মহামিছিলের মহানায়ক

সংখ্যা:

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জে মে মাসের সতেরো তারিখ সকাল। টিপটিপ বৃষ্টি ঝরছে। আকাশ যত কালো তার চেয়ে আঁধার বেশি। আম্রকানন আর লিচুবাগানে ঘন অন্ধকারের পর্দা টেনে বৃষ্টি ঝরছে মন্থর ধারায়। বৃষ্টি থামার আপাত কোনো লক্ষণ নেই। আকাশভরা মেঘ।

আকাশে মেঘ। আম বন, লিচু বনের নিচে সরু রাস্তায় মানুষের ঢল। চাঁপাইনবাবগঞ্জে রাত কাটানোর পর লাখো জনতার মিছিল ছুটে চলেছে সীমান্তের দিকে। বৃষ্টিমুখর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বজ্রানির্ঘোষ শ্লোগান মুখে নিয়ে মিছিল পার হয়ে যাচ্ছে মহানন্দা। ফারাক্কা মহামিছিল চলছে কানসাট সীমান্তে। মহানন্দা পার হয়ে সামনে আরও ১৬ মাইল পথ।

মহামিছিলের মহানায়ক মওলানা ভাসানী তখনও সীমান্তের পথে যাত্রা শুরু করেননি। কিছুক্ষণ পর তাঁর মিছিল অনুগমন করার কথা। মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে। আর মওলানা ভাসানী তখন কথা বলছিলেন কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মনি উকিলের বৈঠকখানায় বসে। তিনি স্মৃতিচারণ করছিলেন বিগত দিনের রাজনীতির। স্বপ্ন দেখছিলেন ভবিষ্যৎ সমাজ-ব্যবস্থার। সীমান্তমুখী মিছিলের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল থেকে থেকে। শ্লোগানের আবহে সেই বৃষ্টিমুখর সকালে শতাব্দী প্রবীণ জননেতা বলছিলেন ব্রিটিশ-ভারতে সিরাজগঞ্জ কৃষক সম্মেলনের কথা। একটা পয়সা চাঁদা তোলা হয়নি। কৃষকরা সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়ে এসেছিল চাল ডাল তরিতরকারি নুন-তেল-লাকড়ি। একমুঠো চাল চুরি করার কথা কেউ ভাবেনি। এক বেলায় ১৮শ’ মণ চাল-ডালের খিচুড়ি পাক হয়েছিল। তারপরও উদ্বৃত্ত ছিল ৯শো’ মণ চাল। লাকড়ি তেল-নুনের হিসাব বাদই থাক। নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করলেন—‘কাকে বিশ্বাস করব? পয়সা দেখলে কারও মাথা ঠিক থাকে না। কোনো প্রোগ্রাম নিলেই বের হয় চাঁদা তুলতে। কে ক’টাকা চাঁদা তুলে তার হিসেব চাইলে বলে রশিদ বই হারিয়ে গেছে। এদের বিশ্বাস কোরো না তোমরা। যারা হাজার হাজার বিঘা জমির মালিক, যাদের বাড়ির কয়েক মাইল সীমানায় অন্যের জমি নেই, তারাই সব কৃষক-নেতা। এরা কৃষকের সমস্যা, কৃষকের দুঃখ বোঝে না। তোমরা যাও একটা গ্রাম বেছে কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে সার্ভে করো। দেখবে, কৃষকদের মেরুদণ্ড নেই।’

মওলানা ভাসানী বক্তা। সাংবাদিকরা নীরব শ্রোতা। কথা বলতে বলতে অসুস্থ বৃদ্ধ জননেতার কণ্ঠ আবেগে জড়িয়ে গেল। বললেন, ‘আজ আমি বুড়ো হয়ে গিয়েছি। আমি গরিব কৃষকদের জন্যে কী করে যেতে পারব জানি না। তবে এখন মনে হয় এদের সাথে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। এদের বিশ্বাস অর্জন করেছিলাম। তার মূল্য আমি দিতে পারিনি। এই গরিব মানুষদের ভোট এনে আমি বারবার গদিতে বসিয়েছি কতগুলো বেঈমানকে, যারা ওয়াদা করে ওয়াদা রাখেনি, যারা কৃষকদের কথা ভুলে নিজেরা সম্পদের পাহাড় তৈরি করেছে। আজ আর কিছু বলতে পারি বা না পারি, একটা কথা কৃষকদের বলে যাব—এইসব নেতাকে তোমরা বিশ্বাস করো না, নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হও।’

মওলানা বলে চললেন, ‘সব গ্রামে এই স্বাস্থ্য নিয়ে ঘুরতে না পারি, অন্তত আমার ১২ লক্ষ মুরিদকে এ কথা বলে যাব।’ সাংবাদিকদের তিনি জানিয়ে দিলেন, তিনি মুরিদদের দীক্ষা দেন। ছাপানো ফরমে লেখা থাকে—আমি আজীবন সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ-পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে কৃষকরাজ কায়েমের জন্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করব। আমি রোজা-নামাজ-হজ-জাকাত নিয়মিত আদায় করব।’ ডুপ্লিকেট কপির মওলানা ভাসানী সাক্ষরিত কপিটি থাকে মুরিদের কাছে। আর মুরিদদের সাক্ষরিত কপিটি থাকে মওলানা সাহেবের কাছে। ধর্মপ্রাণ দরিদ্র কৃষকদের মনে দুর্বার রাজনৈতিক চেতনা সৃষ্টির এই কৌশল একান্তই মওলানা ভাসানীর নিজের। সর্বহারা রাজনীতির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিয়ে যাঁরা কৃষকদের কাছে যেতে চেষ্টা করেন, এই কৌশলের কাছে তাঁরা পরাস্ত হতে বাধ্য।

মওলানা ভাসানী আশাবাদী। কৃষকদের মধ্য থেকেই কৃষক নেতা বেরিয়ে আসবেন। তিনি বললেন—‘দিন সামনে রয়েছে, খুব দূরে নয়। দেখবে, এখন যারা নেতা তারা কেউ নেই। কৃষকরা এগিয়ে এলে এরা তখন পালাবে।’

১৬ মে (১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দ) ফারাক্কা মহামিছিল দ্বিপ্রাহরিক বিরতির জন্যে রাজশাহী শহর থেকে ১৩ মাইল দূরে প্রেমতলীতে থেমেছে। এর আগে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে মিছিল এসেছে প্রেমতলীতে। তখন আর বৃষ্টি নেই। রোদে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে মিছিলকারীদের মুখ। একটা পিকআপ ভ্যানের ওপর মাইক্রোফোন বাঁধা। পিকআপ ভ্যানের পা-দানিতে একটা পা রেখে মাউথপিস হাতে নিয়ে বক্তৃতা করছিলেন মওলানা ভাসানী—‘আজ এই ঐতিহাসিক লংমার্চের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে দরিদ্র মানুষের ঐক্য। এই ঐক্য অটুট রেখে তোমরা এগিয়ে গেলে ধনী আর গরিবকে শোষণ করতে পারবে না। কৃষকরাজ তোমরা ইনশাআল্লাহ কায়েম করতে পারবে।’

অনন্য রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির অধিকারী মওলানা ভাসানী ভবিষ্যতের কী কী ছবি দেখেছেন তা তিনি ছাড়া কেউ জানেন না। ফারাক্কা মহামিছিল করে রাজশাহী থেকে কানসাট সীমান্ত পর্যন্ত ৫০ মাইল পথে তিনি কী ইতিহাস সৃষ্টি করলেন, তার মূল্যায়ন ভবিষ্যতেই হবে। এ মুহূর্তে শুধু এটুকুই বলা যায়—এ মিছিলের মাধ্যমে এই বৃদ্ধ জননেতার ওপর জনগণের আস্থা আবার নতুন করে প্রমাণিত হলো। একমাস আগে ঢাকার ইসলামিক ফাউন্ডেশন হলে এক ক্ষুদ্র সমাবেশে তিনি ঘোষণা করলেন ফারাক্কা মিছিলের কথা। তারপর যেন সব দায়িত্ব চলে গেল যাঁরা মিছিল করবেন তাঁদের ওপর। এলাকাভিত্তিক কোনো সাংগঠনিক সভা-সমাবেশ হলো না। কেবলমাত্র সাংগঠনিক কমিটির সদস্যদের মিছিলের আগের দিন পর্যন্ত রাজশাহীতে দেখা গেল না। শুধু মওলানা ভাসানী বসে রইলেন রাজশাহীতে। কখনও পান চিবোতে চিবোতে, কখনও-বা লিচু খেতে খেতে কথা বললেন দর্শনার্থীদের সঙ্গে।

কী বিরাট কর্মসূচি। ৫০ মাইল পথ যাত্রার সাফল্য-অসাফল্যের ঝুঁকি। অথচ বৃদ্ধ নেতার চোখে-মুখে উদ্বেগের লেশমাত্র নেই। অবিচল আস্থা নিয়ে তিনি বসে আছেন নির্বিকার। মিছিল হয়ে গেল। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত একজন কৃষক, একজন শ্রমিক থেকে একজন সীমান্ত প্রহরী পর্যন্ত রচিত হলো এক অবিচ্ছিন্ন ঐক্যের সেতু।

মনাকষা সীমান্তের চৌকি ফাঁড়ি। দেড় মাইল দূরে ভারতীয় ভূখণ্ডে সবদেলপুর। ভারতীয বাহিনী সবদেলপুর থেকে এগিয়ে এসে সীমান্ত খুঁটির প্রায় ওপরে ছাউনী ফেলেছে। বাবলা গাছের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায় কনভয়ের সারি আর আমাদের চৌকা ফাঁড়িতে বসে আছেন মাত্র এক প্লাটুন বিডিআর-এর জওয়ান। তাঁদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, বিপক্ষের বিরাট শক্তির সামনে তাঁরা দাঁড়াতে পারবেন কিনা। উত্তরে তিনি বললেন, ‘কেন পারব না? পেছনে আপনারা একলাখ আছেন।’

সীমান্ত-প্রহরীর মনে এক কঠিন আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছেন মওলানা ভাসানী। যে বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে এক বৃদ্ধ নেতা ডাক দিয়েছেন ফারাক্কা মহামিছিলের, যে মিছিলে যোগ দিয়েছে দেশের লাখো জনতা।

(লেখাটি হাসান আবদুল আজিজ সম্পাদিত ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ‘মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী’ স্মারকগ্রন্থ থেকে চয়িত)

 

নভেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১