ঘুড্ডি ওড়ানো গ্রামীণ শৈশবের জন্য আক্ষেপ

সংখ্যা:

 

সদ্য কৈশোর পেরুনো টিংটিঙে একটি বালক, শিক্ষার তাগিদে রোজকার সাইকেল দাবিয়ে বেড়ানো পথঘাট পেরিয়ে হুট করে ছুটে চলল যখন শহরের যান্ত্রিক কোলাহলের দিকে, সে ভোরবেলার স্মৃতিমাখা ওই গল্পের আলাপ আমার ভেতর প্রায়ই দুলে দুলে ওঠে যেন। আমার আধোভাঙা মনে চিত্রিত একটি ছবি রোজই আমার ভেতর চূর্ণন সৃষ্টি করে, আম্মাজান অর্ধেক ভেজানো ওই দুয়ারে একলা দাঁড়িয়ে দেখছেন পুত্রের চলে যাওয়া। আব্বার হাত ধরে বৃষ্টিমুখর সকালটিতে পুত্র হাঁটছে এবং বারেবারে ফিরে তাকাচ্ছে। দৃষ্টির দৌড় যতখানি, ততটুকু জুড়েই মিশে আছে সুদূরে দাঁড়িয়ে থাকা আম্মাজান এবং তাঁর জল-ছলছল দু’টি চোখ। চলে আসবার কালে আমার বুকপকেটে যখন তিনি পুড়ে দিচ্ছিলেন বিশেষ এক আবদার—‘ভালো থেকো বাবা’—আমার খুব করে মনে চেয়েছিল আম্মার স্ফিত সবুজ ওই সুতি শাড়িটির কোণে আমার শত অনুরাগের মিশেলে কেঁদে ওঠা কান্নাগুলো মুছে দিয়ে আসি। যাতনার আবডালে কেমন সব ভুলে যাচ্ছিলাম আমি। যেন ভুলেই যাচ্ছিলাম এই একটু পর, আমাকে ছেড়ে যেতে হবে আমার রঙিন শৈশবের প্রতিটি পথঘাট, শানবাঁধানো পুকুরের ঘাট আর ডাংগুলি খেলবার সুবিস্তৃত মাঠ। ক্লাবঘরের পেছনের ওই জঙলামতন জায়গায় আমাদের নির্মিত খেলাঘরের কথাও আমাকে ভুলে যেতে হবে একটু সময় পেরুলেই, তাও যেন আমার বড় অজানা ছিল। গ্রামীণ শৈশবের বহুরঙা সব গালগল্প হুট করেই কেমন স্মৃতি স্মৃতি রূপ ধারণ করতে থাকল একেবারে অজান্তেই। যেন-বা অবিশ্বাস্য মন জানতই না সত্যিই ছেড়ে চলে আসছি আমি আমার অপূর্ব গ্রামীণ জীবন।

সেদিনের পর থেকে ইটপাথরের এই শহুরে জীবনযাপনে ছাত্রাবাসের নির্ঘুম রজনীগুলোতে আমি এখনও মনে করে পুলক অনুভব করি, আমারও ছিল একটি ছবির মতো গ্রাম। ছিল ঘুঘুর ডাক আর শীতের রাতে আম্মার গলা জাপটে ধরে শুয়ে শুনতে থাকা শেয়ালের শব্দ। মাঝেমাঝে জোছনাধরা মনোরম রাতে ভূত দেখবার কোশেশে ঘর থেকে পালিয়ে এপাড়া ওপাড়া চষে বেড়ানো আর ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে ঘরে ফিরবার মতো গল্পও তো আমার আছে। স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রচণ্ড দাবদাহে সবান্ধব নদীতে বেলা পার করে ঘরে ফিরে আসবার কালে আম্মার ওই যে বেত হাতে রাগে গড়গড় চোখে তাকিয়ে থাকার দৃশ্য, এতোটা মধুর স্মৃতিই-বা আছে ক’জনের! মধ্যবিত্ত পরিবারের লাগাম ধরে রাখা আমার আব্বা সাইকেলের পিঠে চড়ে সারাবেলা পিওনের কাজ সেরে বাসায় আসতেন যখন, অস্থির মনে আব্বার বুকপকেট থেকে দু’টাকা তিনটাকা চুরি করে আতাউরের লাল সন্দেশ আর মতিচুরের লাড্ডু খাবার যে ব্যগ্রতা ছিল আমার গ্রামীণ শৈশব ঘিরে, এসব এখন স্মৃতির আলাপ বনে হয়ে আছে কাঙ্ক্ষিত এক ঝালমুড়ির ঠোঙা। সে ঠোঙা প্রত্যাশিত মনেই ফিরে পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা পুষে পুষে করছি রোজকার দিনগুজরান।

আমাদের মধ্যপাড়ার প্রাইমারি স্কুলটিতে ক্লাস শেষে যেভাবে বেজে উঠত ঘণ্টাধ্বনি এবং অপেক্ষিত আমাদের মনে সে ধ্বনি হতো এক ভীষণ মায়াময় আবহের স্রষ্টা, আমার ভেতরও আমার ওই শৈশব সেভাবেই অনুরণিত এখন। ওই নয়নপুর গ্রামটিতে কী সব সুন্দর সকাল তৈরি হতো, গ্রামের দস্যি ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে ঘুরে বেড়াত সারা গ্রাম, গেয়ে উঠত পাখি, আর নেচে উঠত তাদের মধ্য থেকে আমার মতোই কোনো একজন। উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা মর্ত্যরে মতো দেখা যেতো আমাদের বাড়িটি। এর মাঝে সুবিশাল উঠোনে রোজ সন্ধ্যায় বসত আমাদের গল্পের আসর। দাদি থাকতেন সে আসরের মধ্যমণি। সারাদিন তালপাখা নিয়ে ঘুরতে থাকা আমাদের দাদি নাতিনাতকুর সবাইকে কাছে টেনে এক হাতে পাখাটি ঘোরাতেন বিরামহীন আর চলতেন গল্পের ভেতর দিয়ে। ঘুমঘুম চোখে আমরা শুনতেই থাকতাম। একটা শেষ হলে আমাদের আরেকটা শোনাবার শক্ত আবদার আমাদের দাদিকে ক্লান্ত করে ফেলত। তবুও তিনি চলতেন আর চলতেন। আর যেদিন দাদী ক্ষান্ত দিতেন, আমরা ছুটতাম বাড়ির পেছনের ওই গন্ধলেবুর ঝোঁপে। সেখানে ছিল জোনাকির বিশাল পসরা। দাদার অষুধের দোকান থেকে চুরি করে আনা ছোট্ট কাঁচের শিশি নিয়ে জোনাকি ধরার প্রতিযোগিতায় নামতাম সবে মিলে। লেবুর কাঁটায় গা ছিড়েখুঁড়ে যেতো। তবুও জোনাকি ধরে এনে রাতের বেলা অন্ধকারের বন্ধ ঘরে সেগুলো ছেড়ে দেবার সে যে এক আনন্দ, তার কাছে এসব কাঁটাবন ম্লান হয়ে যেতো একেবারে। ফেলে আসা ওই গ্রামীণ সময়ের বিস্তৃতি স্বল্প হলেও তার ভেতর ঘটে যাওয়া কেসসার বয়ান মোটেও কম নয়। আজ তা থাকুক, হবে অন্য কোনোদিন, কোনো সময়।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, মাদরাসাতুল কাউসার আল ইসলামিয়া, ঢাকা

সেপ্টেম্বর 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১