হৃদয়ের কথা শুনিতে ব্যাকুল

সংখ্যা:

 

বইয়ের নাম ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’। নবপ্রকাশের বই। প্রচ্ছদে বাঁশবনের শ্যামল ছায়া। পাতারা। একটা জানালা আধখোলা, বিকেলের নরোম রোদের ঘ্রাণ পৌঁছে যাচ্ছে বাতায়নপথ। হয়তো-বা জানালাটির ওপাশেই লেখকের শিথান, একটা কলম খসখস কালি খসিয়ে যাচ্ছে হৃদয়ের অমল ধবল জোৎস্নার প্রান্তরে।

হঠাৎই পদ্মাপাড়ে আমার হারানো গ্রামে ফিরবার একটা মওকা এসছিল দিনদুয়েকের জন্য, ব্যাকপ্যাকে গিয়ে চুপচাপ সিঁধোলো বইটি। সফরে, এইরকম দুই-একটা বই থাকেই সঙ্গে। এই বইটি সেবারের ধ্যানযাত্রায় অংশ নেয়ার কারণ, কিছু কিছু বই থাকে, যেগুলোর বিষয়বস্তুতে এমন সুর ও স্বর প্রবহমান যে, তা অনুরূপ অন্তস্থ করতে হলে পাঠের জন্যেও একপ্রকার বিশেষ পরিপার্শ্ব ও অবস্থা/অবস্থান দরকার পড়ে পাঠকের জন্য; লেখকের জন্য তো বটেই।

সেখানে কোথায় ব্যস্ততা! শুধু বিঘ্নতাবিহীন অফুরন্ত নিঝুম নিস্তরঙ্গতা, সেখানে শুধু বাতাসের ফিসফিস আর বিলের ঝিমঝিম, আকাশে থির নক্ষত্ররাজির মতো অগণন নিরিবিলি কথামালা কেবল।

বইটি সে বিচার থেকে পুরোপুরি যোগ্য।

যেকোনো রচনার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে লেখক বা কথকের যে বলবার ভঙ্গিটি বা বক্তা হিসেবে বয়ানের যে অবস্থানটি, তা গুরুত্বপূর্ণ। এই বইটায় একজন সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর, জীবন ও তারুণ্যের নাগরিক কোলাহল ও মিছিল থেকে ফিরে বটের শীতল উঠানে বসে উৎসাহী এক অনুজের মনের একান্তে খুলে দিচ্ছেন ভূত অভিজ্ঞতার ভাঁজ, ব্যাকুল অগ্রজের কাতর বর্ণনার অক্ষর—বুনন ছাপিয়ে দুধের মতো বলক দিয়ে উঠছে স্নেহ প্রেম কোমলতা শুভাকাঙ্ক্ষার সৌরভ।

এই বইটাতে অনেক কথা বলা আছে। এর মধ্যে সমস্ত বাক্যের সারবাক্য হিসেবে বলা যায়, হৃদয়ের ঐশ্বর্যের প্রতি উদাত্ত আহ্বান।

জীবন জগত পৃথিবী—এই যে মানুষের জন্য বিপুল বিস্ময়ের পসরা সাজিয়ে বসে আছে, তার দিকে মুগ্ধভাবে তাকাতে শেখা। কত তারা ঝলমল করে আকাশের জলসায়, অনন্ত বয়ে চলার মধ্যে নদীর খলবল কথকতা, এই যে ধানক্ষেতের ভেতর বিকেলের বাতাস কী সুরভি নিয়ে আসে, অবিরাম বৃষ্টির মধ্যে বুনোহাঁসের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে এক হাওড় থেকে অন্য হাওড়ে—পৃথিবীর এতসব বিস্ময়কর সৌন্দর্য এত প্রাণ এত সুরছন্দ বেকার পড়ে আছে, শুধু এসব দেখার জন্যেও কাউকে না কাউকে তো চাই। লেখক বলছেন, অফুরন্ত বিমুগ্ধতার সঞ্চয়ের কথা, মহৎ থেকে তুচ্ছ সকল সৌন্দর্যে বিস্ময়ের উপাদানগুলো বাঁচিয়ে রেখে অস্থির সময়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা।

নাগরিক মানুষ যতদূরই এগোক, খোসার পর খোসা ছাড়িয়ে তার খুব ভেতরে সুপ্ত আদিম যে মানুষের ভিত্তি, ক্ষীরের মতো গাঢ় মাটির সে কোমল তো তাকে অহর্নিশ ডাকবেই।

মনের খরজমিতে সুখদ বৃষ্টি নামালেও, আলোচ্য বইতে লেখকের চিন্তক হিসেবে যে অবস্থানটি, তা আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। লেখকের নিজের বেশকিছু অভিমত মাঝেমধ্যে এমন জোরালো ভঙ্গিতে প্রকাশ হয়েছে যে তাকে অভিমত নয় বরং সিদ্ধান্ত প্রদান বা একমাত্র সমাধান হিসেবে ঘোষণা মনে হয়েছে।

কিছু আলাপ আমার বোধহয়, এরকম মোটাদাগে ব্যাপারটাকে খালাস করে না দিয়ে চিন্তার আরও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, আরও গভীর দৃকপাত ও আলোচনার দাবিদার ছিল।

যেমন ধরা যাক, বইয়ের একেবারে শেষের প্যারায় বলা হচ্ছে, হাজার পাতা লিখো, এক লাইনও যাতে ইসলামের বিপক্ষে না যায়। এখানে কথা হলো, বিপক্ষে যাওয়াটা আসলে কী? কোথায় বিপক্ষ? বিপক্ষতা ব্যাপারটা কি এতই বিস্তৃত ও চঞ্চলমতি যে হাজার পাতা লিখলেও বিপক্ষতা ব্যাপারটা বারবার সামনে এসে পড়বে আর একে বারবার মুকাবিলা করতে হবে? ব্যাপারটা হলো বিষয়বস্তুর। একজন যদি বিভিন্ন ধর্ম, সমাজ বা এ সংক্রান্ত বিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখতে বসে, তার ক্ষেত্রে তথ্যপ্রদান ও প্রমাণে এই পক্ষ আর বিপক্ষতা আসাটা স্বাভাবিক। কারণ এখানে মুখোমুখি ময়দানে দুই বা ততোধিক মত বিরাজমান।

কিন্তু একজনের বিষয়ই যদি অন্যধারায় হয়, তার বিষয় কবিতা বা কথাসাহিত্য, যেখানে কোনো চিন্তা বা স্পষ্ট উদ্দেশ্যই মূর্ত থাকে না, থাকে অন্য একটা বিস্তৃত আকাশ, খোলা মাঠ, হয় অন্যরঙের সব আলাপ বয়ান, থাকে নন্দনতত্ত্ব, থাকে জীবন, সেখানে পক্ষ বিপক্ষতা ব্যাপারটাই তো এক্সিস্ট কওে না। বলবেন জীবন থেকে কি ধর্ম আলাদা? তা নয়, জীবন যাপনের বর্ণনার সঙ্গে যে ধর্মের অনুষঙ্গ আসে, তা তো ওতপ্রোত, একটাই পক্ষ, বিপক্ষ কিছু নেই। যেমন ‘আজানের সুরে সুরে জনপদে সন্ধ্যা নামিয়াছে / মন্দিরে পূজোর ঘণ্টা জানান দিতেছে যে সন্ধ্যা নামিতেছে’—এইসব বর্ণনা ধর্মের পক্ষতা বা বিপক্ষতা নেতিবাচক কিছু নির্দেশ করছে না, কাহিনির পরিবেশভেদে বর্ণনার জনপদে তো হেরফের হয়ই।

এত আলাপে এটাই বোঝানো যে, লেখকের বলা ওই হাজার পৃষ্ঠা লেখো কিন্তু ইসলামের বিপক্ষে এক বাক্যও যাতে না যায়, এখানে হাজার পৃষ্ঠায় অনেক রকম বিষয়বসস্তুরই সন্নিবেশ থাকতে পারে, কিন্ত ধর্মের পক্ষতা-বিপক্ষতা ব্যাপারটা কিছুমাত্র বিষয়ের সাথে যেতে পারে। সুতরাং সমষ্টির সমান্তরালে একটা ফরদকে এভাবে বড় করে দেখানো ও বইয়ের চূড়ান্ত বক্তব্য হিসেবে ধারণ করাটা বেশ স্থ’ল মনে হয়। এটা নতুন পাঠকের মনে কেমন সংকীর্ণ বাঁকের দিকে নির্দেশ করে।

কলেবরবৃদ্ধির ভয় না থাকলে এরকম বারংবার খটকার জায়গাগুলো সবিস্তারে আলাপ করা যেত, তা যেহেতু হচ্ছে না, আরেকটা ছোট উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

অর্থ উপার্জনের নেশায় সুন্দর জীবনের সর্বস্ব বিসর্জন—এই ব্যাপারটাকে তিরবিদ্ধ করতে লেখক টাকাপয়সা বস্তুটাকেই কেমন অচ্ছুৎ-অপ্রয়োজনীয় দুর্ভাগ্যজনক হিসেবে প্রতীয়মান করতে চেয়েছেন। একজন মাঝির গল্প লেখক বলছেন উদাহরণস্বরূপ, যে কিনা সকালে কিছুক্ষণ কাজ করে সারাদিন জীবন উপভোগ করে এবং সে জীবনে সুখের জন্য আরও টাকাপয়সা কামানোর সুযোগটা নিতে চায় না। ব্যাপারটাই আসলে অবাস্তব। একজন জেলের জীবন কখনও সকালে একটু মাছ ধরে শেষ না, তারা দিনের পর দিন ঘন্টার পর ঘন্টা নদীতে সমুদ্রে নোনাজলে রোদে ভাসে, ঢেউয়ের সঙ্গে ঝড়ের সঙ্গে ভাগ্যের সঙ্গে নিত্যনৈমিত্তিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এতকিছুর পরও তাদের নূন্যতম প্রয়োজন ও মানবাধিকারগুলোও ভালোভাবে পূরণ হয় না এই বর্তমান যুগের পুঁজিবাদী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক করুণ বাস্তবতায়।

লেখক যেই জেলের কথা বলছেন তা সম্ভব হয়তো ছিল আদিম যুগে, কিন্তু এইযুগে এসে সে গল্প শোনানোটা কেমন যেন মাদরাসার হুজুরদের সাহাবিদের ত্যাগের গল্প শুনিয়ে ছাত্রদেরকে—আরে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকো, রিজিক পায়ের সামনে এসে পড়ে থাকবে—র মতো কথা। অর্থই সুখ নয় এটা যেমন জোরের সঙ্গে বলা হয়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ যে আবার সুখের একটা অনুষঙ্গও, এই কথাটাও সমান জোরের সঙ্গে বলাটাই শ্রেয় বলে মনে করি।

অবশ্য বইতে লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিক চমৎকারিত্বের চেয়ে হৃদয়বৃত্তিক প্রয়াসটা উদ্দিষ্ট ও স্পষ্ট। আর চিন্তার স্তর যেহেতু অধিকাংশেরই এক না, এবং টার্গেটেড অডিয়েন্স এমন—যাঁরা জীবনের খালে নতুন জোয়ার-ডাকা বয়সী, ভাবতে চাইবো যে চিন্তার বেশি বিস্তার না করাটা লেখকের সচেতন প্রয়াস।

বলার অপেক্ষা রাখে না, বইটি ভীষণ জরুরি মনে হয়েছে আমার কাছে—আমাদের জন্যেই। জীবনের যাপিত এক নাজুক সময়—বয়ঃসন্ধি, কৈশোর, তারুণ্য, অভিজ্ঞাতহীন নতুন গড়ে ওঠা মনন ও বোধে জগতের নানান সংকট-বিপন্নতা যখন জাঁকিয়ে নামে, নানান মিথ্যা হাতছানি ডাকতে থাকে অন্ধকার গলির মুখে, ফাঁপা ও সারশূন্য জৌলুস যখন গন্তব্যপথকে করে দেয় দোদুল্যমান, নিথুয়া পাথারে একাকী মনের পোড়া ও দহন-দুষ্কালের দিবানিশিতে এই বইটি যেন মাথায় বোলানো স্নেহের হাত, ভরসার স্পর্শ, সাহসের শ্লোগান, মিথ্যা-বেসাতির পর্দা উদোম করা আলো, উদ্যমের বারুদভরা ঘুমন্ত বিস্ফোরক।

 

ডিসেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১