অবহেলার মতো দেশলাইটা বুকপকেটে রেখে দুই আঙুলের চিপায় সিগ্রেট ধরে সুখটান দিতে দিতে, ‘সিলেট সিলেট’ বলে বজ্রকণ্ঠে প্যাসেঞ্জার ডাকছেন হেলপার। স্টেশনের গেঞ্জামের ভেতর নিজেকে অর্পণ করে, বাসের জানলা দিয়ে বেয়াড়ার মতন আমি তাকিয়ে আছি। হাওয়ায় ভাসছে স্টেশনের চারপাশে থাকা মানুষগুলোর নানান তরিকার নানান কথা। বাসের গ্লাস ভেদ করে বিকালের ঠাণ্ডা-কোমল রোদ ঢেকে দিয়েছে আমার শরীর। রোডের পাশে শিরিশ গাছটিতে ঝুলানো স্বচ্ছ ব্যানারের মতো মায়ের মুখটা আমার চোখে ভেসে উঠছে। আর কবে ফিরবো, মাকে আবার দেখব কবে; ঠিক-ঠিকানা নেই। ক্ষুদার্থ বন্দী পাখির মতো আমার চোখগুলো কাঁপতে লাগল। মনটা কেমন হু হু করে উঠল। আমি তো মা বলতেই গ্রাম বুঝি, গ্রাম বলতেই আমার মা। একদিন তাই লিখেও ফেললাম—
‘কতদিন হলো গ্রামে যাই না।
প্রায়ই মা’কে বলি, তোমাকে না দেখলে
গ্রাম দেখা হয়ে ওঠে না আমার।
বাবার মসৃণ হাতের রোয়া ফরাশ আর
লাল-শাকে ভরে ওঠা গাঙের চর দেখলে
মন ভরে না; আমি বাবার হাত দেখি—
যেন মলিন কাঠের প্রতিচ্ছবি।
বাবার শরীরের ঘাম; বাঁশের গতর বেয়ে
টপটপ করে ঝরে পড়া কুয়াশা যেন।
রোদের ছলাকলায় মুগ্ধ-হওয়া কিশোর
শিশিরকণা আর শুকনো দুর্বাঘাসে বিচ্ছিরি
স্যান্ডেল পায়ে নদীর পাড় ধরে হেঁটে হেঁটে—
জামাল চাচার বাড়ি ফেরা। নুরু চাচার হাসি;
হাতে কালো সুতার জাল, মাছ রাখার খলই।
উঠানের মাচায় ঝুলন্ত ডজনখানেক
লাউয়ের ফাঁক দিয়ে তবু আমি মাকে দেখি,
ওড়নার মতো করে শাড়ির আঁচল ধরে
হাসিমুখে দাঁড়ানো দুয়ারে; এ আমার মা
মাকে না দেখলে—
গ্রাম দেখা হয়ে ওঠে না আমার।’
গ্রামের মায়া ছেড়ে শহরে যাবার আগে এরকম অনুভূতি হয় না—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। শান্ত নিটোল পরিবেশে, পাখির কুহুতান আর নদীর কলতানে তান মিলিয়ে মেতে থেকে যে সময়টা পার হয় তা অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা করবার নয়। আহা গ্রাম, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে কিছুটা সময় গ্রাম নিয়ে ভাবলেই মনটা ভীষণ ফুরফুরে হয়ে ওঠে।
গ্রামাঞ্চলের সঙ্গে বাঙালির নাড়ির সম্পর্ক। ধানের ক্ষেতে মৃদুমন্দ হাওয়ার ঢেউ খেলানোর মতো দৃশ্য গ্রাম বাংলার এক চিরাচরিত রূপ। দিগন্ত-জোড়া ফসলের ক্ষেতের মাঝখানে কিছুদূর পর পর দু-একটা বসতবাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। কল্পনার রাজ্যে তখন এই কুঁড়েঘরগুলোকেও রাজপ্রাসাদের মতো মনে হয়। দোয়েল, কোকিল, ঘুঘু, পাপিয়া, বৌ-কথা কও প্রভৃতি পাখিগুলো গ্রাম্য প্রকৃতিকে সারাবেলা মোহনীয় সংগীতে মাতিয়ে রাখে। বিলের মাঝে অল্প পানিতে বকের এক পায়ে-দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য, মাছরাঙার মাছ শিকারের ফন্দি দেখা, ঝড়ের দিনে আম কুঁড়ানোর মতো সুখ, চিরচেনা পুকুরের পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি গাছ, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, বিস্তীর্ণ ফসলি ক্ষেত, প্রকৃতির স্নিগ্ধ সবুজ, প্রশান্তির ছায়া, কোমল হাওয়া, কাকডাকা ভোর কিংবা টিনের চালে টাপুরটুপুর বৃষ্টির শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে পুরো এক ছবির মতো।
শীতকালের কুয়াশামোড়া ভোরের গ্রামকে তো মনে হয় ধোঁয়ায় ডুবে থাকা গ্রাম। শীত চলে যাওয়ার পরও গ্রামে কুয়াশার এই দৃশ্য অনেক দিন থেকে যায়। এই যে হাজারো আনন্দময় অনুভূতি ও মুহূর্ত, এগুলো কেবল গ্রামীণ জীবনের সংস্পর্শেই পাওয়া যায়। সবকিছু মিলে গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’-এর মতোই অনিন্দ্য-সুন্দর ও স্নেহ-মমতা জড়ানো। তার উপর গালিগালাজ, হাতাহাতি, চুলোচুলি, গুজব নিয়ে লোফালুফি—এসবের মাঝেও রয়েছে গ্রামের এক সাহজিক নান্দনিকতা। নিখাদ সরলতার এক অনবদ্য সৌন্দর্য। হেলাল হাফিজ এজন্যেই হয়তো অকপটে বলে ফেললেন—
‘আমিও গ্রামের পোলা
চুতমারানি গাইল দিতে জানি।’
এখন তো আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম্যজীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। গ্রামের মানুষ এখন বহু ধরনের পেশায় নিজেদের যুক্ত করে জীবন বদলে নিচ্ছে। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামেও চলে গেছে ব্যাংকের সেবা। উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছে গ্রামের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাও। কৃষির পাশাপাশি ছোট ছোট শিল্প স্থাপনের প্রতি আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে।
গ্রামের অর্থনীতির পরিবর্তনটি গ্রাম্য বাজারের কোনো মুদির দোকানে গেলে আরও স্পষ্ট চোখে পড়ে। সেখানে এখন শুধু চাল, ডাল আর কেরোসিন তেলই নয়, বিক্রি হয় শ্যাম্পু, সুগন্ধি সাবানসহ প্রসাধন সামগ্রীও। গ্রামের মানুষ এখন আর কাঠ-কয়লা দিয়ে দাঁত মাজে না, মাজে টুথপেস্ট ব্রাশ কিংবা নিদেনপক্ষে টুথ পাউডার দিয়ে। দেশের তেরো কোটি মোবাইল ফোন-গ্রাহকের বড় অংশ এখন গ্রামের মানুষ। প্রায় এক কোটির উপরে গ্রামবাসী কৃষকের আছে নিজস্ব ব্যাংক একাউন্ট।
গ্রামের দৃশ্যপট যদিও খুব একটা বদলায়নি, অতীতের গ্রাম আর এখনকার গ্রামের মধ্যে অন্যভাবে ঘটেছে বিরাট পরিবর্তন। আগেকার দিনে আয়োজন করে ঘরে বসেই চলত পুঁথি পাঠ। গ্রাম্য লোকজন পল্লী সাহিত্য ও সংস্কৃতির যথাযথ চর্চা করার সুযোগ পেত। লেখাপড়া করার তেমন সুযোগ না থাকলেও সেসময় গ্রামের মানুষদের মধ্যে ধর্মবিশ্বাসটা ছিল প্রগাঢ় ও সুদৃঢ়। জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধটাও ছিল গভীর। বিকেল হলেই মাঠগুলো ভরে উঠত কানায় কানায়। শিশু, বৃদ্ধ বণিতা সবাই খেলার মাঠে নিজেদের মতো করে সময় কাটাত। কেউ ব্যস্ত থাকত খেলা নিয়ে কেউ-বা খেলা দেখা নিয়ে আবার কেউ কেউ আড্ডায় মশগুল হয়ে যেত। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত জমজমাট এক দৃশ্য ছিল উপভোগ করার মতো। অবশ্য সে সময়ে এই বিকেলটুকু ছিল বিনোদনের অন্যতম মাত্রা।
এখন বিনোদনের মাধ্যম অনেক সহজলভ্য হয়ে ওঠায় দিন দিন সেসব প্রযুক্তিতে বুঁদ হয়ে যাচ্ছে মানুষ। বিকেল বেলায় গ্রামের মাঠগুলো এখন আর খেলোয়াড়দের দখলে নেই। কিছু কিছু মানুষ বিক্ষিপ্ত আকারে মাঠের এ প্রান্তে ও প্রান্তে মোবাইল ফোনে আপন মনে সময় কাটাচ্ছে। নেই প্রাণবন্ত আড্ডা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশ এগোচ্ছে ঠিকই কিন্তু কেমন যেন এক কৃত্রিমতা চেপে ধরেছে। আহসান হাবীবের কবিতায় এই চিত্র ফুটে উঠল কি-না একবার দেখা যেতে পারে—
‘এই সেই গ্রাম
এখানে নয়ন মেলে
পা রেখে এখানে
আজ শুধু ভয় করে ওঠে।
অনেক মানুষ ছিল মরেছে অনেক
সেই সাথে মরে গেছে তারো চেয়ে বেশি
শতাব্দীর গড়ে ওঠা এইসব গ্রাম।’
জকিগঞ্জ, সিলেট
সেপ্টেম্বর 2019

