‘প্রিয়তমা’ নবিজির ঘরোয়া জীবনের নান্দনিক গল্পভাষ্য

সংখ্যা:

 

আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন নিতান্ত কিশোরী। বউ হয়ে সবে এসেছেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ঘরে। উম্মাহাতুল মুমিনিন, নবিজির অন্যান্য পূণ্যবতী স্ত্রীগণের ব্যাপারে কিশোরী আয়েশার মনে প্রায়ই একটা প্রশ্ন উঁকি দেয়, অকারণ কৌতূহল জাগে তাঁর মনে—রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীদেরমধ্যে কাকে অধিক ভালোবাসেন? তাঁকে, নাকি অন্য কোনো স্ত্রীকে?

একদিন রাসুলকে তিনি জিজ্ঞেস করেই ফেললেন। তবে বুদ্ধিমতী আয়েশা প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে করলেন, বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে আপনি কতটা ভালোবাসেন?’

নবিজি খানিক ভেবে উত্তর দিলেন, ‘তোমার এবং আমার মধ্যে ভালবাসার বন্ধনটা এতটা শক্ত, যেমন একটা রশির মধ্যে সুতাগুলো শক্তভাবে জড়িয়ে থাকে, একই বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকে।’

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ভীষণ খুশি হলেন নবিজির এ উত্তর শুনে। আর কথা বাড়ালেন না তিনি, তাঁর উত্তর ইতিমধ্যে পেয়ে গেছেন, মন থেকে মুছে গেছে কৌতূহলের কালো মেঘ।

তারপর প্রায়ই তিনি নবিজিকে দুষ্টুমিভরা স্বরে জিজ্ঞেস করতেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, বন্ধন কি আগের মতোই আছে, না ঢিল হয়ে গেছে?’

নবিজিও তাঁর দুষ্টুমির জবাবে মুচকি হেসে বলতেন,‘বন্ধন আগের মতোই দৃঢ় আছে। বাঁধনে কোনোদুর্বলতা বা পরিবর্তন আসেনি।’

এমনই গল্পধারায় এগিয়ে গেছে সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর রচিত নবিজির ঘরোয়া জীবনের নান্দনিক গল্পভাষ্য ‘প্রিয়তমা’র বর্ণনা। ‘প্রিয়তমা’য় বিবৃত হয়েছে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের এগারোজন পূণ্যবতী স্ত্রীর জীবন ও সংসারের প্রেমময় আখ্যান। কিন্তু এটা তাঁদের জীবনীগ্রন্থ নয়, বরং তাঁদের জীবনের সুরম্য গল্পভাষ্য। জীবনের গল্পগুলো জীবনীর মতো গৎবাঁধা ধারায় বর্ণনা না করে গল্পের আদলে সাজানো হয়েছে গ্রন্থটি। জীবনের গল্প বলতে গিয়ে উঠে এসেছে তাঁদের সঙ্গে রাসুলের দাম্পত্য ভালোবাসা, সাংসারিক প্রেম, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, জীবনযুদ্ধে লড়ে যাওয়ার সঞ্জীবনী, নারী অধিকার, নারীশিক্ষাসহ আরও অনেক অজানা কাহিনি।

একবার আম্মাজান হজরত মায়মুনা বিনতে হারিস রাদিয়াল্লাহু আনহা গিরগিটির গোশত রান্না করেন। নবিজি তাদেখে বললেন, ‘আমি তা খেতে পছন্দ করি না।’ তবে সাহাবিদের বললেন,‘তোমরা খেতে পারো।’ মায়মুনা রাদিয়াল্লাহু আনহা হয়তো আগে এ মাংস খেতেন, কিন্তু রাসুলের অপছন্দ দেখে তিনি নিজের অপছন্দের তালিকায় যুক্ত করে নিলেন এ মাংসকে।

এ কেবল দু’জনের মাঝে অপরিসীম ভালোবাসা থাকলেই সম্ভব। একজন সঙ্গী যখন তার অপর সঙ্গীর পছন্দ- অপছন্দকে নিজের ললাটলিখন বানিয়ে নেয় তখন এ ভালোবাসা জাগতিক সকল ক্ষুদ্রতা ও পরিসীমা ছাড়িয়ে যায়।

এমন ভালোবাসার জন্যই যুগে যুগে রচিত হয়েছে অসংখ্য মহাকাব্য।

 

রাসুলের ভালোবাসার ছায়ায় থেকে সকল উম্মুল মুমিনিনই নিজেদেরকে কোনো না কোনো মহত্বেবিশেষায়িত করেছিলেন। কেউ ছিলেন হাদিসবিশারদ, কেউ জ্ঞানের আধার, কেউ খোদাভীতিতে অতুলনীয়, কারও ছিলো কোরআন পাঠের মুগ্ধকর চরিত্র, তেমনি কেউ ছিলেন দানশীলতায় এগিয়ে।

আমরা সাধারণতদুই থেকে তিনজন উম্মুল মুমিনিনের জীবনীসহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাথে বিবাহ-পরবর্তী ও পারিবারিক কিছু ঘটনামোটামুটি জানি। বাকি আট থেকে নয় জনের ব্যাপারে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া পর্যন্তই আমাদের জ্ঞান সীমিত।

‘প্রিয়তমা’ বইটিতে এগারোজন উম্মুল মুমিনিনের জীবনী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগ থেকে বিবাহ পরবর্তী জীবন, রাসুলের সাথে কেমন করে দিন অতিবাহিত করেছেন তাঁরা, আর তাঁর সাংসারিক জীবন কেমন ভালবাসাপূর্ণ ছিল তা খুব যত্নের সাথেলেখক আমাদের জানিয়েছেন।

কোনো একজন আম্মাজান রান্নায় পারদর্শী ছিলেন, রাসুলুল্লাহ তাঁর রান্নার প্রশংসা করতেন। কেউ তীক্ষ্মবুদ্ধির অধিকারী ছিলেন, রাসুল তাঁর বুদ্ধির তারিফ করতেন।

নারীদের বিষয়গুলোতে (যেমন অন্য স্ত্রীদের একটু অন্য চোখে দেখা) তিনি অন্য স্ত্রীদের সতর্ক করে দিতেন। কেউ ভুল কর‍লেশুধরে দিতেন। আবার তিনি স্ত্রীদের কাছে নিজের প্রবল ব্যক্তিত্বের বাহাদুরি প্রকাশ করতেন না, নিজেকে স্ত্রীদের কাছে সমর্পণ করে দিতেন তাঁদের ভালোবাসার আঙিনায়।

মোটকথা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবনের টুকরো টুকরো আয়না ছিলেন তাঁরা। যে আয়নায় তাকালে রাসুলের জীবনের ছায়াচিত্র স্বচ্ছ হয়ে ভেসে উঠবে। তাঁরা তাঁর আলোকেই নিজেদের জীবনকে সাজিয়ে তুলেছেন এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য উৎসর্গ করেছেন তাঁদের লব্ধ জ্ঞানের ঢালি।

আমাদের লৌকিক সমাজের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই শোনা যায় স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্যকলহ, মানসিক টানাপোড়েন, পরস্পরের বিশ্বাসহীনতা, সংসার ভাঙার করুণ সুর। আমরা কখনো কি নবি-সংসারকে সামনে রেখে আমাদের পারিবারিক সমস্যাগুলো দূর করার চেষ্টা করেছি? হয়তো করা হয়নি। অথচ উম্মাহাতুল মুমিনিনদের জীবনে রয়েছে প্রেম আর ভালোবাসায়পূর্ণ এক সংসারের ছায়াচিত্র, যা সমগ্র পৃথিবীর জন্য শিক্ষণীয়। যে গ্রহণ করবে তার জীবন আলোকিত হবে। ‘প্রিয়তমা’ গ্রন্থটিতে সেই সুখী আর প্রেমময় জীবনের গল্পই বলা হয়েছে।

 

আগস্ট 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১