‘মা…!’
রিয়ানার চিৎকার শুনে দৌড়ে ওর কাছে গেল আফসানা। ভয়ে কাঁপছে ও। চোখদুটো বন্ধ। জোর করেই আটকে রেখেছে চোখের পাতাগুলো।
‘কী হয়েছে মা? এই তো আমি এসেছি, চোখ মেলে দেখো।’ মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলল আফসানা। রিয়ানাও মাকে শক্ত করে চেপে ধরেছে।
‘মা, দেখো!’—চোখ বন্ধ করেই বলছে রিয়ানা, এখনো ভয়ে কণ্ঠ কাঁপছে তার—‘মোমবাতির আগুনটা কেমন আমার দিকে ধেয়ে আসছে!’
‘কিচ্ছু না মা! চোখ মেলে দেখো কিচ্ছু হয়নি। এই তো সব ঠিক আছে।’ মেয়েকে সাহস দিল আফসানা। বুঝতে পেরেছে জ্বরের তীব্রতায় আবোল-তাবোল দেখছে রিয়ানা। ‘এই যে, মা আছি তোমার সাথে, কোনো ভয় নেই। আমার দিকে তাকাও, রিয়ানা, লক্ষ্মী মা আমার।’
আফসানার কথায় কাজ হলো। চোখ মেলে তাকাল সে।
‘অনেক ভয় করছে, মা।’ ক্ষীণ আওয়াজে বলল রিয়ানা।
‘কোনো ভয় নেই,’—মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে আফসানা—‘আমি আছি তো তোমার সাথে।’
‘হুমমৃ’ আস্তে করে আবার চোখ বুজল রিয়ানা। মেয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আফসানা। গভীর এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিড়ে। তিন দিনের জ্বরে কেমন শুকিয়ে গেছে মেয়েটা। চোখের উজ্জ্বলতাও ম্লান হয়ে গেছে। ফরিঙের মতো চঞ্চল মেয়েটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। এই তো সেদিনই ফজরের নামাজ পড়ে আফসানা দেখে রিয়ানা বাসায় নেই। কই গেল, কই গেল করে সারা বাসা তারপর মহল্লায় খুঁজল, অথচ তার কোনো পাত্তা নেই। অবশেষে যখন খোঁজাখুঁজি বাদ দিয়ে রাগে ফুঁসছিল সে, তখনই ‘মা! মা!’ বলে ডাকতে ডাকতে এলো রিয়ানা। জামার আস্তিন ভরা বিভিন্ন ফুল এনে বলছে, ‘মা, চলো তোমায় বউ সাজিয়ে দিই।’
রিয়ানার কানে ফুল, মাথায় ফুল, চুলে ফুল, ঠিক যেন ফুলপরী। ওকে দেখেই রাগ পড়ে গিয়েছিল আফসানার। তার বউ সাজানোর কথা শুনে হাসি আটকাতে পারেনি সে। ‘একটা দিব ধরে’ হাত উঠিয়ে আহ্লাদী কণ্ঠে এই কথা বলতেই আস্তিনের সমস্ত ফুল ওর মাথার উপর ছুড়ে দিল রিয়ানা, আর হাসতে হাসতে বলল, ‘দেখো, তোমার উপর ফুলের বৃষ্টি ঝরালাম।’
জানালা দিয়ে আসা ভোরের আলোয় মা-মেয়ের এই ফুল নিয়ে খেলা-হাসির দৃশ্য, সেদিন স্বর্গীয় হয়ে উঠেছিল। রিয়ানাকে আফসানার স্বর্গ থেকে নেমে আসা ফুলপরীই মনে হয়। তার স্বর্গীয় ফুলপরী আজ জ্বরে বিছানায় পড়ে আছে, ভাবতেই মনটা কেমন করে উঠল আফসানার। রিয়ানার কপালে একটা চুমু এঁকে দিল সে। চারদিকে রাতের নিস্তব্ধতা। জানালা দিয়ে আসা বাতাসে মোমবাতির আলোটা এদিক-ওদিক দুলছে। মায়ের আদরের স্পর্শ পেয়ে তার হাত চেপে ধরল রিয়ানা।
‘মা, দাদা কি সত্যিই আকাশের তারা হয়ে গেছে?’ ক্ষীণ আওয়াজে জিজ্ঞেস করল সে।
‘হুমম…।’ আফসানা জানে, দাদাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে রিয়ানা। দাদাও বেঁচে থাকতে খুব ভালোবাসতেন ওকে। যখন তিনি মারা গেছেন তখন মৃত্যুর এই চরম সত্য ব্যাপারটা রিয়ানা তেমন বুঝত না। এখন হয়তো মোটামুটি বোঝে। বয়সের চাইতে একটু বেশিই পরিণত হচ্ছে সে।
‘মা, আমি যদি মারা যাই, তাহলে কি দাদার মতো আকাশের তারা হব?’
মেয়ের প্রশ্নে অবাক হয়ে গেল আফসানা। মুখটা হা হয়ে আছে তার। মনের মাঝে অজানা আতঙ্ক ভর করেছে আফসানার। বুকের মাঝে চেপে ধরল সে মেয়েকে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকল অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা দূর উপত্যকার দিকে। মেয়ের প্রশ্নের কোনো উত্তর বের হলো না আফসানার মুখ থেকে। অন্ধকার রাতটা আজ বেশিই অন্ধকার মনে হচ্ছে।
কদিন ধরে পুরো রাজ্যে কারফিউ চলছে। ঢালাওভাবে শুরু হয়েছে ধরপাকড়। বড় বড় নেতারা হয়েছে নজরবন্দি। আবার কেউ কেউ চলে গেছে কারাগারে। একেবারে পূর্ণ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা কাশ্মীরিদের স্বায়ত্তশাসনও উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতোদিন কাজেকর্মে পরাধীন ছিল, সেটা এখন খাতা-কলমেও হয়ে গেছে। সারা রাজ্যে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। পুরুষরা বাড়ির বাইরে বের হতে পারছে না। যতটা আন্দোলন হচ্ছে নারীরাই করছে। স্কুল-কলেজ সব বন্ধ। যোগাযোগের প্রায় সব ব্যবস্থাই বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আজ ভোর থেকে বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে রাজ্যের বেশিরভাগ স্থানে। এর মধ্যে আবার মেয়েটা তিনদিন ধরে জ্বরে ভুগছে। ভালো একজন ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন, কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে রিয়াজ শরীফ। ঘরের বারান্দার চেয়ারে বসে চুরুটের ধোঁয়া ছাড়ছে আর ভাবছে, কী করবে।
রিয়ানা একমাত্র মেয়ে তার। ভালোবাসার পুরো জায়গাটা জুড়ে সে। অথচ মেয়েটার জন্য তেমন কিছুই করতে পারছে না। একদিকে নিজেকে অসহায় আর অপরদিকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। একটু আগে পাশের বাড়ির বন্ধু ডাক্তার ইকবাল এসে রিয়ানাকে দেখে গেছে। বলেছে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলে ভালো হয়। যে কোনো মুহূর্তে খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে।
সকাল হলেই রিয়ানাকে হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করবে বলে মনে মনে ঠিক করেছে রিয়াজ।
চারদিক নীরব অন্ধকারাচ্ছন্ন। আধুনিক জমানায় বিদ্যুৎ ছাড়া পৃথিবী কতটা অন্ধকার হতে পারে তা প্রবলভাবে বোঝা যাচ্ছে রাতের কাশ্মীর দেখে। আল্লাহই জানেন, এবার কী খারাপ মতলব এঁটেছে ভারত সরকার। হয়তো সেনাবাহিনী দিয়ে প্রত্যেক ঘরে ঘরে হামলা চালাবে। অনেক বাড়িতে অবশ্য তেমনটা করেছেও। বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল রিয়াজের। এখন যদি তাদের ঘরে হামলা করে সেনাবাহিনী তাহলে কী হবে! চোখের সামনে ভেসে উঠল আফসানার সুন্দর মুখ। মনের অজান্তেই শক্ত মুষ্টিবদ্ধ হলো হাত। যদি বউয়ের গায়ে কোনো আঁচড় লাগে ছেড়ে কথা বলবে না সে। তাতে প্রাণ যায় যদি যাক। জীবন থাকতে স্ত্রীর বেইজ্জতি হতে দেবে না।
‘এই, শুনছ!’—ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার করল আফসানা—‘রিয়ানা কেমন যেন করছে।’ শেষের অংশটায় কান্না মিশ্রিত ছিল কণ্ঠে।
দৌড়ে ঘরের ভেতর গেল রিয়াজ। সত্যিই কেমন যেন করছে রিয়ানা। সারা শরীর কাঁপছে। দাঁতে দাঁত লেগে গেছে।
‘রিয়ানা! রিয়ানা!’ রিয়ানার বাহু ধরে দুবার ঝাঁকি দিল রিয়াজ। তারপর স্ত্রীকে বলল, ‘তুমি ওকে নিয়ে বাড়ির গেটে এসো! আমি অটো নিয়ে আসছি। ওকে হাসপাতাল নিতে হবে।’
রিয়াজ একরকম দৌড়ে বের হলো বাড়ি থেকে। হাত ঘড়িটা হাতেই ছিল। একবার সময়টা দেখল। রাত ১২টা বেজে ৪৯ মিনিট। আশেপাশে কোনো অটো দেখতে পাচ্ছে না। দৌড়ে সামনের মোড়ে গেল, নাহ কোনো অটো নেই। রাস্তায় শুধু সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে। একটা কুকুরও নেই, অটো থাকবে কোত্থেকে। পেছন ফিরে আবারও দৌড় দিল রিয়াজ। উদ্দেশ্য বিপরীত দিকের রাস্তার মোড়। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারল না। সেনাবাহিনীর এক সদস্য ডাক দিল তাকে।
কী করবে সে বুঝতে পারল না। ডাকে সাড়া দিতে গেলে দেরি হয়ে যাবে, আর সাড়া না দিলে ফায়ারও হতে পারে। ভাবতে ভাবতেই সেনা সদস্য কাছে এসে পড়ল।
‘চল! এতো রাতে রাস্তায় দৌড়ানোর মতলব কী তোর?’—কলার চেপে ধরেছে সৈন্য—‘জানিস না কারফিউ চলছে! হামলা করতে এসেছিস! আজাদি চাস! আয় দেখাচ্ছি আজাদি!’ রিয়াজকে টেনে নিয়ে গেল মোড়ের একটু সামনে। একটি মিলিটারি ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। সাথে দাঁড়ানো আছে দু-চারজন সেনা।
‘স্যার, আমার মেয়ের খুব জ্বর, হাসপাতালে নিতে হবে, অটো খুঁজছিলাম।’—এক নাগাড়ে বলে যাচ্ছে রিয়াজ——‘আমায় ছেড়ে দিন স্যার, আমার মেয়ে খুব অসুস্থ।’
সেনা সদস্যটি তাকে ভ্যানের কাছে নিয়ে আসতে আসতে বলল, ‘তোর মেয়ের বয়স কত রে?’ কুৎসিত একটা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল সেনা সদস্য। রাগে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল রিয়াজের, তবুও স্বাভাবিকভাবে বলল, ‘নয় বছর স্যার।’
‘প্লিজ স্যার! আমায় ছেড়ে দিন, আমার মেয়েটা মারা যাবে।’ হাত জোড় করে বলল রিয়াজ।
‘ইসস আরেকটু বড় হলে তো তোর মেয়েকে আমরাই হাসপাতালে নিয়ে যেতাম।’ ভ্যানের সাথে হেলান দেওয়া এক সেনা কথাটা বলেই খিক খিক করে হাসল।
‘জ্বরে মানুষ মওে না, তোর মেয়েও মরবে না।’ ওকে ধরে আনা সেনা বলল।
‘স্যার! স্যার! ছেড়ে দিন স্যার, আমার মেয়েটার তিনদিন ধরে জ্বর! ডাক্তার বলেছে হাসপাতালে না নিলে খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারে।’ এবার সেনার পা ধরে বলল রিয়াজ।
‘তোর বউ কই? তোর বউ নিয়ে যাবে হাসপাতালে! তুই চল থানায়।’ পাশে থাকা আরেক সেনা বলল।
কী করবে রিয়াজ খুঁজে পেলো না। ধাক্কা দিল সেনা সদস্যকে, ‘আমি বলছি না আমার মেয়ে অসুস্থ, আমি কী অপরাধ করেছি যে, আমায় থানায় যেতে হবে!’ এবার রেগে গেছে রিয়াজ।
‘থানায় না গেলে এখানেই মরবি! চল! ওঠ ভ্যানে।’ পালটা ধাক্কা দিল ওকে ধরে আনা সেনা।
‘মারা আর ধরা ছাড়া তোদের আর কোনো কাজ আছে নাকি! শালা! এই জন্যই তো তোদের বোম দিয়ে মারাই ভালো।’ চেঁচিয়ে বলল রিয়াজ। আর সাথে সাথে পেছনে দাঁড়ানো সেনা লাঠি দিয়ে পায়ের মধ্যে বাড়ি দিল রিয়াজের। ব্যাথায় বসে পড়ল সে।
‘শালা! আমাদের দেশে থেকে আমাদের উপর বড় বড় কথা তাই না, দাঁড়া!’ বলেই ওকে ধরে আনা সেনা সদস্য মারতে শুরু করল রিয়াজকে। ‘তুই তো মরবি, তোর বউ-বাচ্চাও মরবে।’ হাতের সাথে মুখও চলছে সমান তালে সবার।
পিটিয়ে আধমরা করে রিয়াজকে গাড়িতে তুলল সেনাসদস্যরা। একটু উপরের র্যাঙ্কে থাকা সেনা অন্য একজনকে অর্ডার করল, খোঁজ নাও ওর বাসা কই? ওর বউ-বাচ্চাকে ধরে নিয়ে আসো।’
‘জি স্যার!’ বলেই দুজন পা চালাল যেদিক থেকে রিয়াজকে ধরেছে সেদিকে।
চারিদিকে ঘন অন্ধকার। কোথায় কিছুই সহজে চোখে পড়ছে না। রিয়ানাকে কোলে নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আফসানা। অপেক্ষা করছে স্বামীর। এদিকে রিয়ানার কোনো সাড়া শব্দ নেই। গরম তাপ থেকে শরীর কেন জানি আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। অনবরত কাঁদছে আফসানা। আর একটু পর পর রিয়ানাকে ঝাঁকি দিয়ে ডাকছে ‘রিয়ানা! রিয়ানা!’ বলে। প্রথম গোঙানির মতো আওয়াজ করলেও এখন কিছুই বলছে না। কী করবে ভাবতে পারছে না আফসানা। এমন সময় হঠাৎ এগিয়ে আসতে দেখল দুজন লোককে। বুকে যেন সামান্য আশার সঞ্চার হলো। বাড়ির পাশেই একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল। হয়ত সতর্ক করছে কাউকে। সেদিকে খেয়াল নেই আফসানার। সে তাকিয়ে আছে দুজনার আসার পথে। দুজন সেনা আসছে তার বাড়ির দিকে। কী করবে আফসানা বুঝতে পারছে না। নাহ, মেয়েকে বাঁচাতে হবে। দৌড়ে গেল সেনাদের কাছে। পেছন থেকে ঘেউ ঘেউ করে উঠল কুকুরটা।
‘আমার বাচ্চাটার খুব জ্বও, একটু হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন প্লিজ। ওর বাবা অটো আনতে যেয়ে হয়তো পাচ্ছে না। কারফিউ চলছে তাই হয়তো কোনো অটো নেই। আপনারা একটু সাহায্য করুন না।’ কাতর গলায় সেনাদের বলল আফসানা।
দুজন সেনা পরস্পর চেহারার দিকে চাওয়া চাওয়ি করল। তারপর বলল, ‘চলো!’
পেছনের কুকুরটা করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওদের গমনপথের দিকে। হয়তো ভাবছে, সত্যিই কি ওদের এই রাস্তা শেষ হবে হাসপাতালে যেয়ে?
লেখক : ছাত্র, জামেয়া হুসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ, মিরপুর ১, ঢাকা
অক্টোবর 2019

