বইজগতের মানুষ হলে পরিবারের অন্য সবার দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। সারাক্ষণ মাথা-ব্যথা থাকে সবার—এই বুঝি ছেলেটা উচ্ছন্নে গেল, অকর্মন্য ও দায়িত্বজ্ঞানশূন্য হয়ে মহাবিপদসংকেত নিয়ে আবির্ভূত হলো।
কী করবে এই বই-টই পড়ে? না পারবে ঘরের কাজ করতে না পারবে বাইরের। সংসার করবে ক্যামনে? বৌ-বাচ্চারে খাওয়াবেই-বা কী? দুশ্চিন্তার কালোমেঘ যেন ভেঙে পড়ে সবার মাথায়।
এই তো সেদিন, একটামাত্র একটা বই কিনেছি। তা হাতে করে বাড়িতে ঢুকতেই মা দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন—‘আবার বই কিনছস! সারা ঘর বই দিয়া ভইরালা।’ এমনিতে মায়েরা সর্বংসহা হন, কিন্তু ছেলেমেয়েদেরকে বই কিনতে ও বইপাঠের নির্জন নিমগ্নতা দেখলেই কোত্থেকে যে এমন কঠোরতা নিয়ে হাজির হন, আল্লাহ মালুম।
এটা শুধু একজনের বিরক্ত মনোভাবের প্রকাশ, বাকি আরো যারা আছেন তাঁরাও কি কম যান! আব্বা তো তিরস্কারের সুরে কতবার বললেন—‘হেয় বলে সায়িত্যিক অনব, লেকক অইব! বাপের হোটেলে খাও তো, টের ফাও না। সামনের মাসেত্তে টেহা কম ফাবি, বুঝলি?’ মাসের পর মাস চলে যায়, নাস্তা না করে, ভালোমন্দ না খেয়ে টাকা জমিয়ে একটা দুটা বই কিনি, তাও কত কথা শুনতে হয়। আরো যে কত বই কিনতে না-পারার ব্যথা বুকে রয়ে যায়, কে অনুভব করবে এই ব্যথার জ্বলন?
বই তো বই। যে বই পড়ে, তার জন্য এটা যত্ন ও ভালোবাসার বিষয়। যে পড়ে না, তার কি আর অত যত্ন-টত্ন ও আলমারিতে সাজিয়ে-গোছিয়ে রাখার ব্যাপার-স্যাপার আছে? তার কাছে এই বই মানে ফেরিওয়ালার ভ্যানে কয়েক পয়সায় বিক্রির সামান। আপাতত কয়দিনের চা আর পানসুপারির খরচ চলে যাবে নির্দ্বিধায়। নইলে সেদিন কেন আমার প্রাণপ্রিয় বাপজান পুরাতন প্রায় পঞ্চাশখানা বই ও বিভিন্ন ম্যাগাজিন বিক্রি করে দেবেন!
আমি ছিলাম বাইরে। খবর পেয়ে তড়িগড়ি এসে দেখি আব্বা একশো টাকার কয়েকটা ও দশবিশ টাকার সামান্য কটি নোট গুণছেন। সাথে সিকি পয়সাও আছে কয়টা, এ যুগে যা অচলপ্রায়। আর এদিকে তেল চিটচিটে কালো মাথার ফেরিওয়ালা লোকটা বইগুলোকে তার ভ্যানে আছড়ে ফেলছে। সে যেন বইগুলোকে নয় আমাকেই আছড়ে আছড়ে হাড়গোড় ভেঙে দিচ্ছে। আমার সর্বনাশ হয়ে গেল। চশমার উপর দিয়ে আব্বা আমাকে দেখে বলেন—‘এইগুলা তো ফুরান অইয়া গ্যাছে, ফাতা ছিরা গ্যাছেগা, টিশ খইয়া গ্যাছেগা, বালাগুলি আনি নাই, গরে রইছে দ্যাহোগা।’
আমি শুধু বাপজানের কাণ্ড-কারখানা দেখতে থাকি। আমার ভেতরটা নিদারুণ ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠতে থাকে। এই বইগুলো বিগত ১০ বছরে দফায় দফায় কেনা। মাত্র একদিনের একটা মুহূর্তেই নাই হয়ে গেল!
২০১৮-এর জুলাই মাসে নবধ্বনি পত্রিকায় ‘প্রিয় শিক্ষক’ প্রতিযোগিতার বিজয়ী পাঁচজনের মধ্যে আমার লেখাও স্থান পেয়েছিল। উসতাজে মুহতারাম শায়েখ শহীদুল্লাহ ফজলুল বারী রহ.-কে নিয়ে লিখেছিলাম। পরম যত্নে এই লেখাটা লেখার পর যখন পত্রিকায় ছাপা হলো এবং পুরস্কার হিসেবে অনেকগুলো বই ও পত্রিকার কপি পেলাম, প্রথমেই আমার খিটখিটে আব্বাকে দেখালাম—‘এই দেখেন, এই লেখাটার জন্যই পুরস্কারগুলো পেয়েছি।’ আব্বা বইগুলোতে হাত বুলিয়ে দেখলেন, তেমন কিছুই বললেন না। অজু করে এশার নামাজে চলে গেলেন। আমিও বইগুলো গোছিয়ে রেখে নামাজের জন্য পা বাড়ালাম।
নামাজ থেকে ফিরে আব্বা বললেন—‘তোর লেহাডা দে দেহি, কি লেকছত ওট্টু ফরি।’ আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে আব্বার সামনে লেখাটা বাড়িয়ে দিলাম। পুরো লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়ে মন্তব্য করলেন—‘বালা লেকছত, তয় এমন কিছু লেকবি না যে বাইত ফুলিশ আয়ে, বুঝলি?’ আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালাম আর বললাম—‘আমরা বাড়িতে পুলিশ আসবে এমন লেখা লেখি না, আমরা দীন-ধর্ম ও কুরআন-হাদিসের কথা লেখি।’
আমার আব্বা প্রচুর পত্রিকা পড়েন। একজন তুখোড় সংবাদপাঠক বললেও ভুল হবে না। মাঝেমধ্যে মজার গল্পগ্রন্থ হলে তাও পড়েন আয়েশ করে। অনেক সময় মাকেও পড়ে শোনান। যেখানে হাসির কথা সেখানে পড়ার মধ্যেই হাসতে থাকেন আর পড়তে থাকেন। মাও তাই। আব্বার সাথে তাল মিলিয়ে হাসেন।
পরদিন সকালে হঠাৎ করেই আব্বার চ্যাঁচানি শুনতে পেলাম। দৌড়ে ওই ঘরে গিয়ে দেখি তাঁর হাতে হোসাইন আবদুল কাদিরের জবানবন্দি—‘গুয়ান্তানামোর ডায়েরি।’
আমি বললাম—‘এতো চিল্লাপাল্লার কী আছে?’ আব্বা আমাকে চোখ বড় বড় করে ধমকের সুরে বললেন—‘এই বই আজ্জাত্তে যে আর বাইত না দেহি, এই বই গাঙ্গ ফালাবি। এম্নোই দেশকাল বালা না, তরা থাহছ দূরে দূরে, মাদরাসাত, আমরা কত চিন্তা করি। আবার এই জাতের বই, ফুলিশ না বাইত আইয়া উটবো, মাদরাসাতও কি এই সমস্ত বই ফরছ?’
আমি বললাম—‘আরে না, মাদরাসায় আউট বই পড়ার সময় কই। আর এ বইয়ে কোনো সমস্যাই নাই। এাঁ কেবল একটা আত্মজৈবনিক গ্রন্থ। লেখক কিছুদিন সন্দেহের আসামি হয়ে কারাগারে বন্দী ছিলেন, তার এই বন্দীজীবনের নানান নির্যাতন ও কষ্ট-দুর্ভোগের কথাগুলোই বইয়ে লিখেছেন। এতে জঙ্গি-টঙ্গীর কিচ্ছু নেই। আপনে শুধু শুধু চিল্লায়েন না। আগে পুরা বই পড়েন, তারপর যা কওয়ার কইয়েন।’
দেখলাম তিনি আবার বইয়ে মনোযোগ দিয়েছেন।
বইটা শেষ করেছেন বোধহয়। চোখেমুখে বিমর্ষ ভাব দেখে বুঝলাম বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়ানো নিদারুণ ব্যথায় তিনিও এখন ব্যথিত। হোসাইন আবদুল কাদিরকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে পাঁচ মিনিটের কথা বলে। আব্বা বললেন—‘কই ফাছ মিনিট আর কই ছাব্বিশ মাস, এমুন আরো কত বালা মানুষ জেলখানাত ফইরা রইছে, বিনা দোষে, কোনো অফরাদ নাই, তাও। মিছা মামলায় ডুহায় দিছে। সবতে জদি এম্নে কইরা লেকতারতো আর সারা দুইন্নার মানু ফরতারতো।’
তারপর আমি আব্বাকে নবধ্বনির দশ বছর পূর্তিসংখ্যা বের করে বি-বাড়িয়ার হাফেজ মাওলানা মুবারকের প্রায় ছয়বছর গুয়ান্তানামো কারাগারে বন্দী থাকা ও নির্যাতনের কাহিনি পড়তে দিলাম। দেখলাম আব্বা বেশ আগ্রহের সাথেই পড়তে শুরু করলেন। একসময় এ সংখ্যাও পড়ে শেষ করে ফেললেন।
আমার হাতে তখন নবধ্বনি গল্পসংকলন বইটি। মাত্রই অর্ধেক পড়েছি। আব্বা জিজ্ঞেস করলেন—‘তোর আতো এইডার নাম কি?’ আমি বললাম—‘নবধ্বনি গল্প সংকলন।’ গল্পের কথা শুনেই তিনি তৎক্ষণাৎ বইটি চাইলেন। আমিও পড়া আগে না বাড়িয়ে বইটি আব্বার হাতে দিয়ে দিলাম। আব্বার আগ্রহকে এখানে সমীহ করলাম আমি এই আশায়, হয়তো তিনি সামনে আমার আর কোনো বই বেচে দেবেন না। নতুন কোনো বই কিনলেও যাচ্ছে তা বকবেন না।
এক দুপুরে দেখি আব্বা নাক ডেকে ডেকে ঘুমোচ্ছেন। লাগাতার এই নাক ডাকার শব্দ আমার কাছে কেমন যেন কোনো এক জঙ্গলে একলানির্জন দুপুরে ভূতুড়ে আওয়াজের মতো লাগছে। সমুদ্রের ভয়াল গর্জন ও উত্তাল তরঙ্গমালার শব্দ যেমন, ঠিক তেমন। আমি কল্পরাজ্যে আব্বাকে দেখতে পেলাম একজন দক্ষ নৌ-সনাপতি ও সাহসী ক্যাপ্টেনরূপে। যিনি সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন রাজ্য পরিভ্রমণে বের হয়েছেন। সঙ্গে আমিও আছি এবং দুর্দান্ত সব সৃষ্টিরহস্য ও অজানা সব নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্ঘাটন করে চলেছি। সমুদ্রের অথৈ জলরাশি ও পাহাড়সম ঢেউয়ের ভেতর দিয়েই আমার কল্পনার জাহাজ এগিয়ে চলছে। কখনো স্বস্তি, কখনো স্ফূর্তি আবার কখনো বিপদাশংকার সমুপস্থিতি। বিভিন্ন দেশের রাজরাজড়াদের অভ্যর্থনা, আপ্যায়ন এবং নানান দেশের নৌ-সেনাদের সাক্ষাৎদর্শন ও ভুবনবিখ্যাত শাহিমহলের বিপুল আতিথেয়তার দুর্লভ অভিজ্ঞতাসঞ্জাত অনুভব-অনুভূতির এক দারুণ আখ্যান। এভাবেই কল্পনার রাজ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলাম। হঠাৎ করেই আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল আব্বার নড়ে ওঠার ফলে। তাঁর মুখের ওপর উপুড় করে রাখা খোলা বইটির কারণে বোধহয় নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে। বইটি আমি আলতো করে তুলে নিলাম আব্বার মুখ থেকে। দৃশ্যত তিনি এখন আমার ঘুমন্ত শান্ত-স্থির বাবা। আগের মতো রূঢ় ও খিটখিটে স্বভাবের নন। তবে কি তিনিও একসময় নিজেকে পনেরো শতকের দ্য অ্যাডমিরাল সাইয়িদি আলি রইস ভাবতে ভাবতে অজান্তেই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছেন?
গাজীপুর, ঢাকা
ডিসেম্বর 2019

