গল্পের ক্যানভাসে মাওলানা ভাসানীর জীবন

সংখ্যা:

 

ছয় বছরের শিশু আবদুল হামিদ, হেসেখেলে বেড়ায়। হঠাৎ বাবা মারা গেলেন। বাবার শোক কাটিয়ে উঠতে না-উঠতেই কয়েক বছরের মাথায় একসাথে তার মা এবং দুই ভাই মারা গেল। এতিম বালক আবদুল হামিদ চাচা ইবরাহিমের আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার কাছেই থাকেন এবং কাজ-কর্ম করেন। এ সময় একদিন তার চাচা বাড়িতে বিরাট এক ভোজসভার আয়োজন করলেন। ধনী-গরিব সবাইকেই দাওয়াত দিলেন। কিন্তু প্রথা অনুযায়ী গরিবদের খেতে দেয়া হলো কলাপাতায় আর ধনীদের সুন্দর সুন্দর থালায়। কিশোর আবদুল হামিদ নিজেও তার এক গরিব বন্ধুকে দাওয়াত করেছিল। কিন্তু খাওয়ার সময় বন্ধুকে সে গরিবদের জায়গায় না বসিয়ে ধনীদের কাতারে বসাল। এতে কিছু কিছু ধনী অপমানিত বোধ করল। আয়োজন শেষে সবাই চলে গেলে চাচা ইবরাহিম আবদুল হামিদকে অনেক বকা—ঝকা করলেন।

কিশোর আবদুল হামিদের ভীষণ মন খারাপ হলো। চাচার এই বৈষম্যপূর্ণ আচরণে প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়তে ইচ্ছে হলো তার। কিন্তু আশ্রয়দাতা মুরব্বি চাচাকে তিনি কী-ই বা বলতে পারেন! শেষে বুক-ভরা অভিমান নিয়ে সবার অগোচরে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়লেন অজানার উদ্দেশ্যে। ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে শাহজাদপুরে তার দূর-সম্পর্কের এক ভগ্নিপতির বাড়ি এসে আশ্রয় নিলেন। মকতবে ভর্তি হলেন। কিছুদিন পর পীর নাসিরউদ্দিন শাহ বাগদাদির সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। কিশোর আবদুল হামিদের পছন্দ হয় এই নির্লোভ পরিশ্রমী পীর সাহেবকে। পীর সাহেবেরও এই সদা চঞ্চল এতিম কিশোরের প্রতি মায়া পড়ে যায়। মকতবে ভর্তি করে দেন। এরপর ১৮৯৭ সালে পীর সাহেব তাকে নিয়ে দীন প্রচারের কাজে আসামে চলে আসেন। এখানেই বালক আবদুল হামিদ দীর্ঘদিন স্বয়ং পীর সাহেবের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকেন এবং জনগণের সাহায্য-সহযোগিতা করতে থাকেন। কিন্তু শিক্ষিত অভিজ্ঞ পীর সাহেব আবদুল হামিদের শিক্ষাকে এখানেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাইলেন না। তিনি তার দীনি শিক্ষার পরিপূর্ণতার উদ্দেশ্যে ১৯০৭ সালে বিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দেওবন্দ মাদরাসায় পাঠিয়ে দিলেন।

এভাবেই দারুল উলুম দেওবন্দে শুরু হয় যুবক আবদুল হামিদের উচ্চতর শিক্ষাজীবন। সান্নিধ্য পান আল্লামা আজাদ সোবহানির এবং ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব আল্লামা হোসাইন আহমাদ মাদানির। তাঁদের শিক্ষা ও সান্নিধ্যে যুবক আবদুল হামিদের জীবনের মোড় ঘুরে যায়…

 

দুই

১৯২০ সাল। আন্দোলনে যোগদান করার অপরাধে জীবনে প্রথমবারের মতো কারাভোগ করেন ভাসানী। তখন তিনি বসবাস করছেন আসামের গোয়ালপাড়া জেলার ঘাগমারী অঞ্চলে। ১৯২৮-২৯ সালে এই ভয়াবহ জায়গাটিতেই তিনি মাত্র ১ টাকা ১৪ আনা ব্যয়ে একখানা কুঁড়েঘর তৈরি করে অসহায় বাঙালিদের সাথে বসবাস শুরু করেন। জমিদারকন্যাকে উঠালেন একেবারে নিখুঁত কুঠুরে। জনদরদী ভাসানী রাতদিন মানুষের সেবা-কল্যাণে জীবন পাত করতে থাকেন, কিন্তু সমস্যা হতে থাকে তাঁর স্ত্রী আলেমা বেগমের। এই বিদেশ-বিভূইয়ে শ্বাপদ জঙ্গলে বসবাস করা তাঁর জন্য ভীষণ কষ্টকর হয়ে ওঠে। তিনি তাঁর পিতৃভূমি বাংলায় ফিরে আসার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠলেন। মওলানা প্রশান্তচিত্তে স্ত্রীকে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করলেন। স্ত্রী ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি যাবেন না?’

ভাসানী বললেন, ‘না, আমি এখনই যাবো না। আমার নিরন্ন, নিরস্ত্র বাঙালি চাষীদের একটা সুরাহা যতদিন না হবে, ততদিন আমি আর বাংলায় ফিরে যাব না।’

সত্যিই মওলানা ভাসানী দেশ স্বাধীনের আগে আর আসাম থেকে ফিরে আসেননি। তিনি আবাস গাড়েন ধুবড়ী শহরের অদূরে ভাসানচর নামের একটি নতুন চর এলাকায়। প্রতিষ্ঠা করেন মসজিদ মাদরাসা স্কুল ও কলেজ। লক্ষ লক্ষ ভক্তের পীর হিসেবেও তিনি প্রচুর খ্যাতি লাভ করেন। ধীরে ধীরে তিনি ‘ভাসানচরের মওলানা’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরে শুধু ‘ভাসানী’ নামেই মশহুর হন।

 

তিন

অধ্যক্ষ ইবরহিম খাঁ লিখেছেন—

টাংগাইল শহরের চর অঞ্চল। বন্যার তাণ্ডবে কেবল ভাটা ধরেছে, এমন সময় একদিন আমার করটিয়ার বাসার ঘাটে আসাম প্রত্যাগত এক ভদ্রলোকের নৌকা ভিড়ল। নাম তাঁর আবদুল হামিদ খান। তাঁর নৌকায় মণ পঞ্চাশেক ধান। বললেন, বাড়ি আমার আগে বাংলাদেশেই ছিল, তারপর যাই আসামে। বন্যার কথা শুনে বিপদের জন্য কিছু ধান নিয়ে এলাম। তার খানিকটা বিতরণ করেছি, বাকিটা আপনার সাথে পরামর্শ করে বিতরণ করব ভেবে নিয়ে এলাম।’

মওলানা সাহেব টাঙ্গাইল শহরের চর অঞ্চলে কাজ শুরু করলেন। এরপর তিনি আরো কয়েকবার ধান আনলেন। কাপড় সংগ্রহ করলেন। টাকা জোটালেন। খুব জোরেশোরে তাঁর কাজ চলল। দেশের সাদা-দিল মানুষ, তারা তাঁর কথায়, তাঁর দরদে, তাঁর সেবায় মুগ্ধ হয়ে গেল। কিছুদিন পর তাদের মধ্যে বলাবলি শুরু হলো—

‘লোকটা কে রে ভাই, কোথা থেকে উড়ে এল আমাদের সাহায্যের জন্যে?’

‘জানিস না? উনি যে ভাসানচরের মওলানা! দেখিস নাই তাসবিহ? মস্ত ফকির!’

‘তাই তো রে ভাই! তবে এসব ধান-কাপড়-টাকা উনাকে জিনে বোধহয় জোগায়।’

‘আমি তো তাই মনে করি। ওর পানি পড়ার যে বেশুমার বরকত। সে তো অনেকেই পরখ করে দেখেছে।’

এরপর তার কাছে জমতে লাগল মানুষের ভিড়। কেউ চায় একটুখানি ফুঁ, কেউ চায় পানি পড়া, কেউ চায় কালজিরা পড়া, কেউ চায় তাঁর হাতে চুমো খেয়ে ধন্য হতে। একদিন তিনি রাতে এক বাড়িতে ছিলেন। ভোরে চলে গেলেন। পানি পড়ার জন্য লোক এসে জমল। বাড়ির একজন তামাশা করে বলল, ‘তিনি এক গেলাস পানি পড়ে এই ইন্দারায় ঢেলে দিয়ে গেছেন। এখন ওই ইন্দারার পানি নিলেই চলবে।’

লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ল ইন্দারার উপর। পানি নেয়া শুরু হলো। ইন্দারার পানি শুকিয়ে গেল। লোকে আধ কাদা পানিই তুলতে লাগল। অবশেষে বাড়িওয়ালা তাদের কাছে হাতজোড় করে বললেন, ‘দোহাই আল্লাহর, আমার ইন্দারাটা রক্ষা করো। এর উপর আর পানি তুললে ইন্দারা পড়ে যাবে।’

 

চার

মওলানা ভাসানী আসাম থেকে নদীপথে সিরাজগঞ্জ হয়ে টাঙ্গাইলের চাড়াবাড়ি এসে পৌঁছলেন। তার উদ্দেশ্য পীর শাহজামান রহ.এর মাজার জিয়ারত করা। চাড়াবাড়ি থেকে কাগমারী পর্যন্ত কাঁচা পথ, কিন্তু কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা নেই। রাস্তার শেষের দিকে অতি প্রতাপশালী হিন্দু জমিদার বাড়ি। মুসলমানবিদ্বেষী এই জমিদার মুসলমানদের সঙ্গে নির্মম আচরণ করত। তাদেরকে অতি নীচু ও ম্লেচ্ছ জাতিরূপে ভাবত। জমিদারদের কড়া নির্দেশ ছিল—জমিদার বাড়ির এলাকায় কোনো মুসলমান জুতা পায়ে বা ছাতা মাথায় অথবা ঘোড়ায় চড়ে চলাচল করতে পারবে না।

কিন্তু এদিকে মওলানা ভাসানী চাড়াবাড়ি হয়ে ঘোড়ায় চড়ে শাহজামানের মাজারের দিকে রওয়ানা দিয়েছেন। তিনি ছাতা মাথায় ঘোড়ার পিঠে বসে আছেন, আর ভক্তরা ঘোড়া পরিচালনা করে নিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে তারা জমিদার বাড়ির সামনে চলে এল। ভাসানী আগের মতোই চলতে লাগলেন।

ঘটনাক্রমে স্বয়ং জমিদার মহাশয় এ দৃশ্যটি তাঁর প্রাসাদের ছাদ থেকে দেখে ফেললেন। জমিদার গর্জে উঠলেন। তাঁর লাঠিয়াল প্রধানকে ডেকে বললেন, ‘যবনের ছায়া ঠেকেছে আমার সীমানায় আর তুই নাকি ব্যাটা বসে বসে ঝিমুচ্ছিস?’

‘জি, মহারাজ…’

‘দেখ রাস্তার দিকে তাকিয়ে…’

‘তাই তো মহারাজ। এত শুধু যবন নয় মহারাজ, যবনতম—পায়ে জুতা, মাথায় ছাতা ও টুপি; তার উপর আবার ঘোড়ায় চড়ে—এ যে তিন-চারটে যবনের অপরাধ একাই করছে।’ বলেই রে রে রে করে দৌড়ে এসে মওলানা ভাসানীর পথ রোধ করে দাঁড়াল লাঠিয়াল। কিন্তু ভাসানীর চোখের দিকে তাকিয়ে তার কী যে হলো—একেবারে মিইয়ে পড়ল। অনুনয়ের সুরে বলল, ‘হুজুর, আমাদের জীবন রক্ষার জন্যই দয়া করে জুতা খুলে, ছাতা নামিয়ে, ঘোড়া ছেড়ে জমিদার বাড়ির সীমানাটুকু হেঁটে যান।’

সর্দারের মিনতির প্রতি মওলানা ভাসানীর দয়া হলো। তাছাড়া যাত্রাপথে কোনো ঝামেলায় তিনি জড়াতে চাইলেন না। তাই একটু ঘুরে অন্য পথে কাগমারী রওয়ানা দিলেন। কিন্তু যাওয়ার সময় মন্তব্য করে গেলেন, ‘জমিদার, আমি যবন (তোমাদের ভাষায়) আজ ঘুরে গেলাম। দ্বিতীয়বার যেদিন আমি আসব, তোমাদের ঐ প্রাসাদের বেদীমূলে আমার ভক্তবৃন্দ নিয়ে গরু জবাই করে রাব্বুল আলামিনের নামে শিরনি করে খাওয়াব আর তোমাদের প্রাসাদের চূড়ায় বেগুন গাছ বুনে সেই বেগুনের ভর্তা দিয়ে আমার প্রিয়জনদের নিয়ে আমি ভাত খাব। জেনে রেখো, সেদিন খুব বেশি দূরে নয়।’

’৪৭-এর পর মওলানা ভাসানী তাঁর কথার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। দীর্ঘ মামলা-মোকাদ্দামার পর জমিদার থেকে তাদের এই অবৈধভাবে দখল করা জমিদারি ও প্রাসাদ দখলে আনেন। প্রথম দিনই ঊনিশটি গরু জবাই করে শিরনি করেন এবং এক মাসের মধ্যেই নিজ হাতে উৎপাদিত বেগুনের ভর্তা দিয়ে ভাতও খান। পরে এ জায়গাতেই স্থাপন করা হয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। জায়গাটি মূলত সম্রাট আওরঙ্গজেব পীর শাহজামানের দরবারের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা এসে অবৈধভাবে হিন্দু জমিদারের হাতে জায়গাটি তুলে দেয়।

 

পাঁচ

১৯৪৭ সালের আগস্টে পুরো ভারত যখন স্বাধীনতার আমেজে প্রমত্ত, আজীবন স্বাধীনতা সংগ্রামী মওলানা ভাসানী তখনো জালেমের কারাগারে বন্দী।

কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন পূর্বপাকিস্তানে চলে এলেন। কিন্তু জনগণের সাথে তিনিও স্বাধীন দেশে নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাতে গিয়ে ভীষণভাবে চমকে উঠলেন। বুঝলেন বর্তমানের প্রতিষ্ঠিত শাসকগোষ্ঠী দিয়ে কিছুই হবে না। এ কারণে তিনি এবং অন্য নেতৃবৃন্দ মিলে পুরান ঢাকার টিকাটুলির কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনের এক কর্মী সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক দল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠন করেন। তিনি দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। সহ-সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। তবে শেখ মুজিব তখন ফরিদপুরের জেলখানায় বন্দী থাকায় এ সভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি।

১৯৪৯ সালের মধ্যভাগে পূর্ববঙ্গে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ১১ অক্টোবর আরমানিটোলা ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের একটি জনসভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে অবশেষে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এ সময় সভাপতির আসন থেকে উঠে এসে মওলানা ভাসানী মাইকের সামনে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘ভাইয়ো, সরকার আমাদের সভা পণ্ড করতে চায়। এ অবস্থায় আমরা সভা করব না। আপনারা শান্ত হয়ে যার যার জায়গায় দাঁড়ান। আমরা আল্লাহতায়ালার দরবারে আমাদের ফরিয়াদ জানিয়ে মোনাজাতের মাধ্যমে আমাদের সভা শেষ করব।’

এই কথা বলেই মওলানা ‘আল্লাহুম্মা আমিন’ বলে মোনাজাত শুরু করে দিলেন। সভার সকল শ্রোতাও হাত তুলে ‘আল্লাহুম্মা আমিন’ বলে দাঁড়িয়ে গেল। যদিও মোনাজাতে হাত উত্তোলনকারীদের মধ্যে অনেক হিন্দু এবং নাস্তিক কমিউনিস্টও ছিল।

মওলানা আরবিতে দুয়েকটি দোয়া পাঠ করলেন। এরপরই বাংলাতে বলতে শুরু করলেন—‘হে দীন দুনিয়ার মালিক পরওয়ারদেগার, জালেমের অত্যাচার থেকে তুমি মজলুমকে রক্ষা করো। সরকার বড় অত্যাচারী, প্রজা বড় মাজলুম…’

এরপর পুরো মোনাজাতে আর পরকালের কোনো কথা বললেন না। কবরের আজাব মাফের কথাও তুললেন না। তিনি বলতে থাকলেন—সরকারের অন্যায়-অবিচার ও জুলুমের কথা। এর থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে অব্যাহত সংগ্রামের কথা। আর একটু পর পরই মোনাজাতকারী শ্রোতাগণ ‘আল্লাহুম্মা আমিন’ বলে মাঠ কাঁপিয়ে তুলতে থাকল…।

এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলল এই ঐতিহাসিক মোনাজাত। জনসভায় মওলানা সাহেব তাঁর রাজনৈতিক বক্তৃতায় যা বলতে চেয়েছিলেন, এই মোনাজাতের মাধ্যমেই তিনি তাঁর সব বলে গেলেন। সরকারের উপস্থিত গোয়েন্দা বিভাগ ও পুলিশের বিশেষ শাখার লোকেরাও মোনাজাতে দু হাত উপরে তুলে ‘আমিন আমিন’ করছে।

না করে উপায় কী! ইসলামের দাবী নিয়ে সদ্যমাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। মোনাজাত ছেড়ে জনগণের আক্রোশের শিকার হবে নাকি। এভাবে হাত উপরে থাকায় গোয়েন্দা পুলিশরা জনসভায় ভাসানীর ‘বক্তৃতা’র কোনো নোটও নিতে পারে না।

কিন্তু সভা শেষ করেই মওলানা ভাসানী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ভুখা মিছিল বের করলেন। এবং মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে তাঁকে ১৪ অক্টোবর গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়।

স্বাধীন দেশে পরাধীনের মতো বন্দী হলেন মওলানা ভাসানী।

 

ছয়

১৯৫৪ সাল। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময় অত্যাসন্ন। মওলানা ভাসানী পাবনা টাউন হলের একটি সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন। সরকার পক্ষের বিভিন্ন অত্যাচারের কথা বললেছন। এ সময় তাঁর বক্তৃতার মাঝখানেই দারোগা সাহেব হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে কি যেন বলার চেষ্টা করলেন—আর অমনি বজ্র কণ্ঠে ঘোষিত হলো— ‘খামোশ! শয়তানের বাচ্চা শয়তান!!’

সহসা যেন বোমা ফাটল। মানুষের গলা দিয়ে যে এমন আওয়াজ হতে পারে তা কল্পনাও করা যায় না। মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো সভাস্থল। হাজার হাজার মানুষ—কারো মুখে কোনো কথা নেই। কোথাও কোনো শব্দ নেই। সবাই নির্জীব নিঃশব্দ হয়ে গেছে।

দারোগা বাবুর পা কাঁপতে শুরু করেছে। ভাসানী সাহেব তাকে লক্ষ করে বলতে লাগলেন, ‘পাঞ্জাবি ইংরেজের পা চাটার দল। চাবুক মেরে তোদের পাছার ছাল তুলে নেওয়া হবে। সাপের পাঁচ পা দেখেছিস, ঘুঘু দেখেছিস, ফাঁদ দেখিসনি। তোরা আমাদের সোনার ছেলেদেরকে ঢাকার রাজপথে পশু-পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছিস।… তোদের মনে রাখা উচিত—এই কিষাণ, মজুর মুটেরাই হচ্ছে তোদের মালিক। তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা ট্যাক্সেই তোদের ছেলেমেয়ে-পরিবারের পেটে ভাত যায়। খুনী নুরুল আমিন তোদের বাবা নয়। তোদের আসল বাপ-মা হচ্ছে এই খেটে খাওয়া মানুষেরা, যারা না খেয়ে তোদের মুখে অন্ন তুলে দেয়। হুঁশিয়ার, এখনো সময় আছে। মানুষের বন্ধু হয়ে যা, মানুষের সেবক হ। এখনো হুঁশ হয় না? যখন এই না-খাওয়া মানুষেরা এক জোট হয়ে গায়ের চামড়া তুলে নেবে, তখন আল্লাহর নাম নেয়ারও সময় পাবি না বলে দিচ্ছি। চাকর হয়ে জন্মেছিস, চাকর হয়েই থাক। মালিক হওয়ার চেষ্টা করিস না। ভালো হবে না।’

মওলানা ভাসানী এ কি বাণী শুনালেন— দারোগা-পুলিশ আমাদের সাহায্য করার জন্য, হুকুম করার জন্য নয়। তারা আমাদেরই চাকরি করে। শান্তিপ্রিয়দের শান্তি নিশ্চিত করাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব। কাউকে পেটাবার জন্য বা গুলি করার জন্য তাদেরকে রাখা হয়নি! কী আশ্চর্য—কী আনকোরা কথা!

এ দিনের পর পুলিশ সম্পর্কে এলাকার লোকের ধারণাই পাল্টে গেল। পুলিশকেও তবে চাবুক মারা যায়!

 

সাত

১৯৭২-৭৩-এর ঘটনা।

মিল্ক ভিটা টাংগাইলে প্রথম দুধের ব্যবসা শুরু করে। বিভিন্ন বাজার এবং কিছু পয়েন্ট থেকে দুধ সংগ্রহ করা হতো। দুধের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় গ্রামের গেরস্থরা ভালো মূল্য পাচ্ছিল। এতে স্থানীয় ঘোষেরা পড়েছিল বেকায়দায়। তারা আর অল্প মূল্যে দুধ সংগ্রহ করতে পারছিল না। তাই মিল্ক ভিটার দুধ কেনা বন্ধ করা যায় কী করে তা নিয়ে তারা ফন্দি-ফিকির করছিল। ঘোষেদের মধ্যে দু চার জন বুদ্ধিমান ছিল। তারা একটি বুদ্ধি খাটায়। টাকা-পয়সা খরচ করে ২-৩ শ মহিলাকে তারা শিখিয়ে বুঝিয়ে নিল। তারা এসে মওলানা ভাসানীর বাড়ির সামনে কান্নাকাটি শুরু করতে লাগল। একদিন-দুইদিন বিষয়টার উপর মওলানা তেমন গুরুত্ব দেন নাই। তৃতীয় দিন তিনি জানতে চাইলেন, ‘কী হইছে তোমাদের?

ছোট ছোট বাচ্চা কোলে মায়েরা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হুজুরকে জানালো, মিল্ক ভিটাঅলারা সব দুধ ঢাকায় নিয়ে যায়। তারা বাচ্চাদের মুখেও কোনো দুধ দিতে পারে না। শত কণ্ঠে মাতৃ কলরব শুনে হুজুরের কোমল প্রাণ কেঁদে উঠল। তিনি হুংকার ছাড়লেন, এত বড় সাহস! শিশুর গ্রাস কেড়ে নেয় মিল্ক ভিটা। মিল্ক ভিটা জ্বালিয়ে দঠর, পুড়িয়ে দাও। ওদের লোকজন যেখানে পাওয়া যাবে টুকরো টুকরো করে ফেলো।’

মিল্ক ভিটার লোকদের কানে খবর পৌঁছাতে সময় লাগল না। বাচ্চা কোলে কয়েকশ মহিলা সন্তোষ থেকে ফেরার পথে শহর দিয়ে শ্লোগান দিয়ে গেল। হুজুর বলেছে— যেখানে মিল্ক ভিটা পাবে, সেখানেই তাদের টুকরো টুকরো করো। ব্যস, আর কিছু করতে হলো না। মিল্ক ভিটার লোকজন গিয়ে ইঁদুরের গর্তে লুকাল। কে আর জীবন হারাতে চায়। মিল্কভিটার গাড়ি নেই, পয়েন্টে পয়েন্টে ক্রয় কেন্দ্র নেই। গৃহস্থেরা দুধ বেচতে গিয়ে ফিরে এলো। কেউ আবার অপেক্ষা করতে করতে দুধ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিলে নদীতে ফেলে দিয়ে এলো। আর ঘোষেরা তো ওঁত পেতেই ছিল। কেউ কেউ সাধা জিনিসের আধা দাম, নামমাত্র দামে ঘোষেদের কাছে বিক্রি করল। এভাবে চলল মাসখানেক। আট-দশ আনা সের দুধ তিন-চার আনায় নেমে এল। মিল্কভিটা দুধ নেয়ায় গ্রামে-গ্রামে কৃষকদের যেমন একটা অর্থনৈতিক লাভ এসেছিল ২-৩ মাসে তা আবার মন্থর হয়ে এলো।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘অবস্থা যখন এই পর্যায়ে তখন আওয়ামী লীগের এক সময়ের মন্ত্রী পাবনার জনাব আবু সাঈদ মিল্কভিটার ডাইরেক্টর নাকি চেয়ারম্যান, তিনি মিল্কভিটার কয়েকজন কর্মকর্তাসহ একদিন আমার বাবর রোডের বাসায় এসে হাজির। তাদের কাথা শুনে দু-চার দিন পর আসবেন বলে বিদায় করেছিলাম। সন্তোষে গিয়ে দুধ সম্পর্কে কথা তুলতেই হুজুর তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন, “কোথাকার কোন মিল্কভিটা, ধাপ্পাবাজের দল! সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট। সব দুধ ঢাকায় নিয়ে যায়। শিশু বাচ্চারা পর্যন্ত দুধ পায় না। ওদের জ্যান্ত কবর দেওয়া উচিত।”

‘হুজুরের কথা শুনে বুঝলাম ব্যাপারটা কী। ঢাকায় ফিরে এলাম। এর ৪-৫দিন পর মিল্কভিটার কর্মকর্তারা আবার এলেন আমার কাছে। দুধের দাম না পেয়ে সাধারণ মানুষ বেশি অসুবিধায় পড়েছিল। ঘোষেরা যে কারসাজি করে মিল্কভিটাকে তাড়িয়েছে ততদিনে তা প্রায় সবাই জেনে গিয়েছিল। কিন্তু হুজুরকে তা বোঝানো যায় কীভাবে? অনেক দিন হুজুরের সাথে চলাফেরা করায় তাঁর মানবিক বিষয়গুলো আমার জানা ছিল। তিনি সবসময় নিঃস্ব হতদরিদ্র লোকের পক্ষে ছিলেন। তাই মিল্কভিটাদের বুদ্ধি দিলাম তোমরাও ঘোষেদের মতো কৌশল খাটাও।

কয়েকদিন পর তারা তাই করল। হাজারখানেক গ্রামীণ নারী-পুরুষ-বাচ্চা নিয়ে ভাসানীর বাড়ির সামনে ভিড় জমাল। মেয়েদের কোলে ছোট ছোট বাচ্চা। তারা কান্নাকাটি বলল, ঘোষেরা দুধের দাম দেয় না। আমরা চাল-ডাল কিনতে পারি না। না খেয়ে মরার দশা। মিল্কভিটা দুধ না কিনলে আমরা না খেয়ে মরব।’

হুজুরও বুঝলেন— সত্যিই তো, গৃহস্থরা দাম না পেলে বউ-পোলাপান নিয়ে চলবে কি করে! তিনি আগের নির্দেশ প্রত্যাহার করে নিলেন এবং পরদিন থেকে আবার মিল্কভিটার দুধ কেনা শুরু হয়ে গেল।

 

আট

১৯৭৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি খুলনায় এক সভায় বক্তৃতা প্রদানকালে মওলানা ভাসানী অসুস্থ হয়ে পড়েন। পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। এর মাঝে আবার নতুন করে ফারাক্কার বিষয়টি সামনে আসে। বিভিন্ন ছাত্রদলের নেতা-কর্মী তাঁর নিকট এসে আবেদন জানান— কিছু একটা করতে হবে। নইলে আমাদের দেশ মরুভূমি হয়ে যাবে। বড় সংকট দেখা দেবে। ফলে তিনি ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে লং মার্চের ঘোষণা দিলেন। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহী মাদরাসা ময়দান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের এ মহা লং মার্চের যাত্রা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, এ মিছিল বৃহৎশক্তির বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রামের প্রতীক। গোটা বিশ্বের বুক থেকে জালেমের শোষণ-পীড়নের সমাপ্তি না ঘটা পর্যন্ত এ সংগ্রাম চলবে।

ভাসানী তখনো ভীষণ অসুস্থ। ডায়াবেটিস দ্রুত ১৭/১৮ ওঠা-নামা করছে। ব্রংকাইটিস বেড়ে গেছে। খুবই কষ্ট পাচ্ছেন। যাঁরা পাশ থেকে তাঁর কষ্টের পরিণাম দেখেছেন, তাঁরাই শুধু কিছুটা অনুমান করতে পারবেন— কীভাবে তিনি তার শরীরের উপর নিজের ইচ্ছাশক্তির জোর খাটিয়ে চলছিলেন। প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর কাপড় বদলাতে হচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হয়। তবুও মিছিল চলতে থাকে। লক্ষ লক্ষ মানুষ। বৃষ্টির কারণে কেউ মিছিল থেকে সরে যায়নি। প্রেমতলী এসে রাত্রিযাপন করা হয়। পরদিন সকালে আবার যাত্রা শুরু। আরও ৩৪ মাইল পথ। ১৭ মে বিকাল ৪টায় কানসার্ট গিয়ে মিছিল শেষ হয়। মওলানা ভাসানী মিছিলের সমাপ্তি ঘোষণা করে বলেন, ‘বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার দাবি মেনে না নিলে তিনি আগামী মাসের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন করে আগামী ১৬ আগস্ট থেকে ভারতীয় পণ্য বর্জন আন্দোলন শুরু করবেন। তিনি মিছিলে আগতদের শপথ বাক্য পাঠ করান, গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, এবং দেশ গড়ার কাজে আত্মোৎসর্গ করা।’

ফারাক্কার বিরুদ্ধে মহা লং-মার্চ-এর সময় মওলানা ভাসানীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে আহমদ ছফা লিখেছেন, ‘পেশাবের বেগ তিনি ধরে রাখতে পারছেন না, বেদনায় তাঁর সমস্ত মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে সর্বনাশ ঘটছে এটা তাঁর চেয়ে কেউই আর এতো স্পষ্ট করে বোঝেনি। ফলে জীবনের শেষ সেকেন্ডগুলো তিনি হিশাব করে খরচ করছিলেন।’

লেখক ছফা ভাসানীকে বলেছেন— জলদেবতা।

আর ভারত সম্পর্কে তাঁর বিশেষণ— জলজল্লাদ।

 

নভেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১