ইতিহাস ও সমকালের হৃদয়বিদারক ঘটনাপঞ্জী

সংখ্যা:

‘খলিফা হত্যাকাণ্ড’ ও ‘গুয়ান্তানামোর ডায়েরি’

 

খলিফা হত্যাকাণ্ড

ইসলামি খেলাফতের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। দুর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে শাসন করছিলেন অর্ধজাহান। একদিন ফজরের সালাতে ইমামতির জন্য তিনি মসজিদে নববিতে প্রবেশ করলেন। সবাইকে সফবন্দী করে নিজে গিয়ে দাঁড়ালেন মেহরাবে। একামত হলো। উমর আল্লাহু আকবার বলে তাকবিরে তাহরিমা বেঁধেছেন—এমন সময় এক ক্রীতদাস আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে আচমকা আঘাত করে বসল উমরের গায়ে। একে একে ছয়টি আঘাতে জর্জরিত হলেন উমর। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে।

কিন্তু কেন? সামান্য এক ক্রীতদাস কিভাবে আক্রমণ করতে পারল অর্ধজাহানের শাসককে?

তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। মদিনায় বিদ্রোহের লেলিহান শিখা। অবরুদ্ধ খলিফা উসমান। তাঁর  বাসার চারিদিকে বিদ্রোহীরা অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে।

কেন? কাদের ইন্ধনে শুরু হলো এমন স্পর্ধিত কাজ?

আততায়ীরা ঢুকে পড়ল উসমানের বাসায়। খলিফা উসমান তখন কুরআন তেলাওত করছিলেন। আততায়ীরা হামলে পড়ল তাঁর ওপর। খলিফা উসমান শহিদ হলেন। কুরআনের পবিত্র পাতা ভিজে রক্তাভ হয়ে গেল উসমানের তাজা খুনে।

কিন্তু কেন? কেন এমন নির্মম শাহাদতের শিকার হতে হলো প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রিয় জামাতাকে? এ দুঃসাহস কোথা থেকে পেল আততায়ীরা? আততায়ীগুলোই বা কারা?

উসমানের পর খেলাফতের মসনদে বসলেন হজরত আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। আততায়ীদের হাতে শহিদ হলেন তিনিও।

তারপর এলেন হাসান ইবনে আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। নবিজির সবচেয়ে আদরের দৌহিত্র। তিনিও হত্যার শিকার হলেন।

খলিফা হত্যার এ ধারাবাহিকতা চলতেই থাকল। খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ পেরিয়ে এল উমাইয়াদের শাসনামল। উমাইয়া খেলাফতের অনেক খলিফাও শিকার হয়েছেন এমন হত্যাকাণ্ডের। উমাইয়া যুগের পর আব্বাসি খেলাফতের শাসনামল। আব্বাসি খলিফারাও নিহত হয়েছেন অনেকে। নিহত হয়েছেন উসমানি সাম্রাজ্যের শাসকরাও। কিন্তু কেন? ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে মুসলিম শাসনের ভিত্তিমূল কেন নড়ে উঠেছিল বারবার?

এমন অসংখ্য কেন’র উত্তর নিয়েই সাজানো হয়েছে ‘খলিফা হত্যাকাণ্ড’। যেখানে খলিফা হত্যার নেপথ্য নায়কদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে এক এক করে।

খলিফাদের কেউ ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আটকা পড়ে শহিদ হয়েছেন, আবার কেউ কেউ আপন কৃতকর্মের দরুণ নিহত হয়েছেন আম জনতার রোষানলে।

আরবি ভাষার প্রখ্যাত লেখক ড. কামিল কিলানি ও খালিদ আস-সায়িদ ইসলামি ইতিহাসের বিশাল ভাণ্ডার থেকে ছেঁকে এনেছেন খলিফা হত্যার অনবদ্য এক ধারা-বিবরণী। লেখক ইশতিয়াক আহমাদ তাঁর দরদি কলমে সে ধারা-বিবরণীটুকুই বয়ান করেছেন বাংলা হরফে।

পাঠক পড়তে পড়তে হয়রান হয়ে উঠবেন—হায়! মুসলিম শাসকদের জীবন এতটাই ষড়যন্ত্র-ঘেরা ছিল?

 

গুয়ান্তানামোর ডায়েরি

হোসাইন আবদুল কাদির। তিনি শহিদ আবদুল্লাহ আজজামের ভ্রাতুষ্পুত্র। আবদুল্লাহ আজজাম যুদ্ধ-জিহাদের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও ভ্রাতুস্পুত্র ছিলেন নিরেট একজন শিক্ষক। শিক্ষাদানই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। সে সুবাদে আরব হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন যাবৎ তিনি বসবাস করছিলেন পাকিস্তানের পেশোয়ারে। সপরিবারে। ২০০২-এর এক সন্ধ্যায় হঠাৎ করে পাকিস্তানি কিছু পুলিশ এল তাঁর বাসায়। ‘পাঁচ মিনিটের জন্য একটু আসুন আমাদের সঙ্গে, প্লিজ।’ পুলিশের সবিনয় অনুরোধ। তিনি পাঁচ মিনিটের জন্য গেলেন তাদের সাথে। তারপর?

তারপরের কাহিনিই হোসাইন আবদুল কাদির নিজ জবানিতে বয়ান করেছেন এই বইয়ে। পাঁচ মিনিটের কথা বলে নিয়ে গিয়ে একজন নিরপরাধ নিরীহ শিক্ষককে পাকিস্তানি পুলিশ বাহিনী নির্লজ্জের মতো তুলে দিয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে।

মার্কিন সেনাবাহিনী প্রথমে তাঁকে নিয়ে যায় বাগরাম কারাগারে। সেখান থেকে পৃথিবীর ভয়ংকরতম জিন্দানখানা কিউবায়। টানা আড়াইটি বছর কিভাবে তাঁর ওপর সেরেফ সন্দেহের বশে নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হয়েছিল, ‘গুয়ান্তানামোর ডায়েরি’তে বিবৃত হয়েছে সেই নিষ্পেষণের করুণ দাস্তান। বিবৃত হয়েছে কিউবার নির্যাতন-সেলগুলোতে বন্দী ভাগ্যাহত আরো অনেক মানুষের মানবেতর জীবনযাপনের ভয়ানক চিত্র।

নানা উপায়ে নির্যাতন করা হয় বন্দীদের ওপর। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি আছে ভয়ংকর রকমের মানসিক নির্যাতনও। কখনো বন্দীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনকে অবমাননা করা, কখনো বা সুন্দরী ললনাদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে হেনস্তা করা—নির্যাতনের বিচিত্র সব পন্থা প্রয়োগ করা হয় মার্কিনিদের সেই ভয়ানক সেলগুলোতে। হোসাইন আবদুল কাদির তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া এবং তাঁর চোখে দেখা সেসব করুণ অভিজ্ঞতাগুলোর চিত্রায়ন করেছেন ‘গুয়ান্তানামোর ডায়েরি’র পাতায় পাতায়।

বইটি পাঠ করতে গিয়ে পাঠকের মনে এই সন্দেহ জাগতেই পারে—একুশ শতকের আধুনিক পৃথিবীতে কি এখনও এমন নির্যাতনের চিত্র আছে? পাঠকের সে সন্দেহ নিরসনের জন্য লেখক বইয়ের শুরুতেই জবানবন্দী দিয়েছেন এভাবে, ‘এই বইয়ের অনেক কথা হয়তো অনেকের ভালো লাগবে না, অনেকে মনে করবেন—এ সবই অতিকথন মাত্র। কিন্তু আমি এসব প্রত্যক্ষ করেছি এবং এসব ঘটনা আমার সঙ্গে ঘটেছে—এটাই বাস্তবতা। আরবিতে একটা প্রবাদ আছে—যে শোনে সে তার মতো নয়, যে দেখে।’

আরবি ভাষায় প্রকাশিত মূল বইয়ের নাম ‘জিকরায়াত মু’তাকাল মিন জোয়ান্তানামো’। ২০০৯-এ সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে প্রকাশ হবার সাথে সাথে আরব বিশ্বে বেশ একটা সাড়া জাগায় বইটি। তরুণ অনুবাদক নাজমুস সাকিব তা বাংলায় অনুবাদ করে বাংলাভাষী পাঠকদের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক জিন্দানখানায় ঘটিত নির্যাতনের অজানা অধ্যায়।

 

আগস্ট 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১