দূর থেকে ডাক দিলাম—‘আফসিন’। সে আমার দিকে তাকায়নি। হয়তো ডাক তার কানে পৌঁছোয় নি। আমি কাছে গিয়ে তার পেছনে দাঁড়ালাম। সে একটি নতুন কবরের দিকে চেয়ে আছে। ওটা তার ছোটবোন আসলিহানের কবর। আফসিনের চোখে অশ্রু। মুখে বিন্দুবিন্দু ঘাম। যেন বুকের বিষাদ থেকে সৃষ্ট বাষ্পকণা। বুদ্বুদ ওঠার মতো আসলিহানের একেকটি স্মৃতি উঠছে আফসিনের মনের পটে, চোখের পাতায়। আসলিহান আফসিনকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করত। এই সম্বোধনটি শোনার জন্য আফসিন প্রতীক্ষা করত দুটি কারণে। তাকে ‘তুই’ ডাকার অপরাধে মা আসলিহানকে বকাঝকা দিতেন। অন্যদিকে আসলিহান ঝগড়া করতে গিয়ে আস্তিন গুটিয়ে আঙুল তুলে ‘তুই তুই’ বললে আফসিন মন থেকে এটা উপভোগ করত। এর জন্য আফসিন ইচ্ছে করেই আসলিহানের সঙ্গে কাজে-অকাজে ঝগড়া বাঁধাতো। একদিন আসলিহানকে আফসিন বলেছিল, ‘তোর মতো পাগলা ঝগড়াটে বোন আমার দরকার নেই। যত দ্রুত সম্ভব তোর বিয়ের ব্যবস্থা করা উচিত।’
কথাটা শুনে আসলিহান দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘর থেকে বটি নিয়ে আসে। অবোধ শিশুর মতো বলে, ‘তুই আমাকে বিয়ে দিয়ে দিবি! দাঁড়া তোকে আমি এই পৃথিবীতেই রাখব না।’
কী কাণ্ডটাই না ঘটিয়েছিল আসলিহান। সামান্য হলে আফসিনের গায়ে আঘাতটা লেগে যেত। এরপর কান ধরে এবং বিয়ে না দেওয়ার শর্তে মুক্তি পেয়েছিল আফসিন। ওই রাতে আসলিহান আফসিনের রুমে চুপিচুপি এসে কাচুমাচু করে বলেছিল, ‘ভাইয়া, আমি ভুল করেছি, তুই আমাকে ক্ষমা করে দে। আমার বেশ রাগ হয়েছিল, তাই…। আমি তোকে আর মাকে ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না। তুই কি আমাকে তোর কাছে রাখবি না?’
আফসিন বলেছিল, ‘ঠিকাছে! যদি আজকের মতো আর কোনোদিন এমন পাগলামি না করিস তবে রাখব। কিন্তু আফসিন তার কথা রাখতে পারেনি। আসলিহানকে তার কাছে রাখতে পারেনি। এই পৃথিবী যে শত বাধায় বাঁধা। শত কাঁটায় ঠাসা। তার অলিগলি বিষাক্ত ক্যাকটাসে ছাওয়া। এখানে কি সব কথা রাখা সম্ভব?
দেড়মাস আগে আসলিহান গুম হয়ে যায় তাদেও ব্যালকনি থেকে। পাঁচদিন পর তার লাশ পাওয়া যায় একটি ডোবার পাশে। দেহ ক্ষত-বিক্ষত। চুল এলোমেলো। ধর্ষণের আলামত স্পষ্ট।
গতরাতে আসলিহানকে স্বপ্নে দেখেছে আফসিন। তার গায়ে একটি সবুজ লেহেঙ্গা। আফসিনের কাছে এমনি একটি লেহেঙ্গার বায়না ধরেছিল আসলিহান। সামনের ঈদে কিনে দেবে বলে ওয়াদাও করেছিল আফসিন। কিন্তু তা আর কেনার প্রয়োজন হয়নি। ওপাওে নেয়ামত হিসেবে সবুজ লেহেঙ্গা পেয়ে গেছে আসলিহান।
আজ ঈদের জামাত শেষে আসলিহানের কবর জিয়ারতে এসেছে আফসিন।
‘আসলিহান! আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ তোকে শহিদ হিসেবে কবুল করেছেন। তুই মজলুম। পৃথিবীতে সর্বনিকৃষ্টতম আচরণ হয়েছে তোর সঙ্গে। পৃথিবীটা এমনই। এখানে যেমনি মানুষের প্রধান বন্ধু মানুষ, তেমনি মানুষের প্রধান শত্রুও মানুষ। তারচেয়ে বরং তুই ওখানেই ভালো আছিস। ওখানে কারও শত্রু কেউ নেই। আমি-আমরা সকলেই এই পথের যাত্রী। পার্থিব এ জীবনের পরে মাটিই যে আমাদের শেষ ঠিকানা।’
আমি আফসিনের কাঁধে হাত রাখলে সে আমার দিকে ফেরে। ‘ওরা সকলে অপেক্ষা করছে। চল, যাওয়া যাক।’ বললাম আফসিনকে।
‘আমার একটি বিশেষ কাজ আছে। তাদেরকে বলে দিয়ো আমি আসছি না।’ এই বলে আফসিন চলতে লাগে। যেতে থাকে দূর থেকে দূরে।
দুই
আমি চলে আসি রাশিদের বাড়ি। রাশিদ ইরানে একটি ইউনিভার্সিটিতে রসায়ন নিয়ে পড়ছে। ঈদ কাটাতে দেশে ফিরেছে রমজানের শুরুর দিকে। সালমান ও ফারহান আমার আগে সেখানে পৌঁছে গেছে। ফারহান আমাকে প্রশ্ন কওে, ‘কী রে! আফসিন কোথায়?’
‘তার বিশেষ কাজ আছে।’
‘ঈদের দিনে কী এমন বিশেষ কাজ?’
‘সেটা আমি জানি না। তবে আমি জানি আফসিন দিনদিন অন্যকিছু একটা হয়ে যাচ্ছে। আদালত থেকে সুষ্ঠু বিচার না পেলে কী করে বসে আল্লাহ মালুম।’
‘সুষ্ঠু বিচার নেই বলেই তো ধর্ষণের তালিকায় বাংলাদেশ দিনদিন উপরে উঠছে।’
‘ধর্ষণ বাড়ার পেছনে মেয়েদের হিজাবহীন চলাফেরাও দায়ী।’ বলল সালমান।
ফারহান একটি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, ‘বুঝি শুরু হলো তোর ওয়াজ। যদি পোশাকই ধর্ষণের কারণ হয় তাহলে আসলিহান কেন ধর্ষিতা হলো? সে তো হিজাব পরত। তাছাড়া তাকে তাদের ব্যালকনি থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল।’
‘তাহলে ধর্ষণের কারণটা কী?’
‘সেটা নারীর স্বাধীনতা, ক্ষমতায়ন আর আইন প্রয়োগের অভাব।’
‘আচ্ছা, তুই কী হ্যাশ-ট্যাগ মি-টু আন্দোলনের কথা জানিস?’
‘হু।’
‘সেখানে অ্যাঞ্জেলা জোলিসহ হলিউড-বলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী ও বিশ্বের অনেক ক্ষমতাবান নারী নিজেদের সঙ্গে ঘটা যৌনহেনস্থার কথা শেয়ার করেছেন। এমনকি খোদ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল ওখানে নাকি যৌন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থের লক্ষ্যেই চাকুরি দেওয়া হয় অল্পবয়সী মেয়েদের। যে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অনুসরণ করে পারিবারিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভীত গড়তে আমাদের বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী এক পায়ে খাড়া। তোর দাবি সত্য হলে স্বাধীনতা আর ক্ষমতার শীর্ষচূড়ায় অবস্থানরত সেই সব নারী ধর্ষিতা হতো না। বিশ্বব্যাপী আইন সাপ্লাইকারী প্রতিষ্ঠান ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠত না।’
ফারহানের ক্রমশ রাগ বাড়ছিলো। এটা তার অভ্যাস। যখন তর্কে যুক্তিতে হেরে যেতে বসে তখন তার রাগ বাড়তে থাকে।
আমি আমাদের সামনে রাখা একটি ক্যালেন্ডারের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। যার নিচের অংশে দিন-তারিখ আর উপরের অংশে একটা মেয়ের ছবি। আমি বললাম, ‘আজকাল ক্যালেন্ডার সাবান তেলসহ প্রায় সকল মুদিপণ্য এমনকি চকলেটের কাভারে নারীর ছবি ছাপা হচ্ছে। এসব পণ্যের সঙ্গে নারীর সৌন্দর্যটাও পণ্য হিসাবে বিক্রি হচ্ছে। আর এর বিনিময়ে ওই নারী মহানন্দে কিছু টাকা গ্রহণ করছেন। মডেল হচ্ছেন। ‘স্বার্থক’ ক্যারিয়ার গড়ছেন।’
ফারহান চোখ তুলে কিছু বলতে গিয়ে আটকে যায়। বুঝলাম সে এখানে আপত্তি করতে চায়। আমি বললাম, ‘ফারহান, তুই সহজ করে ক্রয়-বিক্রয়ের একটা সংজ্ঞা দে।’
‘ক্রয়-বিক্রয় হলো ক্রেতা-বিক্রেতার সম্মতিতে পণ্যের বিনিময়ে মালের আদান-প্রদান।’
‘তাহলে দেহ ব্যবসার নামে যখন শরীর বিক্রি হয় সেখানে পণ্য হচ্ছে দেহ?’
‘হুম।’
‘দেহ যখন পণ্য হচ্ছে তাহলে যেভাবেই দেহের বিনিময়ে টাকা আসবে সেটা দেহব্যবসা হবে। চাই রূপ-সৌন্দর্য পরিবেশন করে হোক বা শরীর ভোগ করতে দিয়ে হোক। সুতরাং মডেল স্টার বেশ্যা ইত্যাদি নাম গিয়ে একটি নামে একত্রিত হচ্ছে। সেটা হলো দেহব্যবসায়ী? এই বিজ্ঞাপন ভিত্তিক দেহব্যবসা জনমানুষের মনে খুব সূক্ষ্মভাবে রোপণ করে দিচ্ছে নারীকে পণ্য বা ভোগ্যবস্তু ভাবার বিভৎস চেতনা।’
ফারহান হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
আমি আবারও বলতে শুরু করলাম, ‘এভাবে সারাবিশ্বে সিনেমা নাটক গল্প উপন্যাস কবিতা—সবকিছুতে নারীকে উপস্থাপন করা হচ্ছে একটি ভোগ্যপণ্য হিসেবে। অতঃপর একটি শিশু এগুলো দেখে দেখে, এগুলো পড়ে পড়ে বড় হচ্ছে। তার সঙ্গে মনের মধ্যে বড় হচ্ছে নারীদেহ ভোগের বা ধর্ষণের একটি নিকৃষ্ট আকাঙ্ক্ষা।
‘কাজেই তোমরা যদি ধর্ষণের কারণ চিহ্নিত করতে চাও তাহলে ভাবতে হবে একজন ধর্ষকের মন নিয়ে। কেন এবং কোথা থেকে তার মনে এই চেতনা এলো। একজন জলজ্যান্ত মানুষকে কেন সে ভোগবস্তু ভাবতে গেল। ভাবতে হবে অশালীন পোশাকসহ যৌনতার প্রতি আকর্ষণ করে এমন সবকিছু নিয়ে। আইন ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। ভাবতে হবে আরও বহুকিছু নিয়ে। বিশ্বের যেসব দেশ এই নীতিগুলো অনুসরণ করছে সেসব দেশ ধর্ষণের তালিকায় অনেক নিম্নে আছে।’
রাশেদ বলল, ‘হ্যাঁ, ইরানে ধর্ষণের খবর আমি শেষ কবে শুনেছিলাম মনেই নেই।’
‘নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে কি ধর্ষণের জন্য দায়ী করা যায়?’ প্রশ্ন করে সালমান।
ফারহান চোখ ঘুরিয়ে বলে, ‘এটা হবে কেন? এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও নেই।’
‘একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে।’ বলল রাশেদ।
আমরা গুরুত্ব দিয়ে রাশেদের কথা শুনতে লাগলাম। ‘১৭৩৩ সালে চার্লস ফ্রাঁসোয়া দুফে নামে এক ফরাসি গবেষক দেখলেন আকর্ষণের শক্তি আছে দু’ধরনের। তিনি দেখলেন একটি কাঁচের দণ্ড আর একটি সিলমোহর করার গালারকে রেশম দিয়ে ঘষলে দুটিতেই বিদ্যুৎ জন্মায়। কাঁচের দণ্ড ছোট ছোট জিনিসকে আকর্ষণ করে আবার গালারও তেমনি আকর্ষণ করে।
‘মনে করা যাক বিদ্যুতযুক্ত দুটি কাঁচের দণ্ড রেশম দিয়ে কাছাকাছি ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। দেখা যাবে তারা পরস্পর দূরে সরে গেছে। অর্থাৎ তারা একে অন্যকে বিকর্ষণ করেছে। কিন্তু যদি একটি কাঁচের দণ্ড আর একটি গালারকে কাছাকাছি ঝুলিয়ে দেওয়া হয় দেখা যাবে তারা পরস্পর কাছে চলে এসেছে। অর্থাৎ তারা একে অন্যকে আকর্ষণ করেছে।
‘এই তত্ত্বের নিরিখে আমরা দেখতে পাই পদার্থের মধ্যে তার সমজাতীয় জিনিসকে বিকর্ষণ এবং বিপরীত জাতের জিনিসকে আকর্ষণ করার জন্মগত ক্ষমতা রয়েছে। এভাবে মানুষ মৌলিকভাবে নারী ও পুরুষ দুটি বিপরীত জাতে বিভাজ্য। তাই বিজ্ঞানের এই তত্ত্বমতে পুরুষ-নারী তারা একে অন্যকে আকর্ষণ করবে। যা হতে পারে ধর্ষণের কারণ।’
রাশিদের কথাগুলো সবাই নীরবে শুনছিলাম। নীরবতা ভেঙে ফারহান বলল, ‘বুঝলাম, কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন হলো, পদার্থের ব্যপারে প্রতিষ্ঠিত একটি তত্ত্ব মানুষের ওপর প্রয়োগ করা কীভাবে শুদ্ধ হবে?’
রাশিদ জবাব দিল, ‘পদার্থের রূপান্তরিত প্রক্রিয়া থেকেই এসেছে বর্তমান মানুষের রূপ। তাছাড়া প্রাকৃতিক নিয়মে মানুষসহ সকল জীব তার বিপরীত জাতকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা খুবই প্রবলভাবে বিরাজমান।’
‘আর বলতে হবে না। ধর্ষণের কারণ হিসেবে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকেও দায়ী করতে আমার কোনো আপত্তি নেই।’ আত্মসমর্পণের সুরে বলল ফারহান।
রাশিদের মা আমাদের জন্য চা-নাস্তা পাঠিয়েছেন। আমরা চায়ের সঙ্গে দেশ-বিদেশের নানান কথাবার্তা চিবাচ্ছি। আমার মোবাইলে একটি ফোন আসে। ওপাশ থেকে কেউ একজন বলে আফসিনকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। আমরা হুড়োহুড়ি করে বাইরে বের হই। দৌড়োই আফসিনের দিকে।
তিন
আমরা বাজার পয়েন্টে এসে দেখি মানুষের ভিড়ে আফসিনকে ধরে রেখেছে কয়েকজন পুলিশ। তার হাতে দণ্ড। শার্টে রক্তের দাগ। পাশে দুটি লাশ। উভয় লাশের গলায় ঝুলানো একটি করে চিরকুট। ‘আমি একজন ধর্ষণকারী। একজন হত্যাকারী। এমন কাজের পরিণতি এটাই হওয়া উচিত।’ (হারকিউলিস)।
আফসিন তার বোনের ধর্ষকদের বিচারের কাঠগড়ায় আনতে চেয়েছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল তিনজন অভিযুক্ত আসামির মধ্যে একজন ছিল স্থানীয় এমপি সাহেবের দুঃসম্পর্কে ভাগিনা—রমিজ। ওই এমপি সাহেব নাকি থানায় বলে দিয়েছিলেন তাঁর ভাগিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। মামলা দিয়ে মানহানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার ভাগিনার বিরুদ্ধে যেন কোনো অভিযোগ গ্রহণ করা না হয়। এ জন্য ওসি সাহেব প্রথমে আসলিহানের মামলা থেকে রমিজের নাম কেটে দিতে চাইলেন। পরে আফসিনের পিড়াপিড়িতে রমিজকেও আসামি করা হলো ঠিক কিন্তু মামলার কাজ থেমে গেল।
আফসিন থানায় যায়-আসে। ওসি সাহেব বলতে থাকেন কাজ হচ্ছে-হবে। শেষদিকে আফসিনের সঙ্গে থানার লোকেরা বাজে আচরণ করতে শুরু করে। আসলিহান হত্যার দেড়মাস কেটে যায়। একজন আসামিও গ্রেপ্তার হয়নি। বরং অভিযুক্ত আসামিরা বুক ফুলিয়ে হাঁটতে থাকে জনপদে। রমিজ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পথঘাটে আফসিনকে পেলে চোখ টিপ্পনী দেয়।
একদিন রমিজ বলেই ফেলে, ‘কীরে বেটা, বোনের মামলা কত দূর নিলি? তোর বোনকে তো আমি প্রপোজ করেছিলাম। ভালোবেসে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোর বোন আমাকে যে অপমান করেছিল তা আজও আমাকে পীড়া দেয়। এখন তুইও আমাকে মামলায় ঢুকিয়ে দিলি। আচ্ছা বল তো, যার জন্য মন থেকে ভালোবাসা জন্ম নেয় তাকে কি হত্যা করা যায়?’
আফসিনকে থানায় নেওয়া হয়। পরদিন রমিজ ও তার বন্ধুর হত্যামামলা দেখিয়ে পাঠানো হয় হাজতে।
আফসিনের পৃথিবীতে আসলিহান আর তার মা ছাড়া আপনজন বলতে কেবল আমরা কয়েক বন্ধু ছিলাম। শৈশবে বাবাহারানো ছেলেটি বড় হয়েছিল বহু ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে। কিন্তু এবারের ঘাত থেকে হয়তো তাকে আর রক্ষা করা গেল না।
আফসিনকে হাজতে পাঠানোর ২০ দিন পর আমাদের গ্রামে আরেকজন মেয়ে ধর্ষিতা হয়। তবে তাকে হত্যা করার আগেই তার পরিবার গিয়ে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। অতঃপর ওই মেয়ের করা মামলায় আটক করা হয় একজন ধর্ষককে। রিমাণ্ডের পর জানা যায় সে আসলিহানকেও ধর্ষণ করে হত্যা করেছিল।
এ কথা প্রকাশের পর এমপি সাহেব ও রমিজের আত্মীয়-স্বজনের ক্ষোভ আরও বাড়ে আফসিনের ওপর। তারা দ্রুত আফসিনের ফাঁসির ব্যবস্থা করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। নয় মাসের মাথায় রমিজ ও তার বন্ধুকে হত্যার দায়ে আফসিনের ফাঁসির আদেশ হয়। এর কিছুদিন পর আদেশ কার্যকরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জেলের ফটক থেকে তার লাশ গ্রহণ করতে নোটিশ পাঠানো হয়।
আফসিনের মা, আমি ও সালমান একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যাই কারাফটকে। আফসিনের সঙ্গে শেষদেখা করতে আমরা প্রবেশ করি ভেতরে। সে দাঁড়িয়ে আছে গাছের মতো। তার স্তব্ধ চোখ-মুখ থেকে বেরুচ্ছে পৃথিবীর প্রতি নীরব ঘৃণা।
আফসিনেন মা বললেন, ‘বাবা, তুই কি সত্যি রমিজ ও তার বন্ধুকে খুন করেছিলি?’
‘মা, আমি ঈদের রাতে আসলিহানকে স্বপ্নে দেখার পর খুব অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। পরদিন ঈদের নামাজের পর কোথা থেকে একটি চিরকুট আমার কোলে এসে পড়ে। সেখানে লেখা ছিল তোমার বোনের ধর্ষক ও হত্যাকারীকে আজ দুপুরে বাজারের পেছনে হত্যা করা হবে। তাই দুপুরের দিকে আমি ওখানে যাই। গিয়ে দেখি রমিজ ও তার বন্ধুর রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। আমি ঘটনা কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। রমিজের শরীরে হাত দিই। এতে তার শরীর থেকে কিছু রক্ত আমার হাতে ও কাপড়ে লাগে যায় এবং ফিঙ্গার ছাপ মিশে যায় রমিজের শরীরে। ততক্ষণে মানুষ এসে আমাকে ঘিরে ধরে। ভাবতে থাকে আমিই খুনি।’
‘বাবা, তুই এ কথা আদালতে বলিসনি কেন?’
‘বলেছি, মা! কত বার বলেছি! কিন্তু এাঁ তো সত্য, রমিজের শরীরে সর্বশেষ আমার ফিঙ্গার ছাপ মিশেছিল এবং তার রক্তও আমার গায়ে পাওয়া গিয়েছিল। দুনিয়ার আদালতে ফাঁসি হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।’
সালমান বলল, ‘তাহলে ওদের আসল হত্যাকারী কে?’
‘হারকিউলিস।’ উদাস কণ্ঠে বলল আফসিন।
প্রহরী আমাদের বের হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। আফসিন আমার হাত ধরে বলে, ‘আমার মাকে তুই মা বলে ডাকিস। সকল পরিস্থিতিতে দেখে রাখিস।’
‘কান্না দমিয়ে রেখে আমি কেনো মতে বললাম, ‘ইনশাআল্লাহ।’
আমরা বের হয়ে আসি। আফসিন টলমল চোখে তাকিয়ে থাকে। দরজার ওপাশে আফসিনের কণ্ঠ আসে, ‘মা আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’
ফটকের সামনে এসে আমরা অপেক্ষা করতে থাকি। সালমান বলে, ‘হারকিউলিসটা আসলে কে, নিরপরাধ আফসিনকে যে ফাঁসির কাষ্ঠে পৌঁছে দিলো?’
আমি বললাম, ‘মানুষ আইনের শাসন থেকে নিরাশ হয়ে গেলে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে চায়। হারকিউলিস ওরকমই একটা কিছু হয়তো। কিন্তু ভুল পথে হেঁটে কখনই মেওয়া বাগানে পৌঁছা যায় না। ফলে তাদের নামও লিখিত হয় ইতিহাসের কলঙ্কময় পাতায়।’
ভোর ছয়টায় আফসিনের লাশ আমাদের হাতে দেওয়া হয়। আসলিহানের কবরের পাশে আমরা তাকে দাফন করি।
পৃথিবীর নিয়মে পৃথিবীতে আলো ফোটে। পাখি ডাকে। হাওয়া বয়। ঈদ আসে। ঈদ যায়। কেবল আসে না আসলিহান। আসে না আফসিন। কেনা হয় না ঈদের পোশাক সবুজ লেহেঙ্গা।
ইমাম আবু হানিফা ইনিস্টিটিউট, সাগর দিঘীরপার, সিলেট
ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

