ডায়েরিতে কী লিখব এ নিয়ে প্রায় সপ্তাহখানেক দোদুল্যমান ছিলাম। সহপাঠীদের ডায়েরি কেনা দেখে আমিও একটি কিনেছিলাম। কিন্তু ওদের মতো ‘খরচের হিসাব’ ডায়েরিতে লেখা আমার পছন্দ ছিল না। তাই লিখতেও পারছিলাম না। তেমন কাউকে পাচ্ছিও না যে, তার কাছ থেকে জানতে পারব মানুষ আসলে ডায়েরিতে কী লিখে? তখন সময়টা ছিল ‘হিফজ’ পড়ার। সার্বক্ষণিক কুরআন তেলাওয়াতই ছিল প্রধান কাজ। বই পড়া বা লেখার সময় ছিল শুধু আসরের পর। যদিও ওই সময়টা ছিল খেলাধুলার জন্য, কিন্তু আমি বই নিয়েই পড়ে থাকতাম। বলতে গেলে বই পড়াটা তখন থেকেই নেশায় পরিণত হয়েছিল। পড়তাম আর হৃদয়ে স্বপ্নের বীজ বপন করতাম—এমন একটি বই আমিও লিখব, আমিও একদিন বড় লেখক হব। কিন্তু লেখক হতে গেলে নাকি রোজ রোজ লিখতে হয়। যাকে বলে ‘রোজনামচা’। এই রোজনামচা লিখব বলেই ডায়েরিটি কেনা হয়েছিল আমার। কিন্তু রোজনামচায় কী লিখতে হয় তা ছিল অজানা। ফলে এ নিয়ে সপ্তাহখানেক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম। প্রত্যহ আসরের পর ডায়েরি সামনে নিয়ে বসে থাকতাম; কী দিয়ে শুরু করব তা ভাবতে ভাবতেই মাগরিব হয়ে যেত। লেখা হতো না কিছুই।
একদিন এই দুশ্চিন্তার অবসান হলো। বিশাল এক বোঝা নিমিষেই মাথা থেকে উবে গেল। প্রতিদিনের মতো সেদিনও আসরের পর বই ও ডায়েরি নিয়ে বসে ছিলাম। কামরা থেকে উস্তাদজি ডাক দিলেন। যেতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘সবাই খেলছে তুমি বসে আছ কেন?’ উত্তরে বললাম, ‘বই পড়ছিলাম।’ এ কথা শুনে উস্তাদজি খুব খুশি হলেন। কিছু বইয়ের নামও বলে দিলেন তিনি। এ মুহূর্তটাকে মোক্ষম সময় মনে করে সুপ্ত কথাটি বলেই ফেললাম। যা কয়েকদিন ধরে মনের ভেতর ঘুরঘুর করছিল। ‘উস্তাদজি! আসলে আমার লেখক হওয়ার খুব ইচ্ছা আছে। শুনেছি লেখকদের প্রথম সবক নাকি রোজনামচা লেখা। সেজন্য একটি ডয়েরিও কিনেছি। কিন্তু রোজনামচায় কী লিখব তা খুঁজে পাচ্ছি না। যদি একটু বলে দিতেন, উপকৃত হতাম।’ দেখলাম উস্তাদজি আগের তুলনায় এবার দ্বিগুণ খুশি। আমার সদিচ্ছার কথা শুনে তিনি দোয়া করে দিলেন। এরপর রোজনামচার ধরন কেমন তা বলে দিলেন। বললেন, ‘সকাল থেকে সন্ধ্যা যা যা করো তা-ই লিখবে, সহপাঠীদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও লিখতে পারো কিংবা তোমার অতীতজীবনের স্মরণীয় কিছু থাকলে তাও লিখতে পারো।’ ‘জি আচ্ছা!’ বলে উস্তাদজির শুকরিয়া আদায় করে কামরা থেকে প্রস্থান করলাম।
পরদিন থেকেই লেখা শুরু করলাম। আমার প্রথম ডায়েরির প্রথম পাতায় যে লেখাটি ছিল তাহলো, ‘যদি কেউ এই লেখাটি পড়েন তাঁর কাছে অনুরোধ থাকবে যেন আর একটি পৃষ্ঠাও তিনি না খোলেন।’ কারণ, ভয় ছিল, মনের কথাগুলো কেউ জেনে নিয়ে পরে যদি উপহাস করে! তাই না পড়াটাই ভালো। লিখতাম, মনে যা আসত তা-ই লিখে রাখতাম। স্মৃতিবিজড়িত অনেক কথাই তখন ডায়েরিতে স্থান পেয়েছিল। দীর্ঘদিন হয়ে গেছে সে ডায়েরিটি আর খোলা হয়নি।
ফেব্রুয়ারি 2019

