সমাপ্তিহীন তিনটি বইয়ের গল্প

সংখ্যা:

 

আলোর পরশ, যে আলোর বিনাশ নেই

নবিযুগে মক্কার আল-জবিল নামক এক ছোট্ট গ্রামের তাগড়া জোয়ান আবু রায়হান। বয়স পঁচিশ। দীর্ঘায়ত দেহ, বলিষ্ঠ গড়ন, সুন্দও,সুপুরুষ। মেষ চরিয়ে একটি পাথরখণ্ডের পিঠে বসল বিশ্রাম নিতে। এমন সময় সায়ফুন এলো খাবারের আসবাব হাতে। ১৬ বছরের তরুণী সায়ফুন। শৈশব থেকেই তাদের মাঝে পরিচয়। ধীরে ধীরে বয়সের ভারে শৈশবের সম্পর্কের বদল ঘটে প্রেমে। সায়ফুন তার প্রেমাষ্পদের জন্য খাবার নিয়ে এলো। কিন্তু রায়হান খাওয়ার অভিনয় করে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে নিলো সমস্ত খাবার। সন্ধ্যা নামলে এই খাবার নিয়ে চলে যাবে অদূরে এক পাহাড়িগুহায়। সেখানে নতুন ধর্মাবলম্বী কিছু মানুষ আত্মগোপন করে আছে, সমাজের নির্যাতন সইতে না পেরে নির্জন এ গুহায় অবস্থান করে তারা মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথে ডাকে। ন্যায় ও নৈতিকতার কথা বলে ঘুরে বেড়ায় মানুষের দ্বারে দ্বারে। একত্ববাদের আহ্বান নিয়ে ছুটে যায় জনবস্তির অলিগলিতে।

রায়হানের কাছে তাদের কথা খুব যৌক্তিক মনে হয় এই বসবাস-অযোগ্য আরব ভূখণ্ডের জন্য। এখন তার চোখে মূর্তিরকারুকার্যেও ভাসে আল্লাহর অদৃশ্য কায়া। ইসলাম গ্রহণ করে রায়হান। চুপিচুপি সায়ফুনকে বলে এই সুসংবাদ। সেও আনন্দিত হয়ে রায়হানকে আশান্বিত করে ইসলাম গ্রহণের।

এদিকে সমাজপতিদের কানে পৌঁছে যায় রায়হানের ইসলাম গ্রহণের খবর। মূর্তিপুজারীরা রাতের আঁধারকে গায়ে লেপ্টে হামলে পড়ে মুসলিম শিবিরে। অত্যাচারের যন্ত্রনায় মুসলিমরা জঙ্গল মাড়িয়ে জলাশয় সাঁতরে পাড়ি জমায় নাজ্জাশির শামে। রায়হানের মুসলিম হয়ে যাওয়াতে বিবাহ নিষেধ করে দেয় সায়ফুনের অভিভাবকরা। সায়ফুন পাগলের বেশে দিশেহারা হয়ে ছুটে রায়হানের খুঁজে। কিছু দূর গিয়ে দুইজন দুই পথে হারিয়ে যায়।… বেশ লম্বা ফিরিস্তি।

এম. এ. হাশেম খান রচিত ‘আলোর পরশ’ একটি আরব্য উপন্যাস। সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগের দৃশ্যপট নিয়ে লেখা। জাহেলিয়াতের আরব কবর খুঁড়েছিল আলোর অন্তোষ্টিক্রিয়ার জন্য, কিন্তু ইসলামের আলো কীভাবে তার জ্যোতির্ময়তা নিয়ে বারবার বিস্ফোরিত হয়েছে মানুষের হৃদয়ে, তার একটি বর্ণনা ‘আলোর পরশ’। হেরার জ্যোতি তো কবরেও জ্যোতি ছড়ায়। ‘আলোর পরশ’ দিয়ে উদ্ভাসিত করে দেয় অন্ধকার জগত।

২০১৪ সালের রমজান মাসে তিনজন পালাবদল করে পড়েছি বইটা, ঘুম থেকে উঠে যে আগে নেবে সে পড়বে—এই নিয়ম মেনে। তারাবির পড়া বাকি রেখে একটা বাংলা উপন্যাসের বই নিয়ে আমাদের কাড়াকড়ি দেখে অনেকে হাসত, কেউ রাগ হতো। আমাদের এ অবস্থা দেখে কর্তৃপক্ষ একসময় লাইব্রেরি থেকে বইটা সরিয়ে নিলো। এরপর দুই বছর যাবৎখুঁজে আমি একটা পুরনো কপি সংগ্রহ করি। সেই আমাদের প্রত্যেকের সংগ্রহে এখন একটা করে কপি আছে। আমি এখনো পড়ি। প্রতিবার পড়া শেষ হলেও যেন সমাপ্ত হয়না বইটা। চুপিচুপি আবার উল্টে যায় প্রথম পৃষ্ঠা।

মক্কা বিজয়ের পর সাথিরা রায়হানের জন্য বিয়ের বন্দোবস্ত করল। রায়হান কিছুতেই রাজি ছিল না। তার মনে ছিল সায়ফুনের কথা। সায়ফুন তাকে ইসলাম কবুলের আশ্বাস দিয়েছিল। পরিবারেও তাদের প্রেমের জানান ছিল। এখন কেমন আছে, কোথায় আছে সায়ফুন? এতো বছর পরেও রায়হান ভুলতে পারেনি, মনের করিডোরে সায়ফুনকেই খুঁজে ফিরছিল রায়হান। তবুও বাধ্য হয়ে বিয়ের রঙে সাজতে হলো। কন্যা কে, জানেনা রায়হান। মেয়েও জানেনা কে তার বর সেজে আছে। যখন দুজনের চেহারা থেকে পর্দা সরে গেল, রায়হান চোখ বিস্ফোরিত করে চিৎকার দিয়ে উঠল,‘সায়ফুন, তুমি!’

রায়হানের কণ্ঠ শুনে সায়ফুনের সম্বিৎ ফিরে এলো। ধীরে ধীরে চোখ মেলে সে দেখল, সামনে তার প্রিয়তম রায়হান—‘অ্যাঁ, তুমি! তুমি এসেছো!’

 

ফেরা, সংগ্রামমুখর দীর্ঘ পথের গল্প

নীড়হারা দুই মেয়ের ঘরে ফেরার কাহিনি। বাবার ঔরসে থাকতেই দুই বোন হারিয়ে গিয়েছিল ইসলাম থেকে। জন্মের পর নিজেদেরকে খুঁজে পেলো ভিন্ন ধর্মে। মায়ের শেখানো ধর্মেদু’বোন বড় হলো। এখন তারা চারপাশবুঝে। সাদা-কালোর মাঝে পার্থক্য করতে জানে, ভাবতে ও প্রশ্ন করে পারে। একটা একটু বেশি ভাবুক, আসলে সে সত্যের সন্ধান চায়।ইবরাহিম নবির মতো সে প্রশ্ন করে। সে জানে তার বাবা আগে এ ধমের অনুসারী ছিলেন না। ইসলাম ধর্মে ছিলেন। ইসলাম তাদের নীড়। সেই নীড়ে ফেরার পথ আছে। কোন সে পথ? মেয়েটি খুঁজে ফেরে সবসময়। একসময় খুঁজে পায়। কিন্তু ইসালামের আলো তো বিদ্বেষীরা নিভিয়ে দিতে চায়। তাদের হৃদয়ে প্রস্ফুটিত গোলাপটাও ছিঁড়ে নিতে চাইলো কেউ।

কিন্তু সাধ্য কার, যে হেরার জ্যোতিকে দমিয়ে রাখবে! ইসলাম যেখানে শিকড় গাড়ে সেখানে শিখর না ছুঁয়ে নিঃশেষ হয় না।রব্বে কারিমের চিরায়ত বাণী—ওয়া কুল জাআল হাক ওয়া জাহাকাল বাতিল, ইন্নাল বা-তিলা কানা জাহুকা। দুটো মেয়ে তাদের নীড় ফিরে পেলো। বাবাকেও নিয়ে এলো নীড়ে। এই ফেরার পথে পৃথিবীর কাছের মানুষ থেকে তাদের সইতে হয়েছে অগাধ অত্যাচার, লাঞ্ছনা। পাড়ি দিতে হয়েছে সংগ্রামমুখর দীর্ঘ পথ। সেই পথকেই মলাটবদ্ধ করেছে দুই বোন, সিহিন্তা শরীফা ও নাঈলা আমাতুল্লাহ।

এই বইটিতে তাদের ফিরে আসার পরিক্রমা বর্ণনার সাথে ইসলামের বিধানের প্রতি তাদের প্রেম ও আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠার ব্যাপারটা প্রকাশ পেয়েছে। যে কারণে বইটা এতো সমাদৃত, পাঠকপ্রিয়। ‘ফেরা’ বইটা মূলত বিশ্বাসী লোকদের জন্য।

তখন নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতে একুশে গ্রন্থমেলায় যাওয়া হতো। বই কিনে পড়ার আগ্রহ তখন ছিলো না তেমন। সেই সময়ের কেনা বই ‘ফেরা’। এরপর থেকে কেউ বই পড়তে চাইলে আমার অজান্তেই ‘ফেরা’ হাতে দিয়ে বলি—ফেরার পরিক্রমায় স্বাগতম।

 

তুরস্কে তুর্কিস্তানের সন্ধানে, শব্দের আড়ালে ইস্তাম্বুলের দৃশ্যপট

দীর্ঘ একটি সফরনামার পাতায় পাতায় স্পষ্ট হয়েছে মুসলিম ঐতিহ্য ও ইসলামি শাসনের ইতিহাস। সুলতানি শাসনামল। বর্তমান তুরস্কের রাস্তা, ঘাট, বন্দরকে কালো হরফেদৃশ্যায়িত করেছেন লেখক। মেসবাহ-সাহিত্য, শব্দে শব্দে মেশানো ঐতিহ্যের প্রতি আবেগ। সোনালি অতীতের জন্য বাক্যে বাক্যে মাখা ক্রন্দন, তীব্র মায়া। স্তবকগুলো লেখকের থেকে বহন করে আছে প্রেম ও অতীতকে ফিরে পাওয়ার তীব্র বাসনা।

বইটা নিয়ে বসলে সাদা পাতা আর কালো হরফ ভেদ করে দৃষ্টি চলে যায় আয়াসুফিয়ার দেয়ালের কারুকার্যে। শব্দের সাহায্যে ঘুরে বেড়ায় তুরস্কের প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন সমূহে। হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি গুমরে উঠে আঘাত হানে আবেগের মিহি চাদরে। চোখ থেকে টপ টপ ঝরতে থাকে অশ্রুজল। এক পর্যায়ে মনে হয় আমি তুরস্ক সফরে আছি। পায়ে হেঁটে ঘ্রাণ নিচ্ছি তুরস্কের মাটির। আমার মতো অসচ্ছল, নুন আনতে পান্তা ফুরোয়—এমন পাঠকের জন্য আবু তাহের মিসবাহ রচিত ‘তুরস্কে তুর্কিস্তানের সন্ধানে’ বইটিপূর্ণ একটা সফরের আনন্দ।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, লালবাগ মাদরাসা, ঢাকা

আগস্ট 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১