নবপরিবার : প্রিয় বই এবং প্রিয় পত্রিকার ঠিকানা

সংখ্যা:

 

প্রিয় বই অথবা পত্রিকার কথা বলতে গেলে আপনাআপনিই চলে আসে নবপ্রকাশের কথা। নবপ্রকাশের বেশকিছু বই খুব তৃপ্তির সঙ্গে পড়া হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতি মাসে পড়া হয় নবধ্বনিও। সুতরাং এ ব্যাপারে অল্পকিছু না বললে অকৃতজ্ঞতা হবে।

নবধ্বনির কথা যদি বলি, এতো অল্পদামে এতো সুন্দর একটা পত্রিকা পাওয়া যায় পত্রিকাটির সাথে পরিচয় না হলে বোধহয় জানা হতো না। সবচেয়ে ভালো লাগে এর বিষয়ভিত্তিক আয়োজনগুলো। একেক মাসে একেকজন বরিত ব্যক্তিকে নিয়ে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে লেখা, একেক সময় একেক বিষয় বা ব্যক্তিকে জানতে পারা, ব্যাপারটা সত্যিই অনেক ভালোলাগার। এইটাকে আমার কেন যেন টক-ঝাল-মিষ্টি আচারের মতো মনে হয়। মনে হয়, ছোট্ট একটা প্যাকেটে কয়েক প্রকার স্বাদ। যেটা শেষ হওয়ার পর হাত চাটতে চাটতে চলতে থাকে পরেরবার কবে পাওয়া যাবে সেই ভাবনা।

নবধ্বনির সাথে আমার প্রথম পরিচয় সুমাইয়ার হাত ধরে। গোল গোল চশমা-পরা বোকাসোকা চেহারার দুষ্টু মেয়েটা খুব অল্প সময়ে প্রিয় বন্ধুদের জায়গাটা দখল করে নিয়েছিল। নিজে কখনও বই পড়ত না, কিন্তু আমার পড়ার কাজে মনপ্রাণ দিয়ে সাহায্য করত। মাদরাসায় ‘আউট বই’ নিষিদ্ধ। এজন্য লুকিয়ে পড়ার সময় ও স্বেচ্ছায় পাহারাদার বনে যেত। নাওয়া-খাওয়া ভুলে বইয়ের মধ্যে ডুবে গেলে সুমুই খাইয়ে দিত। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেলে যত্ন করে তুলে রাখত বইপত্র। এর-ওর কাছ থেকে ধার করা বইপত্র জোগাড় করে দিত। আর প্রতিবার বাড়ি থেকে ফেরার সময় ভালোমন্দ খাবার-দাবারের পাশাপাশি কোথা থেকে যেন একগাদা পুরনো পত্রিকা নিয়ে আসত। আদর্শ নারী, নকীব, কিশোরকন্ঠ, মঈনুল ইসলাম, আল-আবরারসহ আরও অনেক কিছু। ওসবের ভিড়েই একদিন খুঁজে পেয়েছিলাম নবধ্বনিকে। ওটা সম্ভবত মুফতী আমিনী রহ. সংখ্যা ছিল। প্রচ্ছদের রঙ ছিল কালো। পৃষ্ঠাগুলোও কেমন ঘোলাটে। কিন্তু লেখাগুলো যেন প্রজাপতি রঙে রাঙানো। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গেল। এক বসায় পড়ে ফেললাম পুরোটা। কিন্তু তারপরের সংখ্যাগুলো অনেক খুঁজেও আর পেলাম না। কদিন পর সুমু জানালো পত্রিকাটা নাকি বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় ওর বাবা রাখতেন কিন্তু এখন আর পাওয়া যায় না।

কয়েকবছর পর হঠাৎই খবর পেলাম নবধ্বনি আবার পাওয়া যাচ্ছে। আব্বুকে বলে অর্ডার করলাম। তারপর থেকে প্রায় তিন বছর হলো নবধ্বনির নিয়মিত পাঠিকা আমি।

সময় বদলে গেছে। সাথে সাথে বদলেছে নিজের অবস্থানও। গত বছর ছাত্রী থেকে শিক্ষিকা হিসেবে প্রমোশন হয়েছে। এখন আর লুকিয়ে কোনো কিছু পড়তে হয় না আলহামদুলিল্লাহ। বরং নিজে পড়ার পাশাপাশি ছাত্রীদেরও উৎসাহিত করা হয়। মাস শেষে মেয়েরা ঘ্যান ঘ্যান করে, ‘আপা, নবধ্বনি আসবে কবে?’ আমি মুচকি হাসি। এই হাসিটা প্রশ্রয়ের, আনন্দের এবং কিছুটা গর্বেরও।

তবে একটা কথা না বলে পারছি না। নবধ্বনির প্রচ্ছদসহ প্রায় প্রত্যেকটা পৃষ্ঠায় প্রাণীর ছবি দেয়া থাকে। হয়তো এ ব্যাপারে পত্রিকাওয়ালাদের নিজস্ব ব্যাখাও আছে। কিন্তু বিষয়টা নিয়ে বারবার বিব্রত হতে হয়েছে। অনেকে ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘হুজুরদের পত্রিকায় প্রাণীর ছবি কেন? এইটাই হলো ডিজিটাল জামানা।’ তাছাড়া মাদরাসা-কর্তৃপক্ষেরও এমনটাই অভিযোগ। অনেকসময় পত্রিকা হাতে পেয়ে সবগুলো ছবি কেটে তারপর ছাত্রীদের হাতে দিতে হয়েছে। বিষয়টা আমার নিজের কাছেও দৃষ্টিকটূ মনে হয়। এতো সুন্দর একটা পত্রিকা অথচ এই বিষয়টা নিয়ে কথা শুনতে হয়। অনেকে তো ছবি দেখেই বলে দেন ‘ফালতু পত্রিকা’। ভেতরের পাতা উল্টিয়ে দেখারও প্রয়োজনবোধ করেন না। পত্রিকার ব্যবস্থাপকরা যদি এ বিষয়টা খেয়াল করতেন তাহলে আমার মতো অনেকের উপকার হতো। নবধ্বনির জন্য শুভকামনা রইল। নতুন দিনের পদধ্বনি নিয়ে নবধ্বনি হয়ে উঠুক হাজারও তরুণ-তরুণীর হৃদয়ধ্বনি।

নবপ্রকাশ নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীরের অসম্ভব সুন্দর ‘প্রিয়তমা’ বইটির কথা বলতে হয়। লেখকের প্রায় সাত-আটটা বই পড়ার সুযোগ হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। ‘বদরের বীর’, ‘সেই হীরা’, ‘প্রিয় প্রেয়সী নারী’, ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’, ‘দ্যা অ্যাডমিরাল’—মোটামুটি সবগুলোই ভালো লেগেছে। তবে তাঁর ‘প্রিয়তমা’ বইটা অন্যরকম। একটানে হাজার বছরের অতীতকে কলমের আঁচড়ে বর্তমানে তুলে আনা হয়েছে বইটিতে। পড়তে পড়তে বর্তমান থেকে হারিয়ে গিয়েছিলাম চৌদ্দশ বছর অতীতের ধূসর মরুতে। মনে হচ্ছিল এই তো হাত বাড়ালেই ধরা যাবে, ছোঁয়া যাবে আমার প্রিয় নবিজীকে। সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। উম্মুল মুমিনিনদের সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের দাম্পত্য জীবনের প্রেমময় ছবি এমনভাবে ভেসে উঠছিল, মনে হচ্ছিল যেন রাসুলের উঠোনে আমার ঘরের জানালা খোলা হয়েছে। আর আমি সেখানে বসে প্রতিবেশীর মতো দেখতে পাচ্ছি রাসুলের আলো ঝলমল জীবনছবি। পুরো বইটা জুড়ে আম্মাজানদের প্রতি রাসুলের প্রেম, প্রণয়, স্নেহ-প্রীতি আর ভালোবাসা অভিনব বর্ণনায় উঠে এসেছে।

নবপ্রকাশের চমৎকার আরেকটি বই ‘গল্প বলি ফিলিস্তিনের’। ৮০ পৃষ্ঠা কলেবরের ছোট্ট বই, কিন্তু হৃদয়কাড়া। লেখক হামমাদ রাগিব। হামমাদ ভাইয়ার গল্পের সাথে পরিচয় সেই কৈশোরে। প্রিয় পত্রিকা মাসিক কলমদানিতে ছোটগল্প লিখতেন। যাপিত জীবনের গল্পগুলো বলে যেতেন সহজ সরল সুন্দর ভাষায়। এখানে ফিলিস্তিনের সকরুণ গল্পগুলোও তিনি বলেছেন হৃদয়কাড়া ভঙ্গিমায়। ইসরায়েল শব্দটা ছোটবেলা থেকেই অহরহ শুনে এসেছি রেডিও, টেলিভিশন আর পেপার-পত্রিকায়। ফিলিস্তিন, বায়তুল মুকাদ্দাস, মাসজিদে আকসা—শব্দগুলোও অপরিচিত নয়। কিন্তু এককালের ফিলিস্তিনই যে আজকের জবরদখল করা ইসরায়েল, এটা অনেকটা সময় পর্যন্ত জানা ছিল না আমার। আর যতটুকু জানতাম তাতেও যে প্রশ্নগুলো মনে উদয় হতো, সেসবের যথাযথ উত্তর খুঁজে পেতাম না সেভাবে। এই না-জানা গল্পগুলোই জানানো হয়েছে ‘গল্পবলি ফিলিস্তিনের’ বইটিতে। ফিলিস্তিনের অতীত ও বর্তমানকে একচুমুকে ঢুকিয়ে নেওয়া যায় করোটিতে। ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে গল্পের ছলে পুরো ফিলিস্তিন উঠে এসেছে বইটির পাতায় পাতায়।

বায়তুল মুকাদ্দাসে দ্বিতীয় খলীফা হজরত উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিজয় নিশান ওড়ানো থেকে নিয়ে আল-কুদসের শেষ শাসক ইফতেখারুদ্দৌলার পরাজয়, আরব জাতীয়তাবাদের আশায় ফিলিস্তিনে তুর্কি খেলাফতের মূলোৎপাটন, ব্রিটিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের পুনর্বাসন, ইহুদিদের আলাদা আবাসভূমির স্বপ্ন বাস্তবায়নে পশ্চিমা শক্তির ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র, আল-কুদসে ইহুদিদের জবরদখল, ইহুদি কর্তৃক নির্যাতিত মুসলমানদের শোচনীয় অবস্থা আর তাঁদের মরণজয়ী বীরদের গৌরবময় বিরত্বগাঁথা—সবকিছু লেখা হয়েছে গল্পের আদলে, সাবলীল ভাষায়।

এ ছাড়া নবপ্রকাশের চমৎকার আরও বেশ কয়টি বই পড়েছি, দু-একটা ছাড়া সবগুলোই মৌলিক। প্রতিটা বই-ই বিষয়বস্তু ও লেখার মানের বিচারে আমার কাছে ভালো লেগেছে। তবে সম্প্রতি নবপ্রকাশের দুয়েকটা অনুবাদ বই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চোখে পড়েছে। আমাদের মতো যারা নিজেরা ভালোমন্দ অতোটা যাছাই করার যোগ্যতা রাখে না, ব্যাপারটা তাদের জন্য বেশ চিন্তার। নবপরিবারের কাছে অনুরোধ বিষয়টাতে সতর্ক দৃষ্টি দেয়ার।

নবপ্রকাশ আরও আরও সুন্দর এবং মানসম্মত বই উপহার দিক আমাদের, প্রতি মাসে ঝকঝকে প্রচ্ছদের ছোট্ট নবধ্বনিও হাজির হোক নিত্যনতুন বিষয় নিয়ে, বিরতিহীন, এটাই কামনা। নবপরিবারের প্রতি রইল অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

 

কামারগাড়ি, সদর, বগুড়া

ডিসেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১