নবধ্বনির সহকারী সম্পাদক হামমাদ রাগিব ভাই মারফত জানতে পারলাম নবপ্রকাশের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে ডিসেম্বরে নবধ্বনির বিশেষ সংখ্যা বের হবে। নবপ্রকাশ থেকে যেহেতু ইতিমধ্যেই আমার অনূদিত দুটো বই বেরিয়েছে, বিশেষ সংখ্যায় অনুবাদক হিসেবে আমার কিছু অনুভূতি শেয়ার করা দরকার। কিন্তু বিপদে পড়লাম লিখতে বসে। আমি তো আদতে ওরকম কোনো লেখক নই, সাজিয়ে-গুছিয়ে নবধ্বনি বা নবপ্রকাশ নিয়ে কিছু লেখা আমার জন্য সহজ না। তারপরও কলমের ওপর জোর খাটালাম…
এক.
মাদরাসা থেকে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোনকল।
‘আসসালামু আলাইকুম।’
‘ওয়ালাইকুমুস সালাম।’
‘কে?’
‘আমি সান্তাহার থানা থেকে এসআই জাহাঙ্গীর। আপনার নামে আমাদের কাছে কমপ্লেইন আছে। থানায় এসে দেখা করুন।’
আমি ভড়কে গেলাম। রীতিমতো ভয়ও পেলাম। ভয়মিশ্রিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার নামে কে অভিযোগ করল!’
‘সেটা জানার জন্য আপনাকে থানায় এসে দেখা করতে হবে। ফোনে বলা সম্ভব না। তাড়াতাড়ি আসেন।’ এস আই জাহাঙ্গীর সাহেব ঢাকাইয়া টানে বললেন।
‘কখন আসতে হবে?’
‘আগামীকালের মধ্যেই। নয়তো মামলা হবে।’
হঠাৎ খেয়াল হলো, সান্তাহার তো আদৌ কোনো থানা না! সান্তাহার ঐতিহ্যবাহী রেলওয়ে জংশন। সবাই চেনে। কিন্তু থানা না। থানা হলো আদমদিঘি। সাহস করে বললাম, ‘সান্তাহারে তো কোনো থানা নাই। থানা তো আদমদিঘি!’
‘সান্তাহার থানা না এইটা আপনারে কে বলল! দেখা না করলে বিপদে পড়বেন কইলাম।’
পাশ থেকে কে যেন হেসে উঠল। বুঝলাম, আমাকে বোকা বানানো হচ্ছে। মনে পড়ল, কলমদানি সম্পাদক মুফতী সালাহুদ্দীন মাসউদ ভাই বলেছিলেন, সাজা ভাই বগুড়া আসবেন। বুঝে গেলাম এই এসআই জাহাঙ্গীর সাহেব আসলে কে!
‘এসআই জাহাঙ্গীর তো ভাই আপনার নাম না। আপনার নাম এস ইউ জাহাঙ্গীর।’
সাজা ভাই হাসলেন। বললেন, ‘এতো ভয় পেলে দুনিয়ায় চলবেন ক্যাম্নে মিয়া! বগুড়ায় আসছি। আপনারা কেউ নাই। হোটেলে উঠেছি। আসেন। বাতচিত হোক।’
খুশি হলাম। প্রীত হলাম।
সাজা ভাই, সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ভাই সেলিব্রেটি মানুষ। আমার মতো কাউকে ফোন করেছেন এটা আমার জন্য বিরাট সারপ্রাইজ।
মাগরিব নামাজের পরে জামিল মাদরাসায় দেখা হলো। মুসাফাহা হলো। আন্তরিকভাবে কথা বললেন, অবাক হলাম। অবাক হওয়ার কারণ আছে। লোকমুখে শুনেছি তিনি কিঞ্চিত অহম নিয়ে চলেন। কাউকে তেমন পাত্তা দেন না।
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সাথে আরও একজন আছেন। তিনি তামীম রায়হান ভাই। তামীম ভাইয়ের সাথে সেদিন প্রথম দেখা। এর আগে ম্যাসেঞ্জারে দু-একবার কথা হয়েছে। তাঁর লেখা নিয়ে আমার ভালোলাগার কথা জানিয়েছিলাম।
কথাবার্তার এক পর্যায়ে তামীম ভাই জানলেন আমি টুকটাক অনুবাদ করি। লিখি না। অনুবাদ করি। হঠাৎ করেই বলে বসলেন, ‘আরবি থেকে অনুবাদ করতে পারেন?’
বললাম, ‘আরবি থেকে এখনো অনুবাদ করা হয়নি।’
‘আমি আপনাকে কিছু নমুনা দেবো। আপনি আমাকে অনুবাদ করে পাঠাবেন। যদি ভালো হয় আপনাকে নবপ্রকাশের কিছু কাজ দেবো।’
প্রথম দেখাতেই এমন প্রস্তাব আমার জন্য অকল্পনীয়। হকচকিয়ে যাওয়া না কী বলে! সেটা হয়ে গেলাম। বললাম, ‘চেষ্টা করব।’
তামীম ভাই বললেন, ‘চেষ্টা করব কথাটা ভদ্রতা। আমাদের সাথে কাজ করতে হলে আপনাকে প্রফেশনাল হতে হবে। স্পষ্ট করে হ্যাঁ অথবা না বলতে হবে।’
সাজা ভাই বললেন, ‘আরে ভাই, আপনি তো বেচারাকে ভয় পাইয়ে দিলেন।’
তামীম ভাই বললেন, ‘যদি পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করতে চান তাহলে আমার মেইলটা নিয়ে রাখেন। আমাকে জানাবেন।’
আমি লিখে নিলাম।
তামীম ভাই বগুড়ার কাজ শেষ করে ঢাকা চলে গেলেন। সেখান থেকে কাতার। কাতারে যাওয়ার পরে একদিন মেইল করলাম। ‘কাজটা আমি করতে চাই।’
তামীম ভাই একটা বই দিয়ে বললেন, ‘এটার ভূমিকা-অংশটুকু অনুবাদ করে আমাকে দেখান। আজ রাতের মধ্যেই।’
আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করে অনুবাদ করে দিলাম। তিনি বললেন, ‘ভালো হয়েছে। কাজ শুরু করুন। তবে খেয়াল রাখবেন কাজটা করতে হবে পূর্ণ পেশাদারিত্বের সাথে। দিনক্ষণ আপনি নিজেই নির্দিষ্ট করে দিন। সেই দিনের মধ্যেই কাজটা আপনাকে শেষ করে দিতে হবে।’
রাজি হলাম। কাজ শুরু করলাম। এভাবেই শুরু হলো।
দুই.
নবপ্রকাশের বই নির্বাচন, সেসব অনুবাদ করা এবং পাঠকের সামনে পেশ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা আমার ভালো লাগে, সেটা হলো, তাঁরা নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণীর পাঠককে টার্গেট করেন না। সবশ্রেণীর পাঠকের ভালো লাগবে এমন বই তাঁরা প্রকাশ করেন। যেমন সুলতান কাহিনি, প্রিয়তমা, সুপ্রভাত ফিলিস্তিন, গুয়ান্তানামোর ডায়েরি, ইতিহাসের জানালা। প্রতিটি বই-ই কিন্তু নানা শ্রেণীর পাঠককে ছুঁয়ে গেছে। পাঠকের সংগ্রহশালাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এর মধ্যে ‘প্রিয়তমা’ তো রকমারির বেস্টসেলার বইয়ের তালিকাতেও রয়েছে। নবধ্বনির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাঁরা প্রতিটি সংখ্যা বের করছেন সার্বজনীন পাঠকের উদ্দেশ্যে। যেটার খুব অভাব। অনেকদিনের গড়ে ওঠা একটা বৃত্ত তাঁরা ভাঙতে চেয়েছেন, সফলও হয়েছেন হয়তো। তাঁদের এই সাহসী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।
নবপ্রকাশের আরেকটা জিনিস আমার খুব ভালো লাগে। তাঁদের পেশাদারিত্ব। বই নির্বাচন, লেখা/অনুবাদ, সম্পাদনা, প্রচ্ছদ, ছাপা এবং পাঠকের কাছে পৌঁছানোর প্রতিটি পর্যায়ে দারুণ পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। নবপ্রকাশের সাথে কাজ করার পর এতটুকু আমার জানা হয়ে গেছে। নবপ্রকাশকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও কম নয়। কাজ করতে গেলে এসব সহ্য করতে হবে। জানা কথা। এই ব্যাপারটিও নবপ্রকাশ সামলাচ্ছে পেশাদারিত্বের সাথে।
তিন.
দেখতে দেখতে নবপ্রকাশের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেল। পাঁচ বছর একটা প্রকাশনীর সফলতা বা ব্যর্থতার হিসেব করার জন্য যথেষ্ট নয় হয়তো, তবে এই পাঁচ বছরে নবপ্রকাশের যে সফলতা চোখে পড়ার মতো, তা হলো, নতুন পাঠক তৈরি করা। এবং পাঠক ধরে রাখা। এটা কম কথা না।
নবপ্রকাশ ও নবধ্বনির পাঠক ও অনুরক্ত হিসেবে সবসময়ই খোদাতায়ালার কাছে কল্যাণের প্রার্থনা করি।
লেখক : অনুবাদক, নবপ্রকাশ
ডিসেম্বর 2019

