শুরুটা হয়েছিল ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। শুনেছিলাম একটা লাইব্রেরি যার নাম নবপ্রকাশ। তখন লাইব্রেরি আর প্রকাশনার বিষয়টিও ঠিক বুঝতাম না। ভাবতাম বই বিক্রি করা হয় যেই সকল স্থানে তাকে লাইব্রেরি বলে। পরে জানতে পারলাম প্রকাশনা হচ্ছে একটা প্রতিষ্ঠান যারা বই উৎপান করে বাজারে অন্যসকল লাইব্রেরিয়ানদের নিকট পাইকারি বিক্রি করেন। এতটুকো ধরণা নিয়ে নবপ্রকাশের সাথে আমার পথ চলা।
প্রথমবার যখন বাংলাবাজার এলাম সেটা ছিল আমার জিবনে প্রথম বাংলাবাজারে আসা। এস. এস. সি. পরিক্ষা শেষে চিল্লার জামাত শেষ করে কাকরাইল এসে অবস্থান করেছিলাম। সাথে থাকা বাটন মোবাইলটা অন করে কল করে জানতে পারলাম আমার জন্য চাকরির অফার এসেছে। আলহামদুলিল্লাহ। যদিও এটা আমার জবিনের ৩য় চাকরি। তবে সিদ্ধান্তহিনতায় ভুগছিলাম। আব্বুর চাকরির সুবাধে জন্মের পর থেকে চট্টগ্রামে বসবাস আমার। এক পাশে কর্ণফুলি নদী অন্য পাশে সমুদ্র এর মাঝে চট্টগ্রামের সর্ব শেষ স্থান যার নাম পতেঙ্গা। আম্মু-আব্বু, বন্ধু পরিচিত রাস্তা-শহর সকল একই স্থানে আর আমি চলে যাবো অপরিচত এক শহরে রাজধানী ঢাকা শহরে? পারবো কি আমি টিকতে সেখানে। বন্ধু, আড্ডা ঘুরাঘুড়ি, সব ছেড়ে নতুন এই শহরে আমি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবো কি না সেটা ভাবতে লাগলাম।
সবে মাত্র চিল্লা থেকে এসেছি, তাই ভালো কিছু পাওয়ার আশায় অনেক কিছু ত্যাগ কারার একটি চিন্তাভাবনা মনে গেঁথে গিয়েছে। যে কথা বলতে চেয়েছিলাম— প্রথমবার যখন বাংলাবাজার এলাম তখন লোকদের জিগ্যাস করে ইসলামী টাওয়ার খুজে বেরকরলাম। মার্কেটির প্রথম তলায় একেবারে শেষের দিকে গিয়ে পেলাম নবপ্রকাশ নামে একটি দোকান। লেখা ছিল দোকান নং-২৭।
একেবারে নতুন প্রতিষ্ঠান দেখে বুঝা যাচ্ছে। নতুন ডেকারেশন। পুরো ডেকারেশন জুড়ে শুধুমাত্র ২টি বই সাজানো। “তবুও আমরা মুসলমান” আর “শাহজাদা” একটি তাকে “তবুও আমরা মুসলমান” অন্য তাকে “শাহজাদা” এভাবে পুরো দোকানটা সাজানো। দুইটি বইয়ের স্থানে একজন লেখকের নাম লেখা ছিল। নামটি ছিল “তামীম রায়হান”। নামটি পরিচিত মনে হচ্ছে, পরে বুঝতে পারলাম উনি তাহলে প্রকাশক সেই সাথে লেখকও। এখনও অনেকে আমাকে এই প্রশ্নটি প্রয় করে থাকে, ভাই নবপ্রকাশের মালিক কে? তাদের জ্যন বলি নবপ্রকাশের মালিক হচ্ছেন কাতার প্রবাসী তামীম রায়হান ভাই আর নবপ্রকাশে অন্য যাকে দেখতে পান আসাদুল্লাহ খান। এই দুইজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নবপ্রকাশের প্রকাশ। যাদের বন্ধুত্ব হচ্ছে সেই হেফজ খানা থেকে। সর্বপ্রথম ২০০৭ সালে মাসিক নবধ্বনি প্রকাশ করার মধ্যেদিয়ে নবপ্রকাশের চিন্তা শুরু।
নবপ্রকাশে পাঁচটি বছর
নবপ্রকাশে আসার আগেও কখনো ভাবতে পারিনি পাঁচটি বছর এখানে থাকবো। চোখ বন্ধ করলে মনে হয় সেইদিন মাত্র নবপ্রকাশ এর যাত্রা শুরু হলো। অথচ কেটে গিয়েছে পাঁচটি বছর। কথায় আছে না, ভালো সময়গুলো অতিবাহিত হতে টের পাওয়া যায় না। আমার সাথে হয়তো এমনটা হয়েছে। অনেকে যখন আমাকে জিগ্যেস করে যে, ভাই বাংলাবাজার কোথায় আছেন? কোন প্রকাশনীতে? যখন বলি নবপ্রকাশে আছি। তখন তাদের মুখের হাসি দেখে মনে হয় আমি অনেক ভালো অবস্থানে আছি। এর কারণ নবপ্রকাশের চিন্তা-ভাবনা অন্য সকল প্রকাশনী থেকে অনেকটা ভিন্ন। আমি নবপ্রকাশের থাকা অবস্থায় নতুন নতুন অনেক প্রকাশনীর যাত্রা দেখেছি। এখন নতুন নতুন অনেক প্রকাশনী দেখি যাদের প্রকাশনার যাত্রা মাত্র একবছর কিন্তু বইয়ের সংখ্যা ১৫ থেকে ২০টা ছাড়িয়ে গিয়েছে। সেই হিসেবে নবপ্রকাশ এর বই এর সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০ ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু নবপ্রকাশের বর্তমান বই এর সংখ্যা বর্তমানে ৩৫ টি। তাতে আমাদের প্রকাশনার অগ্রগতি কম বিষয়টি কিন্তু এমন না। বিষয়টি হচ্ছে বাজারে বর্তমানে আছে এমন কোন বই প্রকাশ কারে নবপ্রকাশ অগ্রহী নন। আবার কোন বই প্রকাশ কারলে সেটা বাজারে ধুমাইয়া চলবে এমন কোন টার্গেট নেই। কোন বিজ্ঞ লেখকদের ধরে বই নিতে পারলে বইটির সাথে সাথে নবপ্রকাশ-এরও সুনাম অর্জন হবে এমনও কোন লক্ষ্য নেই। আবার ইাতহাস, গল্প, উপ্যানাস নাহলেও সেটা প্রকাশ করার তেমন কোন আগ্রহগ নেই। তাই বই প্রাকাশের জন্য নবপ্রকাশের ক্যাটাগরি মত বই না পেলে সেটা প্রকাশ করা হয় না। তবে ভালো লাগে নবপ্রকাশ নতুন নতুন এবং তরুণ লেখক অনুবাদকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আবার তরুণ পাঠকদের কথা চিন্তা করে বই প্রকাশ করে। প্রকাশ কারার মত ভালো বই পেলে সেটা প্রকাশ করে যদিও তার সংখ্যা তত বেশি না হয়। তাই পাঁচ বছরেও নবপ্রকাশের বইয়ে সংখ্যা এখনো পঞ্চাশ হয়নি।
যুবকদের কাছে নবপ্রকাশ অন্যরকম এক আবেগের মত। প্রায় সময় আমি যখন বই বিক্রি নিয়ে পাঠকের সাথে কথা বলি তখন নবপ্রকাশ নিয়ে তাদের ভালো লাগা এবং কিছু উপদেশ দেওয়া আমাকে অনেক বেশি আনন্দিত করে। তাদেরও অনেক আগ্রহ নবপ্রকাশ ভিন্ন প্রকাশনা ভিন্ন এই ধারণা নিয়ে বহুদূর যাবে। বসচেয়ে বেশি বলতে শুনা যায় ভাই, আপনাদের বইয়ের প্রচ্ছদ গুলো একবারে আনকমন। প্রতিটি প্রচ্ছদই চোখ জুড়ানোর মত। ভালো লাগে নবপ্রকাশের নিয়মতি কিছু পাঠক দেখে যারা সবসময় নতুন বই প্রকাশের অপেক্ষায় চেয়ে থাকে। বই প্রকাশের খবর পেয়ে সাথে সাথে বাংলাবাজার হাজির হয়। বাংলাবাজার আসতে না পারলে যে কোন অন লাইন থেকে সংগ্রহ করে নেন।
ভালো লাগে নবপ্রকাশের সকল লেখক, অনুবাদক ও পাঠকদের। আমার জানা মতে পাঠকদের কাছে নবপ্রকাশের লেখকদের মধ্যে সকলের প্রিয় লেখক হচ্ছে- সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর। আমার নিজের কাছে লেখক হিসেবে এবং আমার নিজের ব্যক্তিগত প্রিয় মানুষ হিসেবেও তিনি আমার অনেক পছন্দের মানুষ। উনার একটা গুন হচ্ছে যেকোন মানুষকে দেখে নিজ আগ্রহে কথা বলেন এবং তাকে কিছু না কিছু উপদেশ দিয়ে থাকেন। উনার সাথে কেউ কথা বলার পর অথবা কথা শুনে সে উনার ভক্ত হবে না সেটা অসম্ভ। বর্তমানের উনার বইয়ের সংখ্যা ১৫ টি। এর মধ্য নবপ্রকাশের আছে ৬টি বই। উনার সবচেয়ে বেশি বিক্রত বই হচ্ছে প্রিয়তমা। এটা বর্তমানে নবপ্রকাশের বেস্ট সেলার বই। রকমারি ডটকম-এর বেস্ট সেলার বই এর মধ্য এটি একটি। আমার বিক্রত বইয়ের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি। মজার বিষয় হল অনেকেই উনাকে না চিনলেও প্রিয়তমার লেখক বললে খুব সহজে চিলে ফেলেন। নেই হিসেবে উনার অন্য একটি পরিচয় হচ্ছে উনি প্রিয়তমার লেখক। সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীর ভাই নবধ্বনির নির্বাহী সম্পাদক, নবপ্রকাশের একজন লেখক এবং প্রধান সম্পাদক।
উনার পর নবপ্রকাশের ২য় লেখক এবং নবধ্বনির সহকারী সম্পাদক হচ্ছে- নাজমুস সাকিব ভাই। বর্তমানে নবপ্রকাশে ৪টি বই রয়েছে। উনার সবচেয়ে বিক্রিত বই “গুয়ান্তানামোর ডায়েরি” এরপর “সুপ্রভাত ফিলিস্তিন”।
এরপর ৩য় লেখক হচ্ছেন নবপ্রকাশের চেয়ারম্যান তামীম এবং নবধ্বনির সম্পাদক রায়হান ভাই। উনার বর্তমানে ৪টি বই এর তিনটি বই নবপ্রকাশ হতে প্রকাশিত বই। সর্ব প্রথম বই ইতিহাসের হাসি-কান্না এবং সর্বশেষ আর বেস্ট সেলার বই হচ্ছে “সুলতান কাহিনি”। যদিও বাকি ২টি বই “তবুও আমরা মুসলমান” আর “শাহজাদা” বই দুটি দির্ঘদিন ধরে স্টকে নেই।
পছন্দের মানুষের মধ্যে রয়েছেন নবপ্রকাশ এর লেখক এবং নবধ্বনির সহকারী সম্পাদক হামমাদ রাগিব ভাই। নবপ্রকাশ থেকে উনার প্রকাশিত ২টি বই “গল্প বলি ফিলিস্তিনের” এবং “সোনালি দিনের গল্প”।
মোটকথা নবপ্রকাশ পরিবারের সবার সাথে সবার সম্পর্কটা সবসময় ভাই-বন্ধু সরূপ। আর নবপ্রকাশের আসাদুল্লাহ ভাইয়ের কথা আর কি বলবো আমি নিজেই উনার পরিবারে একজন। আর তাঁদের মাঝে সবচেয়ে ছোট ব্যক্তি ব্যক্তি হোলাম আমি। তাই সবার কাছ থেকে আমি অনেক বেশি ভালোবাসা ও জীবন পথে চলার উপদেশ পেয়ে অনেক বেশি কৃতজ্ঞিত।
বইয়ের জগৎটা অন্যসকল জগৎ থেকে অনেক বেশি সম্মানজনক। তাই এই পরিবেশের সাথে নিজেকে রাখতে পেরে অনেক মবেশি ধন্য আমি। নবপ্রকাশের বই একজন বই বিক্রেতা হিসেবে বই বিক্রয় নিয়ে একটি বই লেখার ইচ্ছে আছে। বইটির নাম ঠিক করেছি “একজন বই বিক্রেতা”। যেখানে থাকবে বই বিক্রির আরও অনেক ইতি কথা।
নবপ্রকাশ নিয়ে এখন আমার স্বপ্ন হচ্ছে- অন্তত প্রতিটি বিভাগে নবপ্রকাশের একটি করে শাখা থাকবে। বাংলা একাডেমির আয়োজিত ২১শে বই মেলায় নামকরা প্রকাশনী হিসাবে সবার কাছে প্রকাশ পাবে। ইন শা আল্লাহ সেইদিন আর বেশি দেরি নয়। পাঠকের সহজগীতা এবং ভালোবাসায় নবপ্রকাশ এগিয়ে যাবে আরও বহুদূরে। নবপ্রকাশের ৫ বছর ফুর্তি উপলক্ষে নবপ্রকাশ এর সকল পাঠক, লেখক, এবং প্রকাশনা ভিত্তিক পরিচিত সকল সুভাকাঙ্খীদের আমার পক্ষ থেকে জানাই অন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
ডিসেম্বর 2019

