বই হয়ে উঠুক জীবন গড়ার পাথেয়

সংখ্যা:

 

নবপ্রকাশ নিয়ে নবধ্বনির চলতিসংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে দেখে ভালো লাগছে। এর মাধ্যমে মূলত আমরা নবপ্রকাশের কার্যক্রম সম্পর্কে ব্যাপকভাবে পাঠকদের জানাতে চাই। আশা করছি এই সংখ্যা পড়ে দেশজুড়ে নবধ্বনির পাঠকেরা নবপ্রকাশ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে পারেন।

পাঁচ বছর মোটেও বেশি সময় নয়, খুব কমও নয়। ফলে বলা চলে, নবপ্রকাশ এখনো হাঁটি হাঁটি পা পা পর্যায়ে। এই সময়ে নবপ্রকাশের জন্য অগণিত পাঠকের ভালোবাসা যেমন উৎসাহব্যঞ্জক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে, তেমনিভাবে প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপদেশসুলভ সমালোচনাগুলো দিকনির্দেশক হয়ে এই পথচলায় আলো জ্বেলে রেখেছে। ফলে সব শ্রেণি ও পেশার সুহৃদ ও সমালোচকদের প্রতি নবপ্রকাশের কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।

পাঁচ বছর পূর্তির শুভক্ষণে নবপ্রকাশের যেটুকু সাফল্য, এর মূলে পুরো অবদানের দুজন সমান অংশীদার আসাদ খান ও সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর। বাড়তি বিনয় কিংবা অতিভক্তি করে এই কথা বলা নয়, বরং এটিই বাস্তবতা এবং আমার মনের কথা। সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর সামলে যাচ্ছেন নবপ্রকাশের অন্দরমহলের যাবতীয় কর্মযজ্ঞ, আর সযত্নে তা পাঠকদের সামনে পরিবেশন করে যাচ্ছে আসাদ।

নবপ্রকাশে সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর এবং আসাদ খানের সহযোগী হয়ে আছেন হাম্মাদ রাগিব, নাজমুস সাকিব এবং ইসহাক খান। ইসহাকের কথা আলাদা করে বলতে হয়, কারণ নবপ্রকাশ এবং নবপ্রকাশের বইপত্র সম্পর্কে পাঠকদের মতামত সরাসরি জানার জন্য জানালা হিসেবে ইসহাকের ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

নবপ্রকাশের মাধ্যমে আমরা কী করতে চাই বা কী করব, সেরকম ছকে বাঁধা কোনো শপথ আমাদের নেই। শুধু একটি বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা কিছ্ ুকরবো, সবার চেয়ে ভিন্নতা রেখে করবো। বইয়ের বাজারে আমরা দাগ রেখে যাবো। এই ভিন্নতা যেন বিষয়বৈচিত্রে এবং বইয়ের গুণগতমানে অব্যাহতভাবে ফুটে উঠে, সেটা নিশ্চিত করার পথ ও পন্থা নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

নবপ্রকাশ নিয়ে সুখকর ও বিব্রতকর নানারকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। ইসলামি অঙ্গনে বেশ পরিচিত দুজন লেখকের কথা এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে। এই দুজনেরই একটি করে বই নবপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম, এ দুজনের আরও বেশকিছু বই নবপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হোক। কিন্তু একটি করে বই লিখে তারা হারিয়ে গেলেন।

এঁদের একজন এখনো ফেসবুকে নানা বিষয়ে স্ট্যাটাস প্রসব করে প্রচুর সময় ব্যয় করে চলেছেন, কিন্তু বই আর লিখছেন না। হয়তো নগদ লাইক-কমেন্ট পেতে তিনি বেশি ভালোবাসেন, ফেসবুকের বাইরে অধ্যবসায় এবং ধৈর্য ধরে বই লেখা বা অনুবাদে তিনি আত্মিক শান্তি ও তৃপ্তি আর খুঁজে পান না।

আরেকজন দেশময় ওয়াজ করেন, অনলাইনে তিনিও নানা বিষয়ে মত প্রকাশে বেশ সক্রিয়। কিন্তু লেখালেখির চমৎকার প্রতিভার কোনো সদ্ব্যবহার তিনি করছেন না। আমি প্রায়ই এ দুজনের অনলাইন কর্মকান্ডে তাদের মেধা ও প্রতিভার অপব্যয় দেখে হতবাক হই।

ইসলামি অঙ্গনের এ দুজন ধর্মপরায়ণ পুরুষ লেখকের চেয়ে সাধারণ একজন নারীর কাছ থেকে আমরা বেশি পেশাদারিত্ব এবং আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ পেয়ে আসছি। কথাটা বলার কারণ হলো, পেশাদারিত্ব এবং বই লেখালেখি বা অনুবাদকর্ম কেবলমাত্র প্রতিভানির্ভর নয়, বরং হৃদয়ের শেকড়ে যদি এই মহৎ কাজের প্রতি নিষ্ঠা বা মমতা না থাকে, তবে হুজুগে লেখক-অনুবাদক হওয়া হয়তো সম্ভব, কিন্তু তাতে জাত লেখক হয়ে পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী হওয়া যায় না।

লেখক ও অনুবাদকদের ব্যাপারে এমন নানারকম অভিজ্ঞতা নবপ্রকাশের ঝুলিতে জমে আছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত এটুকু শিক্ষা আমি পেয়েছি, পরিচিত লেখকদের পেছনে সময় ও শ্রম নষ্ট না করে আগ্রহী নবীনদেরকে সুযোগ দেওয়াটা অতি উত্তম এবং উপকারী। কারণ, দিন শেষে বিষয়ের গুণে বই টিকে থাকে, লেখকের পরিচিতি ও খ্যাতি বইয়ের প্রচারে সাময়িক সুবিধা যোগ করে মাত্র।

নবপ্রকাশের প্রেক্ষাপটে এবার নিজের ব্যাপারে কিছু গল্প করা যাক।

কিশোর বয়সে আমি বুকভরা আগ্রহ নিয়ে এক দুপুরে হাজির হয়েছিলাম একজন মাওলানার বাসায়। বাংলাবাজারে তাঁর তখন একটি প্রকাশনী বেশ ব্যবসা করছে। আমি তাঁর কাছে মিনতি করেছিলাম, একজন প্রখ্যাত ভারতীয় লেখকের বই আমি অনুবাদ করতে চাই যদি তিনি সম্মতি দেন। তিনি সেদিন সম্মতি দেননি, ন্যূনতম উৎসাহও নয়। আজ ভাবি, সেদিন যদি তিনি আমাকে দিয়ে অনুবাদ শুরু করাতেন, তবে অনুবাদের ওই বৃত্ত থেকে আর হয়তো বের হওয়া হতো না, এমনকি ওই প্রকাশনীর অনুবাদক হয়েই হয়তো কেটে যেত পুরোটা সময়।

এর কিছুকাল পরের কথা। আমার প্রথম মৌলিক বই প্রকাশিত হয় বাংলাবাজারস্থ একটি প্রকাশনী থেকে। বই প্রকাশের খুশিতে বেশ উৎসাহে আমি সেই প্রকাশনীর জন্য নতুন কাজ করতে শুরু করলাম। কিন্তু দেখা গেল, কাজের পারিশ্রমিক নিয়ে এই প্রকাশক বেশ হেলাখেলা শুরু করেছেন। আমি ব্যথিত হলাম এবং কাজ বন্ধ করে দিলাম। এখন ভাবি, যদি তিনি ঠিকমতো পারিশ্রমিক দিয়ে যেতেন, তবে হয়তো এই প্রকাশনীর লেখক হয়ে থাকতে হতো, অন্য কিছু করার ভাবনা আর হতো না।

উপরোক্ত দুটি অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেরা মিলে স্বাধীনভাবে নবপ্রকাশ গড়ে তোলার ইচ্ছা ও সাহসের যোগসূত্র রয়েছে। উপরোক্ত এই দু প্রকাশনীর দুজন কর্ণধার নেতিবাচকভাবে হলেও আমাকে নবপ্রকাশ করতে পথ দেখিয়েছেন, সুতরাং আজ তারা কিছুটা ধন্যবাদের হকদার হতে পারেন।

শেষকথায় শুধু এটুকু বলে যেতে চাই, নবপ্রকাশের সাধ্য এখনো সীমিত, কিন্তু আমাদের স্বপ্ন ও সাহস অসীম। আমরা কেবল বাংলাবাজার বা বাংলাদেশ সামনে রেখে বই নির্বাচন করি না, বরং আমাদের দৃষ্টির সীমানায় থাকে পুরো পৃথিবী। এই বৈশ্বিক দৃষ্টি ও বিবেচনা নবপ্রকাশের বই বাছাই ও প্রকাশে সবচেয়ে গভীর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

পাশাপাশি শুরু থেকে আজ অবধি আমরা পাঠকদের প্রতি পুরোপুরি আস্থা রেখে আসছি। কারণ আমরা জানি, জ্ঞান ও তথ্যপ্রবাহের এই আধুনিক সময়ে পাঠকদের চোখ-কান খোলা। কাজেই নিন্দুকদের সমালোচনা বা প্রতিযোগী ব্যবসায়ীদের অন্ধবিদ্বেষ নবপ্রকাশের যাত্রাপথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারবে না।

আমরা চাই একদল সচেতন বই পাঠক, যাদের চিন্তা-চেতনা ও কর্মে উপকৃত হবে সমাজ, দেশ ও পুরো পৃথিবী। নবপ্রকাশের বই কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং তা জীবন গড়ার পাথেয় হয়ে উঠুক পাঠকদের কাছে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

ডিসেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১