মওলানা ভাসানী। বাঙালির ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম। বরং তাঁর নামই এক ইতিহাস। কিন্তু তাঁকে আমরা অনেকেই জানি একজন বামপন্থী রাজনীতিবিদ বা চীনাপন্থী কম্যুনিস্ট হিসেবে। শুরুতেই এ ব্যাপারটা একটু পরিস্কার করে নেওয়া যাক।
এক বাঙালির গদ্যপাঠে আমরা পেয়ে যাব এ সংশয়ের সাফ সাফ জবাব। তাঁর নাম বেদুঈন সামাদ। বাংলাদেশের একজন বরেণ্য কথাশিল্পী ও ঔপন্যাসিক। তাঁর মনেও উদিত হয়েছিল এমন সংশয়। তিনি সেটা দূর করেছেন একান্ত নিকট থেকে মওলানার জীবন পাঠ করে। কীভাবে? শুনুন তাঁর জবানিতে—
‘মওলানা ভাসানীর নিঃস্বার্থ রাজনৈতিক জীবন, অনাবিল মানবপ্রীতি এবং নিখাদ দেশপ্রেম তাঁকে সর্বস্তরের মানুষের আপনজনে পরিণত করেছিল। ইতিপূর্বে অনেকের মতো আমারও ধারণা ছিল, তিনি একজন চীনাপন্থী কম্যুনিস্ট। কিন্তু বক্তৃতার মাঝে কথায় কথায় ইসলামের শিক্ষার দৃষ্টান্ত দেওয়ায় আমার সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল সেদিন। অবশ্য তাঁকে কম্যুনিস্ট সাম্যবাদে বিশ্বাসী বলে বহুল প্রচার করেছিল পুঁজিপতিরা।
‘তদানীন্তন পাকিস্তানের শাসকগণ মওলানা ভাসানীকে অর্থ, পদমর্যাদা প্রভৃতি সবকিছুর প্রলোভন দেখিয়েও তাঁর মতবাদ হতে তাঁকে ইঞ্চি পরিমাণও টলাতে পারেননি। বারবার কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েও তিনি রয়েছিলেন হিমালয়ের ন্যায় অটল। তাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে তাঁরা তাঁকে কম্যুনিস্ট বলে প্রচার করেছেন জনগণের কাছে। তাঁরা জানতেন কম্যুনিস্ট সম্বন্ধে ভীতি আছে জনগণের মনে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ চিনতেন তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতা মওলানা ভাসানীকে। তাই তাঁরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তদানীন্তন পাকিস্তানের গণধিকৃত নেতাদের সে প্রচার, সে বিবৃতি।’
মওলানা ভাসানী নিজেও দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছেন—‘আমি চীনের নাস্তিক্যবাদ ছাড়া আর সবকিছুকে সমর্থন করি।’ আর সবকিছু কী? সাম্রাজ্যবাদ? উঁহু, পড়ুন একবারের ঘটনা—
জনৈক সাংবাদিক এসেছেন মওলানা ভাসানীর সাক্ষাৎকার নিতে। জিজ্ঞেস করলেন, মিস্টার মওলানা, আপনি কি সারাজীবন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সংগ্রাম করে যাবেন? জবাবে মওলানা ভাসানী বললেন, ‘কবরে মুনকার-নাকির ফেরেশতা এসে যদি জিজ্ঞাসা করে সেখানেও তাদেরকে বলব—সাম্রাজ্যবাদ মানি না! মানি না! মানি না!’
ভাষাসৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুরের গদ্যপাঠে ব্যাপারটা অনেকটাই খোলাসা হবে। আসুন পাঠ করে নিই, আর দূর করি মনের সংশয়। একটি চমৎকার উদাহরণসহ পরিষ্কার বাংলায় তিনি লিখেছেন—‘আসলে মওলানা ভাসানী ছিলেন স্থানকালের সমস্ত ক্ষুদ্রতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে মানবতার মুক্তিকামী এমন এক বিশাল ব্যক্তিত্ব, যাঁর কল্যাণদৃষ্টি থেকে ক্ষুদ্র-বৃহৎ কেউই বঞ্চিত থাকত না। তিনি মূলতই ছিলেন মানবতার এক মহান মুক্তি সৈনিক এবং তাঁর কর্মজীবনের সমস্ত আপাতবৈপরীত্য ও বাহ্যিক পরস্পরবিরোধিতার আড়ালে তাঁর এ মূল পরিচয়টা খুঁজে পেতে যেকোনো নিরপেক্ষ সত্য সন্ধানীর বেগ পাবার কথা নয়। তবুও যে আমরা অনেকে ভাসানীকে ভুল বুঝি, তার কারণ আমাদের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা ও অগভীরতা। বলতে গেলে আমরা অনেকেই সাত অন্ধের হাতি দেখার মতো ভাসানীর খণ্ড পরিচয়কেই পূর্ণ পরিচয় ধরে নিয়ে আমাদের নিজেদের ব্যর্থতার কারণে ভাসানীর ‘পরস্পরবিরোধী রূপ’ নিয়ে এক অর্থহীন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছি।’
মওলানা ভাসানী তবে কেমন ছিলেন? প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর কাছে তিনি মূর্ত হয়ে ওঠেন এভাবে—‘ভাসানীর মওলানা সাহেবের কাজকর্ম দেখে মনে হয়েছে লোকটি বাংলার কালবৈশাখী। প্রচণ্ড তাঁর শক্তি ততোধিক তাঁর বেগ। যেদিকে চলেন তাঁর দাপটে আধমরা ডাল ভাঙে, জরাজীর্ণ গাছ উপড়ে যায়, বাসি পাতা খসে হাওয়ায় ওড়ে, বুতো ঘর ভূমিস্যাৎ হয়। তারপর কালবৈশাখী কোথাও চলে যায়। নতুন ঘর তোলার দায়িত্ব অন্য লোকের, নতুন চারা লাগানোর ভার অন্য মালীর, নতুন পাতা পল্লব জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব নব বসন্তের।’
এটাই ছিল মওলানা ভাসানির স্বরূপ। তিনি ছিলেন কালবৈশাখী উপমাধারী। এর মূলে কী ছিল? এককথায় মাটির মায়া এবং মাটির মতো মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা। এ ভালোবাসার জোরেই তিনি হয়েছিলেন বাঙালির মজলুম জননেতা। কারণ চাষাবন্ধু মওলানা ভাসানী নিজেও ছিলেন একজন চাষা। লালনীতি, নীলনীতির রাজনীতির চেয়ে নিজেকে চাষার পরিচয়ে জাহির করতে মওলানা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। অধ্যক্ষ মুহাম্মদ হোসেনের স্মৃতিকথায় শুনুন এর গল্প—‘হুজুর মওলানা ভাসানী হজে যাবেন। হজে যাবার পাসপোর্ট করতে হবে। ফরম আনা হলো, হুজুরের নামধাম, পিতার নাম লেখা হলো। পেশা রাজনীতি বলে উল্লেখ করা হলো। হুজুর ক্ষেপে গেলেন। বললেন, রাজনীতি কি পেশা হয়? লেখ চাষা!’
চাষ যাঁর পেশা তিনি তো কালবৈশাখী হবেনই। বরং তিনি হবেন আরো যুৎসই উপমার অধিকারী। সেটা ঝলমলিয়ে উঠেছে গোলাম সারওয়ারের পঙক্তিপুঞ্জে—
‘ভাসানি মানে ক্ষেপে ওঠা কোনো চাষাড়ে যুবক—
তাঁর চোখে শুধু অবিনাশী ক্রোধের লবণ
সে যেন এক খেটে খাওয়া কৃষকের শান দেওয়া
ঝলসানো অস্ত্র’
হ্যাঁ, ঝলসানো অস্ত্রই বটে। আর যাদের হাতের পরশে তিনি ঝলসে উঠেছিলেন, তারা এ বাংলার চাষাভুষা জনগোষ্ঠী। নিপীড়িত কৃষক সমাজ। তিনি ছিলেন তাদের সুখদুখের ভাগীদার। আত্মার আত্মীয়। হৃদয়ের পরমজন। তাই অন্তর দিয়ে অনুভব করেছেন তাদের দুঃখ। সহমর্মিতা জানিয়ে বলেছেন—‘ভারতের কৃষকের দুঃখ, ইরানের কৃষকের দুঃখ, বার্মার কৃষকের দুঃখ, নেপালের কৃষকের দুঃখ, ভুটানের কৃষকের দুঃখ, কাবুলের কৃষকের দুঃখ, বাংলাদেশের কৃষকের দুঃখ—এক দুঃখ।’
তাদের পক্ষপাত নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে আওয়াজ তুলেছেন— ‘বাংলার কৃষক তোমরা প্রস্তুত হও! দুনিয়ার নিপীড়িত মানুষ, দুনিয়ার মজলুম মানুষ, দুনিয়ার নির্যাতিত মানুষ, শোষিত মানুষকে তোমরা মুক্ত করো—আমরা মুক্ত করবই করব!’
মূলত বাংলার মাটি আর মাটির মতো সরল, উর্বর, তেজস্বী কৃষক সমাজই ছিল তাঁর রাজনীতির কারণ। তাদের অধিকার আদায়ে তিনি লড়েছেন আজীবন। কৃষি আর কৃষকের উন্নতি ছিল তাঁর আন্দোলনের লক্ষ্য। এ সম্পর্কে মওলানা নিজেই বলেছেন—‘দেশের উন্নতি বলতে আমি বিশ্বাস করি, আমি বুঝি কৃষকের উন্নতি, কৃষির উন্নতি। কারণ কৃষকই জাতির মেরুদণ্ড। এজন্যই আমি কৃষকের দাবি নিয়ে আন্দোলন করে থাকি।’
বিশ্বাসের এ বচন মওলানা কোথা থেকে ধারণ করলেন তাঁর হৃদয়ে? সেও ওই চাষাভুষা জনগোষ্ঠী আর নিপীড়িত কৃষক সমাজ থেকেই। রূপকথার রাজপুত্রের এদিকটা উন্মোচন করেছেন শরিফুল ইসলাম আল মাজি—‘কৃষকের সন্তান মওলানা। শহরের তথাকথিত চাকচিক্য তাঁকে লালায়িত করেনি। ৯৮ ভাগ সাধারণ সরলপ্রাণ মানুষ ছিল তাঁর সঙ্গী। ঋণ সালিশ বোর্ড থেকে শুরু করে এদেশে যতগুলো সংস্কারমূলক আইন পাশ হয়েছে, প্রতিটির পেছনে মওলানা ভাসানীর দান অনস্বীকার্য। কৃষকের নয়নমণি মওলানা ভাসানী পুরো জীবন কাটিয়েছেন গাঁয়ের সরলপ্রাণ কৃষকের মাঝে। আর তাই তিনি কৃষকের সমস্যা উপলব্ধি করতে পারতেন সঠিকভাবে। অলৌকিক কম্পিউটারের মতো বলে যেতেন কখন চালের দাম কত, আলুর দাম কত, সারের দাম কত। বলে যেতেন ঝড়ে বা খরায় কৃষকের কতটা ক্ষতি হয়েছে। বলে যেতেন কৃষকের ঘরে হাহাকারের কথা।’
বাংলার নিপীড়িত কৃষক সমাজ, যারা প্রাণপণ পরিশ্রম করে সারা বছর সকলের ভাতের যোগান দেয়, তাদের ঘরে থাকে ভাতের অভাব। তাদের দিন কাটে হাভাতে। ভাতের বাইরে আর কোনো চাহিদাকে তারা মনে ঠাঁই দেয় না। অথচ তার মনে আকুলিবিকুলি করে কত আকাঙ্ক্ষা! নিরীহ কৃষকের এ সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার কথা মওলানা বুঝতে পারতেন। অধ্যক্ষ মুহাম্মদ হোসেনের স্মৃতিকথায় শুনুন এর গল্প—‘মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো এক গরিব মুরিদের বাড়িতে এলেন মওলানা ভাসানী। রোগী তখন মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাতর। এক গ্লাস পানিতে ফুঁ দিয়ে রোগীর সম্মুখে গ্লাসটি তুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কী খাবা?”
“রসগোল্লা, হুজুর!” ভাসানীর হুজুর দুটি রসগোল্লা আনলেন। একটি রসগোল্লা অর্ধেক খাওয়ার পর রোগী আর অর্ধেক খেতে পারেনি। এর কিছুক্ষণ পর সে মারা যায়।
‘একদিন হুজুরের মুখে বাংলার দরিদ্র কৃষকের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে শুনলাম এ কাহিনি। কাহিনি শেষ হতে হুজুরের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল দুফোঁটা পানি। হুজুর আবেগজড়ানো কণ্ঠে বললেন, “জানি বাংলার ঘরে ঘরে এমনই বহু বহু দরিদ্র কৃষক রয়েছে, জীবনে একটা রসগোল্লা খেয়ে মরতে পারেনি।”’
মওলানা ভাসানী ছিলেন সাদাসিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত। খদ্দরের সফেদ পাঞ্জাবি, তাঁতের লুঙ্গি, তালের আঁশের টুপি, কাশফুল দাড়ি—এই ছিল তাঁর প্রাত্যহিক রূপ। কিন্তু উদাত্ত কণ্ঠস্বর, নিরাপোষ অহংকার এবং কাউকে তোয়াক্কা না করে হক কথা বলা—এসব অনন্য গুণে তিনি ছিলেন সমৃদ্ধ। মওলানার এ অভিন্ন রূপ ও অনন্য গুণের মাহাত্ম্য ঝংকৃত হয়েছে নেছারউদ্দিন আহমদের ছড়ার ছন্দে—
‘কোন সে নেতার ছেঁড়া জামা
বেতের টুপি মস্তকে,
ন্যায়ের পথে করতে লড়াই
কে বাড়াতেন হস্তকে?
তিনি হলেন সবার সেরা
নাম হল তাঁর ভাসানী,
ভয় পেতেন না জালিম রাজার
রক্তচক্ষু শাসানি।’
মওলানার মাথায় শোভিত ওই বেতের টুপির মাহাত্ম্য কী ছিল? দেশের আর সব আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ যখন কোমল সুতোর গোল বা লম্বা টুপি মাথায় ধারণ করতেন, তখন তিনি কেন আম নেজামের বাইরে গিয়ে তালের আঁশের শক্ত বেতের টুপি মাথায় পরতেন? কী রহস্য ছিল এর? জানতে হলে পড়ুন কবি ও লেখক আবদুস সাত্তারের স্মৃতিকথন—‘একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হুজুর, আপনার ওই বেতের টুপির মাজেজা কি? তিনি শেখ সাদির ‘উসতাদ জেহরে মেহরে পেদার—পিতার স্নেহের চেয়ে শিক্ষকের মার ঢের ভালো’ এই বয়াতটি উচ্চারণ করে বললেন, শিক্ষক ছাত্রদের শায়েস্তা করেন বেত মেরে। সমাজকেও শায়েস্তা করার জন্য বেতের প্রয়োজন।’
আসলে মওলানা ভাসানী ছিলেন সমাজের শিক্ষক। আর সমাজের এ মহান শিক্ষকের কাছে কবিতার খাতা নিয়ে ছুটে যেতেন আধুনিক বাংলা কবিতার সেরা কবি আল মাহমুদ। তিন আমলের প্রাচীন শতবর্ষী বিটপির কাছে ছুটে যেতেন হাল আমলের আধুনিক কবিতার ভ্রমর। তিনি তাঁকে শোনাতেন কবিতার সংগীত। তাঁর সামনে উপুড় করে ঢালতেন নিজের সমস্ত সঞ্চয়। পড়ুন না কবির ভাষায়—
‘মওলানার টুপিওয়ালা উঁচু মাথাটি যেন
এক হারিয়ে যাওয়া পর্বতের স্মৃতি।
আমি এই পর্বতের পাশে মাঝেমধ্যে যেতাম
স্নিগ্ধ, যেন নিজের মধ্যে সমাহিত এক বাতাসের ফুঁৎকার
বলতেন, কবিতা দিয়ে কী হবে? আগে চাই স্বাধীনতা
তারপর ভাত-কাপড়।
স্বাধীনতা আর ভাত-কাপড়ের পর আপনার আর কী চাই মওলানা?’
মওলানা তখন তাঁর নিপুণা ঘরনির রান্না করা গলদা চিংড়ির মালাইকারি দিয়ে পাতভরা ভাত প্রাচীন অজগরের মতো নিঃশব্দ লোকমায় খেয়ে নিতেন। তারপর দাঁত ও দাড়ি খেলাল করতে করতে কবিকে বলতেন তাঁর খাতা খুলে আবোলতাবোল যা খুশি পড়তে। কবি খাতাটি খোলার আগেই মওলানা ঘুমিয়ে পড়তেন। হয়তো-বা কবিতা শোনার জন্য নিজের মধ্যে মুরাকাবার হালত তৈরি করতেন। কবি তখন ঘুমন্ত পর্বতের পাদদেশে একের পর এক ওড়াতে থাকতেন তাঁর কবিতার ফড়িং।
সমঝদার এ সমাজ-শিক্ষকের একটা চমৎকার কাহিনি পেয়েছি তাঁর ছায়াপালিত ছাত্র শেখ মুজিবকে নিয়ে। এ জেড এম শামসুল আলমের বর্ণনায় শুনুন সেই কাহিনি—‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান মওলানা ভাসানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সন্তোষ যান। তাঁর খেদমত করার সুযোগ দিতে শেখ মুজিব মওলানার প্রতি আবেদন জানান। মওলানা বললেন, তুমি আমার আর কী খেদমত করবা? আমার খেদমতের দরকার নাই। কলেজটি চালাতে আমার অসুবিধা হতেছে। তুমি এটাকে নিয়ে যাও।
‘শেখ মুজিব জানালেন, কলেজটি সরকারি করতে তিনি রাজি আছেন, তবে এক শর্তে। শর্তটা হলো, কলেজটির নামকরণ করতে হবে ‘মওলানা ভাসানী কলেজ’ নামে। মওলানা জানতে চাইলেন, মুহাম্মদ আলি নামটা কী দোষ করেছে? শেখ মুজিব বললেন, এ নামটা পশ্চিমা। মওলানা বললেন, মুজিব, আমি তোমার শর্ত মানতে রাজি আছি, তবে আমারও একটা শর্ত আছে। দেখা যায় পশ্চিমা হলেই দোষের হয় তোমার মতে। আমার নবিও যে ছিলেন পশ্চিমা। তুমি যদি আমাকে একজন পূরবা নবি এনে দিতে পারো, আমি তোমার শর্তে রাজি আছি। মওলানার এ জবাব শুনে শেখ মুজিব লা-জবাব। অগত্যা মওলানা মুহাম্মদ আলি নামেই এই কলেজটির সরকারিকরণ করা হয়।’
মওলানা ভাসানীর এ নিরাপোষ অহংকারকে কবিতার শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েছেন মুকুল চৌধুরী—
‘আমি এক তর্জনির শাসানো ভঙ্গি দেখেছি
বুকের ডানার মতো শুভ্র-সফেদ ওই অবয়ব
লালবাগ কেল্লাকেও গাম্ভীর্যে হার মানিয়েছিল।’
খালেক বিন জয়েনউদ্দিন দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন তাঁর অকুতোভয়তার গাঁথা—
‘মওলানা ভাসানী
মানে নাই শোষকের
জেল-জুলুম শাসানি।’
মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে নিয়ে আবদুল গাফফার চৌধুরী গেয়েছেন কোটি বাঙালির প্রাণের গান—
‘শহরে বন্দরে গ্রামে ঘরে
হৃদয় নগরে
মুখের ভাষায় শুনি, বুকের সাড়ায় শুনি, চোখের তারায় দেখি নাম
মওলানা ভাসানির নাম।
পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণের কালাম—
কণ্ঠে শুনি তাঁর। হতবাক সবিস্ময়ে দেখি
জীবনে জীবনে এ কী
মিলিত প্রাণের গতি; কলকণ্ঠে আকাশ মুখর
বজ্র আর ঝড়ে শুনি স্বচ্ছ স্বর
মুখের ভাষায় শুনি নাম
মওলানা ভাসানির নাম।’
বাঙালির ইতিহাস মওলানা ভাসানী, অবিনশ্বর হোক তাঁর পাঠ।
নভেম্বর 2019

