ডায়েরি লেখার ধূসর স্মৃতি

সংখ্যা:

 

লেখালেখির অভ্যাসটা কবে থেকে—তা ঠিক করে আমারও মনে নেই। কারণ, খুব ছোটবেলা থেকে আমি লিখি। যদ্দুর মনে পড়ে—যখন আমি ‘কবিতার ক-ও বুঝি না’, তখন থেকে কবিতা লিখি। মাদরাসার আঙিনা মাড়ানোর আগে শৈশবের ক-খ শিখেছি স্কুলের বারান্দায়। সেই সময়ের কবিতা লেখার স্মৃতিও আমার করোটিতে বিদ্যমান। তবে সেগুলো কেবলই ধূসর, মলিন, জীর্ণ-শীর্ণ। দু’বছর আগেও দাঁড়িকমা প্রকাশনীর পাণ্ডুলিপি আহ্বানে জমা দেব ভেবে ‘কবিতার পাণ্ডুলিপি’ তৈরি করেছিলাম। নাহবেমির জামাতে থাকাকালীন লেখা কবিতাও ছিল তাতে। কাঁচাহাতের লেখা! সেজন্য আর আগ বাড়তে পারিনি।

শরহে বেকায়া পড়লাম ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হাকিমুল উম্মত (মারকাযুন নূর) মাদরাসায়। মূলত এখান থেকেই আমার লেখার হাতেখড়ি। কিছু লিখতে শিখেছি দাবি করলে একেই বলা যায়। রোজনামচা লিখতে উদ্বুদ্ধ হলাম আদীব হুজুরের পুষ্প পড়ে। তখন থেকে নিয়মিত ডায়েরি লিখতাম। তবে লেখা শেখার জন্য কারও হাতে কাটাছেঁড়া করা জরুরি—ব্যাপারটা তখন জেনে ফেলেছিলাম, কিন্তু কাটাছেঁড়া করানোর মতো কাউকে পাচ্ছিলাম না। কিছুদিন পর নতুন মাদরাসায় নতুন সহপাঠী নেসারুদ্দীন রুম্মান ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। তাঁকে নিয়মিত রোজনামচা লিখতে দেখতাম। স্বেচ্ছায় তাঁর পাশ ঘেঁষতাম। লেখাগুলো পড়ার অনুমতি চাইতাম। তিনি আমাকে লেখাগুলো পড়ার সুযোগও দিতেন। আমার লেখা দেখে দিতেন। ভুল শুধরে দিতেন। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি কবিতার মাত্রাজ্ঞান। লেখার ধরন। ভুল এড়ানোর শক্তি। বানানভুল তিনি একদমই পছন্দ করতেন না। পাশে থেকে থেকে এই অভ্যেসটা আমার মধ্যেও জন্ম নিয়েছে। তাঁর কাছে আমি অনেকভাবে ঋণী।

মাদরাসার চৌহদ্দির মধ্যে থেকে সাহিত্যচর্চা করাটা ছিল একরকম দুঃসাহসিক কাজ। কারণ, আমাদের মাদরাসার মুরব্বিগণ এটা পছন্দ করতেন না। লুকিয়ে লুকিয়ে লেখালেখি করতাম। ডায়েরি লিখতাম। সাহিত্য ম্যাগাজিন, বই-পুস্তক সংগ্রহ করতাম। তখন ম্যাগাজিন কেনার এবং পড়ার এক ধরনের নেশা তৈরি হয়েছিল। বিকেল ছাড়া তেমন কোনো সময় আমাদের ছিল না। নেসার ভাইকে দেখতাম ডিম লাইটের নিয়ন আলোতে রাত জেগে জেগে রোজনামচা লিখছেন। আমার খুব ভালো লাগত। উৎসাহ পেতাম।

আমি বিকেলের অবসরেই লিখতাম বেশি। সে-বছরের ডায়েরিটা এখনও দেখলে, পেছনের লেখাগুলো পড়লে আন্দোলিত হই। আবেগে আপ্লুত হই। শিহরিত হই। কোনো কোনো লেখা আমাকে এতটাই অবাক করে যে, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এটা আমার লেখা! আবার কোনো কোনো লেখা দেখে আশ্চর্য হই, এত বাজে লেখাও লিখতাম একসময়!

ডায়েরি লেখার সময় বানানভুল নিয়ে খুব সচেতন থাকতাম। সন্দেহ হলেই সাথে সাথে অভিধান দেখতাম। কারও সুন্দর লেখা দেখলে, আকর্ষিত লেখা পড়লে ভালোলাগা শব্দগুলোর বানান ও ব্যবহার টুকে রাখতাম। তখন আমাদের জামাতে বেশ কয়েকজন সাহিত্যপ্রেমী ছিলেন। তারমধ্যে শামীম আশরাফ ভাই উল্লেখযোগ্য। বানান নিয়ে তাঁর সঙ্গে কত যে বচসা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বাজি ধরতাম আমরা। আমি জিতেও যেতাম বেশিরভাগ সময়। এতে আমাদের উপকার হয়েছে বৈকি!

এখন কর্মজীবনে ব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়েছি। ঠিক করে ডায়েরি লেখা হয় না। যা হয় তা হলো, মোবাইলের নোটে লেখা। কোথাও লেখা পাঠানোর ইচ্ছে থাকলে এই নোটেই একটু-আধটু লিখি। ডায়েরির লেখাগুলো আমাকে দেখে উপহাসের হাসি দেয়। আর কী যেন বলতে চায়। আমি আফসোস করি। ভাবি, কেন লেখার সময় হয় না আমার! আমি কেন এখন আর নতুন ডায়েরি কিনি না! ঘ্রাণ শুঁকি না! কলমের আঁচড় কাটি না তার বুকে!

 

সালেহানগর, ঢাকা থেকে

ফেব্রুয়ারি 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১