রুদ্ধদ্বার একটি অন্ধকার কক্ষে বসে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন একজন কবি। তাঁর চাকরিটা চলে গেছে। পয়সার অভাবে মেয়েটাও মরে গেল একেবারে বিনাচিকিৎসায়। ফ্যাসিবাদের রক্তহিম করা এ দিনগুলোতে হয়তো এ কবি ভাবছেন দিন ফুরোবার কথা আর প্রশ্ন করছেন নিজেকে—‘মৃত্যু কি তাঁকে পাবে নাকি তিনি মৃত্যুকে? একটি জাতিসত্ত্বাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে জেগে ওঠার ইশতেহার দিয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের হর্তাকর্তা একজন কবির কি এ মুহূর্তে উচিত তাঁর অতীতকে ভুলে গিয়ে কবিতার লক্ষকোটি হরফ, যেগুলোর আবেদন এ জাতির কাছে অতুলনীয়—সব একেবারে চোখের সামনে জ্বালিয়ে ছাই করে দেবেন? ভেবে পান না এ কবি। কবি জানেন, ভাবনার পালা শেষে কোনো না কোনো একদিন ফুরাবে দিনকাল। সাময়িক রূপসজ্জার মোহে অন্যায়ের সঙ্গে আপোস অথবা নিজের আদর্শকে এর সাথে মিশিয়ে নিজস্ব সত্ত্বাকে কালিমালিপ্ত করা অন্তত একজন কবির সঙ্গে যায় না। দুঃখই হোক যাপিত জীবনে কবির একমাত্র প্রতিদান।
হ্যাঁ, এমনই উপেক্ষিত, অবহেলিত এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে নিতান্ত বিষফোঁড়া হয়ে জীবনকে বরণ করে নেয়া এ দুঃখী কবির নামই ফররুখ আহমদ। বাঙালি জাতির জন্য নিবেদিতপ্রাণ একজন স্বভাবকবি হয়ে থাকলেও বাস্তবিক জীবনে বাঙালি ও বাঙালির ক্ষমতায়নের যাতাকলে পিষ্ট এ জাতিসত্ত্বা তাকে পীড়া ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। কিন্তু কেন? কী তাঁর অপরাধ? কেন একজন কবিকে পয়সার অভাবে রোজ সন্ধ্যায় উপোস মুখে বসে থাকতে হয়েছিল একাকী, নির্জন বিলাসে? যে সময়টাতে সমস্ত বাংলা-সাহিত্যে যার মতো একজন শক্তিশালী স্রষ্টা খুঁজে পাওয়া ভার, সে সময়টাতে কেন এমন একজন স্রষ্টা অনাহারে থেকে তিলে তিলে মরতে বাধ্য হয়েছেন? তাঁর ঘর থেকে বের হবার পথ নেই। সৎভাবে খেটে খেয়ে একটু রুটিরুজির ব্যবস্থার সব দুয়ার বন্ধ তাঁর জন্য। তিনি ঘরে বসে মরে যান, মরে যান এমন করে—কেউ না জানুক তিনি চলে গেছেন, এই তো রাষ্ট্রের কোশেশ।
একজন প্রধানতম কবির এহেন দুর্যোগের একমাত্র কারণ কি তাঁর কবিতা? হ্যাঁ, কবিতাই তাঁকে এরকম বঞ্চনার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। অভিযোগ করা হয়েছিল একদা পাকিস্তানের সপক্ষে তিনি কবিতা লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের এ পবিত্র লড়াইয়ে একসময়ের পাকিস্তানপন্থী কবির ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই—এমনই অবস্থান সে সময়কার ফ্যাসিবাদী কর্তৃপক্ষের।
এখন কথা হলো, মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রামের পূর্ববর্তী সময়ে পাকিস্তানের স্বপক্ষে কবিতা লেখা কি কোনো অপরাধ ছিল? আমরা যতটুকু জানি সেসময়কার পাকিস্তান নিয়ে আজকের বাংলাদেশে লেখেননি এমন কোনো কবি-সাহিত্যিক নেই বললেই চলে। অন্য অনেককে বাদ দিয়েও ছফার বক্তব্য অনুযায়ী যদি বলি, কবি সুফিয়া কামালের পাকিস্তান এবং জিন্নাহর ওপর নানা সময়ে লেখা কবিতাগুলো জড়ো করে প্রকাশ করলে ‘সঞ্চয়িতা’র মতো একখানা গ্রন্থ দাঁড়াবে বলেই আমাদের ধারণা। অথচ ভাগ্যের কী পরিহাস, কবি সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হয়ে মস্কো-ভারত ইত্যাদি দেশ সফর করে বেড়াতে শুরু করেছেন আর ফররুখ আহমদ রুদ্ধদ্বার কক্ষে বসে অপমানের লাঞ্ছনায় মৃত্যুর দিন গুণছেন।
কী অদ্ভুত সমীকরণ। পাকিস্তানের পক্ষপাতিত্বের মতো হাস্যকর অভিযোগ একজন কবির ব্যাপারে যখন দায়ের করা হয়, সাহসের সাথে আমরা তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও অভিযোগের বেড়াজালে আটকে দিতে পারি। ৭ ই মার্চের পূর্ব পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু পাশাপাশি জয়-বাংলা এবং জয়-পাকিস্তান শব্দ দু’টো উচ্চারণ করে বক্তৃতা করতেন, এ কথা কি কারো অজানা? তাহলে আন্দোলনের পূর্ববর্তী সময়কে টেনে পাকিস্তানের স্বপক্ষের লোক বলে হীন অভিযোগ করে একজন কবিকে বিদ্ধ করা কতটা যৌক্তিক ছিল? দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা বাধ্য হয়ে পাকিস্তানের স্বপক্ষে বক্তব্য রেখেছেন এমন মানুষের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। কবি শামসুর রহমানও তো পাকিস্তানি সৈন্যদের তত্ত্বাবধানে সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক ‘দৈনিক পাকিস্তানে’র সম্পাদকীয় রচনা করে আচ্ছা বাহবা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ভাত নেই কেবল ফররুখের বর্তনে।
বাকশালি ফ্যাসিস্ট আমলে কবি ফররুখের ব্যাপারে মোটাদাগে আরও যে অভিযোগ করা হয়েছিল, তিনি আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করে বাংলাভাষার স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করেছেন। কিন্তু কবি ফররুখ আহমদ নিজেই তো বলেছেন, তিনি শব্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, কবিতার ক্ষেত্রে তা নিশ্চয়ই দোষণীয় নয়। বিশেষত বাংলাদশে এমন একটা সময় ছিল, কবি-সাহিত্যিকেরা উর্দু-ফারসি শব্দ দিয়ে রচনা করাকেই বরং সম্মানের কারণ মনে করতেন। অথচ তাঁদের অনেকেই এখন বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থাকলেও কবি ফররুখ আহমদ রয়ে গেছেন দোষীর কাতারে। দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করতে গিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে এও বলা হয়, তিনি রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে চল্লিশ জন স্বাক্ষরদানকারীদের একজন। চল্লিশজনের বাকি ঊনচল্লিশটি স্বাক্ষর পাতা থেকে মুছে গিয়ে সবাই হয়ে গেছেন শিল্প-সমঝদারদের হর্তাকর্তা। অথচ পাকিস্তানের সশ্রদ্ধ সমর্থক হিসেবে চাকুরি হারাবেন, না-খেতে পেয়ে মারা যাবেন কেবল ফররুখ আহমদ।
কবি ফররুখকে লাঞ্চনার দ্বারস্থ হবার এইসব ঘটনা-উপঘটনার কারণ বাহ্যতভাবে আমরা যেরকমই দেখি না কেন, এর একমাত্র কারণ বাকশালি ফ্যাসিস্ট আমল এবং সেক্যুলার উৎসব। তাঁর প্রধান অপরাধ তিনি ইসলামি রেনেসাঁর একজন মানবতাবাদী কবি। তিনি অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করতে দ্বিধা করেন। কৃত্রিম সম্মানের ফাঁদে আটকে যাবার ভয়ে ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ দেয়ার কথা উঠলে তিনি নির্দ্বিধায় অস্বীকার করতে জানেন। বলে দেন, ক্ষমতাদর্পীর হাত থেকে একজন কবির নেয়ার কিছুই নেই। প্রতিবাদ তো তাঁর কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ। সেইসাথে বিরুদ্ধপক্ষ জানে তাঁর কবিতার আধুনিকতার কথা। তাই যতোই আধুনিক হোক সে কবিতার গতি-প্রকৃতি তাঁকে সংকীর্ণ ও গৌণ প্রমাণ করবার জন্য বলে দিতে হবে এটা নিছক ‘ইসলামি সাহিত্য’। কিন্তু সবচাইতে আশার কথা যা—দুঃখী এ কবি তো ইহকালীন কোনো প্রতিদানের মুখাপেক্ষী ছিলেন না কখনই। যার ফলে বাহ্যত তিনি বঞ্চিত থেকে গেলেও তাঁর আদর্শ ও বিশ্বাস অনুযায়ী বলে দেয়া যায়—অনন্য সৌন্দর্যে ভরা সম্মানজনক প্রতিদানে তিনি ভূষিত হয়ে আছেন ওপারে।
লেখক : ছাত্র, মাদরাসাতুল কাউসার আল ইসলামিয়া, ঢাকা
অক্টোবর 2019

