিণ পাড়ার রহমত আলি এসেছেন আবির মাস্টারের খোঁজে। পুত্র তার বহুদিন পর চিঠি পাঠিয়েছে বিদেশ থেকে। কত কথা নিঃশব্দ পড়ে আছে কালো কালো অক্ষরে। পত্র পড়ে শোনার জন্য বাড়িতে সবাই অপেক্ষার সময় গুনছে। আবির মাস্টারকে এই চিঠে পড়ে দিতে হবে। কিন্তু আবির মাস্টার কই গেছে, কখন ফিরবে কেউ জানে না। রহমত আলি এবার চিঠি পড়ার জন্য কাকে খুঁজবে?
দুপুর কাত হয়ে সূর্য ঢলে ঢলে বেলা যায় যায়। গাঁয়ের রাস্তায় ধূলি উড়িয়ে গরুর পাল হাঁকিয়ে রাখালরা ফিরছে গৃহপানে। সারাদিনের খেলা শেষে গাঁয়ের পথের শিশুরা ফিরছে নিজ নিজ নীড়ে। ঘনালো সন্ধ্যায় কুপিবাতিগুলো জ্বলে উঠেছে প্রতিটি ঘরে ঘরে। উঠানে বসেছে শীলতপাটির আসর। মহিলারা জড়ো হয়ে বসেছেন শিশুদের নিয়ে। দাদি খুলেছেন কিচ্ছার ঝাঁপি। কিচ্ছার সুতায় বেঁধে হাজির করছেন দেও-দানব, পরি। গল্প বলছেন রাজা-বাদশাদের। উজির-কোটালের। গল্পে গল্পে কখনো নিয়ে যাচ্ছেন পাতালপুরীর অতল রহস্যে। কখনো ভয় ভয়, কখনো আনন্দ, কখনো-বা বিষাদ-বেদনা। এরই ফাঁকে শোনা যায় হুকা টানার শব্দ, নাকে আসে তামাকের গন্ধ। বাড়ির পুরুষেরা একে একে বাজার-সদাই নিয়ে ফিরছেন। কেউ কেউ সদাই রেখে চলে যাচ্ছেন মনাই শেখের বাড়ি রেডিও শোনার জন্য। একটা মাত্র রেডিও, সেটা শোনার জন্য কত ভীড়! জোয়ান পোলার মন ঘরে টিকে না। সেও বেরিয়ে গেছে বাঁশি হাতে। যে বাঁশির সুরে গভীর রাত অবধি ঘুম আসে না পল্লীবালার চোখে।
শেষ রাতে বৃষ্টি নামে। বহুল প্রতীক্ষিত বৃষ্টি। কালিঞ্জা বেলা উঠে লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে গরু হাঁকিয়ে কৃষক ছুটে যায় মাঠ পানে। হিরহির, ইতিইতি ডাকে জেগে ওঠে পুরো মাঠ। কঠিন শক্ত মাটি আজ গলে গলে পড়ে লাঙ্গলের ফালে ফালে।
বাড়ির কৃষাণীর নিস্তার নাই। ঘুম থেকে জেগে তার ঘরে-বাইরে, গোয়াল ঘরে, পাকঘরে বিস্তর কাজ। ‘বন্দে’ পাঠাতে হবে নাস্তা। দিতে হবে তামাক সাজিয়ে।
বেলা বাড়ে। রোদ চড়ে। চাষি বারংবার তাকায় বাড়ির দিকে। কোনো এক কৃষাণী, বালক কিংবা কিশোরী আলপথে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে আসছে হালের কাছে। আর ঐদিকে চেয়ে দেখো পল্লীবালার দিকে। এক হাতে ধরেছে জগ অন্য হাতে কাপড়ের পোটলা। আলতা পায়ে নূপুর বাজিয়ে এগিয়ে আসছে তার বাপজানের কাছে। বাপজানের কাছে আসতে এতোটুকুন পথ, তবুও যেন সে পথ ফুরায় না। রাখাল চোখ ফিরে ফিরে তাকায়। সে লাজে মরি মরি। লাজে তার পা আটকে যায়। কখন যে পিছলে পড়ে নরম আইলে। আর তার লজ্জার ভারে গলে যায় পায়ের তলের মাটিও…। ওগো পল্লীবালা, ও আমার খাঁটি সোনা, লক্ষ্মী ময়না। তোমার পদচিহ্নের খুঁজে আজও আমার রাখাল মন ঘুরে বেড়ায় বাংলার আইলে আইলে!
আকাশে ঘন কালো মেঘ আর বৃষ্টির মাতম। পানিতে থৈ-থৈ চারপাশ। এখন ঘোর বারিষা। ঝমঝম বৃষ্টির দিনে ঘরের চিপায়-চাপায় শিশুরা মেতেছে লুকুচুরি খেলায়। মেয়েরা গল্পে গল্পে হস্তশিল্প বুনে। কখনো একে অন্যের প্রতি ধাঁধাঁ ছুড়ে—‘তিন কুনা মাঝে গাত, না ভাংগাইলে খাইবে লাথ।’ কিশোরীর হাত নাচে ফুলঘুটির ছন্দ—‘ফুল ফুল ফুলটি, কুসুম কুসুম কুসুমটি…।’
বৃষ্টি একটু ধরালে ছেলেরা বের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে থৈ-থৈ পানিতে। ভেলা ভাসিয়ে দেয় জলের বুকে। মায়েদের বকা আর বারণ পড়ে যায় তাদের গা পিছলে পিছলে। কে পারে বেঁধে রাখতে এমন দূরন্ত শৈশবকে?
গরিব কৃষকের মন ভালো নেই এমন দিনে। ঘরে তার হানা দিয়েছে আষাঢ়ের নিদান। পেট করে ছুঁ ছুঁ। আর বৃষ্টিতে ভিজে পচে খসে খসে পড়ে শনের চাল। বৃষ্টির পানি গড়াগড়ি খায় তার ‘খাটাল’ জুড়ে। কলাপাতা, তালপাতা এনে চালে দেয়। কিন্তু তা কতোটুক পারে বৃষ্টি রুধিতে? বাচ্চারা কেঁদে জারে জার। পেটের ক্ষুধা মানে না আল্লাহরও দোহাই। ঋণের জন্য কৃষক দৌড়ায় সুদিমহাজনদের দুয়ারে দুয়ারে!
ও আমার সোনা ফলানো মানুষ। গায়ের রক্ত পানি করে ঘামে নেয়ে সারা বছর তোমার কী পরিশ্রম আর খাঁটুনি। অন্ন যোগাও জাতির জন্য। অথচ তোমার ঘরে আজ ভাত নেই। কোন ডাকাতের নাও এসে লুটে নিয়ে যায় তোমার সমস্ত অর্জন? তোমাকে ঠকিয়ে যারা সম্পদের পাহাড় গড়ে তাদের ওপর খোদার লানত পড়ুক!
নিদানে নিদানে বারিষা যায়। আসে ভাদ্রের তাল-পাকা গরম। একটু জিরাম নেই কিষাণ-কিষাণীর। ঘাম ঝরে দরদর। আউশের ধান ঘরে তুললে পেটে দু মুঠো ভাত হয়। খড়, ন্যাড়া দিয়ে গরুগুলোরও একটু উপায় হয়। সাথে সাথে আবার জমিনকে প্রস্তুত করতে হয় আমনের জন্য। দম নেবার সুযোগ নেই। ব্যস্ত কৃষক। ব্যস্ত কৃষাণী।
আকাশে উড়ছে শারদীয় মেঘ। কাশবনে শুভ্র ঢেউ। বাতাস লুটিপুটি খায় ধানের ক্ষেতে। গায়ের রাস্তার ছেলেরা দল বেঁধে দৌড়ায়। আলতা রাঙ্গা নুপুর পায়ে আঁচলে ঢেউ তুলে যায় পল্লী বালিকা। শিউলি ঝরে পড়ে গাছ তলায়। ভোর-বিহানে পল্লীবালা এসে ফুল নিয়ে যায় কুঁড়িয়ে। কার জন্য এতো মালা গাঁথে তা ভেবে সেও হয়তো কুল-কিনারা পায় না! তবুও সে কোনো একজনের তরে আঙুলে সুই ফুটিয়ে গেঁথে যায় শিউলি ফুলের মালা।
এদিকে ছোপ ছোপ সোনা-রঙ লেগেছে ধানক্ষেতে। কৃষক তাকায় বারবার ফিরে ফিরে। দেখতে না দেখতে পুরো মাঠ ছেয়ে যায় সোনালি রঙয়ে। মাঠ জুড়ে কাস্তের ঘ্যাচ-ঘ্যাচ, কৃষকের হাঁক-ডাক। কখনো গলা ছেড়ে গান গায়—রূপের মাইয়া, একবার চাইয়া গো, ভাব লাগাইয়া পরাণ কাড়িলে…।
উঠানে ধানের স্তুপ। কৃষাণী বিছায় মাড়া। দুপুর থেকে রাত অবধি গরু হাঁকিয়ে ধান মাড়ায়। হেলতে-দুলতে থাকা কুপি বাতির আলোয় রাত ঘনায়। বউ-ঝিয়েরা খড় ঝেড়ে ধান আলাদা করে। তারপর সেই ধান ঘওে তোলে। আবার নিয়ে যায় রোদে শুকাতে। কুলা দিয়ে বাতাস করে পরিস্কার করতে হয় খড়কুটো। উঠানে উঠানে আজ ধানের স্তুপ। বাড়িতে বাড়িতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে খড়ের গম্বুজ। বহুদিন পর অচল ঢেঁকি আবার সচল হয়েছে। পাড়াজুড়ের ধান-ভাঙা ঢেঁকির আওয়াজ। গভীর রাতে ঢেঁকির তালে তালে শোনা যায় ও বাড়ির কুলসুমের গলা—
‘বলি, ও ননদি, আর দু মুঠো চাল ফেলে দে হাঁড়িতে
ঠাকুর জামাই এলো বাড়িতে—
লো ননদি, ঠাকুর জামাই এলো বাড়িতে…’
সকাল হতে না হতে শোনা যায় গ্রামজুড়ে ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক। কেউ নিয়ে আসে হাঁড়ি-পাতিল, কেউ কুলা, টাইল, চালনী—এসব, কেউবা চোঙ্গা পিঠার বাঁশ। বাচ্চারা দৌড়ায় লাড্ডুওয়ালার পিছে। বধূ-বালিকারা ঘিরে বসে আলতা, স্নো, চুড়িওয়ালাকে নিয়ে। বিনিময়-মূল্য ধান। ফেরিওয়ালার বেতের পাত্রে মেপে মেপে দিতে হয়।
চারদিকে ধানের মৌ মৌ গন্ধ। নতুন চালের ঘ্রাণ। পিঠাপুলির আয়োজন। গ্রামজুড়ে চলছে আমনের মহোৎসব। রাতে বসছে পুঁথির আসর। জারি কিংবা পালা গানের মজমা। মসজিদে মসজিদে চলছে ওয়াজের এলান। গোল্লাছুটের দৌড়ে জমিনের খাড়া ন্যাড়া হয় ধরাশায়ী। ‘নুনতা বলোরে— এক হলো-রে…ইচিংবিচিং চিচিং চা…সুলতানা বিবিয়ানা— সাহেব বাবুর বৈঠকখানা…।’ কিংবা কানামাছি, ডাংগুলি, দাড়িয়াবান্ধা, কাবাডি—আরও কত কত খেলায় মেতে আছে পুরো মাঠ।
এদিকে কুঁয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে ঠকঠক করে গ্রামে ঢুকেছে শীতের বুড়ি। বউ-ঝিয়েরাও কম যায় না। তাকে দেখে আগে থেকেই বসেছে কাঁথা সেলাইয়ে। কেউ-বা সুই-সুতা দিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে ফুল, লতাপাতা, আল্পনা আঁকছে নক্সিকাঁথার মাঠে!
পুরো গ্রামে বয়ে চলছে হাসি-খুশি আর আনন্দের বন্যা। মেতেছে নবান্নের উৎসবে। ও পাড়ার মতিন মিয়ার বাড়ি মেয়ের বিয়ে লেগেছে। টেপ রেকর্ডারে উচ্চ ভলিয়মে গান বাজছে। সই-ভাবিরা মেহেদি তুলছে। পাড়ার মেয়েরা নেচে নেচে গাইছে বিয়ের গান-
‘আইলারে নয়া দামান, আসমানেরও তেরা
বিছানা বিছাইয়া দিলাম শাইল ধানের নেরা
ও দামান বও, দামান বও।
বও দামান কওরে কথা, খাওরে বাটার পান
যাইবার কথা কও যদি কাইট্যা রাখমু কান
ও দামান বও, দামান বও…’
এতো আনন্দ-উৎসবের ভীড়ে কে-বা খোঁজ রাখে ও বাড়ির বালিকা বধূর মনের খবর। বহুদিন হয় সে বাপের বাড়ি যায় নাই। কথা ছিল অঘ্রানে এসে নিয়ে যাবেন বাবা। এ পাড়ার মেয়েরা সব একে একে ‘নাইয়র’ এসেছে। এখানের বধূদেরকে তাদের বাপ-ভাই এসে নিয়ে গেছে। কিন্তু তার বাড়ি থেকে এখনো কেউ যে আসে না। ক্ষেতের কাজ কি এখনো শেষ হয়নি? প্রতিদিন সে ফিরে ফিরে তাকায় মেঠোপথের কিনারে। দূরে কোনো পথিককে আসতে দেখলে সে মনে করে এই বুঝি তার বাপ-ভাই কেউ আসছেন তাকে নাইয়র নিতে। সে অপলক তাকিয়ে থাকে। যখন দেখে সেই গেঁয়ো পথিক কিছুদূর এগিয়ে আবার অন্য পথে চলে যাচ্ছে, তার বুক ভেঙে যায়। নিরাশ হয়ে ফিরে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বালিশ ভিজায়। কেউ বুঝতে চায় না তার মনের ব্যথা!
লেখক : তরুণ গল্পকার, মৌলভীবাজার
সেপ্টেম্বর 2019

