: হ্যালো কে?
: আমি।
: আমি মানে?
: জি, আমি বলছি। এই গভীর রাতে আপনি কেমন আছেন? ঠিক মতো ঘুম হচ্ছে তো?
: এই ফাজিলের ফাজিল! এতো রাতে ঘুম ভাঙাস, কে তুই?
: আমি আব্দুল। আপনি রাগছেন মনে হয়! মাঝ রাতে ঘুম থেকে জেগে রাগ করা ঠিক না। মাথা ব্যথা আসে। আপনার স্ত্রী থাকলে তাকে হ্যাল্লো দিবেন, রাখি। আব্দুল লাইন কেটে দিলো।
রাত পৌনে দু’টা। ঘুমোয়নি আব্দুল। বাজে কিসিমের মনখারাপ। বাজে কিসিম হলো- মনখারাপের কারণ খুঁজে না পাওয়া। আব্দুলের এই কিসিমের মনখারাপ হয় মাঝে মাঝে। এই সময় অচেনা লোকদের বিরক্ত করতে ভালো লাগে । দু’-একজনের ক্যাড়ে গলার গালি শুনলে মন ভালো হয়ে যায়। গালির ধরণ বেশি বাজে হলে হয় না, মোটামুটি ধরণ। যেমন খাটাশ, ফাজিল, ঢঙের ঘরের ঢঙ, ত্যাদড় কোনানের- এই সব গালি বেশ লাগে। হাসি পায় আব্দুলের। এই গালিগুলোতে একধরণের আন্তরিকতার ভাব আছে।
আব্দুল চোখ বুজে নাম্বার ডায়াল করে। কার নাম্বার উঠলো সে বিষয়ে মনোযোগের দরকার মনে করে না । রিং হচ্ছে ওপাশে। মাঝ বয়েসি ভারি গলার আওয়াজ এলো- হ্যালো কে?
: জি, আমি। এই গভীর রাতে আপনি কেমন আছেন জানতে পারি?
: কে আপনি? কাকে চান? কী দরকার? কেন ফোন দিয়েছেন?
: আপনি নিশ্চয় ঘুমাননি। ঘুম থেকে জাগা লোক এক সাথে চারটা প্রশ্ন করার কথা না। আপনার চারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি রাজি নই। আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন?
: কোনো প্রশ্ন নাই, আগে নাম বল। নইলে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেবো।
: আপনার কি মাথাব্যথা দোষ আছে? থাকলে কিন্তু এই মুহূর্তে রেগে যাওয়া ঠিক হবে না। ব্যথাদোষে ধরলে সব কিছু ফাঁটা ফাঁটা লাগবে, বুঝতে পারছেন?
: এই বদের বদ, বজ্জাতের বজ্জাত, তুই কে রে? জ্ঞান দেখাস আমারে, রাখ ফোন!
লোকটার দাঁত কটমটের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মারাত্মক রেগেছে বেটা। বেশ মজা পাচ্ছে আব্দুল।
: আপনার গালিগুলো বেশ ভালো লেগেছে। দয়া করে আরো দু’-একটা গালি দেন!
ওপাশে কোনো সাড়া-শব্দ নেই। চুপচাপ যাচ্ছে সময়। লোকটা যে আর কথা বলবে না এই ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত আব্দুল। কিন্তু ফোন কেটে না দেয়ার পেছনে কারণ কী বুঝতে পারছে না। হাতে যন্ত্রণা হচ্ছে। বেশ সময় ধরে কানে হাত। আব্দুল লাইন কেটে দেয়। নিজেকে হতাশ হতাশ লাগছে এখন। আলাপ সম্পূর্ণ না হলে মাথায় ভন ভন করে। ফোনালাপে এই জটিল বিষয়টা সহ্য হয় না। আরো একটা ফোন করা দরকার। মন্ত্রী-টন্ত্রী কাউকে ফোন দিলে কেমন হয়! দেশের সার্বিক বিষয়ে জমিয়ে কথা বলা যেতো।
নিশ্চয় মন্ত্রী সাহেব এখন কফির মতো কিচ্ছু খাবেন। দেশের উন্নতির ফর্মুলা খুঁজবেন মনোযোগ দিয়ে । মন্ত্রী সাহেবের মনোযোগ নষ্ট করে দিয়ে জিজ্ঞেস করা যেতো- মিস্টার মন্ত্রী মহোদয়! লেবু জিনিসটা কি ফলের পর্যায়ে পড়ে? মন্ত্রী সাহেব রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকাতেন। এতো কিছু থাকতে লেবু বিষয়ে জটিলতা দেখা দিলো কেন, এই বিষয় তদন্ত কমিটি তৈরির চিন্তা-ভাবনা করতেন। মন্ত্রী সাহেবের ভাবনা ভেঙে দিয়ে আবার বলা হতো- লেবু আমাদের জাতীয় ফল হলে কেমন হয়? মন্ত্রী সাহেব চোখ কপালে তুলে হাবার মতো চেয়ে থাকতেন। মন্ত্রীদের হাবা বানাতে কী রকম লাগে কে জানে। লেবু জাতীয় ফল হবে কেন, এই বিষয়ে যুক্তি দেয়া যেতো- দেখুন মন্ত্রী মহোদয়! কাঁঠাল আমরা বারো মাসে একবার পাই। আর লেবু পাই আল্লাহ’র দেয়া বারো মাস। আপনার ডাইনিং থেকে নিয়ে কালুর কুঁড়ে ঘর পর্যন্ত লেবুর ছড়াছড়ি। আমার মনে হয় লেবু যে জাতীয় ফল এই বিষয়ে আপনার চিন্তা-ভাবনা করা দরকার, কী বলেন? মন্ত্রী সাহেব ছোট্ট করে জবাব দিতেন- হুঁ।
সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় আব্দুল। মন্ত্রী সাহেবের নাম্বার দেখা যাচ্ছে মোবাইলের স্ক্রিনে। রিং হচ্ছে…। কেউ রিসিভ করবে?
লেখক : সুরশিল্পী, গীতিকার
