নবপ্রকাশ : গৌরবময় পথ চলার পাঁচ বছর

সংখ্যা:

 

যেভাবে শুরু

নবপ্রকাশের যাত্রা শুরু হয়েছিল খুব নীরবে, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। প্রথমদিকে রাজধানীর লালবাগের একটি লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছিল স্বপ্নময় এই প্রতিষ্ঠান। তার কিছুদিন পর বইয়ের রাজ্য বাংলাবাজার ইসলামি টাওয়ারের প্রথম তলায় কোণার দিকে ছোট্ট একটি দোকানে ঠাঁই হয় তার।

প্রথমদিকে গুটি কয়েক বই নিয়ে যাত্রা শুরু। তার মধ্যে নবপ্রকাশের প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িতদের লেখা বইয়ের সংখ্যা বেশি। তখন হয়তো বাংলাবাজারের অনেকেই জানতেন না নবপ্রকাশ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করেছে এই মার্কেটে। কেউ ভাবেনি সবার অগোচরে গড়ে ওঠা এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অল্পদিনেই জয় করে নেবে পাঠকদের মন।

২০১৬ সালের শেষদিকে, আমি তখন প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার চাপে জর্জরিত। শেকলের হুড়কোর মতো একের পর এক পরীক্ষা আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখছে। পড়ার বইয়ের বাইরে অন্য কোনো বই হাতে নেবারই ফুরসত নেই তখন, লেখা তো দূরের কথা।

অক্টোবর মাসের শেষদিকে বহু প্রতীক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষা শেষ হলো। কিছুটা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু তার এক সপ্তাহ পরই আবার মাদরাসার প্রথম সাময়িক পরীক্ষা। ব্যস্ততা যেন ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’।  আমাকে আবারও মুখ গুঁজতে হলো বইয়ের পাতায়।

পরীক্ষা শেষ হবার পর সেদিন সন্ধ্যায় শুরু করলাম জীবনের নতুন এক দিগন্তে পথচলা। হোসাইন মুহাম্মদ আবদুল কাদির নামের একজন ফিলিস্তিনি লেখকের জেল-জীবনের স্মৃতির একটি বই দিয়ে শুরু করলাম অনুবাদ। এর আগে তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। মাদরাসায় পড়া আরবি সাহিত্যের বইয়ের অনুবাদ আর মাঝে মাঝে পত্রিকায় প্রকাশিত দু-একটি গল্প—এই ছিল আমার পথচলার পাথেয়।

পড়াশোনার পাশাপাশি অল্প অল্প করে অনুবাদ চলছিল। এর মাঝে পরীক্ষার জন্য বিরতি ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ছয় মাসের বেশি লেগে গেল ১৬০ পৃষ্ঠা একটি বই অনুবাদ করতে। সম্পাদনা, প্রুফ রিডিং ইত্যাদি পেরিয়ে সেই বই বাজারে এলো ২০১৭ সালের নভেম্বরে। পুরো একটি বছর। ‘গুয়ান্তানামোর ডায়েরি’ নামে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম অনুবাদগ্রন্থ।

ততদিনে আরেকটি বইয়ের অনুবাদ প্রায় শেষের পথে। পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ হওয়া আমার অনূদিত উপন্যাস ‘সুপ্রভাত ফিলিস্তিন’ বেশ সাড়া ফেলেছিল পাঠকদের মধ্যে। অনুবাদক হিসেবে এটা ছিল আমার জন্য বড় অনুপ্রেরণা।

তারপর আর থেমে থাকিনি। জুরজি জায়দান ও আহমাদ আমিনের লেখা দুটি বই প্রকাশের পর আরও একটি বই পাঠকদের জন্য অপেক্ষা করছে। আশা করি এমন বই বাংলাভাষায় প্রথম এবং এটাও পাঠকদের মন জয় করবে। এখন যুক্ত হয়েছেন বেশ কজন লেখক ও অনুবাদক। শুরু থেকেই নবপ্রকাশ বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে নতুন এবং অভিনব বিষয় ও লেখকদের বই একের পর এক প্রকাশ করে চলেছে।

নবপ্রকাশের পাঁচবছর পূর্তি হচ্ছে আর কিছুদিন পর। নবপ্রকাশকে নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে নবধ্বনির ডিসেম্বর সংখ্যা। নবপ্রকাশ থেকেই এখন প্রতিমাসে প্রকাশিত হয় পাঁচটাকা নামমাত্র মূল্যের এই পত্রিকা। নবধ্বনির জন্ম যদিও নবপ্রকাশের অনেক আগে তবু নবধ্বনির অভিভাবক এখন নবপ্রকাশই।

নবপ্রকাশ নিয়ে এই সংখ্যায় কিছু গল্প হয়ে যাক। নবপ্রকাশ সম্পর্কে অনেক কিছু জানার সঙ্গে সঙ্গে আশা করি পাঠকদের অনেক প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যাবে এর মধ্য দিয়ে।

 

বই বাছাইয়ে ভিন্নতা

নবপ্রকাশ দ্রুত পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে তার একটি বড় কারণ ভিন্ন ধরনের বই। বাংলাবাজার ঘুরে দেখলে যে কারও মনে হবে ইসলামি বইয়ের বাজার অনেক সমৃদ্ধ। অনেক অনেক প্রকাশনী। প্রচুর বইয়ের সমাহার। কিন্তু একটু ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে এর দৈন্যদশা। একই বইয়ের নাম পরিবর্তন করে প্রকাশ করা, একই বইয়ের একাধিক অনুবাদ, হুবহু একই বিষয়ের একাধিক বই, সামান্য কজন লেখকের অনুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা ইত্যাদিতে আক্রান্ত আমাদের বইয়ের বাজার। এই দৈন্যতা কাটিয়ে উঠতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ নবপ্রকাশ।

নানা লেখকের নানা বিষয়ের বই প্রকাশে সচেষ্ট নবপ্রকাশ। সমুদ্রে ডুব দিয়ে মণি-মুক্তা খুঁজে আনার মতো করে নবপ্রকাশ বই বাছাই করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে একটা বইয়ের কথা বলা যেতে পারে—‘মক্কা শহরে ছদ্মবেশী এক খ্রিষ্টানের দিনলিপি’। অনন্য একটি বই। এমন বইয়ের খোঁজ বাংলাভাষায় পাওয়া দুষ্কর। মাত্র শত পৃষ্ঠার এই ভ্রমণকাহিনি আমাদের সামনে তুলে ধরে অজানা কিছু ইতিহাস। সে সময়ের মক্কা এবং সেখানকার অধিবাসীরা কেমন ছিল—এর প্রত্যক্ষ বর্ণনা পাওয়া যায় বইটিতে। আধুনিক যুগের নিকট-অতীতে হজযাত্রা কতটা দুঃসহ ছিল তাও জানতে পারি আমরা এই বই থেকে।

বই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মূলত নির্ভর করা হয় ইন্টারনেটের ওপর। তবে শুধু ইন্টারনেটই যথেষ্ট নয়; বইটির বিষয়, পাঠকপ্রিয়তা, প্রাসঙ্গিকতা ইত্যাদি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অনুবাদের।

 

প্রয়োজন কাজের মানুষ

বই বাছাইয়ের প্রক্রিয়ার কথা তো বলা হলো। তারপর প্রয়োজন হয় লেখক বা অনুবাদকের। এখানে এসে হোঁচট খেতে হয়। এত লেখক ও অনুবাদকের ভিড়েও কাজের লোক পাওয়া বড় কঠিন হয়ে পড়ে। লেখালেখির জগতে পেশাদারিত্বের বড় অভাব। অনেক অনুবাদককে নানা কারণে বই দেয়া যায় না। দেখা যায়, তিনি নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা মতবাদের সাথে জড়িত। কিংবা পাঠকদের কাছে নিজের ভাবমূর্তি বজায় রাখতে সক্ষম নন। কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি সারাদিন বিতর্ক-নিন্দা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এসব কর্মকাণ্ড আমাদের নিরুৎসাহিত করে তাঁকে দিয়ে কাজ করাতে।

অনুবাদকের চেয়েও বেশি অভাব লেখকের। বাংলাদেশের বেশিরভাগ লেখক নিজের পছন্দমতো লিখে প্রকাশকদের কাছে আসেন। কিন্তু প্রকাশক বা পাঠকের চাহিদাকে সামনে রেখে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে লেখার মতো লেখকের বড় অভাব।

লেখক ও অনুবাদকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা তা আন্তরিকতার অভাব। অনেক অনুবাদক খুব আগ্রহ দেখিয়ে বই নেন। কিন্তু কিছুদিন পর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। দিনের পর দিন যোগাযোগ করেও তার কাজের আর খোঁজ মেলে না।

তবু নবপ্রকাশ আশাবাদী। ইতিমধ্যে বেশ কজন লেখক-অনুবাদক কাজ শুরু করেছেন নবপ্রকাশের সাথে। ধীরে ধীরে একটি সুন্দর প্রকাশনা ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে এই প্রত্যাশা আমাদের।

 

কেন অনুবাদে আগ্রহ

অনেকেই এই প্রশ্নটা করে থাকেন। অনুবাদকে কেউ কেউ দুর্বলতা মনে করে থাকেন। কিন্তু এ কথা মনে রাখতে হবে, অনেক সময় নতুন দশটা বই লেখার চেয়ে একটা বই অনুবাদ করা অনেক কঠিন হয়ে যায়।

অনুবাদে নবপ্রকাশের আগ্রহের বেশ কিছু কারণ আছে। প্রথমত অনুবাদ সাহিত্যের আলাদা একটি শাখা। অনুবাদের মাধ্যমে ভিন্ন দুটি ভাষার লেখক ও পাঠকের মধ্যে সংযোগ ঘটে। অনুবাদের মাধ্যমে জ্ঞানের আমদানি হয়। তারচেয়ে বড় কথা, যে-কোনো সভ্যতার শুরু হয়েছিল অনুবাদ দিয়েই। আব্বাসি যুগে খলিফারা বই সংগ্রহ করে স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে দিতেন অনুবাদের জন্য। মনসুর ও হারুনুর রশিদের আমলে অনুবাদ শুরু হয়েছিল বলেই পরে একদিন বাগদাদে বাইতুল হিকমাহ গড়ে উঠেছিল।

বাংলাভাষায় ইসলামি ঘরানার বই এখনো তার শৈশব অতিক্রম করতে পারেনি। তাই অনুবাদ একান্ত  প্রয়োজন। অনুবাদের মাধ্যমে চিন্তা ও জ্ঞানের বিকাশ ঘটবে। এভাবে গড়ে উঠবে সুযোগ্য লেখক। এসব গুরুত্ব অনুধাবন করে অনুবাদে গুরুত্ব দেয় নবপ্রকাশ।

 

নিন্দায় কী আসে যায়

বাংলাদেশে ইসলামি বইয়ের বাজার যদিও এখন তার শৈশব অতিক্রম করতে পারেনি তবু ইতিমধ্যে নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত এই বাজার। পরস্পরের প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক এখানে বেশিরভাগ সময় রূপ নেয় রেষারেষিতে। তার সাথে আছে নানা দল ও মতের প্রভাব। বিভিন্ন মতের অনুসারীদের ঘিরে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন প্রকাশনী। সহযোগিতামূলক মনোভাবের বিপরীতে হিংসাত্মক আচরণ লক্ষ করা যায় মাঝে মাঝে। এসব কদাকার বিষয় কেবল প্রকাশকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পাঠকদের মাঝেও।

তবু স্বীকার করতে হবে এর মধ্যে বেশ কিছু উন্নত মানের প্রকাশনী গড়ে উঠেছে। মানসম্মত বইয়ের পাশাপাশি তারা প্রতিযোগিতামূলক সুন্দর একটি বইয়ের বাজার তৈরি করতে আগ্রহী। কিন্তু নিন্দুকেরা বসে নেই। কারণে-অকারণে তাঁরা সুযোগ পেলেই বিভিন্ন প্রকাশনী, লেখক কিংবা অনুবাদকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করেন। কখনো দেখা গেছে প্রকাশক তাঁর বই ছাপাতে রাজি হননি বলে লেখক ফেসবুকে আঁটঘাট বেঁধে নেমেছেন তাঁর বিরুদ্ধে।

নবপ্রকাশের মতো নতুন একটি প্রকাশনাও রেহাই পায়নি নিন্দুকের ছোবল থেকে। অমুসলিম লেখকের বই প্রকাশের কারণে ইসলাম বিকৃতিসহ নানা অভিযোগ এসেছে নবপ্রকাশের বিরুদ্ধে। নবপ্রকাশ ইহুদি-খ্রিষ্টানদের দালাল—এমন কথা বলতেও দ্বিধা করেননি কেউ কেউ।

কখনো নবপ্রকাশের বই প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে পুরো বই ঘেঁটে ভুল বের করে তা নিয়ে হই-চই ফেলে দিয়েছেন অনেকে। তবে আখেরে লাভ হয় নবপ্রকাশেরই। ‘নেগেটিভ মার্কেটিং’ বলে একটা বিষয় আছে। এভাবে বইয়ের প্রচার হয়ে যায় অনেক দ্রুত।

একটু খোঁজ নিলে দেখা যায়, এসব অপপ্রচার ছড়ানোর পেছনে মূল কারণটা ব্যবসায়িক। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এমন পথ বেছে নিয়েছেন অনেকে।

আশার কথা হলো, এসব নিন্দা গায়ে মাখে না নবপ্রকাশ। বরং সমালোচনা ও নিন্দাকে সাফল্যের অংশ মনে করা হয়। যে যা বলার বলুক, দিনশেষে সম্মানিত পাঠকরাই মূল্যায়ন করবেন নবপ্রকাশের।

 

লেখক : অনুবাদক ও সম্পাদক, নবপ্রকাশ; সহকারী সম্পাদক, মাসিক নবধ্বনি

ডিসেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১