এই অন্তর্জালের যুগে এখন আর ডায়েরি লেখা হয় না আমাদের। যখন আমাদের খুব বেশি ইচ্ছে করে কিছু বলতে বা লিখতে তখন ফেসবুক খুলে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে বসি। সাথে সাথে অনেক মানুষের কাছে চলে যায় মনের গহীনের গোপন অনুভূতি। মুহূর্তের ভেতর মানুষেরা—এমনকি যার সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি, সেও আমার হৃদয়ের কথাটা জেনে যায়। অথবা ফেসবুক খুলে অনলি মি করে পোস্ট ঝুলিয়ে রাখি। এটা কেউ দেখে না, কেবল নিজের মতো করে গচ্ছিত থাকে আর বছর পর পর ফেসবুক আমাদের এই ঘটনাটা স্মরণ করিয়ে দেয়।
অন্যভাবে বললে, হয়তো ডায়েরি লিখবার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। ডায়েরি লিখতে অপেক্ষা লাগে, সাজানোর ব্যাপার থাকে, থাকে উচ্ছ্বাসের প্রয়োজন। লেখার আগে ভেবে ভেবে বের করতে হয়—এই পুরো দিনে কী করলাম? আজ লিখবার মতো কী আছে! এগুলোর সময় কই!
আমি প্রথম ডায়েরি লিখি ২০১৪ সালে। তখন অবশ্য ডায়েরি বলতাম না, বলতাম রোজনামচা। সে সময়ের রোজনামচাগুলো ভরা থাকত দৈনিকের কথাবার্তায়। সারাদিন কার সাথে মিশলাম, কী অবাক কাহিনি ঘটেছে, বিদায় অনুষ্ঠানে কে কী বক্তৃতা দিলো—এসব এবং খুব অল্পই লিখেছি তখন।
পনেরো সালের মাঝামাঝিতে দরগায় (জামিয়া কাসিমুল উলুম দরগাহে হজরত শাহজালাল রহ. সিলেট) ভর্তি হবার পর নিয়মিত ডায়েরি লিখতে শুরু করলাম। পুরো এক বছর পুরো দমে লিখেছি। আমার ভেতর তখন অন্য মন্ত্র কাজ করেছে। কে যেন বলেছিল—লেখালেখি করতে হলে ডায়েরি লেখার বিকল্প নেই। পরবর্তী সময়েও ডায়েরি লিখেছি, তবে অনিয়মিত। এখনও কিছু খুঁজতে গিয়ে সেই ডায়েরিগুলোতে হাত পড়ে। মাঝে মাঝে বের করে খুলে চোখের সামনে ধরি। তখনই উঁকি দেয়—আলিয়ার মাঠ, ছাত্রাবাস, সাহিত্য আসর, চৌহাট্টা, প্রিয় মানুষগুলোর মায়াভরা মুখ, দরগাহ মাঠে মানুষের ভীড় অথবা গহরপুরের শান বাঁধানো পুকুরঘাট, বড়ভাগা নদী। মাঝে মাঝে কিছু চরিত্রকে স্মরণ হয়—যাদের প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। অনেককে আবার চিনতে পারি না। কাউকে চেষ্টা করেও মনে করতে পারি না—লোকটা কে ছিল।
জীবনে দু’একজনকে ডায়েরি লিখতেও বলেছি। তারা সহজ উত্তর দেয়—প্রতিদিনই কী লিখবো? বলেছি, তোমার আজকে এমন কিছু ঘটেছে—যা গতকাল ঘটেনি। মানুষের সকল দিন সমান যায় না। তোমার এই সমান না যাওয়াটাই লিখো। কথাগুলো বলার পর মনে হয়, এগুলো পেলাম কই! আমি তো এত ভেবে ডায়েরি লিখতে বসিনি!
ডায়েরি নাকি উপহারের জন্য খুব উপযোগী। উপহারগ্রহীতা ডায়েরি পেয়ে কী করে? সবার কথা লেখে, নাকি যে দিলো কেবল তার কথাই? একবার এক বিদায়ের দিনে প্রিয় এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘বলো তো, তোমার কাছে বিদায়বেলা দেবার মতো উপযুক্ত উপহার কী?’ সে সরল ভাষায় বলেছিল, ‘ডায়েরি।’ আমি পাশের ছোটো বাজারে গিয়ে ডায়েরি খুঁজে বেড়িয়েছি। কিন্তু তাকে একটা ডায়েরি উপহার দিতে পারিনি। বিষয়টা মাঝে মাঝে ভাবায়।
মাদরাসাগুলোতে বছরের শেষে ডায়েরি করার প্রচলন আছে। আমার যে বন্ধুরা সদ্য তাকমিল শেষ করে—তারা স্মৃতিস্বরূপ আমাকে ডায়েরি উপহার দেয়। অনেকে আবার দেবে বলে দেয়া হয় না। আমি ওগুলো তুলে রাখি। কিছু লিখি না। কেন যেন মনে হয়, লিখলেই তো শেষ। একজন মানুষের উপহার এত সহজে শেষ করা যায়! এত সহজে একজন মানুষের স্মৃতি ধূসর করা ঠিক? তারচে বরং রঙিন পাতাগুলো চকচকেই থাকুক।
এই ডায়েরি না লিখবার সময়েও মাঝে মাঝে আমার ডায়েরি লিখতে মন চায়। খুব বেশি আনন্দিত হলে বা খুব করে কষ্ট পেলে অথবা লিখে রাখবার মতো কোনোকিছু ঘটলে এখন যে ডায়েরি নিয়ে বসি, সেটি আমাকে আমার একজন প্রিয় শিক্ষক পুরস্কার হিসেবে দিয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় শিক্ষক কবি মুসা আল হাফিজ একদিন ক্লাসে ঢুকে বললেন, ‘বনফুলের ‘নিমগাছ’ গল্প অনুসরণে একটা গল্প লিখো। আমরা যে যার মতো গল্প লিখে জমা দিলাম। আমার গল্পটা দেখে বললেন, ‘তুই একটা পুরস্কার পাবি।’ তারপর এক বিকেলে হুজুরের রুমে বসে কোনোমতে প্রকাশ করলাম—আমার পুরস্কার বাকি আছে। হুজুর পাশের তাক থেকে একটা ডায়েরিতে অটোগ্রাফ দিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন, ‘নে।’
মাঝে মাঝে খুব করে অতীতে চলে যেতে ইচ্ছে করে। তখন আমি ডায়েরি নিয়ে বসি। দেখি, ডায়েরির পাতাগুলোতে আমার হারানো দিন বাঁধা। প্রতিটি লাইলে গল্প, আড্ডা, স্মৃতি ঝলমল করে। চোখের সামনে ভাসে রঙিন অতীত। ভাসতে ভাসতে কাঁদি, হাসি। তারপর মনে হয়, অতীতটাই ভালো ছিল।
হবিগঞ্জ থেকে
ফেব্রুয়ারি 2019

