আধো আধো ভেঙে পড়া একটি মেঠোপথের দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অজস্র কড়ই গাছ আর তার মাঝে শৈল্পিক কারুকাজে নির্মিত অসংখ্য পাখির বাসা থেকে ভেসে আসা কিচিরমিচির শব্দের অভিনব কোলাহলের মধ্য দিয়ে স্কুলের পথটি পেরোবার সেই যে এক সুরম্য ছবি আমি ধারণ করেছিলাম আমার শৈশবমুখর গ্রামীণ জীবনে, তা ভেবে আজকাল উথলে উঠতে চায় আমার সমগ্র দেহ-মন। আমার মনে হতে থাকে বাবার হাতটি ধরে প্রথমবার স্কুলে যাবার সেই মনোরম চিত্রটি। সফেদ বিস্ময়ের প্রাচুর্য ঠেলে যেন ডুবে যাচ্ছিলাম প্রকাণ্ড এক মহাসাগরে। প্রথম দিনেই পিটিতে অনুপস্থিত থেকে লজ্জিত মুখে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবার সকরুণ স্মৃতিটুকুও আমার কাছে এখন মনে হচ্ছে এ যেন এক মধু মধু গ্রামীণ অতীত। সাঁই-সাঁই করে উড়তে থাকা একটি মস্ত বড় বাংলাদেশের পতাকার সম্মুখে দাঁড়িয়ে সকলের লেফটরাইট লেফটরাইট চিৎকার, যেন এক আনন্দঘন মুহূর্ত—ভাবনার অতীত।
ছয় বছর বয়সের লাট্টু ঘুরানো গ্রামীণ শৈশবে রহিম চাচার ধারালো লৌহশলাকার লাটিমগুলোর প্রতিটি শিরা-উপশিরায় যেন-বা মিশে আছে সে সময়কাল। ঘরকোপ, ঘুরতি কোপ আর বেল্লাপার করার ধুন্ধুমার লড়াইয়ের মুক্ত প্রতিযোগিতার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে আমার কাছে তখন মনে হতো ঘূর্ণায়মান এ লাটিমের অক্ষশীর্ষ থেকে ক্রমশ গোলকটির নিম্নার্ধ পর্যন্ত সুষমভাবে পেঁচিয়ে থাকা দু-তিন হাত দৈর্ঘের সুতলিটির মতোই যদি জড়িয়ে থাকা যেত আজীবন! মাঝে মাঝে এও তো মনে হতো যেভাবে আগুন পাখি, মাছরাঙা, জেমিনি আর চরকি লেজ ঘুড়িরা উড়ে বেড়াচ্ছে আমাদের হাতে থাকে নাটাইয়ের সুতোয়, কখনো উড়ে যাচ্ছে কোথাও, কেউ জানে না—হতো যদি শৈশবটি আমার তেমনই!
আমার ওই গ্রাম্যজীবনের বিচ্ছেদ্য শৈশবটি যদি আটকে যেত স্কুলের প্রতি ক্লাসে কিংবা পথে থাকা কড়ইয়ের ডালে পাখির বাসা আছে কতগুলো—এ নিয়ে বৃথা তর্কের মাঝেই। আক্ষেপ এবং ‘ইয়া আসাফা’র জিগিরেই রত আমার মনকে তখন শান্ত করে তোলে আমার স্মৃতিকাতর শৈশব। আমাকে মনে করিয়ে দেয় বসন্তের কোকিল যখন সুরের মূর্ছনায় পাড়াগাঁয়ে রইরই মাতম তুলত আমরা তখন পসরা সাজাতাম কদমের। হুল্লোড় চেচামেচিতে ভরে উঠত আমাদের কদমের হাট বাজার। কাঠালের পাতা দিয়ে মিছামিছি কেনা-বেচার খেলায় আমরা দিনশেষে হয়ে উঠতাম সবাই সবার চাইতে লাভবান। হিজলের তলে আমরা ভাই-বোন মিলে সেই সকাল সকাল কুড়িয়ে আনা ফুলগুলো যত্নভরে মালায় গাঁথতাম। কদম আর হিজলের সাজে ভরে উঠত আমাদের পাঁচিলঘেরা ঘরদুয়ার।
কাঠের উইন্ডোতে মুখ গুঁজে টানাবাদাম আর কটকটিওয়ালার অপেক্ষায় কেটে যেত আমাদের অনেকটা সময়। স্টোরে জমানো বিশেষ ভাঙাচোরা নিয়ে আমরা দৌড়ে ছুটতাম হকার আঙ্কেলের পেছনে। মা বকে দিতেন মাঝে মাঝে—ওসব ভালো না, খাওয়া যাবে না। কিন্তু পেটে অসুখ বাঁধিয়েও আমরা দিনরাত এসবের জন্য অপেক্ষায় অপেক্ষায় দিন-গুজরান করতাম।
সাত বছর বয়সে বাবা সাঁতার শেখাতে পুকুরে নিলেন। প্রথমে তো আঁটোসাটো করে বোতল বেঁধে নিতাম দুপাশে। কিন্তু দিন ফুরালে বাবা এও নিতে দিলেন না। এবার হবে আসল খেলা—এরকম বলে আমাকে ছেড়ে দিতেন। হাপুস নয়নে কেঁদে কেঁদে উঠতাম ভয়ে। পানি দিয়ে ভরে যেত পুরোটা পেট। তলিয়ে যেতে যেতে বাবার অস্তিত্ব টের পেয়ে যেন পুনরায় জীবন ফিরে পেতাম। কী অপূর্ব সুখের সময়। সাঁতার শেখা হয়ে গেলে তখন কে দেখে কার খেলা। স্কুল ফাঁকি দিয়ে আম্মার চোখ থেকে পালিয়ে ভরদুপুরে সন্ধ্যা তক ভিজে জ্বর বাঁধিয়ে ফেলতাম। তবুও তো মেটে না সাধ, মানে না বিপত্তির অবিচ্ছেদ্য বাধা।
বড়চাচার কবুতরের বিশাল পসরাতেও আমাদের সময় কাটত। আয়েশ করে উঠোনের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া ধান আর হাল্কা শিস দেয়াতেই কাঁধে চাপা দিয়ে বসে পড়ার দৃশ্য দেখতাম। কিন্তু একবার হলো কী, গ্রামে শুরু হলো তিনডোরা নোঙরের প্রকোপ। কবুতর-হাঁস-মুরগী খেয়ে বেড়াতে লাগল এই পিশাচসুলভ প্রাণীটি। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই তিনডোরা নোঙরকে কেউই ধরাশায়ী করতে পারছে না। এইরকম যাতনায় প্রতি রাতেই আমাদের কান্না পেতো। একদিন দেখা গেল একে একে সব কবুতর কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। হাঁস-মুরগীও কমে যেতে থাকল ক্রমশ।
এমনই ছিলো আমার লাট্টু ঘুরানো আর ধান কাটবার দিনে বিশাল মাঠে ছড়িয়ে পড়ে গোল্লাাছুট খেলবার গ্রামীণ শৈশব। টিনের চালে বৃষ্টির দিনে টুপটাপ ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির মাধুকরী সৌন্দর্যে আমাদের জড়সড়ভাবে বসা গল্প-আসরের অনন্য গল্প হয়েই যেন হারিয়ে গেছে আমার গ্রাম, আমার শৈশব। হারিয়ে গেছে স্কুলঘরের মেরামতহীন ল্যাবরেটরিতে ঝুলে থাকা কঙ্কাল এবং চলে গেছে কোথায় সেসব বন্ধুবান্ধব, কোন অদূরে।
লেখক : শিক্ষার্থী, মাদরাসাতুল কাউসার আল ইসলামিয়া ঢাকা
সেপ্টেম্বর 2019

