আমার স্মৃতিপটে খুব জ্বলজ্বল করে মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহি আলায়হির বিদায় নেয়ার দিনটি, ১২-১২-১২ ইংরেজি বুধবার। কী শীতল ও উষ্ণ ছিল প্রভাতগুলো! কী বেদনা ও দগদগে ছিল প্রহরগুলো! বিভিন্নজন বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে ঘিরে স্মৃতিচারণ করছেন। মূল্যায়ন করছেন। সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। তাঁর জীবনচরিত ও আন্দোলন-সংগ্রাম প্রসঙ্গে সুদীর্ঘ আলোচনা করছেন। তাঁর আতুলনীয় আচার-উচ্চরণ নিয়ে কেউ কেউ বিস্তারিত বলছেনও। ঠিক তখনই মুফতী আমিনী রহমাতুল্লাহি আলায়হিকে নিয়ে ছোট্ট একটি সাময়িকী দৃষ্টিগোচর হলো, নবধ্বনি। আমার কাছে নামটিও তখন একেবারে নব নব লাগছিল। আর এতো কৌশলী নাম, বাহ! খুলে দেখি আমাদের সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ভাই। তামীম রায়হান ভাইকে চিনি না। পরে নবধ্বনিতে তাঁর বিশেষ সাক্ষাৎকার ও ‘সুলতান কাহিনি’ পড়ে তাঁকে জানার চেষ্টা করি।
সেই সময়ে নবধ্বনির ভেতরে আশ্চর্য একটি শ্লোগান ছিল। হুবহু বাক্য-কাঠামো আমার মনে নেই, তবে অনেকটা এমন—
নবধ্বনি পড়ে কেউ আলেম হয়ো না,
নবধ্বনি পড়ে কেউ আবেদ হয়ো না,
নবধ্বনি পড়ে কেউ লেখক হয়ো না,
নবধ্বনি পড়ে কেউ সাহিত্যিক হয়ো না,
নবধ্বনি পড়ে পারলে একজন মানুষ হয়ো!
এই অসম্ভব সুন্দর তীর্যক শ্লোগানটি পড়ে নড়েচড়ে বসেছিলাম। বাব্বা, কী বলে নবধ্বনি!
সাময়িকীটি কলেবরে ক্ষীণ হলেও আমার কিশোর মনে নিদারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। বোঝাই যাচ্ছিল মুফতী আমিনী রহমতুল্লাহি আলায়হির বিচ্ছেদ-বেদনায় বিবেকের ক্রমাগত কষাঘাত ও আবেগের সীমাহীন মর্মজ্বালায় দ্রুত উপস্থাপন করেছে। সাময়িকীর মান-মাত্রা সাধ্যমতো সুন্দর করার প্রয়াস ছিল। আমি সেই সংখ্যাটি দেখার সাথে সাথেই সংগ্রহ করে নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে কীভাবে যেন সে আমাকে ছেড়ে কোথাও চলে গিয়েছিল। দীর্ঘ অনুসন্ধান করেও তাকে হৃদয়ের মখমল চাদরে মুড়িয়ে রাখতে পারিনি। আনন্দ-বেদনা এবং আলো-আঁধারির এ উষ্ণতার মধ্য দিয়ে মাসিক নবধ্বনির সাথে আমার পরিচয় গড়ে ওঠে।
দুই.
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ভাইকে পড়তাম আমরা মনযূর সাহেবের রহমত থেকে। সাহিত্য-প্রভাতের সেই উন্মেষকালে হৃদয়ের মণিকোঠায় তাঁর লেখাগুলো সাহিত্যচর্চার প্রতি একপ্রকার ভালোবাসার আবহ সৃষ্টি করত। নজরুলের ‘রি রি ব্যথা’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘হঠাৎ বিরতি প্রদানে জগতের কোন জায়গায় যেনো একটু ছেদ পড়িয়াছে, কোথাও যেন একটু ছন্দপতন ঘটিয়াছে’ মতো ভাবনাবোধক ও শব্দ-অনুপ্রাস-জাতীয় সাহিত্যচেতনা হৃদয়ের একান্ত আড়ালে সৃষ্টি হতো। ভাবনার সেই উপ্ত আগুন দিয়ে নিজ রচনার কত জায়গায় প্রদীপ ধরিয়েছি আরও কতজনের রচনার সলতেতে অনল ধার দিয়েছি তার কি ইয়ত্তা রাখা যায়!
তিন.
এরপর এক আলো-ঝলমল রাঙা প্রভাতে আসলো সাপ্তাহিক লিখনী। আমাদের আবদ্ধ স্বপ্নগুলো আরেকটু সাহসী হয়ে উঠল। কথার সাথে কলমের শক্তিগুলোও যেন একটু দুর্বিনীত হতে থাকল। সেখানে দেখি, শাহ ইফতেখার তারিক আছেন। গাজী আতাউর রহমান আছেন। আছেন জাগ্রত কবি মুহিব খান। তরুণদের মাঝে সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ভাই, মহিম মাহফুজ ভাই ও রোকন রাইয়ানসহ আরও অনেকে আছেন।
পাঠ্যক্রমের বিরতিতে লিখনী পড়তাম আর পর্যবেক্ষণ করতাম জগতের গতি ও সময়ের নক্ষত্র। এর কিছুদিন আগে সালাহউদ্দীন ভাইয়ের সম্ভাব্য বিশ খণ্ডে সমাপ্য ‘গল্পের ফুলদানি’ সিরিজের চারটি প্রকাশ হয়েছিল ‘মাহফিল’ থেকে। আশরাফ ভাই ও নিজাম ভাই একটি দিয়েছিলেন হাদিয়া। আর বাকিগুলো কোনো এক জম্পেশ সন্ধ্যায় কিনে ফেলেছিলাম।
সেই সিরিজের গল্পগুলো পড়ে পোস্টমর্টেম করে ভেতরের কলকব্জা খুলে পরখ করেছিলাম। এখন হয়তো কোনো এক অশান্ত বাছুর অসংলগ্ন আঁচড়ে সেই সিরিজের পরবর্তী খণ্ডগুলো নিশ্চুপ হয়ে আছে। কোনো একদিন হয়তো ‘এখানে আমার পিতারা ঘুমায়’-এর মতো ধূমকেতুর গতিতে আমাদের কালের যাত্রার নতুন মাত্রা যোগ করবে।
চার.
সময় তার গতির অনুসরণ করবে। এই স্বাভাবিক। একদিন চকচকে একটি বিজ্ঞাপন পেলাম, নবপ্রকাশ নামের নতুন এক প্রকাশনার। ঠিক সে সময়ে কার অনুভূতির খেরো খাতায় কী উদয় হয়েছে জানি না, তবে আমার খুবই আনন্দ লেগেছিল যে, আমাদের অঙ্গনে একটি মানসম্মত প্রকাশনার উদয়ন প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। সেই যে আদম আলায়হিস সালামের জামানার প্রচ্ছদ আর নুহ আলায়হিস সালামের প্লাবনে ডুবে সেঁদসেঁদে কাগজে আমাদের লেখালেখি চলত তা দিয়ে কি আর যুদ্ধ জেতা যায়! বড়জোর প্রয়োজন মিটতে পারে। তবে আমি বলি না, সেগুলো দ্বারা কোনো উপকার সাধিত হয়নি। এও বলবার মতো মূর্খতা করি না যে, সেগুলো ফালতু ছিল। নিশ্চয় সে-সময়ের প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রকাশ ঘটিয়েই সেগুলোর প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু সময়ের বাস্তবতা কারও জন্য একটুও বিরতি দেয় না যে! কারও জন্য নূন্যতম অবকাশও রাখে না। সময় এখন নানা বস্তুর গতির মাত্রা শেষ করে শব্দ ও আলোর গতি টপকে যাচ্ছে। বলি না, জগত-সংসারের সবকিছুর বিবর্তনের দায়িত্ব আমরা নিয়েছি। কিন্তু আপন বলয়ের ভাব ও ভালোবাসা, বক্তব্য ও সাধনা বিশ্বজগতের জন্য সামগ্রিকভাবে নিজেদের জন্য স্থায়ীভাবে উপস্থাপনের নতুনতর কৌশল রপ্ত করা তো হালের দাবি। দুনিয়াতে যদি আমরা সত্য হয়ে থাকি তাহলে মিথ্যার ধ্বজাধারীদের নগ্ন আস্ফালনের বিপরীতে সত্য উড্ডয়নের জন্য একটু অভিনব কৌশল তো গ্রহণ করতে পারি। বলা বহুল্য, সেটি নিশ্চয় শরিয়তের নির্ধারিত মানদণ্ড বজায় রেখে। মানদণ্ডের মর্যাদা বিসর্জন দেয়ার কথা কখনো বলিনি। কৌশলের আশ্রয়ে অপহৃত হবার কথা বলছি না। উপলক্ষের পেছনে পড়ে লক্ষ্য হারাবার বয়ান দিচ্ছি না।
যাহোক, আমাদের মুদ্রণ ও প্রকাশনা-জগতে শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের ভারসাম্যতা আসবে, এ নিশ্চয় সুখের সংবাদ। প্রথমা কিংবা অন্যপ্রকাশের মতো হার্ডহিটার প্লেয়ারের সামনে অন্তত একটু পুষ্ট সৈনিকের দরকার। আমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে যতভাবেই বিশ্লেষণ করি না কেন, বিস্ময়ে বিমোহিত হয়ে যাই! পুলকে আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়ি। অবশ্যই মহান রব সত্য ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ [সুরা আহজাব : ২১]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতিটি কাজে ও পদক্ষেপে কী পরিমাণ রুচি ও বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ করি। তাঁর এমন কোনো কাজ ও আচরণ নেই যাতে রুচি, সৌন্দর্য, আদর্শের প্রকাশ নেই। ঠিক এ বিশ্লেষণ সামনে রেখে বলি, বই-পুস্তক হলো জ্ঞানের বাহন। মননের আহার্য। নীরবে ব্যক্তি-সত্ত্বা গঠনের অসম্ভব মন্ত্র। অতএব এর প্রকাশে ও প্রচারে একনিষ্ঠতা তৈরিতে যদি যত্ন আর রুচির পরিমার্জন না থাকে তাহলে সেটি আমাদের নিম্ন মানসিকতা ও নীচাশয় চরিত্রের প্রকাশক। পাশ্চাত্যের ধোঁয়াশায় চোখ ধাঁধিয়ে কেন আমরা নিজেদের অনুপম আদর্শ ভুলে যাব? ন্যায়ের পথে উচ্চাভিলাষ আর উন্নত মানসিকতা আমাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আমাদের সাবলীল চরিত্র।
পাঁচ.
প্রতি সংখ্যায় বিশেষ কিছু নিয়ে সকলের ক্রয়ক্ষমতা সাধ্য করে নবধ্বনি যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তা বিরল। কালি ও কলমের ইতিহাসে এ বিজয় অনন্য। কামনা করি, যেন নবধ্বনি কল্যাণ সাহিত্য ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার বিকাশ ঘটায়। অপসাহিত্য ও অসুস্থ সংস্কৃতি সমাজে লোপ পেয়ে যায়। একজন পাঠক হিসেবে এই আশা করাটি হয়তো ঔদ্ধত্য হবে না যে, আমাদের অতি উন্নত শরিয়তের তুলাদণ্ড সমুখে রেখে ধীরে ধীরে মননশীল সাহিত্যের একটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হয়ে যাবে নবধ্বনি। আমরা বিশ্বাস করি বিশুদ্ধ ইসলামচর্চার উৎস থেকে উন্নত ও কল্যাণ সাহিত্যের মাল-মসলা সংগ্রহ করা যায়।
ছয়.
একে একে নবপ্রকাশের দৃষ্টিনন্দন বইগুলো যখন পাঠকের হৃদয় কাড়ছিল তখন আমিও সুযোগ করে সংগ্রহ করেছিলাম, ‘প্রিয়তমা’, ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’, ‘গল্পগুলো ফিলিস্তিনের’, ‘সুপ্রভাত ফিলিস্তিন’, ‘রামাল্লা থেকে বলছি’, ‘দ্য ক্রসিং’। প্রতিটি বইই আপন জায়গায় প্রশংসার দাবিদার। তবে আবদারের সুরে বলতে চাই, আমাদের শাশ্বত বিষয়গুলো যেন তরল শিরোনামে উপস্থাপিত না হয়। এতে বিষয়টির মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। নিজস্থানে কাজটির বর্ণনাতীত মাহাত্ম্য থাকলেও শিরোনামের অন্তরালে তাতে যেন তরলতা চলে না আসে। আমরা সরলতাকে ভালোবাসি, কিন্তু তরলতাকে পছন্দ করি না। আশা করি দুটির পার্থক্য স্পষ্ট।
গত রমজানে একদল দরবেশ হজরতদের সুহবত-সান্নিধ্যে জল-জোছনায় ভেসে ভেসে-২ চাঁদপুর যাওয়ার প্রাক্কালে সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ভাইকে বললাম, ‘আপনার হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল বইটি এতো ভালো লেগেছে যে, আমি নিজেই লেখককে এককপি উপহার দিতে চাই!’ তিনি মজা করে বললেন, ‘দেন! টাকা দেন! বাংলাবাজার গিয়ে নবপ্রকাশ থেকে কিনে নিজেকে নিজে উপহার দিয়ে দেবো!’ কিন্তু এখনো যে বইটি কেন কিনে তাঁকে দিতে পারলাম না, তা ভেবে বেদনায় মুষড়িয়ে থাকি। আবার কোনো এক জোছনারাতে লেখকের সাথে সাক্ষাৎ হলে হাদিয়াটি পৌঁছানো যাবে। বইটি পরিচয়-সংকটে ভুগে এমন সকল তরুণের অবশ্য পাঠ্য। আমার এক পরিচিত বন্ধুকে উপহার দিয়েছিলাম। সে পাঠ করে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছিল।
সাত.
ইতিহাস বিষয়ে নবপ্রকাশের ভীষণ আগ্রহ আছে তা বলা লাগে না। তাদের প্রকাশিত বইগুলো দেখলেই বিষয়টি অনুধাবন করা যায়। তবে মনে রাখার মতো একটি কথা হলো, ইতিহাসের পাতা থেকে সত্য তুলে আনতে হয়, মিথ্যা নয়। বাস্তবতার অনুসন্ধান করতে হয়, কল্পনার নয়। সাহিত্যের প্রয়োজনে ভিন্ন কোনো গোত্রের রচনা পাঠকের দোরগোড়ায় হাজির করতে হলে পাদটীকায় কিংবা বিশেষ দ্রষ্টব্যে অথবা লেখক-পরিচিতি-পর্বে তাঁর ভ্রান্তিগুলি তুলে ধরতে হয়। আমাদের সালাত, সিয়াম, সাহিত্য, ইবাদত, মুআমালাত, মুআশারাত, লেখালেখি, সাংবাদিকতা, ইতিহাসচর্চা ইত্যাদি জীবনঘনিষ্ঠ সবকিছু একমাত্র জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাই এমন কিছুই চাই না যা আমাদের পরকাল বরবাদ করে দেয়।
ইতিহাসবিমুখতার এই খরার যুগে নবপ্রকাশ যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা অতীব সাধুবাদ পাবার যোগ্য। কামনা করি, পাঠক আমাদের সেই গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্যের সুবৃহৎ সরোবরে প্রাণভরে অবগাহন করুক। আমাদের হারানো চৈতন্য ও বোধোদয় ফিরে আসুক। কারণ, সাংস্কৃতিক বিপ্লব একদিনে আসে না। জাতীয় চরিত্র ও মৃত্তিকার স্বভাব একদিনে বদলে যায় না। অতএব জাতিসত্তার বিনির্মাণে এমনসব গঠনমূলক বইই প্রকাশিত হোক যাতে চিন্তার খোরাক, আত্মার খোরাক, চরিত্রের খোরাক, চৈতন্যের খোরাক ইত্যাদি সব মিলে থাকে। নিছক কল্পবিলাসী সাহিত্য ও শব্দ-বারুদ কিংবা বাক্য-বিস্ফোরণ-জাতীয় রচনা স্তুপে কী লাভ হবে?
লেখক : শিক্ষার্থী, উচ্চতর আরবি ভাষা ও সাহিত্য, মাহাদুশ শায়েখ ফুআদ লিদ্দিরাসিল ইসলামিয়া, কতমতলি, ঢাকা
ডিসেম্বর 2019

