নিশীথ প্রস্ফুটিত আশ্চর্য শ্বেত ফুলের মতোন যখনই হৃদয়ের নরম জমিনে ভাব দানা বাঁধে তখনই ঘটে শব্দের বাকস্ফূর্তি। ওলোটপালোট হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো ঘাসের শুকনো ঝোপ যেমনটা উড়ে বেড়ায় শব্দসুতোয় নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায় ঘুরে বেড়ায় ভাব-ভাবনার রঙিন ঘুড়ি।গুচ্ছ গুচ্ছ,সারি সারি লাল নীল ধ্বনির বিস্ফোরণ-আস্ফালনে হয় শব্দের রচন-গঠন।বর্ণমালার আস্তরণে ও আবরণে প্রাণ ধারণ করে জেগে ওঠে শব্দ। শব্দ ভাষা সৌধের ও বাক্য দেহের বোবা উপাদান।
সৈয়দ হক তাঁর কুসুমিত সারস গদ্যে শব্দের মহিমা বয়ান করেছেন এভাবে—গায়কের সপ্তস্বর, চিত্রকরের রঙ,নর্তকের মুদ্রণ, সাহিত্যেও আমার সৃজনের উপকরণ শব্দ। শব্দ বিনা ভাব কিছু নয়। ভাব আকার ধরে উঠতেই পারে না শব্দের সহায় বিনা। শব্দ না চিনলে সৃজন হয় না। শব্দ না জানলে ভাবকেও ধরা যায় না। ভাব আছে ভাষা নেই—এর চেয়ে ছেঁদো কথা আর হয় না। শব্দকে তাই আমি ভাব-সাধন কেবল নয়, জীবনসাধনের কেন্দ্রেও রাখি। জীবনকে জানতেই পারতাম না, মানুষ হিসেবে আমার উত্তরাধিকারকে হাতেই পেতাম না শব্দের সহায় ছাড়া।
বাক্য সুঠাম সৌধের দেয়াল।শব্দ তার ইট। রবীন্দ্র সুরে যদি গাই—ধ্বনি দিয়ে আঁটাবাঁধা শব্দই ভাষার ইট।নানা রকম শব্দচিহ্নের গ্রন্থি দিয়ে এই কথাগুলোকে গেঁথে হয় ভাষা।
শব্দ হরেক রঙের। শব্দের রস-গন্ধ যেমন বৈচিত্রের চিত্রে অঙ্কিত, তার ছন্দের ঝঙ্কারও পাঁচমিশালি সুরে ঝঙ্কৃত। সংগীতময় ধ্বনির মধুর প্রতিধ্বনিতে থাকে মিষ্টি এক আমেজ। পাকা আঙুরের মতো ম্লান আভাময় লেবাস। কিছু শব্দ মলিন-ম্লান খসখসে। কিছু শব্দ কাশফুলের মতো মসৃণ তুলতুলে নরম, মধুরতায় ও কোমলতায় টইটুম্বুর রসকষে।বৃষ্টিস্নাত নতুন শস্যের মতো সবুজ ও সজীব।কিছু শব্দে চাঁদের ক্লান্তি। চাঁদ মধুরতায় ভরা।
যিনি অমৃত শব্দপুঞ্জ ওড়ান তুলারুর যন্ত্রে, তিনি লেখক। লেখকের অভিপ্রায় অনুযায়ী শব্দ অভিধা পায়। একজন লেখককে হতে হয় শব্দ ব্যবহারে কুশলী ও চৌকস।প্রতি মুহূর্তে জানতে হয় নতুন নতুন শব্দ। বুঝতে হয় শব্দের মারপ্যাঁচ। অভিধানের সাহায্যে শব্দের সমৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। লেখকের শিথানের পাশে অবশ্যই অভিধান থাকা বাঞ্চনীয়। অভিধান ছাড়া লেখকের চলে না, চলতে পারে না। যেমনটা স্বীকার করেছেন সৈয়দ হক—‘আমার লেখার টেবিলের ওপরেই থাকে বইয়ের তাক, হাতের একেবারে নাগালের মধ্যে কিছু অভিধান সেখানে। অভিধান ছাড়া এক মুহূর্ত আমি চলতে পারিনা। জানা শব্দকেও নতুন করে জানতে হয়,জানবার দরকার হয়। লেখকের কাছে শব্দ তো প্রতিদিনের ব্যবহৃত শব্দ নয়, লেখার কাজে শব্দকে হতেই হয় প্রতিদিনের ব্যবহার থেকে মুক্ত, নতুন করে কৌমার্যপ্রাপ্ত। শব্দের পরে শব্দ যখন বসে তখন পাশাপাশি দুটি শব্দের ভেতরে অনবরত চলে প্রতিফলন, ফলে শব্দ-স্থাপনার বিভায় পুরনো শব্দ হয়ে ওঠে নতুন। এ কাজে অবিরাম দরকার পড়ে সাধারণ ও বিশেষ অভিধানের—দেখে নিতে হয়, বুঝে নিতে হয়, শব্দের ভেতর শব্দের প্রত্ন সন্ধান করতে হয়।’
শব্দের প্রতিফলন-প্রতিস্বরণে বাক্যের উৎপাদন। শব্দের গুঞ্জন ও মুখরতায় বাক্যের পরিচয়। শব্দের ইট-পাথর ও চুন-সুরকির মিশ্রণে বাক্যের নিটোল উচ্চ মিনার হয় গ্রন্থন, নির্মাণ। রসালো-মিঠেল বাক্যে মন-প্রাণে শীতলতার আবহ বয়ে যায়। তীক্ষ্ম ধারালো বাক্যে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় অবিরাম। শব্দগুণ-বিভায় বাক্য হয় বিশোভিত। শব্দকুশলীর ভাব-চিন্তার ও অনুভূতি-উপলব্ধির মানসসত্তার সংস্পর্শে শব্দ হয় প্রাণময় ও বাঙময়। স্নিগ্ধ অনুরণিত শব্দে গড়ে ওঠে রমণীয় স্বাদু বাক্য। নক্ষত্রের রুপালি আগুনভরা নীল চাঁদোয়ার তারা-স্পন্দিত রাতে অনিঃশেষ শব্দের দোলনায় পাঠক খুঁজে পান জোছনার সুষমা।
লেখক : শিক্ষার্থী, জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম
আগস্ট 2019

