‘সুলতান কাহিনি’ উসমানি সালতানাতের নির্মোহ ধারাবর্ণনা

সংখ্যা:

 

মংগোলদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে যখন জনাকয়েক ঘোড়সওয়ার মাতৃভূমি ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায় তখনও কি তারা ভাবতে পেরেছিল তাদের বংশধরেরা একটা সময় পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ ভূমি শাসন করবে, তা-ও প্রবল প্রতাপে? সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়, উসমানি সালতানাত, ধীরে ধীরে বাড়ে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আর বিস্তার। জন্ম-মৃত্যুকে কেউ এড়াতে পারে না, এক সুলতান যান, আসেন আরেক সুলতান… সালতানাতের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হয়, বাড়ে সালতানাতের পরিধিও।তরতর করে এগিয়ে চলে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অগ্রযাত্রা। কিন্তু সব কিছুরই শেষ আছে। একটা সময় সমাপ্তি ঘটে তাদের সুদীর্ঘ কালের শাসনের, এবং অতি অবশ্যই সমাপ্তিটা ছিল নিদারুণ দুঃখজনক। ততদিনে কালের গর্বে হারিয়ে গেছে ৬২৪টি সৌরবর্ষ। কিন্তু হারিয়ে যায়নি ৬২৪ বছর জুড়ে ব্যাপৃত উসমানি সালতানাতের উত্থান-পতন আর অবদানের গল্প, প্রবল প্রতাপে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ শাসনকারী সুলতানদের উদারতাকিংবা উদাসীনতার কাহিনি। ইতিহাসের পাতায় নানা আঙ্গিকে নানা বর্ণনায় গেঁথে আছে তাঁদের কাহিনি ও গল্পগাঁথা। সেই সব কাহিনি নতুন বিন্যাসে বাংলা ভাষায় নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে ‘সুলতান কাহিনি’ গ্রন্থে ।

উসমানি সালতানাতের সমাপ্তি হয়েছে ১০০ বছরও হয়নি, কিন্তু এর গৌরবময় ইতিহাস বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষের অনেকেরই অজানা। তুর্কি ব্যতীত ভিন্ন ভাষায় উসমানি সাম্রাজ্য বা উসমানিসুলতানদের ইতিহাস যা লেখা হয়েছে তা অনেকটাই পক্ষপাত দুষ্ট। মুসলিমরা যেমন গুণকীর্তন করেছেন একচেটিয়াভাবে, অপর দিকে এ ইতিহাসে বির্ধমীরা বিদ্ধ করেছে সমালোচনার তীর। আর বাংলা ভাষায় তারই গুটি কয়েক অনুবাদ হয়েছে।

এসব পক্ষপাতদুষ্টতা ও সমালোচনার বাইরে এসে সুলতান কাহিনি বইটিতে লেখক তামীম রায়হান চেষ্টা করেছেন উসমানি সাম্রাজ্যের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে। সৎ ও প্রজাবৎসলসুলতানদের ইসলামপ্রীতি, মানুষকে ন্যায় শাসন প্রদান, ইসলামের খেদমত এবং ইসলাম রক্ষার্থে জিহাদের ময়দানে ছুটে বেড়ানোর ইতিহাস যেমন এনেছেন, পাশাপাশি নারীর মোহে আটকে থাকা সুলতানদের ইতিহাসও পাশ কাটিয়ে যাননি তিনি।

পাঠক খুব অল্পতেই উসমানি সাম্রাজ্য সম্পর্কে সাম্যক ধারনা লাভ করতে পারেন বইটি পড়ে। উসমানিসুলতানদের জীবন-কর্ম, বৈচিত্রময় চরিত্র, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, ভৌগলিক সীমানা পরিধি ও প্রভাব প্রতিপত্তির ইতিহাস সম্পর্কে একচুমুকে জেনে নেওয়া যায় বইটির সাহায্যে। কখনো আনন্দে উজ্জ্বীবিত হবেন আবার কিছু ঘটনায় কষ্টে মুষড়ে পড়বেন পাঠক। পীড়া দেবে ক্ষমতার পালাবদলের রক্তাক্ত ইতিহাস। ভাইয়ের হাতে ভাই, বাবার হাতে পুত্র. পুত্রের হাতে বাবা, মায়ের হাতে পুত্র আবার পুত্রের হাতে মায়ের হত্যা ও নির্বাসনের ঘটনা নিদারুণ দুঃখজনক।

উসমানি সাম্রাজ্যের সূচনা হয় সুলতান প্রথম উসমান বিন আরতুগরুলের হাতে। ১২৯৯ সালের ২৭ জুলাই তিনি স্বাধীন রাজ্যে নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ছিলেন উসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান। তারপর সাম্রাজ্য বিস্তার ও বিজয়ের ধারা অব্যহত রাখেনসুলতান উরখান বিন উসমান ও তাঁর পুত্র প্রথম মুরাদ বিন উরখান বিন উসমান। যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিজয়ী হয়েও প্রতারনার দরুণ শহিদ হন তিনি।

তাঁরপর ক্ষমতা গ্রহণ করেন তাঁর পুত্র সুলতান প্রথম বায়েজিদ বিন মুরাদ। এবং তাঁর হাতেই প্রথম রক্তারক্তি প্রথা চালু হয়। ক্ষমতায় বসেই ভাইকে হত্যার আদেশ দেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতাযুগে যুগে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে অনেক নিরপরাধ শাহাজাদার। তার ইতিহাসও সুখকর হয়নি। বীরত্বের সাথে রাজ্য পরিচালনা করলেও তৈমুর লঙের কাছে পরাজিত হয়ে বন্দী হন প্রথম বায়েজিদ এবং বন্দী অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন। এ সময় তাতার নেতা বিজিত অনেক সাম্রাজ্য পূর্বের ক্ষমতাসীনদের কাছে ফেরত দিলে ছোট হয়ে আসে সাম্রাজ্য। আর এ অবস্থায় বিবাদে লিপ্ত হন প্রথম বায়েজিদের চার পুত্র। ক্ষমতার নেশায় একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতেও পিছপা হননি।

এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে সুলতান হন প্রথম মুহাম্মদ। তাঁর মৃত্যুর পর পিতার স্থলাভিষিক্ত হন সন্তান দ্বিতীয় মুরাদ। ৪০ বছর বয়সে তিনিই প্রথম ১৪ বছরের শিশুপুত্র দ্বিতীয় মুহাম্মদের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেন নিজ ইচ্ছায়। যদিও পুনরায় তাঁকে আবারও ক্ষমতায় বসতে হয় ইউরোপিয়ানদের হামলা মোকাবেলায়।

তারপর সপ্তম শাসক হিসেবে আবারও ক্ষমতায় বসেন পুত্র দ্বিতীয় মুহাম্মদ। এবং তিনিই ইতিহাসের মহানায়ক সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতেহ। তাঁর হাতে জয় হয় কনস্টান্টিনোপল। বাস্তবায়িত হয় শত শত বছর আগের নবিজির হাদিস।

এরপর ক্রমধারা অব্যাহত রেখে ক্ষমতায় আসেন সুলতান প্রথম সেলিম। উসমানি সালতানাতে তিনিই প্রথম সুলতান, যাঁর নামের আগে আমিরুল মুমিনিন উপাধী ব্যবহার করা হয়। আট বছরের শাসনামলে তিনি অসংখ্য নতুন রাষ্ট্র জয় করে উসমানি শাসনের আওতায় এনেছেন।

তারপর ক্ষমতায় আসেন সুলতান সুলায়মান। তিনিও প্রতাপের সাথে শাসন করেন এবং উসমানি সাম্রাজ্য বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সুদীর্ঘ ৪৮ বছর তিনি উসমানি সাম্রাজ্যের প্রভাবশালী সুলতান হিসাবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর হাতেই পুত্র হত্যার মতো ঘটনা ঘটে। যদিও তাঁর শাসনকালে তিনি শায়খুল হাদিসের ফতোয়ার বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি। সকল ফতোয়ার কাগজ তাঁর মৃত্যুর সময় বাক্সবন্দী করে তাঁর সাথে কবর দেয়া হয়।

তাঁর মৃত্যুর পরেইমূলত উসমানি শাসনের পতনের ধারা শুরু হয় এবং শেষ পেরেকটি বিদ্ধ হয় সুলতান দ্বিতীয় আবদুল মজিদ বিন আবদুল আজিজের সময়।

এর ভেতর ঘটতে থাকে নানা উত্থান-পতন। কিন্তু কোনো শাসকই আর পূর্বপুরুষের ধারা বজায় রাখতে পারেননি। অন্দর মহলের নারীদের ক্ষমতা পরিচালনা, সৈন্যদেও ভেতর বিশৃঙ্খলা, সদরে আজম, শায়খুল হাদিসদের ক্ষমতার অপব্যবহারসহ প্রশাসনিক দুর্নীতি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ষড়যন্ত্রের কারণেএক সময় ধ্বংস হয়ে যায় উসমানি শাসনব্যবস্থা। সাথে মুসলিম বিশ্ব হারায় মুসলমানদের একক নেতৃত্ব—খেলাফত। আর এ সবই ধারাবাহিকভাবে সংক্ষিপ্ত কিন্তু চমৎকার ও পর্যাপ্ত বর্ণনাধারায় বিবৃত হয়েছে অনুসন্ধানী লেখক-সাংবাদিক তামীম রায়হানের ‘সুলতান কাহিনি’ গ্রন্থে। বিবৃতি হয়েছে কামাল আতাতুর্কের ইসলাম-বিদ্বেষী কার্যকলাপসহ ইংরেজদের যাবতীয় ষড়যন্ত্রের কাহিনিও। গ্রন্থটি পাঠ করতে করতে পাঠক একই সঙ্গে আনন্দিত ও দুঃখিতবোধ করবেন উসমানি সাম্রাজ্যের বিজয় ও পরাজয়ের আখ্যানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে।

 

আগস্ট 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১