প্রবাসযাত্রার গল্প ও আরবের দিনলিপি

সংখ্যা:

 

মার্চের নয় তারিখ ক্রমশ ঘনিয়ে আসছিল আমার দিকে। চোখের পলকে দিনগুলো ফুরিয়ে এলো বুঝি। মৃদু শীত ও পড়ি পড়ি গরমের আবহে কিছুটা নাতিশীতোষ্ণ সময়। ফেব্রুয়ারির হুল্লোড়ে কোনোরকম ভুলে ছিলাম ছেড়ে যাবার কথা। জগদ্দল পাথরটা ততদিন দূরেই ছিল। সুদূর কোনো ভূমি, মরুভূমি কিবা পাহাড় চূড়ায়। ভাবতেই চাইনি আজন্ম সবুজ ছায়াবীথি গ্রাম, জলডোবা পুকুর, পাখির ডাক, আম্মা ও ফুলের মুখ দুটি ছেড়ে কোথাও যেতে হবে। ব্যক্তিজীবনে আড্ডা ও কাফেতে কবিতার চরণ উল্টে নির্ঘুম রাত্রিযাপন চির-বোহেমিয়ান আমি কিছুটা বাৎসল্যপরায়ণ। চরিত্রগুণ কি অকৃত্রিমতা—যাহোক বন্ধুভাগ্য আমার বরাবরই ভালো। ছোট্টকালে ভবিষ্যৎ পণ্ডিত বানাবার অভিপ্রায়ে বাবা-মা তাঁদের প্রথম পুত্র সন্তানকে সেই যে ঘরছাড়া করলেন, এখনও ফিরতে পারলাম কই? প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ চুকোবার প্রথম দিনই চাকুরি। তারপর ছ’মাস না যেতেই এ আরবভূমিতে চির আড্ডাপ্রিয় বন্ধুবাজ যুবকের নিঃসঙ্গ যাপন। (কোনোদিন পুস্তক রচনা হোক না হোক আত্মজীবনী আমি লিখবোই, সেখানেই দেব ও দেবীতুল্য আমার বন্ধু ও বান্ধবীদের কথা লিখবো বলে সঙ্গত কারণেই এ রচনায় তা এড়িয়ে গেলাম)।

সেদিন বৃহস্পতিবার। কুসুমিত ভোরটা এক ডুবে পার হয়ে গেল দেখলাম। বাবা কিছুক্ষণ কেঁদেকুটে বিদায় হলে দ্রুত ছাদে গিয়ে স্বস্তিতে কাঁদলাম। মা তো রাজ্যের ব্যস্ততা নিয়ে ঘুরছেন। কী নিলাম আর কী রাখলাম ওই খোঁজে হণ্য। সারা বাাড়তে যেন গোছগাছের ধুম পড়েছে। কে জানে কেন অভিমান হলো! রাগ হলো খুব। মনে মনে ভাবলাম, আমাকে তাড়াবার কি উচ্ছ্বাস তাদের। একটিবার যদি আমার ভেতরটা দেখত কেউ—কী বইছে ওখানে!

যাকগে, তা গোছগাছে লাগেজ ভরেটরে তিনটিতে গিয়ে ঠেকলো। তাতে বস্ত্র ও প্রয়োজনীয় আসবাব থেকে বই-পুস্তকই যে বেশি তা বলে আর বিদ্যাপতি সাজছিনে। তারপর ঝিম দুপুরের একটু আগে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়লাম। এমনিতে আমার বাড়ি আসা হতো নিতান্তই গুণে গুণে। এমন অনেক হয়েছে, তিনচার কিস্তি বাবার আর্তনাদ শুনে তবেই বাড়ি এসেছি। কিন্তু সেদিন, সেদিন যে আমার ঘরটা, বইয়ের আলমারি ক’টা, শোবার খাটটা আমাকে ক্রমাগত গলা টিপে ধরছিল, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল কী এক গোপন অসহ্য ও ব্যথায়, তা আমার জানা নেই। তবু শ্লথ, নিঝঝুম, বাক্যহীন বিষণ্ন পথিকের মতো হেঁটে হেঁটে গাড়িতে উঠলাম। আমি সামনে ড্রাইভারের পাশে। পেছনে আম্মা, খালামণি, বড়োআপা, ভাগ্নী ও ছোটোভাইয়েরা। খোলা রাস্তা ধরে মাইক্রো চলছে।

বাম পাশের লুকিং গ্লাসে হঠাৎ দেখি আম্মার মুখ। সেখানে এমন মেঘ, যেন তাবত পৃথিবী ধ্বসে যাবার পূর্বে আকাশে তারই প্রলয়মূর্তি। আর তার ভারে আকাশটা ভেঙে পড়ছে। ঠিক তেমনই আমার মা ভেঙে পড়ছেন। তার জলটলমল চোখের সে কাঁপনে মনে হলো প্রবল ঝড়ে যেন জানালার কপাট দুটি মেলছে আর ঠাসঠাস বন্ধ হচ্ছে। এই দেখে সেই যে চোখ বন্ধ করলাম, ঘণ্টা দুই পরে একদম এয়ারপোর্টে এসে তবেই পাতা দুটি মেলে ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসা পৃথিবীটা দেখতে পেরেছিলাম।

বেলা যায়। আমার এক যুগের পরিচিত ঢাকাটি কেমন বিষাদে ঘেরা। বিকেল হাঁটছে অন্তপুরীতে। বন্ধুদের কথা বলেছিলাম, আমার একটা জীবন যাদের কাছে তুলে দিতে পারি, একেএকে তাদের অনেকেই এলো। কে আমি, কীই-বা দিয়েছি তাদের, অথচ তারা এলো। কেউ কেউ চকিতে চোখটাও মুছে নিল অলক্ষে। কিন্তু সেদিন কি আর ফাঁকি দেয়া যায়? দেখে ফেলি। আর ভাবি এই অস্তমান সূর্যটা আরেকটু ধীর হোক। একদিন সন্ধ্যা না নামুক। আমরা এভাবেই একটি বিকেলে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই। আমাদের একছত্র পদচ্ছাপের গল্প বলে বলেই কাটাতে পারি এ বিরহী মায়াবেলার অনুরাগ। কিন্তু এ লহমার আবেগ যতটা করুণ তার চেয়ে প্রকৃত বিষয়টি হলো আমাকে যেতে হবে। আর ফিরতে হবে আমার সকল আত্মীয়দের। তারা ফেরে না। আমিই বরং ঢুকে যাই এয়ারপোর্টের বদ্ধ লাউঞ্জে। কে নিষ্ঠুর? আমি না তারা? সময় ও জীবনের কোনো বিপর্যস্ত কাল কখনো কখনো এমন প্রশ্ন রেখে যায়। যা মেনেই হয়তো চলতে হয় আমাদের। তেমনই করুণ ও অস্বস্তিভরা সন্ধ্যাটা কাটিয়ে রাত দশটার ফ্লাইটে চড়লাম। গন্তব্য দুবাই, শারজাহ। সেখানে ঘণ্টা ছয়ের ট্রানজিট শেষে আভা। আমার কর্মক্ষেত্র।

দুরুদুরু বুক। গহীনে চাপা নিঃশ্বাসটা ছেড়ে আলোজ্বলা ঢাকাকে দেখলাম জানালার কাঁচ দিয়ে। তারপর আর কী! ব্যাগ থেকে গোলাম মোস্তফার ‘বিশ্বনবী’টি বার করে পুনর্পাঠ শুরু করলাম। মহাপুরুষের দেশে যাই, পথে পথে তাঁকে ভাবি। বহুবছর আগে মওলানা আবু তাহের মেসবাহ সাহেবের অনুবাদকৃত গুরুদত্ত সিংয়ের ‘তোমাকে ভালোবাসি হে নবী’ পড়ে যেমন আপ্লুত হয়েছিলাম, আজ তেমনই হচ্ছি। কী মসৃণ বিভোরতায় ডুবে যাচ্ছি আমি। ভাবালুতার গহীন অরণ্যে হেঁটে এই বুঝি পালিয়ে যাচ্ছি কোনো যাজকের মতো। ইবনে হিশামের ‘সিরাতে ইবনে হিশাম’, ইদরিস কান্ধলভির ‘সিরাতে মুস্তফা’ পুস্তকক’টিও তো অধমের পড়া। কিন্তু গোলাম মোস্তফার এই বই আগে একবার পড়ার পরও কী মনে করে যে ব্যাগে ভরলাম! কী গদ্য, কি প্রেম, বাক্যের কী গাঁথুনি আর সহজাত কাব্যিকতার কী অদ্ভূত উপমা সব! বাংলাসাহিত্যে বোধকরি রাসুলের জীবনভিত্তিক এরচেয়ে উচ্চমার্গীয় কোনো পুস্তক এখনো রচিত হয়নি। ইনি হয়তো শাস্ত্রীয় কোনো পণ্ডিত নন, কিন্তু একজন কবি তাঁর হৃদয়োৎসারিত প্রেমের নৈবদ্য যখন অঞ্জলি ভরে পেশ করেন তাঁর ভাষায়, তাঁর আকুলতায়, তাঁর মর্মে মর্মে উপলব্ধ পবিত্র গচ্ছিত সে-প্রেম, তা তো পাঠককে নাড়া দেবেই। সমস্ত বায়বীয়তাকে তছনছ করে কোনো এক নিঃসীম অনুভবে পাঠিয়ে দেবে ছত্রে ছত্রে। বিদ্যে তো নেই-ই, সাকুল্যে একআনা, ততধিক অক্ষমতা প্রকাশে, নইলে সেসময় নবিজিকে অনুভবের কিঞ্চিতও তুলে ধরার ব্যর্থ চেষ্টাটি করতুম।

রাত দুটো নাগাদ শারজাহ পৌঁছি। এখান থেকে সকাল আটটায় ট্রানজিট বিমানে আভার উদ্দেশে রওয়ানা। বিমানবন্দর কেমন, সেখানের হালচাল নিয়ে আর গ্যাজর গ্যাজর করছিনে। তবে এটুকু বলে যাই, বন্ধুভাগ্য যে আমার ভালো তা তো জানতুমই। কিন্তু পরদেশে এসে প্রথম সকালেই যে ওয়েটিং লাউঞ্জের এককোণে বসে পাকিস্তানি, ভারতীয় ও আফগানিদের সঙ্গে আড্ডা জমিয়ে দিতে পারব তা জানতুম না। (এই তিন জাতের মানুষের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে খুব অল্পদিনেই আমার বিস্তর মেশা হয়েছে, তাদের লোকাচার ও অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ডের কথা গ্রন্থিত রচনায় আসলেও আসতে পারে।) এর মাঝে কখন যে একপাশে চুপটি করে বসা বাঙালি কিশোরীটির প্রতি মন টইটই করে উঠল টেরই পাইনি। দু’চারবার চোখাচোখিতে তিন তিনটে দুষ্প্রাপ্য আগাছা কবিতার জন্ম কখন যে দিলেম, সেদিন সন্ধ্যায় ডায়েরি হাতড়ে তাই মনে করার চেষ্টা। শাস্ত্র তাই বলে—ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।

দুপুর গড়িয়ে আসছে এখানে। জানালার ওপারে নিচে তাকিয়ে দেখি সার সার উঁচু-নিচু বিস্তৃত পাহাড়ি উপত্যকা। আভা পাহাড়বেষ্টিত অঞ্চল। এখানে আরবের অন্যান্য শহরের চেয়ে প্রকৃতি ও আবহাওয়া একেবারেই উল্টো। মার্চের এ সময় রিয়াদ, মক্কা, মদিনায় যেখানে ঠাঁ-ঠাঁ গরম, এখানে তখন প্রাত ও সন্ধ্যায় হাঁড়কাঁপানো শীত। সে যাহোক, এলেবেলে এসব কথা আসবে সময়ে সময়ে।

 

ঘড়ির কাঁটা এগারো ছুঁইছুঁই। আভায় অবতরণের মাধ্যমে টানা তেরো ঘণ্টার ঝক্কিঝামেলা ও গুমোট একটি দীর্ঘশ্বাসের যবনিকাপাত ঘটে। এ এয়ারপোর্টটা কেমন নিঃস্তব্ধতায় মোড়া। শান্ত। খুব বড়সড় কিছু নয়। আগাগোড়া একতলা বন্দর। অল্পক্ষণেই ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে বাইরে বেরিয়ে দেখি বেলাল ভাই দাঁড়িয়ে। আমার খালাতো ভাই। খুব ছোট থাকতে আম্মা বাঘের বদলে তাঁর কথা বলে ভয় দেখাতেন। এতকাল পরে একসঙ্গে থেকে বুঝতে পেরেছি, কী বোকাটাই না ছিলাম তখন। মানুষও এমন সহজ, সুন্দর ও নির্মল মনের হতে পারে! যেন মৃৎপাত্র। কোনো ক্ষোভ নেই, অভিযোগ-অনুযোগের বালাই নেই। হাজারটা ভুল করলেও ঢলে পড়া সূর্যটির মতো দিনটাকে আগলে রাখতে চায়। তা এভাবে আর কতক্ষণ? বললাম, ‘ভাইজান! পেটে তো ক্ষুধা চোঁ চোঁ করছে।

জ্ঞানতাপস প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক একদা বঙ্গদেশের আরেক মনীষা আহমদ ছফাকে বলেছিলেন,‘যখন কোনো নতুন জায়গায় যাইবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানার চেষ্টা করবেন। ওই জায়গার মানুষ পড়ালেখা কী খায়। আর পড়ালেখা কী করে।’ দু দুবার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ পড়ে কিছু অর্জন হোক না হোক খাবারের কথাটা ঠিক মনে রেখেছি।

কী খাবো, কোথায় খাবো, জিজ্ঞেস করতেই বললুম, ‘তা ভাইজান, নিয়ে চলুন আরবের কোনো হোটেল রেস্তোরাঁয়। প্রথমে এ স্বাদটাই চেখে নিই। বিদ্যে-বুদ্ধি বা পণ্ডিতসংশ্রব হবে কি হবে না তা পরে দেখা যাবে ক্ষণ। রন্ধনশিল্পে আরবরা কতটা অভিজাত তা এখনো জানা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আরবের মেহমানদারির সে ঐতিহ্য এবং নিজেকে নিঃস্ব করে মুসাফিরের চিত্ত জয় করার গল্পগাঁথা তো ইতিহাস। এদের মতো এতটা আপ্যায়নে সুখী কোনো জাতি পূর্বকালে পৃথিবীতে কোথাও ছিল কিনা তা খোঁজা বড় মুশকিল। বলিহারি কারবার। দোকানটা ইরানির। কিন্তু সমস্ত খাবার আরবীয়। বঙ্গদেশের পূর্বআমলের বৈঠকখানার মতো করে বিছানো লম্বা চৌকি-মতো সিমেন্ট বাঁধা বসার স্থান। পুরু কার্পেট আর মোলায়েম ফোমের সাহায্যে এতটাই উঁচু করা হয়েছে যে, বসতেই নিতম্বটা ধীরে দেবে যায়। তা আপনি সেখানে শুয়ে পড়ুন কি তেহাতি হয়ে বসে আহার করুন, ও কারো দেখার সামান্য ইচ্ছে নেই। না কেউ নাক সিঁটকাবে না আঁড়চোখে দেখে ফিসফিসিয়ে তাচ্ছিল্য করবে। কাষ্ঠ কপাল! এ জ্ঞান আমার পরে আহরিত হয়। নইলে সেদিন কি আর অমন বসে বসে কৃত্রিম বাঙালিপনা দেখিয়ে কিছুটা ইংরেজ ও কিছুটা ইউরোপীয় হয়ে ভদ্রস্থের ভান করি! বিনাবাক্যে সটান শুয়ে তবেই ঘণ্টা আধেক বাদে আহার সারতুুম।

দস্তরখানার প্রচলন তো মুসলিম জাতির সর্ব দেশেই আছে। তা চেনাও বটে আমাদের। কিন্তু যখন দেখলুম ধবধবে সাদা পুরো টেবিলসমেত বিরাট একখানা পলিথিন এনে বেয়ারাটা সামনে বিছালো, প্রথমে কিছুটা হতভম্ব তো হয়েছিলুমই, পরে যখন এক পাতিল সাদা চিক্কন চালের পীতবর্ণের ভাত ও আস্ত দুটো মোরগ ভাঁজা তার ওপর ছেড়ে দিল, তখন হতভম্বের ঘোর কেটে বিস্ময়ে বিমূঢ়। এ কোথা এলেম ভাই! এ কেমনতর খাবার আর পদ্ধতিই বা কী! গোলগোল চোখে নতুন দেশের নানাবিধ আচার-পদ্ধতি দেখে যে আমি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছিলাম, ভাই ও তাঁর পাতানো এক মামা ততক্ষণাৎ তা উপলব্ধি করলেন। হাসতে হাসতে গল্পচ্ছলে তাঁরা যে কী করে সে খাবার গলধঃকরণ করলেন তা আমার বুঝতে এবং খেয়ে অভ্যেস করতে টানা দুমাস লেগেছে। এ সোয়াদী খাবারের নাম ‘ফাহম’। সাধারণত বৃহদাকারের চওড়া থালা ও ডেগচিতে করে এ খাবার পরিবেশন করা হয়।

বঙ্গদেশে অনায়াসে যা ছ’সাত জনের পেটপুরে খাওয়া হবে, আরবিরা তা নেয় দুজনে। সংখ্যাধিক্যে তা কখনো অতিমাত্রায় পৌঁছলে তিন-চারে গিয়ে পৌঁছে। সেইসাথে রুটি, কাবাব, কোপ্তা, বুরুস্ট (অধুনা আমরা যেটিকে গ্রিল বলি, তারই এক রকমফের) এবং মোলায়েম মাছের মাংস (কী এক বিশেষ কায়দায় ভেতরের সমস্ত কাঁটা বার করে শুধু মাংসই সেদ্ধ করে দেয়) নিয়ে বসে। এন্তার বাহারি খাবারে দস্তরখান ভরে শেষাবধি তার অধিকাংশটাই ফেলে যায়। এ বড় আজব জাতি। খোদাতাআলা ফলমূল-খানাখাদ্যে যত প্রাচুর্য দিয়েছেন তাদের, তারা যেন ঠিক ততটাই অপচয় করে। এ বড় নির্মম সত্য ও প্রকৃত আরবীয় ইতিহাস। তা এর ব্যতিক্রমও যে নেই সেটা বলেছিনে। তবে এমন আরব লোকের সংখ্যা বিশাল আরব ভূখণ্ডে নিতান্ত সামান্য বলেই একদিন কথায় কথায় জানিয়েছিল আমার আরবীয় বন্ধু আনাস। সামনে তার সঙ্গে কাটানো সময় ও নানা বিষয়ে আমাদের বাতচিতের গল্প আসবে।

সাত-আষ্টেক গোবদাগাবদা পুরুষের আহার ‘ফাহাম’-এ মোটে গুণেগুণে আটটি এলাচ, দুটো তেজপাতা আর উপরে রাখা দুটো আস্ত মুরগিই সার। এই হলো আরবদের কওমি খাবারের সাধারণ শ্রী। ভোজনরসিক তো নই, সেহেতু আরবরা নিত্য তাদের খাদ্যাভ্যাসের তালিকায় কীসব উমদা খাবার রেখেছে তা অতোটা রপ্ত হয়নি। তবুও একজন নবাগত পরবাসী নাগরিক হিসেবে সাধ্যে যতটা কুলোয়, বা কী খাচ্ছে এ জাতি এ সন্ধানে কিছুটা খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলুম। তাদের বিবাহশাদি, অথবা কোনো আচার-অনুষ্ঠানে যেসব খাবার বাহ্যত ঐতিহ্য হিসেবে রাখতেই হয় তা হলো—ইদাম (তিরমিজি শরিফে এই খাবারের কথা রাসুলের পছন্দের বলে উল্লেখ আছে), মুশাক্কাল, আদাস। তবে এই প্রকার থেকে আরেকটু শালীন ও উচ্চাভিলাষী খাদ্য হলো ‘মান্দি’। চালের তুলনায় এতে গোশতের পরিমাণ বেশি। তারপর তার ওপর আস্ত একখানা বকরি ভেজে কি ফ্রাই করে বসিয়ে দাও। এর স্বাদ এখনো চেখে দেখা হয়নি। শুনেছি রমজানের পরপরই এ অঞ্চলে বিবাহের ধুম পড়ে। সেখানেই এ খাবার পরিবেশন করা হয় সাধারণত। আসন্ন কোনো বিবাহযজ্ঞে নেমন্তন্ন পাবার যে সুপ্ত বাসনা মনে আতিপাতি করছে, তা আর লুকিয়ে রেখে লাভ কী!

নতুন দেশ, নতুন মানুষ। সময়গুলোও কেমন নতুন মনে হচ্ছে। কখনো মন টেকে আবার মুহূর্তেই তা যেন বিষাদে ভর করে ঘনঘোর অমাবস্যার রূপ নেয়। আপন দেশ, মাটি, পরিবার ও পরিচিতদের গন্ধ ছেড়ে যারা এমন দূরদেশে পাড়ি জমায়, তারাই বোঝে শূন্যতা কী! একাকিত্বের কষ্ট কেমন। সে কষ্টই বুঝি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে আমাকে। টানা ১৫ দিন কেবল কর্মক্ষেত্রে যাওয়া আর বিকেলে দোতলার গুমোট রুমটাতে ফেরাই ছিল প্রত্যহকর্ম। যে বাড়িতে থাকি, তার পেছনেই পাহাড়ি এলাকা। সন্ধ্যার একটু আগে তিরোহিত আলোটা যাচ্ছি যাব বলো যেই এপাশ-ওপাশ করে, তখনই ঘনায়মান অন্ধকার কী মসৃণ করে তাকে টেনে নেয়। হঠাৎই যেন তা পাহাড়ের পেছনে ডুবে যায়। মনে হয় সূর্যটা বুঝি ও পাহাড়ের পেছনেই ঘুমোতে যাচ্ছে। সেইসাথে ভাবতাম, আহা! আমার বাঙালি সূর্যটা না কতক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে গেছে। তার সাথে গভীর নিদ্রামগ্ন আমার পরিচিত সকল নারী। মনটা কেমন ককিয়ে উঠতো। জল টলমল চোখ কখন যে ঝাপটা মেরে কপোল ধুইয়ে দিত, তা টের পেতাম শুকোনোর পর।

এমন নিঃসঙ্গ একেলা যাপনের কালে আনাসের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। সদ্য কৈশোর পেরোনো এই যুবক কী অদ্ভুত অমলিন সুন্দর। যেন কোনো স্নিগ্ধ পবিত্রতায় মোড়ানো তার চোখ। যা থেকে ঠিকরে ঠিকরে পড়ে অকৃত্রিম বিশ্বাস। ভালোবাসা তার প্রতিটি উচ্চারণে।

আনাস মদিনা ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাসে পড়ছে। সাথেসাথে ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য শিল্পকলা নিয়েও একটা আলাদা কোর্স করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পৃথিবীর নানান দেশের ইতিহাস বুঝি তার নখদর্পনে। বলছে তো বলছেই। আরবি শিল্প-সাহিত্যেও বিস্তর জ্ঞান। আমারও যেহেতু এদিকেই ঝোঁক, তাই ক্রমে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা গাঢ় থেকে প্রগাঢ়ে উপনীত হলো। প্রথাগত সাহিত্যের ছাত্র যেহেতু নই, জানাশোনাও শূন্যের কোটায়, তবুও কী করে কীভাবে যেন আমাদের আলোচনাগুলো জমে যাচ্ছিল। বোধকরি সেই ছাত্রজীবনে সাবয়ে মুয়াল্লাকা পাঠ আর মাদরাসার চৌহদ্দিতে থেকে কখনো ফারাজদাক, ইমরুল কায়েস, তরফা বিন আল-আবদ, জুহায়ের বিন আবি সুলমা, লাবিদ বিন রাবিয়া, আমর বিন কুলসুম, কাব ইবনে জুহাইর, আনতারা বিন সাদ্দাদের কবিতা নেড়েচেড়ে দেখায়; তাই বলতে পারছিলুম। আর তাতেই আনাসের চক্ষু ছানাবড়া। ‘তুমি আরবের এত কবিদের চেনো!’

বললুম, ‘অমন চোখ রগড়াচ্ছ কেন? সম্প্রতি দেখছি আলি আবু শামলার ‘সালিনা’ উপন্যাস নিয়ে তোমাদের নবীন ছেলেমেয়েদের ত্রাহিত্রাহি উত্তেজনা, ও-ও পড়ে নিয়েছি এখানে এসেই।’

‘আনতা মুমতাজ’ বলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে আনাস জড়িয়ে ধরে আমাকে।

বললুম, ‘ছাড়ো, ছাড়ো!’

আনাস হকচকিয়ে বলে, ‘হলোটা কী?’

‘বলো, জায়্যিদ জিদ্দান!’

‘কেন?’

কিছুক্ষন চুপ থেকে মৃদু হেসে বললাম, ‘সারাজীবন কাব্যি করা ছেলেটা বেশিরভাগ ও-ই হয়েছে। দেখা যেত গোটা কয়েক নম্বরের জন্য নচ্ছার মুমতাজটা হাতছাড়া হয়ে গেছে।’

দুজনেই হো-হো করে হেসে উঠলাম।

পুনশ্চ : ভারতীয়, পাকিস্তানি ও পাঠানদের কথা বলব ভেবেছিলেম। এদের নানা সব রসাত্মক গল্প বিস্তারিত হয়ে আছে আমার ভেতরে ও উপরে। কিন্তু বিধিবাম। হাফেজ না হয়েও খোদাতাআলা রহমত করে তারাবিহ পড়ানোর ভাগ্য খুলেছেন। প্রথমদিন পড়ানোর পরই বুঝেছিলুম হাফেজরা কেন এই মহান ইবাদতটি সম্পন্ন করে এসে ফরাসে চিৎপটাং হতেন। আপাতত ওদিকেই ছুটলুম।

 

লেখক : প্রবাসী কবি ও গল্পকার

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১