ডায়েরি তুমি, কোথায় আছো কেমন আছো

সংখ্যা:

প্রিয় আমীনুল ইসলাম,

তোমার চিঠি আমার হাতে এলো প্রায় সাত মাস পর। তা-ও এলো যখন আমি পল্টন থেকে সান্ধ্যবাসে করে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছি, তখন। বন্ধুবর এহসান সিরাজের কাছে তুমি চিঠিটি দিয়েছিলে গত বছর জুলাই মাসের শেষদিকে। সেই চিঠি দীর্ঘদিন এহসানের ঘরবন্দী থেকে অবশেষে পৌঁছলো আমার হাতে। যখন আমি গাবতলীগামী একটা বাসে চড়ে পার হচ্ছিলাম প্রেসক্লাবের পাশঘেঁষা আকাশমণি গাছের সারি। আর আকাশমণি ফুলের গন্ধে আমি বড় করে কয়েকটা নিশ্বাস নিয়ে ভুলতে চাইছিলাম জ্যাম-গন্ধময় ঢাকা শহরের জীর্ণ স্মৃতি।

বাসের ভেতরের আলোগুলো ক্ষয়িষ্ণু। রাস্তার নিয়নবাতি ততক্ষণে জ্বলে উঠেছে। হলদে নিয়ন আলোয় আমি পড়তে শুরু করলাম তোমার চিঠি। বহু বহু দিন বাদে কেউ আমাকে চিঠি লেখে। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে সেসব চিঠি পড়ি। ভালো লাগে। আমারও খুব ইচ্ছে হয় প্রেরকের চিঠির উত্তর দিতে। কিন্তু হয়ে ওঠে না। তাই আশ্রয় নেই হয়তো আন্তর্জালিক কোনো মাধ্যমের অথবা কোনো ম্যাগাজিনের পাতার।

 

প্রিয় আমীনুল,

নবধ্বনি নিয়ে লেখা তোমার ভালোবাসাময় চিঠিটি আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। বিগত দিনকয়েক সে আমার সঙ্গেই ছিল। এ চিঠি আমার সহধর্মিণী পড়েছেন, পড়েছে আমার ভাগ্নে ও ভাগ্নী। তারা বিহ্বল হয়েছে—এখনও মানুষ চিঠি লিখে? আসলেই তো! যে প্রজন্ম বেড়ে উঠছে পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিনের আন্তর্জালিক আলোকিত অভিশাপের দায়ভার মাথায় নিয়ে, যারা সময়ের অভাবে ভুলতে বসেছে বন্ধুর হৃদ্যতা, যাদের হৃদয়ে ভালোবাসার মানে যখন কেবলই শারীরিক মোহ—সেই সময়ের গৃহদাহ পেরিয়ে তুমি কেন লিখতে গেলে এই চিঠি—অবাক হওয়ার মতো ঘটনা!

 

প্রিয় আমীনুল,

তোমাকে যখন লিখছি তখন ভোর চারটে পঞ্চাশ। আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে আমি ঘুম থেকে উঠেছি। সাধারণত আমি রাত দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি, ভোরে উঠি চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে। বাড়ি থাকলে এটা আমার মোটামুটি প্রাত্যহিক রুটিন। দিন-রাতে আমি পাঁচ থেকে ছ ঘণ্টা ঘুমাই। দিনে ঘুমানোর অভ্যাস খুব একটা নেই। তাই রাতে শুয়ে পড়লে ঘুমাতে খুব একটা সময় লাগে না। আর একবার ঘুমালে আমার ঘুম হয় পুকুরের জলের মতো নিস্তব্ধ, নিথর।

এ-কথাগুলো তোমাকে কেন বললাম—অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে—আপনি কখন লিখেন? কিন্তু সেভাবে বলতে গেলে, আমার আসলে লেখালেখির নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। তবে ভোরের এই সময়টাতেই আমার প্রতিদিনকার লেখালেখির সূচনা হয়। কোনোদিন তাহাজ্জুদের সময় থাকলে নামাজ পড়ে নিজেকে মানুষের কাতারে আনার চেষ্টা করে তারপর লিখতে বসি। আর সময় না থাকলে অমানুষের মতো ঘুম ঘুম চোখেই লিখি।

ভোরে উঠে লেখার এ অভ্যাসটা আমার আগে ছিল না। এটা বিগত কিছুদিনের অভ্যাস এবং বেশ চমৎকার অভ্যাস। এ সময়টাতে পৃথিবীর চারপাশ কেমন স্তব্ধ হয়ে থাকে। চারদিকে গুমোট অন্ধকার, পাখিরা পর্যন্ত তখনো জাগে না। থম মেরে থাকা সময়। হঠাৎ একটা শেয়াল হাঁক দেয় বা কোনো বাড়ির বোকা মোরগটা ভোর হয়ে গেছে ভেবে বাগ দিয়ে ওঠে। বিলের মাঝে শব্দ পাওয়া যায় ভট ভট একটা স্যালো ইঞ্জিনের। হয়তো কোনো পুকুর থেকে পানি তুলছে। একটা কানাকুকা কুউ কুউ করে কয়েকবার ডেকে কী বার্তা যেন ছড়িয়ে দিতে চায় পাখিদের লোকালয়ে। সে আসলে কী বলে? ভোর হতে আর দেরি নেই… তোমরা সবাই উঠো… বেরিয়ে পড়ো জগৎজোড়া… এসবই কি বলে কালো আর খয়েরি রঙের পালকপরা পাখিটা? আমি ঘুম থেকে জেগে এসব ভাবি।

 

প্রিয় আমীনুল,

ভোরের এই সময়টাতে ইদানীং আমি ডায়েরি লিখি। ভোর জিনিসটাই এমন, এই সময়ে কেন যেন ব্যক্তিগত বিষয় আশয় লিখতে ভালো লাগে। একান্ত নিজস্বগত স্মৃতি বা চিন্তা। মানুষের বোধ তখন সম্ভবত আত্মকেন্দ্রিক থাকে। নিজেকে নিয়ে ভাবার একটা মোক্ষম সময়। সারারাত মস্তিষ্কের নিউরনগুলো কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে সকাল সকাল আমাদের উপহার দেয় নতুন কিছু চিন্তা, কিছু প্রত্যয়, মোলায়েম একটা মন।

ডায়েরি লেখার অভ্যাস তেমন একটা আমার ছিল না কোনোকালেই। কখনো সখনো কোনো ডায়েরিতে কিছু স্মৃতি লেখা হয়েছে, কোনো ডায়েরিতে লিখেছি গোটা কয়েক কবিতা কিংবা কোনো গল্পের শুরুর অংশ। যে গল্প আর কোনোদিন শেষ হয়নি। কৈশোরে ভালো লাগতো যেসব কিশোরীর মুখ, তাদের নিয়ে বিরহী কোনো বয়েত-নজমও থাকতো বৈকি। কিন্তু নিয়মিত ডায়েরি লেখা আমার কখনো হয়ে উঠেনি। এখন কেন শুরু করলাম? সেই গল্পটা বলি।

বছরখানেক ধরে আমার সঙ্গে ছোট্ট একটা পকেট ডায়েরি থাকে, আমার ব্যাগে। ডায়েরিটা কিনেছিলাম বড় আপার কথায়। বড় আপা বলেছিলেন, সঙ্গে সবসময় একটা ডায়েরি-কলম রাখবি। যখনই কবিতা বা উপন্যাসের কোনো লাইন বা প্লট মনে আসবে তখনই সেটা চট করে লিখে ফেলবি। কারণ মানুষের চিন্তা এই আছে এই নেই। বাসে বসে তুই মনে করলি, আচ্ছা, চিন্তাটা যখন এসেছে তাহলে সেটাকে আপাতত ডালাপালা ছড়াতে দিই, বাড়িতে বা অফিসে গিয়ে যুতমতো বসে লিখে ফেলা যাবে।

কিন্তু এমনটা হয় না। আমি নিজেই এর বড় ভুক্তভোগী। বহুবার এমন হয়েছে, হঠাৎ চলতিপথে কিছু একটা দেখে বা ভেবে সুন্দর একটা লাইন মনে এসেছে। ভেবেছি, বাড়ি গিয়ে সুস্থির হয়েই লাইনটা লিখে ফেলতে হবে। বাড়ি এসে মগজের এ-কোনা হাতড়াই ও-কোনা হাতড়াই, নাহ, সেই অনিন্দ্য লাইনটা আর ফিরে আসে না। চোখ বন্ধ করে, দম বন্ধ করে কতোভাবে লাইনটা স্মরণ করার চেষ্টা করি—লাইনটা আর আসে না। ভাঙা ভাঙা দু-একটা শব্দের খুচরা অংশ আসে কখনো, ওই ভাবনাটা আর আসে না। কখনো তো পুরো বিষয়টাই ভুলে যাই। বাসে বসে বসে যে এমন একটা চিন্তা মাথায় উদয় হয়েছিল—সেই বিষয়টাই আর মনে আসে না। এভাবেই অকালমৃত্যু ঘটেছে বাংলাদেশের এক অখ্যাত যুবকের নাম না জানা শত সহস্র কবিতা-গল্পের।

তো, আমি একটা ছোট ডায়েরি কিনে নিলাম। ডায়েরি না বলে সেটাকে বরং নোটবই বলাই শ্রেয়। দেখতে আদার বেপারিদের হিসাবের খাতার মতো। দাম নিয়েছিল সম্ভবত ত্রিশ টাকা। এখানে সেখানে গেলে সেই ডায়েরিটা আমার ব্যাগে থাকে। কিছু মনে এলে বা লিখতে ইচ্ছে হলে আমি ওটা খুলে ছোট ছোট অক্ষরে লিখি। ওই ডায়েরিতে চিন্তা বা ভাবনা ছাড়া নিজস্ব কোনো স্মৃতি লেখা নেই। গল্প বা উপন্যাসের জরুরি কোনো চিন্তা বা ঘটনা মনে এলে ওখানে টুকে রাখি। কোনো চরিত্রকে মেরে ফেলি, কোনো চরিত্রকে উপহাসের পাত্র বানাই, আবার কখনো কোনো চরিত্র নিয়ে লিখতে লিখতে সে আমাকেই কান্নায় ভিজিয়ে দেয়। এরকমও হয় মাঝে মাঝে। নিজের লেখা চরিত্র তখন বাস্তব মনে হয়। মনে হয়, উপন্যাসের মধ্যে সে যেমনটা কষ্ট পাচ্ছে, ওর চেয়ে গাঢ় কষ্ট জড়ো হচ্ছে আমার ভেতরে।

এ তো গেলো আমার কাগুজে ডায়েরির কথা। ইদানীং আমি অনলাইনে ডায়েরি লেখা শুরু করেছি, মেইলে। প্রতিদিন আমার যেসব চিন্তা আসে কিংবা লেখালেখির নতুন যে ভাবনা আসে—সেগুলো রোজ রোজ লিখে আমি নির্দিষ্ট কারো মেইলে পাঠিয়ে রাখি। অথবা এমনও হয়, আমি নির্মাণাধীন উপন্যাসের একটা খণ্ডিত অংশ মেইলে লিখে ফেলি। এরপর মেইলগ্রহীতার সঙ্গে ওই অংশটা নিয়ে কখনো সখনো আলাপ করি। কোনোদিন রোজকার ঘটনাগুলোও লিখি। কোথায় কোথায় যাই, গ্রামে কী ঘটছে না ঘটছে, ওইদিন কী কাজ বাকি পড়ে আছে—এইসব বিষয়ও লিখে ফেলি।

এতে হয় কি, প্রতিদিনই কিছু না কিছু লেখা হয়। হাত একদম বসে থাকে না। জং ধরে না লেখালেখির চিন্তায়। একজন লেখকের জন্য লেখার মশকো জারি রাখা খুব জরুরি বিষয়। মেইলে যখন রোজনামচাগুলো লিখি, তখন চেষ্টা করি গদ্যটা সুডৌল রাখতে। যে গদ্যে আমার উপন্যাস নির্মাণ হচ্ছে, সেই গদ্যটা ওখানেও ধরে রাখি। এতে পাণ্ডুলিপির প্রাথমিক হাতসাফাইটা হয়ে যায়।

 

প্রিয় আমীনুল,

এবার তোমাকে ডায়েরির কিছু ফায়দা-ফজিলত বলি। ডায়েরি লেখার সময় দেখা যায়, একটা লাইন মনে করে লিখতে বসলাম, লিখতে লিখতে হুটহাট করে আরও কিছু লাইন ওটার সঙ্গে ফ্রি হিসেবে চলে আসে। অনেক সময় উপন্যাসের জন্য সামান্য একটা ঘটনার শুরু লিখে রাখতে চেয়েছি, কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখি ঘটনার আরও উপাদেয় ডালাপালা বেরিয়ে আসছে। তখন আধ পৃষ্ঠা লেখার জায়গায় কয়েক পৃষ্ঠা অনায়াসে লেখা হয়ে যায়। ওই চিন্তাটা লিখে রাখতে রাখতে কখনো আরও গোটা দুই নতুন চিন্তারও উদ্ভব হয়। আমার অনেক হয়েছে এমন।

ডায়েরি লেখার আরেকটা বড় ফায়দা, ডায়েরিতে অনেক দ্রুত লেখা যায়। অনেকেই হয়তো মোবাইলের নোট বা ফেসবুকের ‘ওনলি মি’ স্ট্যাটাসের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। কিন্তু মোবাইলের কিবোর্ডের চেয়ে ডায়েরির হস্তলিপি অনেক দ্রুত হয় এবং সহজেই অনেক কিছু লিখে ফেলা যায়। এ কারণে ডায়েরির বিকল্প মোবাইল বা ইলেক্ট্রিক ডিভাইস ভরসাযোগ্য নয়। সঙ্গে একটা ডায়েরি বা নোটবুক রাখা আশু কর্তব্য।

 

প্রিয় আমীনুল ইসলাম,

বলতে বলতে তোমাকে অনেক কথা বলা হয়ে গেলো। সময় বয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর। পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ হচ্ছে, কোথাও দুর্ভিক্ষ, কোথাও বা ধর্মাচারের নামে ছেয়ে যাচ্ছে অধর্মের অনাচার। এ এক অলিখিত নিয়মতান্ত্রিকতা। এমনই হবে। পৃথিবী জন্মের পর থেকে, মানুষ আগমনের পর থেকে চলে আসছে যুদ্ধ, বিদ্বেষ, মানুষে মানুষে জিঘাংসার ইতিহাস। তুমি ইচ্ছে করলেই মুহূর্তে তা পাল্টে দিতে পারবে না। আগে তোমার নিজেকে তৈরি হতে হবে। তুমি যদি কিংবদন্তি হতে পারো তবে তোমার পৃথিবীটাও কিংবদন্তি করতে পারবে। একজন অলস বা একজন আত্মকেন্দ্রিক মানুষ কখনো পৃথিবী বদলের হাতিয়ার হতে পারে না। যে নিজের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সংগ্রামকে মানুষের বিপ্লবের জন্য তৈরি করে, তার হাতেই লেখা হয় পৃথিবীর ইতিহাস। আমি কামনা করি, তুমি জ্ঞানার্জন ও প্রজ্ঞা লাভের মাধ্যমে সেই সংগ্রামী মানুষদের কাতারের ইমাম হও।

 

ইতি

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

 

ফেব্রুয়ারি 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১