দুঃখী মানুষের গল্প শোনি

সংখ্যা:

 

৪-৫-২০১৯, রাত সাড়ে এগারোটা

রাত দশটার দিকে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরছিলাম। অটোতে বসা। অপজিটে একজন মহিলা এবং তার স্বামী। সাথে ছোট একটা মেয়ে। গাড়িতে মেয়েমানুষ থাকলে আমার অস্বস্তি ও আড়ষ্টতা লাগে কেন যেন। মহিলাকে দেখে বিষণ্ন মনে হলো। অসুস্থতার ছাপ চোখেমুখে। চোখের কোণ বেয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়তে দেখলাম। খুব বেশি কি অসুস্থ?  স্বামী হঠাৎ বলে উঠলেন ‘দেখো, ব্যথা তোমার চেয়ে আমি কিন্তু কম পাইনি।’ বুঝলাম এটা অসুস্থতার অশ্রু নয়, এ ব্যথার অশ্রু। হৃদয়-ব্যাথার। যেখানে ব্যথা থাকলে দেখা যায় না, শুধু উপলব্ধি করা যায়। এবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন মহিলাটি। শিশুটি গরুর অবুঝ সরল চাহনির মতো উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মায়ের কোমল মিষ্টি চেহারার দিকে। আবিষ্কার করতে পারছে না কান্নার কারণ, কিংবা বুঝতেই পারছে না কেন কাঁদছে। স্বামী বেচারার চোখে জল নেই। তবে চেহারার অভিব্যক্তি থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে কষ্টের আগুনে।

মেয়েরা তো চোখের জলে কষ্টটা কিছুটা হলেও মানুষকে বোঝাতে পারে, কিন্তু পুরুষজাতি? বড় আজিব তারা। নিজের কষ্টটাকে কোনোদিন প্রকাশ করতে পারে না মানুষের সামনে। কান্নার ছলে ঘোচাতে পারে না ব্যথার জল। তাদেরকে যে কাঁদতে নেই। বরং কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতিতেও —যখন বুক ফেটে কান্না আসে, তাকে শান্ত থাকতে হয়। সান্ত্বনা দিতে হয় সকলকে। উপর থেকে দেখে বোঝার উপায় কী যে, এই মানুষটার ভেতরে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে! এই যুগলকে দেখে আমারও বেশ কষ্ট হলো। প্রথমে ভেবেছিলাম নিজেদের মধ্যেই কোনো ঝগড়া-টগড়া হয়েছে হয়তো। পরে বুঝতে পারলাম আসলে ব্যাপারটা তেমন না। তাদের মধ্যে বেশ মিল আছে। কষ্টের কারণ অন্য কিছু। স্বামীকে মনে হলো স্ত্রীর পক্ষেই রয়েছে। বারবার তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছে। কষ্টের মুহূর্তেও এই দৃশ্যটা দেখে আমার ভালো লাগল। সত্যিই, কোনো কষ্ট বা বিপদে স্বামী যদি স্ত্রীর পাশে থাকে তাহলে স্ত্রী বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখে, সাহস রাখে।

একবার মনে হলো জিজ্ঞেস করি তাদের মনখারাপের কারণ। কিন্তু অপরিচিতভাবে এমন জিজ্ঞেস করাটা অনুচিত। আমি চুপ কওে বসে থাকলাম। শুধু আফসোস হলো, জানতে না পারার কারণে। কেউ হয়তো বলতে পারেন এখানে আফসোসের কী আছে? আসলে সবকিছুতেই আমার প্রচণ্ড আগ্রহ। বড্ড কৌতূহলী এই আমি। সবকিছুর খুঁটিনাটি আমি জানতে চাই।

জীবনের কত রঙ! কত বৈচিত্রময় মানুষের জীবন। প্রত্যেকটা মানুষের জীবনের বাঁকে বাঁকে রয়েছে হাজারও গল্প৷ কিছু গল্প সুখের, কিছু দুঃখের। কিছু গল্প আনন্দের, কিছু আবার বেদনার।

আমার মনে চায়, সমস্ত মানুষের আলাদা আলাদা জীবনগুলো, তাদের নানান বর্ণের গল্পের জগতগুলোকে নিবিড় করে দীর্ঘ সময় নিয়ে, প্রাণমূলের স্পর্শ ছুঁয়ে ছুঁয়ে বের করে আনি, জানি।

মানুষের সুখের গল্প, আনন্দের গল্প—এগুলো আমার কাছে অনেক সময় ভালো লাগে না৷ বিরক্তিকর মনে হয়। কেউ এসে যখন তার সুখের গল্পগুলো বলে, সৌজন্যতা রক্ষার্থে কখনো হয়তো শুনি। তবে বিরক্তিবোধ হয়। কখনো আবার পুড়ি আফসোসের আগুনে। কিন্তু মানুষের দুঃখের গল্পগুলো আমার ভালো লাগে। ভালো লাগে যখন দেখি কেউ মনের ব্যথাগুলো, হৃদয়ের গহীনে জমা হাজারও কষ্টের গল্পগুলো আমাকে বলে কিছুটা হলেও নিজেকে হালকা বোধ করে, তৃপ্তি পায়।

সুখী মানুষের সুখের গল্প শোনানো আমাকে ওভাবে আনন্দ দেয় না, কিন্তু কোনো দুঃখী মানুষের মুখের সামান্য হাসির কারণ হতে পারাটাই আমাকে তুমুল আনন্দিত করে। আমি তৃপ্তি বোধ করি। পাশাপাশি শিখতে পারি অনেক কিছু। ঝুলিতে যুক্ত হয় কত অভিজ্ঞতা। শিখতে পারি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবন-বোধ। আমি এখান থেকেই নিই জীবনের শিক্ষা।

আমি এভাবেই শিখতে চাই, একজীবন শুনে যেতে চাই দুঃখী মানুষের গল্প। আছে কি কেউ, আমাকে শোনাবে তার এক পৃথিবীর দুঃখের কাহিনি?

 

মাদরাসাতুল উলুমিল ইসলামিয়া, সারুলিয়া, ডেমরা, ঢাকা

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১