প্রতীক্ষাকাল

সংখ্যা:

 

নগরীর উপকণ্ঠে পূর্ত ভবনের পাশে মনোহর যে মসজিদটি সেখানে নামাজের সময় ছাড়াও মানুষজন আসে। বিশেষ করে অবসর বিকেলে সময় কাটানোর জন্যও বহু লোকের সমাগম হয় সেখানে। বিশাল দেয়াল-ঘেরা মসজিদের পুকুর, পুকুর পাড়ের চারদিকে ছায়াদার বৃক্ষের নিচে অনেক মুসল্লি আসে নগর-জীবনের অবসাদ ঘোচাতে। পুকুরের বাঁধানো সিঁড়িতেও বসে বসে তারা গল্প করে। পুকুর-ঘাটে মাছের ঝাঁক দেখার জন্য কেউ কেউ আসার সময় নিয়ে আসে খানিক মুড়িও। একমুঠো মুড়ি ছুড়ে দিলেই শুরু হয় মাছেদের লোফালুফি। এটা দেখে তারা আনন্দ পায়।

এ মসজিদের খতিব মুফতি বদরুদ্দিন সাহেব। তিনি দেশের নাম করা একজন আলেম। প্রতি শুক্রবারে এসে জুমার নামাজটা পড়ান। দারুল উলুম দেওবন্দ, মদিনা ভার্সিটি পাশ করা মধ্য বয়সি এ আলেম এখানকার মানুষের কাছে খুবই শ্রদ্ধাভাজন। তিনি সরকারি সনদপ্রাপ্ত দেশের রেজিস্টার্ড মুফতিদেরও একজন। দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ তাঁর কাছে আসে দুআ নিতে। মাসআলাগত কিছু জিজ্ঞেস থাকলে তিনি অতি সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন। কেউ কেউ আসে তেলপড়া, পানিপড়ার জন্যও। তবে এসবে তাঁর বেশ অস্বস্তি থাকলেও কাউকে হতাশ করতে দেখা যায় না। তিনি মনে করেন মানুষ সান্ত¦নার জন্য আসে তিনি সান্ত¦নাটাই দেন। অসুখ-বিসুখের জন্য পরামর্শ দেন অনর্থক অর্থ ও সময় নষ্ট না করে ভালো ডাক্তারের শরণাপন্ন হবার। তাঁর কাছ থেকে মানুষ সব সময় ভালো পরামর্শটাই পায়।

মসজিদের পুকুরপাড়ের এক কোণে দেবদারু গাছের নিচে অনেকক্ষণ যাবত একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত দু হাঁটুতে হাত বেঁধে বসায় তাঁকে বেশ আত্মমগ্ন কিংবা চিন্তিত দেখাচ্ছে। তিনি এসেছেন মুফতি বদরুদ্দিন সাহেবের কাছে। বেশ দূর থেকে এসেছেন একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে। তবে মুফতি সাহেব কোনো একটি বাসায় দাওয়াতে থাকায় আসতে বিলম্ব হচ্ছে। তাঁর না আসা পর্যন্ত এভাবে বসে অপেক্ষায় কাটাতে হচ্ছে এই বৃদ্ধকে।

এই বৃদ্ধ মানুষটাকে এখানকার উপস্থিত কেউ হয়তো না চিনলেও তিনি হচ্ছেন কুলাউড়া কলেজের দর্শন বিভাগের একসময়কার তুখোড় শিক্ষক ফরাজ উদ্দিন স্যার। দেশ-বিদেশের বহু জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাঁর ছাত্ররা। গুণমুগ্ধ ছাত্রদের মুখে আজও ফরাজ উদ্দিন স্যারের প্রশংসার খই ফোটে। অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক একসময় অনেককিছু তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেও আজ তিনি পরিস্থিতির শিকার। নিজেকে সামান্য প্রবোধ দিতে আশ্রয়  নিতে হয়েছে অনেক ছলনারও। তন্ত্র-মন্ত্র, ঝাঁড়-ফুঁক এসবে তাঁর তীব্র অবিশ্বাস থাকলেও কালের দুর্বিপাকে পড়ে  সামান্য আশ্বাস কিংবা সান্ত¦না খুঁজতে সে-সব জায়গায়ও তাঁকে যেতে হয়েছে। যেমন, কেউ তাঁকে এসে বলেছে অমুক জায়গায় এক তান্ত্রিক কবিরাজ আছে, অনেকেই বিভিন্ন সমস্যার জন্য যায়। ঐখানে এক জিন-সাধক আছে, যে কিনা জিনের মাধ্যমে অনেক কিছু বলে দিতে পারে! মিথ্যা-ধোঁকা জ্ঞান রেখেও যে যেখানে বলেছে এমন অনেক জায়গায় মেয়েকে নিয়ে গিয়েছেন। সাধ্যমতো কোনো চেষ্টা বাদ রাখেননি তিনি। ব্যর্থ হয়ে আশা, সান্ত¦না, ছলনার মধ্যে খুঁজেছেন বেঁচে থাকার মতো ভর। জীবনকে দাঁড় করিয়ে রাখতে একটা স্পেস তাঁর দরকার। যে স্পেসেই গিয়ে তিনি প্রদীপ জ্বালান, হতাশা এসে সেখানে হানা দিয়ে নিভিয়ে দেয়। তখন তাঁকে আরেকটি স্পেস খুঁজতে হয়। এসব যতটা না তাঁর নিজের জন্য, তারচেয়েও বেশি মেয়েটার প্রয়োজনে।

চোখের সামনে আপন মেয়ের এমন দুর্দশা কোন বাবারই-বা সহ্য হবে? কে-বা ভেবেছিল তাঁর এমন আদুরে মেয়ের ভাগ্যে নেমে আসবে এমন বিষাদ শর্বরী!

মুক্তিযোদ্ধা বাবার সন্তান। সম্ভ্রান্ত পরিবার। শিক্ষিত, স্মার্ট, ভদ্র-সজ্জন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত পরোপকারী ছেলে। সবার প্রিয়জন সে। প্রস্তাব পেয়ে দ্বিমত করেননি ফরাজ উদ্দিন সাহেব। মেয়ে ইকোনমিকসের ছাত্রী। পাঠ না চুকিয়েই তিনি মেয়েকে বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে দেন। ছেলে-পক্ষ বলেছে, মেয়ে যতদূর লেখাপড়া করতে চায় সে দায়িত্ব তাদের। সে-কথা তারা রেখেছেও। বিয়ের পর সংসারের কাজ-কর্মে না জড়িয়ে লেখাপড়ার প্রতি গুরুত্ব দেয় তারা। কোনো কিছুর অভাব ছিল না মেয়ের দাম্পত্য জীবনে। স্বামী তার মোটর বাইকের পেছনে বসিয়ে কলেজে পৌঁছে দিত। আবার নিয়ে আসত। কোনোদিন এমনও হতো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে থাকত অপেক্ষায়। দুজনের সম্পর্ক এমনভাবে জমেছিল যেন হাজার বছরের পরিচয়ের সূত্রে তারা দুজন দুজনার মাঝে মিশে একাকার হয়ে গেছে। কী প্রেমময় জুটি! সবাই বলত বেশ মানিয়েছে দুজনকে। পিতা ফরাজ উদ্দিন একমাত্র মেয়েকে যথাযোগ্য পাত্রের হাতে তুলে দিতে পেরে নিজেকে করেছিলেন নির্ভার, নিশ্চিন্ত। বলতেন, মেয়ের সুখ আমার সুখ। এমনভাবে চললে মরে গিয়েও তাঁর আর কোনো দুঃখ নেই।

সবকিছুই তো ঠিকঠাক ছিল। এমন উজ্জ্বল ফকফকা আকাশ হঠাৎ করে কালো মেঘ আর অমাবশ্যায় ঘোর হয়ে যাবে তা কে গুনেছিল?

সেদিন সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে তার স্বামী বাসা থেকে বের হয়েছিল। রাতে পুষ্পিতার মোবাইলে একটা এসএমএস আসে—‘ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন লোক আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’

এটুকুই। তারপর থেকে মোবাইলটিও বন্ধ। মানুষটিও নিখোঁজ!

গত তিন বছরে পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি এমন কোনো সংস্থা বাদ রাখেননি। দেশের সকল থানা, জেলা সম্ভাব্য সব জায়গায় তাঁরা খোঁজ নিয়েছেন। কোনো সন্ধান মেলেনি। মিডিয়াতেও এ নিয়ে অনেক নিউজ হয়েছে। যতজন যত পরামর্শ দিয়েছে শুনেছেন। যে যে জায়গায় বলেছে, গিয়েছেন। বিভিন্নভাবে পাত্তা লাগিয়েও কোনো কাজ হয়নি। পুলিশও অনেক চেষ্টা করেছে কিছুতেই কিছু হয়নি।

তিন বছর গত হয়ে গেলেও পুষ্পিতা এখনো তার স্বামীর প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছে। স্বামীকে মুছতে পারেনি একটি বারের জন্যও। স্বামীর জন্য কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। একলা নিশীথে বালিশ ভিজেছে তার দু নয়নের জলে। চোখের জল ফুরিয়ে গেছে, সে আজও অপেক্ষা করে তার স্বামী আসবে। রাত জেগে থাকে আশায় আশায়, হঠাৎ তার স্বামী এসে বলবে—দরজা খোলো পুষ্পিতা, আমি যে এসেছি! এমনও হয়েছে মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তার স্বামী নাকি এই মাত্র এসে তাকে ডেকেছে! সেদিনের বাগানে ফোটা ভোরের তরতাজা ফুলের মতো মেয়েটার দিকে তাকালে আজ সবার মনটা ব্যথাতুর ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

ফরাজ উদ্দিন সাহেব সেদিন যখন মেয়েকে তার স্বামীর বাড়ি থেকে আনতে গিয়েছিলেন তার বেয়াই কিছুক্ষণের জন্য পাথর হয়ে যান!

‘মেয়েকে নিয়ে যেতে চান বেয়াই সাহেব, না করব না। তবে আমার একটা কথা আছে। মেয়েটা শুধু আপনার দাবি করে বসবেন না। মেয়েটা আমারও। আপনার ওখানেও থাকবে, আমার এখানেও থাকবে। আমি যদি আনতে যাই, আপনি না করবেন না বেয়াই সাহেব…। আমার কপাল, সব আমার কপাল বেয়াই সাহেব…।’ দু হাত জোড় করে বুকে মাথা আছড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। জড়াজড়ি কান্নায় সেদিন আবারও বাড়িতে নেমে এসেছিল শব্দিত শোক আর অশ্রুর বর্ষা।

‘মাইনষে কয় একদিন না একদিন ফিরে আসবে। তারা নজির দেখায়, অমুক জায়গায় এক ব্যক্তি এভাবে দুবছর গুম ছিল। তারপর তাকে পাওয়া যায় ভারতের কোনো এক এলাকায়। আরেক জায়গার আরো কাকে নাকি একবছর গুম রেখে একদিন তাকে কে বা কারা রাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে যায়।’

মানুষজন এমন অনেক ঘটনার উপমা টেনে বুঝায়। ফরাজ উদ্দিন এসবে আর বিশ্বাস করতে চান না। এ সবই মিথ্যা সান্ত¦না। গত তিন বছরে তিনি নিজেও মেয়ের সাথে মিথ্যা সান্ত¦না আর ছলনার খেলা কম খেলেননি। আর কত? এখন আর পারছেন না। তিনটি বছরে কি কম সময় গড়িয়েছে? এ তিন বছরে পৃথিবীতে কতবার সূর্য উঠেছে, কতবার অস্ত গিয়েছে। কত মানুষ জন্মেছে, কত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। কতকিছুই না ঘটে গেছে পৃথিবীতে, কে তার হিসেব রাখে?

এখন আর আগের মতো তাঁর মনের জোরটাও নেই। যতটা না বয়সের ভারে, দুঃশ্চিন্তার বোঝায় তারচেয়েও বেশি ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন তিনি। কয়দিন বা আর বাঁচবেন। মেয়ের একটা বিহিত না করে গেলে মরেও যে শান্তি পাবেন না! তার জীবন, তার প্রেম অন্যে একজনের মাঝে হলেও জীবিত থাকুক। মেয়েটা সব ভুলে আবার জীবন শুরু করুক নতুন করে। তিনি এমনটা ভাবছিলেন কিন্তু মুখ খুলে বলতে পারছিলেন না। কয়দিন আগে পুষ্পিতার শশুড় এসেছিলেন। তিনিও বলেছেন—‘সব বুঝি বেয়াই সাহেব, সব বুঝি। মেয়েটারও একটা ভবিষ্যৎ আছে। কপালের এমন লিখন ছিল কে জানত? আমার ছেলেটা বেঁচে আছে না মরে গেছে তাও জানি না…।’ চোখ মুছতে মুছতে বলেন—‘বেয়াই সাহেব, মেয়ে যতটা আপনার ততটা আমারও। ভালো কোনো জায়গা যদি পান, আমার কোনো আপত্তি নাই।’

কিন্তু পুষ্পিতাকে এ ব্যাপারে সহজে রাজি করানো যাচ্ছে না।

‘এটা কী বলছেন, আমার স্বামী তো আমাকে তালাক দেয়নি। সে যে মারা গেছে তা কি করে নিশ্চিত হই? একজনের বিবাহিত স্ত্রীকে আপনারা কেমন করে অন্যজনের সাথে বিয়ে দেবেন?’

বোকা মেয়ে কি এখনো মনে করে যে তার স্বামী আসবে? শিক্ষিত মেয়ে। কিছু যে বুঝে না তাও তো না। শুধু শুধু এমন অজুহাত কেন? আর যদি হয়েও থাকে সে যা ভাবছে তাহলে সেটাও ভেঙে দেবেন ফরাজ উদ্দিন। একজন স্ত্রী, যার স্বামী গুম হয়ে গেছে, বছরের পর বছর যার কোনো খোঁজই নেই, এমন স্বামীর জন্য স্ত্রী কতদিন অপেক্ষা করবে? দেশের নির্ভরযোগ্য কোনো মুফতি, কাজিকে জিজ্ঞেস করে ধর্মের বিধানটাও তিনি মেয়েকে জানিয়ে দেবেন।

ফরাজ উদ্দিন স্যারের মন আবারও ভারাক্রান্ত হয়ে ঢুকরে ওঠে—‘…হুজুর আমরা সংসার, সমাজ নিয়ে বসবাস করি। ধর্মকর্ম ঠিকমতো পালন না করলেও মেনে চলার চেষ্টা করি। আল্লাহর কাছে অনেক কেঁদেছি, আজও ফরিয়াদ জানাই…। তিনটি বছর হুজুর, তিনটি বছর হয়ে গেল কোনো সন্ধান নেই। আমরা জানি না ছেলেটা মরে গেছে না বেঁচে আছে। আর আমার মেয়েটা…!’ ফরাজ উদ্দিন স্যার হু-হু করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মুফতি বদরুদ্দিন সাহেব তাঁকে সামলে বুকে টেনে নিলেন। তাঁর মাথা-পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে নির্বাক তাকিয়ে রইলেন সুদূর আকাশের দিকে। তাঁরও দু চোখ অশ্রুতে টল টল।

 

লেখক : তরুণ গল্পকার, মৌলভীবাজার

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১