হিফজখানার ডিমবাতি জ্বালানো শব্দহীন রাতে একটি ছেলের হাতে খচমচ করে উল্টে যাচ্ছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। নীরবতার বরফ গলে গলে এ রাতটি হয়ে উঠছে তাঁর কাছে শব্দের ভেতর ঘুমিয়ে পড়া শীতের সন্ধ্যা অথবা শীতের রাতে মাহফিল শেষে বাবা আসবার প্রতীক্ষিত যাপন। ছেলেটির মনে ভয়—কেউ যদি দেখে ফেলে। সেই সাথে শেষরাতের সবক ইয়াদ না হবার পীড়া বারেবারেই তাকে বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে। তার মনে বেজে উঠছে গত দিনের সবক না পারার অপরাধে শাস্তির বেসামাল হিক্কার। কিন্তু সে অনড়; স্থিরসংকল্পের কাছে নিবদ্ধ তার প্রাণজ আত্মা। নফসানিয়্যাতের ধারালো ফলার মুখে সে নিরস্ত্র ‘মেঘনাদবধ কাব্য’।
হাতের পুস্তকটি আজই তার কাছে এসেছে। নবধ্বনি এর নাম। সে অত বুঝে না এসব ধ্বনি-প্রতিধ্বনির খেলা। জানে না কী এর মাহাত্ম্যকথা। কিন্তু আজকের এ রাতে তাঁর মনে নবধ্বনির এ পৃষ্ঠাগুলো সরব, উচ্চনিনাদী এবং কোলাহলপূর্ণ। কারণ আজকের এ সংখ্যাটি মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ.-কে নিয়ে। একজন পিতার মতো রাহবার হারিয়ে এতিম সন্তানদের শোকে ভাসা বুকে সান্ত্বনার স্নিগ্ধ প্রলেপ মনে হচ্ছে আজকের এ নবধ্বনি। যেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে একটু আরাম; সান্ত্বনাবাক্য এবং প্রেরণার চক্রবর্তী ঘূর্ণন-শক্তি।
হ্যাঁ, কথা এমনই। ২০১৩’র প্রয়োজনের সময়গুলোতে মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহঃ.-কে হারানোর সংবাদ বুকে নিয়ে রোজ রাতে ছেলেটি যখন কাঁদে, নবধ্বনির পৃষ্ঠাগুলো আওড়ানোর সীমাবদ্ধ জীবনে ছেলেটির হিফজখানার জীবন হয়ে ওঠে তার কাছে বড় ভয়ানক। সে ছোট্ট ছেলেটির বড় মুখ দিয়ে আজকের আমি স্বীকার করতে চাই—নবধ্বনি আমার মন-মস্তিস্কে চেতনা প্রজ্জ্বলনের প্রধান রূপকার। নবধ্বনির লালনীল প্রচ্ছদের সাথে মোলাকাত আমার সে-সময় থেকেই। আমিনী সাহেবের ছবির ভেতর দিয়ে; লক্ষ মানুষের চূর্ণ হৃদয়ের মাঝখান দিয়ে চলে যাচ্ছে একটি পালকি। নীরব নিস্তরঙ্গ হয়ে আছে পালকির ভেতর শুয়ে থাকা দ্রোহের মিনার। বস্তুত আমার সে-সময়কার নিঃসঙ্গ জীবনে চিন্তার পথ খুঁজে পেতে যখন হণ্যে হয়ে ঘুরছি আমি, পাতায় পাতায় সোনা-ঝরানো নবধ্বনি তখন আমার কিছুকালের শ্রেষ্ঠ বন্ধুর চরিত্রে পাশে বসে ছিল। আজকের এ বিকেলে নির্ভার নিরুদ্বিগ্ন মুখে সে হরফগুলোর কাছে আমি ঋণ স্বীকার করতে পারি। কৃতজ্ঞচিত্তে পাঠ করতে পারি শুকরিয়ার বাণী।
তারপর আরও নানা ঘটনা-উপঘটনা। নবধ্বনির সাথে সম্পৃক্তির বিস্তৃতি সময়ে সময়ে বাড়ছে আমার।
বাংলা ভাষার মতো এতো বেশি সংখ্যায় ক্রমান্বয়ে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের উদাহরণ, অন্যান্য ভাষায় খুব বেশি সম্ভবত নেই। বাংলায় বহু ছোটপত্রিকা জন্মায়, তাদের আছু হয় নেহাতই অল্প। আবার অনেক লিটল ম্যাগাজিন ক্ষীণকায় হিসেবে শুরু করে কলেবর বৃদ্ধি ঘটায়, হয়ে ওঠে তালেবর। স্রোত বহমান থাকে। সে স্রোতের ইতিহাস-ভূগোল সময়ের সঙ্গে মিলিয়েও যায়, পরবর্তীরা জানতেও পারে না। কিন্তু নবধ্বনি ততদিনেই সবার চাইতে ভিন্ন হয়ে প্রকাশ করতে পেরেছিল নিজেকে। শুরুর সময়ে পত্রিকার পদক্ষেপ ছোট হতে পারে, কিন্তু তাদের পায়ের ছাপ হয়ে গেছে সুগভীর। স্বকীয়তা বজায় রেখে, স্বাতন্ত্র্য, অসাধারণত্ব নিজ গতিতে বইয়ে বইয়ে পার করে ফেলেছে দীর্ঘ একটি যুগ।
তো যা বলছিলাম, একসময় দেখা গেল ‘উন্মেষ’-সহ আমাদের হাতে হাতে ঘুরতে থাকা ম্যাগাজিনগুলোতে শোভা পাচ্ছে আরও একটি সংযোজনের বিজ্ঞাপন। নবপ্রকাশ। নবধ্বনি ও নবপ্রকাশ যেন একটি আরেকটির পরিপূরক। নবধ্বনির সাফল্যের সাক্ষর আমাদের মনে নবপ্রকাশকে ভিন্নভাবে দেখার জায়গা করে দিয়েছিল। কিন্তু বেখেয়ালি আমি সে-সময়কার সূচনায় সত্যিকার কোনো আকাঙ্ক্ষার বীজ বপন না করলেও কিছুদিন পর আমার মনে হয়েছিল এর কর্মক্ষেত্র সীমাবদ্ধ না। আশার ভাঙন দেখা গেল না সত্যি সত্যিই। চোখে পড়ল মুফতী ফজলুল হক আমিনীর জীবন ও সংগ্রাম। নানা প্রতিবন্ধকতার পরও সংগ্রহ করে ফেললাম। মূলত হুলস্থুল সময়ের পিঠে চড়ে এ পাঠ আমার মনে স্বর্গের উপস্থিতিবোধ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। এরই মধ্য দিয়ে শুরু হলো আমার জীবনে নবপ্রকাশের নবকালীন পাঠপর্ব।
এরপর সময় গড়ালো। চিন্তার পরিধিও ব্যপ্ত হতে থাকল। কিতাবখানার উঠোনে বসে মুতাহায়্যির মনের রসদ খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্তিও চলে আসলো যেন। রাতের বেলার ম্যাসেঞ্জারে ঝড় উঠবার গতিতে নীরবে কেটে যেতে থাকল একেকটি রাত। এ উঠোনের মাঝে চন্দ্রপুকুরের যে শান-বাঁধানো ঘাটটি আছে, সেখানে বসে সাজা ভাইয়ের চাঁদনী রাতের জিকির শোনায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম ইতিমধ্যেই। নবপ্রকাশ মেলে দিলো ডানা। নৌকোতে নদী না ভেঙে উড়ে যেতে চাইলাম নদীর ঠিক ওপারে। দোহার মখমলে সড়ক থেকে একজন ধরে বসে থাকলেন রশি; শক্ত হস্তে। যোগসূত্র ঘটাবার প্রয়াসে এগিয়ে যাবেন তিনি, এ তার বুকভরা আশা।
কেটে গেল পাঁচটি বছর। নবপ্রকাশ এসে দাঁড়ালো শৈশবের ঠিক মধ্যিখানে। উত্থান-পতনের দীর্ঘ মোকদ্দমা সামনে রেখে প্রসব করতে লাগল তাঁর সমস্ত অর্জন। অনুবাদ সাহিত্যের গতিপথ অনুসরণ করে সমৃদ্ধ হতে থাকল বাংলা সাহিত্য।
কিন্তু নবপ্রকাশের পাঁচটি বছরের এ চলন-বলনে কত ‘কিল ও কউলে’র সমষ্টি আমাদের চোখে। সমালোচনা বলি আর প্রশংসার বাক্যে ভাসাই, সবই যুৎসই। চলমান সময়ের সাথে যোগসাজশ রেখে নবপ্রকাশ তার কর্মতৎপরতা চালিয়ে গেছে। তারুণ্যের আবেগের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এমনসব অনুবাদে হাত দিয়েছে, যেন উতলা হৃদয়ে বোশেখের ঝড়। সেই সাথে যুক্ত ছিল নিছক ধর্মান্ধতার ফাঁস-দুড় থেকে মুক্ত কলাম। একরৈখিকভাবে বয়ান করে যায়নি তার ভাষাবর্ণনা। এর উপকারিতার প্রকাশ ঘটেছে তখনই, যখন শ্রেণী-প্রকারের ঊর্ধ্বে থেকে সব মহলের মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে নবপ্রকাশের পুস্তকাদি। সেক্যুলার উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্যেও দেখা গেছে কারও কারও চোখ গভীর দৃষ্টিতে পড়ে আছে gaddafi’s Harem: The Storz of a Young Woman and the Abuses of Power in Libza-এর মত গ্রন্থের অনুবাদে। কখনো Sharon and Mz Mother-in-Law-এর প্রতীক্ষিত বাংলা অনুবাদগ্রন্থকেও পড়ে থাকতে দেখা গেছে তাদের টেবিলে। নবপ্রকাশ এটা পেরেছে। হয়তো ইসলামি মূল্যবোধের প্রশ্নে অনেকেই এটাকে অতি উদারতার মাপকাঠিতে ফেলে সমালোচনার ঝড় তুলতে চাইবেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি নবপ্রকাশের এই কার্যক্রমকে জবাবদিহির আওতায় না ফেলে বরং উৎসাহের কথা বলব। বলব ইসলামি সাহওয়াহর স্বপ্নটা বুকে রেখে হীলা ধরে এই মিশে যাওয়ার কথা; হোক সেটা খানিকটা সেক্যুলার টাইপ কিংবা নিছক ধর্মান্ধতার বিপরীতে আরেকটি পন্থায়।
পাঁচ বছর যাপনে নবপ্রকাশের ছবিগুলো আমার সামনে আসলে আরও অনেক কিছু বলা যাবে। পাঠককে মূল্যায়ন করতে যেভাবে তৎপর নবপ্রকাশ, লেখককে সাধুবাদ জানাতে একটুও পিছপা নন তারা। কেবল নবধ্বনিতে দু কলম লিখে যে রাতে আমি রুফটপে বাফেটের স্বাদ গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করছি, আমার মনে সেসময় বর্তমান সময়ের প্রকাশকদের কার্যকলাপের ভুরিভুরি দৃষ্টান্ত ভেসে উঠছিল। লেখক ও ক্রিটিক মনযূরুল হকের কথানুযায়ী যদি বলি সময়ের অবস্থা, তাহলে ভুল করব না বোধহয়। তিনি লিখেছেন, ‘বইয়ের লেখক যেন মসজিদের ছাপোষা ইমাম—প্রকাশক সে মসজিদের দোর্দণ্ড সভাপতি।’
এমনই এক হেলার শিকার যখন মেধা-শ্রম সব ঢেলে দিয়ে লেখার যোগ্যতা অর্জন করা লেখক শ্রেণী, নবপ্রকাশ তখন সবার ঊর্ধ্বে। সম্মানের যোগ্য মানুষকে সম্মানের আসনে আসীন করতে তার দ্বিধা নেই। নেই কোনো সংকীর্ণতা।
প্রকাশনা শিল্পের এ জগতে নবপ্রকাশ যেভাবে গত পাঁচটি বছর আলো হাতে এগিয়ে গেছে, তার আগামীটাও হোক এর থেকে আরও আরও উজ্জ্বল। সাগর সেঁচা মুক্তোর মতো কুঁড়িয়ে এনে নবপ্রকাশের রাহনুমায়িতে অনূদিত হোক দুর্লভ সব পুস্তক। মজাদার ও ভিন্ন স্বাদের আভিজাত্যে উপকারী সব গ্রন্থ।
লেখক : শিক্ষার্থী, মাদরাসাতুল কাউসার আল-ইসলামিয়া, ঢাকা
ডিসেম্বর 2019

