ছোটবেলার কথা। একদিন এক সহপাঠীর কাছে ফুল অঙ্কিত একটা ডায়েরি দেখলাম। ভীষণ লোভ জাগল। মাথায় ডায়েরির ভূত চাপল। ভাবলাম, ওরকম একটা ডায়েরি কিনব, কিনে তাতে আঁকাআঁকি করব। আমি আবার নাছোড়বান্দা, কোনো জিনিস শুরু করলে যতক্ষণ ওটার শেষ না দেখছি—নিস্তার নিই না। এটা বদঅভ্যাসও বলতে পারেন।
শুরু হলো টিফিনের টাকা জমানো। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। প্রতিদিন আব্বা নাস্তার জন্য পাঁচ টাকা করে দিতেন। না খেয়ে খেয়ে প্রায় ৮০ টাকার মতো জমালাম। তখন মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। ক্লাস থ্রি থেকে কান্নাকাটি করে মাঝেমধ্যে আব্বার সাথে বাজারে যাওয়া-আসা করতাম বিধায় খানিকটা একা বাজারে যাবার অভ্যেস হয়ে যায় পঞ্চম শ্রেণিতেই।
একুশে ফেব্রুয়ারির দিন। সনটা ঠিক মনে নেই। বয়স অনুমানিক ১০ বা ১১ তখন। গ্রামের মাদরাসার বার্ষিক জলসা-ও ছিলো সেদিন। প্রতি বছরের মতো জলসায় জমজমাট মেলা চলছে। জলসার দিনকে কেন্দ্র করে আব্বার কাছ থেকে একটা ৫০ টাকার নোট কবজা করলাম। সোজা জলসার মেলায়। হাতের মুঠোয় টাকা নিয়ে মেলায় ঘুরোঘুরি করছি। এটা ওটা দেখছি। কিন্তু কেন জানি টাকাগুলো খরচ করতে মোটেও মন সায় দিচ্ছিল না সেদিন। বিরক্ত হয়ে মেলা থেকে বের হয়ে পড়ি।
মেইন রোডের পাশেই মেলা বসেছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি মেইন রোডে। জলসায় বক্তা সাহেব ওয়াজ করছেন। হঠাৎ কানে বাজল আরো একটি মাইকের আওয়াজ। অনুমান করলাম আওয়াজটা আমাদের স্থানীয় বাজার থেকেই আসছে। জলসার মাইকের কারণে বাজারের মাইকের শব্দগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না। সাহস করে বাজারের দিকে এগোলাম। আট-দশ মিনিটের পথ। ধীরে ধীরে মাইকের শব্দগুলো পরিস্কার হচ্ছে টের পেলাম। ‘বইমেলা… বইমেলা…’ বলে কেউ একজন মাইক বাজাচ্ছে। যত সামনে এগুচ্ছি লোভের মাত্রা তত বাড়ছে। পৌঁছলাম মেলায়।
জীবনের প্রথম বইমেলা দর্শন। স্টলভর্তি রঙ-বেরঙের বই। যতটুক মনে পড়ে, সেদিন বই দেখে ডায়েরির চিন্তা কিছুক্ষণের জন্য মাথা থেকে উধাও হয়ে যায়। মনে হয়েছিল বই নয়, যেন কেউ আমার সামনে থরে থরে তেঁতুল সাজিয়ে রেখেছে। কোনোকিছু না ভেবেই দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, ৫০ ট্যাকায় কয়টা বই পাওয়া যাইবো?’ ‘কোনটা কোনটা নিতায়, বাছাই করো।’ জবাব দিলেন দোকানি। আমি যে ক’টি বই নির্বাচন করলাম তাতে বিল দাঁড়াল পঞ্চাশের উপরে। তা থেকে কমিয়ে দোকানি বেচারা হিসেব করে ৫০ টাকার বই দিলেন। বই কয়টা ছিলো ঠিক মনে নেই, কিন্তু সেখানে পাঁচ টাকা মূল্যের (ক্রয়কৃত মূল্য) ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ এবং ‘গোপাল ভাঁড়’ নামক দুটি বই ছিল—স্পষ্ট মনে আছে।
বই কেনা হলো। ভাবলাম আরো দু’-একটা স্টল দেখি। হাঁটছি… হাঁটছি… হঠাৎ একটা স্টলে নজর পড়ল। নতুন-পুরান বই, খাতা, কলম, ডায়েরি ইত্যাদিতে ভর্তি স্টল। চোখটা আটকে গেল ডায়েরিতে। পড়লাম মুশকিলে। কোনো দিকে আর না তাকিয়ে, হুট করে কিনে ফেললাম গোলাপফুলের ছবি আঁকা ডায়েরিটা। যে ডায়েরির লেখালেখি, আঁকিবুকিগুলো দেখলে আজ অন্যরকম অনুভূতি জাগায় মনে। ডায়েরির ভেতরের কাগজগুলো কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, তবুও এই ডায়েরির প্রতিটা লেখা, প্রতিটা অঙ্কন আমাকে নতুন কিছু উপহার দেয়। যতবার ডায়েরিটা পড়ি, মনে হয় আজই ডায়েরিটার জন্ম। যেন আমার পুরো শৈশবের কীর্তিগাথা এই ডায়েরিতে অঙ্কিত। অথচ মাত্র ষাট টাকা দামের সস্তামানের একটি ডায়েরি সেটা।
হুসাইন আল হাফিজ : জকিগঞ্জ, সিলেট থেকে
ফেব্রুয়ারি 2019

