আমার বাসার নম্বর ৪১। এলাকার নম্বর ৩৫ এবং সড়ক নম্বর ৮০৬। আমি যে এলাকায় থাকি এর নাম ‘ফিরিজ কিলিব’। সঠিক আরবিতে এটির উচ্চারণ হওয়ার কথা ‘ফিরিজ কুলাইব’। ‘কুলাইব’ শব্দটি যদি ‘কালব’ থেকে হয় তবে এর অর্থ ছোট কুকুর বা কুকুরছানা। নামের এমন ভয়ঙ্কর অর্থে আমি হতভম্ব হয়েছিলাম।
‘ফিরিজকিলিব’ এলাকাটি মদিনাখলিফার অন্তর্গত। কাতারের সদ্যপ্রয়াত সাবেক আমির শেখ খলিফা বিন হামাদ আলথানির নামে এই শহরের নামকরণ করা হয়। ইংরেজিতে এর অর্থ দাঁড়ায় খলিফা সিটি, বাংলায় ‘খলিফা নগর’। মদিনা খলিফায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে।
আমি যেখানটায় থাকি, এর উল্টোদিকে বিশ্বখ্যাত টিভি আলজাজিরার প্রধান কার্যালয়। নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘেরাও করা বেশ বড় জায়গায় নির্মিত এই কমপ্লেক্সে আরও আছে খেলাধুলা সম্প্রচারের চ্যানেল ‘বিইনস্পোর্টস’-এর প্রধান দপ্তর এবং কাতারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবন। এই সড়কে যে গোলচত্ত্বরটি ছিল, সম্প্রতি তা ভেঙে ট্রাফিক সিগন্যালে রূপান্তর করা হয়েছে। গোলচত্ত্বরটির নাম ছিল টিভি চত্ত্বর, আরবিতে বলা হতো ‘দাওয়ার তিলিফিজিউন’।
এখান থেকে ডানদিকে গেলে সোজা কর্নিশে সাগরতীর। বামদিকে গেলে আলরাইয়ান এলাকা পর্যন্ত সোজা সড়কপথে কাতার পাসপোর্ট ও অভিবাসীদের প্রবেশ এবং বর্হিগমন দপ্তর। আর সোজা গেলে কাতার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছা যাবে কয়েক কিলোমিটারেই। গোলচত্ত্বরটি দোহার অন্যান্য গোলচত্ত্বর থেকে আকৃতিতে বেশ বড় ছিল এবং দিনভর এতে যানজট লেগে থাকত।
ফিরে আসি বাসার কথায়। আমার বাসাটি একটি দোতলা পুরনো দালানের ছাদে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। প্রায় একবছর ছাদটি খোলা ছিল এবং আমার স্বাধীনতা ছিল। সম্প্রতি আমার রুমের পাশে আরেকটি রুম তৈরি করেছেন বাড়ির চতুর ব্যবস্থাপক। সেখানে নেপালি তিন তরুণ থাকেন। তাদের সঙ্গে আমার সপ্তাহে দুয়েকবার দেখা হয়, কিঞ্চিত হাসি বিনিময়ে আমাদের কুশল বিনিময় সীমাবদ্ধ।
আমার বাসা থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব মাত্র সাত মিনিটের। ভোর পাঁচটা পয়তাল্লিশে গাড়িতে উঠলে পাঁচটা বায়ান্নতে অফিসে পৌঁছি। বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে অতিক্রম করতে হয় মাত্র একটি ট্রাফিক সিগন্যাল। কর্মস্থল এবং পড়াশোনার বিশ্ববিদ্যালয় কাছাকাছি হওয়ায় এ এলাকাটি আমার প্রিয় এবং পছন্দনীয়। এখান থেকে দোহা শহরের মূল অলিগলি খুব কাছে। মন চাইলে মাত্র ১০ রিয়ালের ট্যাক্সি ভাড়ায় চলে যাওয়া যায় যে কোনো সময়ে।
কাতারের অন্যান্য এলাকার মতো এখানেও তুর্কি, ভারতীয় ও আরবীয় রেস্তোঁরা রয়েছে। তবে আমার বাসা থেকে হেঁটে যাওয়ার দূরত্বে কোনো বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ নেই। নিজে রাঁধতে পারি না বলে দিনে রাতে খেতে হলে ভারতীয় নয়তো আরবীয় রেস্তোরাঁই ভরসা। রুচি বদলের জন্য তুর্কি রেস্তোরাঁর শর্মা অখবা বারবিকিউ বেশ ভালো লাগে।
এই রেস্তোরাঁগুলোর পাশে বেশ জমজমাট ব্যবসা জমিয়েছে অনুবাদ এবং টাইপ করার বেশকিছু দোকানপাট। দিনভর এসব দোকানে ভিড় লেগে থাকে। সাইনবোর্ডে অনুবাদ, টাইপ, ডিজাইন ও প্রিন্ট এবং ফটোকপি লেখা থাকলেও এসব দোকানের অন্য ব্যবসা হচ্ছে অর্থের বিনিময়ে জ্ঞান বিক্রি। মোটা অংকের রিয়াল দিলে এই দোকানিরা যে কোনো বিষয়ে একাডেমিক পেপার তৈরি করে দিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছেলেপুলে এসব দোকানে আসে এবং তাদের প্রয়োজনীয় একাডেমিক অ্যাসাইনমেন্টের কাজ সারিয়ে নেয়। কী বিষয়ে কোন ধরনের শিক্ষাপত্র লাগবে, তা বলে দিলে নির্ধারিত সময়ে এঁরা সেসব তৈরি করে দেয়। বিনিময়ে দিতে হয় মোটা অংকের শিক্ষাসম্মানী। এখান থেকে আমার অনেক সহপাঠী হোমওয়ার্ক কিনে বেশ ভালো নম্বর পেয়ে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেছে।
এই মহল্লার সবচেয়ে উপভোগ্য জায়গাটি হচ্ছে, সবুজ ঘাসে সাজানো সড়কদ্বীপ। এর সামনে রয়েছে চায়ের ছোট দোকান। বিকেল হলে অনেকে এখানে চলে আসেন সময় কাটাতে। চারপাশে খোলামেলা জায়গায় সবুজ ঘাসে বসে কেউ দেশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে ইমো বা বিভিন্ন ফোন অ্যাপের মাধ্যমে ফোনালাপ করেন, আবার অনেকে গোল হয়ে আড্ডায় মেতে ওঠেন। আশপাশের দু-চারটি এলাকায় এমন সুন্দর ছিমছাম ও নিরিবিলি জায়গা নেই।
কাতারে এই এলাকাটি আমার তৃতীয় আবাসস্থল। প্রবাসজীবনের প্রথম সাড়ে চার বছর কেটেছে আলসাদ এলাকায় কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে। কী মধুর ছিল সেই দিনগুলো। অনার্স পাশের পর স্বাভাবিক নিয়মে ছাত্রাবাস ত্যাগ করতে হলো। এরপর বাসাভাড়া নিয়েছিলাম আলহিলাল এলাকায়। বসবাসের জন্য সুন্দর পরিবেশ হলেও ব্যাচেলর হিসেবে আমার জন্য তা ছিল বড় অস্বস্তির। সেখানে চার মাস থেকে পরে চলে আসি এই এলাকায়।
আলহিলাল এলাকায় আমি যে বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলাম, এর বিপরীত দিকে ছিল একজন বদমেজাজি কাতারি বিধবা নারীর বাসা। আমি কেন ব্যাচেলর হিসেবে বাসা ভাড়া নিয়েছি, সেজন্য তিনি নালিশ করেছিলেন পৌরসভা দপ্তরে। পরে সেখানকার কর্মকর্তারা এসে আমার সঙ্গে কথা বলেন। আমি তখন আরবি দৈনিক আলশারকে কর্মরত। ফলে পরিচয়পত্রে লেখক পরিচয় দেখে তারা আমাকে বলেছিলেন, তুমি একা থাকতে পারবে তবে বাসায় তোমার বন্ধুরা আসা-যাওয়া করতে পারবে না। এটি পরিবার নিয়ে বসবাসের জন্য আবাসিক এলাকা, তাই ব্যাচেলর তরুণদের আনাগোনা অনুমোদিত নয়। এর কিছুদিন পরই আমি সেই বাসা ছেড়ে দিই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর সরকারিভাবে আমাকে যে থাকার জায়গা দেওয়া হয়েছিল, সেটি ছিল অনেক উন্নত এবং আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি ভবনে। আমার নামে সেটি বরাদ্দের পর জানানো হলো, এই ভবনের নিচে সবসময় নিরাপত্তাপ্রহরী থাকবে এবং কোনো অতিথি রাতে থাকতে পারবে না। আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অনুরোধ করে সেই আবাসন ব্যবস্থা বাতিল করাই এবং এর বিনিময়ে ভাড়া হিসেবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাবনা পাশ করাতে সমর্থ হই। বন্ধু-বান্ধববিহীন একা একা বিলাসবহুল জীবন কখনোই আমার কাছে ভালো লাগার নয়।
কাতারে ব্যাচেলরদের জন্য রুম বা বাসা ভাড়া পাওয়াটা বেশ কঠিন। অধিকাংশ আবাসিক এলাকা শুধু সপরিবারে বসবাসের জন্য। সেসব এলাকায় ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেওয়া নিষেধ। ফলে অনেক বাসাবাড়ির ম্যানেজাররা এই নিষিদ্ধ কাজটি করেন মোটা অঙ্কের ভাড়া দাবি করে। একটি পরিবারের কাছে ভাড়া দিলে যে বাসার ভাড়া দেড় হাজার রিয়াল হওয়ার কথা, সেটি ব্যাচেলরের কাছে ভাড়া দেওয়া হয় দু হাজারের বেশি রিয়ালে। কাতারজুড়ে এই ব্যবসায় জড়িয়ে আছেন বিশেষত ভারতীয় এবং বাংলাদেশিরা।
চলবে…
