নগ্নতাকে যাঁদের কাব্যে বলা হয় ‘অনিন্দ্য পোশাক’, যাদের মন্তব্য হলো—‘আমার কবিতার বই যদি আমার মেয়ে তার বয়ফ্রেন্ডকে উপহার দিতে না পারে, তবে আমার কবিতার সার্থকতা কোথায়!’, তাঁদেরকে, হ্যাঁ, তাঁদেরকেই আধুনিক যুগে প্রথম সারির ‘প্রগতিশীল কবি’ খেতাবে ভূষিত করা হয়!
সত্যি বলতে কি, প্রগতিশীল উপাধি পাওয়া তথাকথিত এইসব কবি-সাহিত্যিকের একডজন বই যদি কোনো ‘সভ্যজন’ হাতে নিয়ে দেখেন, তবে তিনি অবশ্যই তাঁর ওপর ঘৃণার একদলা থুথু ঝেড়ে দিয়ে এমন মন্তব্য করতে বাধ্য হবেন যে, এইসব কবি-সাহিত্যিকের কাছে কি ‘পঁচা-গান্ধা’ প্রেম-কামের ‘গুজব-গল্প’ ছাড়া লেখার মতো আর কিছুই নাই!
বস্তুত, মহৎ কোনো উদ্দেশ্যের দায়বদ্ধতা, মানবিক নৈতিকতা বলতে সাহিত্যে কিছুই নেই, কেবল শৈলীর সৌন্দর্যই কবির কাছে প্রথম ও প্রধান বিবেচ্য বিষয়—এমন ধ্যাণ-ধারণা থেকে প্রসব করেন তাঁরা যত্তসব জারজ-জঞ্জাল।
এখন কথা হলো, সত্যিই কি সাহিত্যের কোনো নৈতিক দায়বদ্ধতা নেই? মানবিকতা, আদর্শবাদিতার চাষ কি এখানে অনাবাদযোগ্য? কিংবা সাহিত্যে এইসব উদ্দেশ্য-আদর্শ ধারণ করে কি ‘প্রগতিশীল’ কবি হওয়া যায় না? শিল্পসম্মত সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় না?
আমরা বলি, অবশ্যই হওয়া যায়। কালোত্তীর্ণ যে কোনো সাহিত্য অবশ্যই কোনো না কোনো মহৎ উদ্দেশ্যের কাছে ছিল দায়বদ্ধ। যার অপূর্ব ও অনুপেক্ষ দৃষ্টান্ত হলেন কবি ফররুখ আহমদ এবং তাঁর কাব্যসাহিত্য। যিনি নগ্নতা, লাম্পট্য ও অনৈতিকতার মোকাবেলায় একটি আদর্শবাদী উন্নতমান সাহিত্য দিয়ে চাষ করেছেন মানবিকতা ও নৈতিকতার মতো মহৎ ফসল। ধারালো সাহিত্যের শিল্পিত তরবারি দিয়ে তিনি ফলিয়েছেন অধঃপতিত মুসলিম ও মাজলুম মানবতার বিজয়-বিপ্লব। পাল্টে দিয়েছেন ভ্রষ্টাচারী সমাজ ও সময়ের ধারাপাত। বদলে দিয়েছেন চিন্তা ও চৈতন্যের গতানুগতিক সমীকরণ। তুলে ধরেছেন ইসলামি ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র মুসলিম জীবনাচারের প্রায়োগিক ব্যাকরণ। সমকালের সমাজ তাই তাঁর উপাধি দিয়েছে ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’। অর্থাৎ, তিনি ছিলেন মুসলমান ও ইসলামি জীবনবোধের পুনর্জাগরণের কবি। ছিলেন মানবতা ও নৈতিক মূল্যবোধের পুনরোত্তরণের আহ্বায়ক।
দুই
কবি মুসা আল হাফিজ বলেছিলেন, ‘একটি শ্রেণী সাহিত্যকে কেবলই শিল্পের দোহাই দিয়ে নৈতিক আদর্শিক প্রাণশক্তি থেকে বিচ্যুত করতে চায়। এর মাধ্যমে ওরা চায় মূলত ইসলামি শিক্ষা ও চেতনার শিল্পময় বিকাশের দ্বার রুদ্ধ করতে…।’
হ্যাঁ, নীতিভ্রষ্ট এই শ্রেণির এবং আদর্শহীন এই সাহিত্যের জয়জয়কার আমাদের এই সমাজে’ সাহিত্যকে যারা হাতিয়ার বানিয়েছে কেবল ইসলাম ও ইসলামি আদর্শের করব রচনা করতে, আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতাকে জীবন ও জগৎ থেকে মুছে দিতে।
কিন্তু তিক্ত সত্য এই যে, এদের, এদের সাহিত্যের মোকাবিলা করতে পারে—এমন ধারার মানুষের, এমন ধরনের বিকল্প সাহিত্যের প্রকট সংকট। সন্দেহ নেই, সময়ে সময়ে সেই সংকট নিরসনে সময়ের হাল ধরছেন অনেকে। আর সে অনেকেরই অন্যতম প্রাগ্রসর এবং পুরোধা ছিলেন আমাদের ফররুখ আহমদ—ব্যক্তি ও কবি—তাঁর আদর্শবাদী জীবন ও জাগরণবাদী সাহিত্যরাজি।
অতএব, আদর্শ ও জীবনবাদী শিল্প-সাহিত্যের সংকটময় সময়ের এই বাতাবরণে কোনো ধরনের অনুচিত কালক্ষেপণ না করে, আমাদের সকলের উচিত, ফররুখের সেই পথ অনুসরণ করে, সেই পাথেয় অবলম্বন করে সংঘবদ্ধ হয়ে আমরা আবারও এগিয়ে যাই। লেগে যাই সেই জাগরণী ও আদর্শবাদী সাহিত্যসৃষ্টির প্রয়াস-সাধনায়; আরেকটি ‘রেনেসাঁ’র প্রত্যয়দীপ্ত প্রতিজ্ঞায়।
আমরা শুদ্ধ প্রেরণায় শুরু করি, আল্লাহ চাহে তো, অচিরেই সেই নব্য রেনেসাঁর দামামা বেজে উঠবে।
লেখক : ছাত্র, দাওয়াহ ও সাহিত্য বিভাগ, মারকাজুল ফিকরি ওয়াল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ, ঢাকা
অক্টোবর 2019

