চান্নি-পসর এক রাতে জোছনা-ধোয়া আলোকবৃষ্টিতে আমাদের উঠোনে বসেছে তুমুল গল্পের আসর—গল্পের দীপ জলসা। কিচিরমিচির অভিনবে খোকাখুকিদের শক্ত আবদার—‘দাদু একটা গল্প বলো’র সামনে দেখা যাচ্ছে দাদুর অসহায় আত্মসমর্পণ। নিরুপায় তিনি চশমার ফোঁকর দিয়ে একবার এদিকে অন্যবার ওদিকে তাকিয়ে চললেন গল্পের সুবিস্তীর্ণ দৃশ্যপথ ধরে, নানান ভঙ্গিমায়, সুচারু ব্যঞ্জনায়। ঘুমঘুম চোখে সোনামনিরা অপলক তাকিয়ে আছে দাদুর সোনাঝরানো ওই আলোকবৃত্তে। গল্পের তালে তালে অভিনব ছন্দের মিশেলে কৃষ্ণবর্ণা এই রাত কেবলই হয়ে উঠছে ঝলমলে ও সাড়ম্বর।
হ্যাঁ, এমনই এক সুচিত্রিত আসরের পসরা সাজিয়ে দিয়েছেন আমাদের উস্তাযে মুকাউয়িম ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী। তিনটি শব্দের এ নামের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া অজস্র প্রসবণ, আর জুড়ে থাকা বিচিত্র যত অভিধা; তার আলাপ আরেকদিন না হয় করা যাবে। আজকের আলাপ ভঙ্গুর শিল্পের আবরণে রচিত এই ‘দাদু একটা গল্প বলো’ নিয়েই হোক। আলাপের বিষয়বস্তু সীমাবদ্ধ থাকুক সমকালে তার আনন্দের বার্তা বয়ে আনার নানা দিক নিয়ে এবং একটিমাত্র গ্রন্থ প্রয়োজনের মাপকাঠিতে কী অপরিসীম গুরুত্বের দাবিদার, সে বয়ানের মধ্য দিয়ে।
বনে-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে কিংবা গাছের ডালে পাখির ছোট্ট বাসাটির ফোঁকর দিয়ে যে গল্পগুলো চিত্রিত, তারই নাম ‘দাদু একটা গল্প বলো’। সুপ্রসন্ন অরণ্যের প্রতিটি জীব যেখানে গল্পের নায়ক, ডালে ডালে কিচিরমিচির শব্দের রিনিঝিনি অভিনবে বসে থাকা পাখিগুলো যেখানে স্বতন্ত্র একেকটি চরিত্র, রোজ বিকেলের উঠোনে গালগল্পের মহিমায় উদ্বেলিত যখন তারা অথবা বিশাল এ বনের ভেতর দিন গুজরানো যত সকাল-সন্ধ্যা, তারই অঙ্কন ‘দাদু একটা গল্প বলো’র ভেতরে। কিন্তু শুধুই কি গল্পের তাগিদে রসালো আলাপের পসরা এখানে? নাজ্জুর সালহান আর আবুল ফিদা’দের ওই যে গোছালো কেসসার বয়ান, তা কি কেবল দরদ তড়পানো গদ্যের ঝকমকে শৈলীর বহিঃপ্রকাশ? একদম না। অরণ্যের নানারকম জীবের জবানিতে বর্ণিত এইসব গল্পের ভেতরে আছে উপদেশ, শিক্ষা, চেতনা ও আদর্শের মজার পাঠ। পাঠকের শিশুমন বই শুরু করার আগে যেমন চিন্তার ধারক ছিল, নিশ্চিতভাবে গল্পপরবর্তী সময়ে তার চিন্তার মাঝে সৃষ্টি হবে বিস্তর ফারাক। অজান্তেই এখান থেকে শিশুমনে প্রোথিত হয়ে যাবে ব্যক্তি, সমাজ ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কীভাবে শক্ত হাতে জুলুমের পদভারকে পিষ্ট করা যায়। কীভাবে প্রতিরোধের দুর্দদমনীয় যোগ্যতা অর্জন করে আজান দেয়া যায় এক মহাবিপ্লবের।
একটি সুন্দর আগামীর স্বপ্ন যদি আমাদেরকে দেখতে হয় তবে অবশ্যই শিশুদের মনন এবং চিন্তার জগতটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে প্রথমেই। আমাদেরকে ভাবতে হবে অন্যায়ের এই পৃথিবীতে যখন শিশুমনকে নোংরামো আর অসুস্থ চিন্তা দিয়ে ভরপুর করে দেয়া হচ্ছে তখন এর বিরুদ্ধে পরিশুদ্ধ একটি অঙ্গন কীভাবে নির্মাণ করা যায়। কেননা সময়ের এই ক্রান্তিকালে প্রায় ৪২ শতাংশ শিশু যখন ভিডিও গেইম আর অন্তর্জালের ভয়াল আক্রমণের শিকার, তখন এই শিশুদেরকে শুদ্ধতার শিক্ষা দিয়ে পরিশীলিত করবার দায়িত্বটা আমাদের ছাড়া আর কার? এমনই এক সুচিন্তিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন নিয়ে হয়তো এই ময়দানে হাজির হয়েছেন ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী। কিন্তু অবশ্যই তাঁর এই উপস্থিতি সবার থেকে একটু ভিন্ন এবং উন্নত। কেননা তিনি জানেন অপশক্তির মোকাবেলায় তাঁর উপস্থাপন গতানুগতিক গণ্ডিতে পড়ে রইলে আরও দশটি শিশুসাহিত্যের সঙ্গে এটিও দেখা যাবে হারিয়ে গেছে কোথায়—কেউ জানেনা।
ভিন্নতার বয়ানে আমি বলি প্রথমে তার বাহ্যিক অবয়বের কথা। কাজী যুবাইর মাহমুদের ঝকমকে প্রচ্ছদ আর নামলিপিই যেন কাফি এ বেলায়। তার সঙ্গে যখন যুক্ত হয় একশো গ্রাম অফসেট পেপারে করা আবদুর রহমান রুমির গল্পের আন্দাজে নানারকম অদ্ভুত সব ছবি, তখন এটা প্রশংসার ঊর্ধ্বে চলে যায়। শিশুদের উৎসুক মন গল্পের ছলে ছবির ভেতর দিয়ে যখন ঘুরতে থাকবে বনেবাদাড়ে, নতুন পুরোনো সব জীব-জন্তুর হাত ধরে, মস্তিষ্কে তখন গল্পের পেছনে থাকা লেখকের প্রয়াস স্পন্দিত হতে থাকবে। শিশুমন উন্নত চিন্তার ধারক হয়ে এখান থেকে বেরিয়ে আসবে নতুন এক অস্তিত্ব ধারণ করে। আর লেখক তো এটাই চান। লেখক তো চান পৃথিবীব্যাপী বয়ে যাক শান্তির স্বচ্ছ এক বাতাস। আগামীর আলয় হোক বসবাসের উপযোগী এবং আল্লাহপ্রদত্ত বিধানের অনুগামী।
সর্বোপরি এ যেন সুদূরপ্রসারী এক বিপ্লবের আহ্বানকারী প্রচেষ্টা। সর্বমহলে সিদ্ধির চিন্তাকে উপজীব্য করে যার চলন—এবং যে চলন একেবারে নির্মেদ, নিখুঁত। ইফরাত নয়, নয় তাফরিতও, মধ্যমপন্থাকে মাধ্যম বানিয়ে সকল স্তরের পাঠকের উপযোগী করে নির্মিত এক শিশুসাহিত্য ‘দাদু একটা গল্প বলো’। আধুনিক যুগের বামঘেঁষা সেই শিশুসাহিত্য পাঠে নিমজ্জিত একজন পাঠকও অজান্তে তা গিলে গিলে খাবে। নিছক ‘ইসলামি সাহিত্য’ বলে উড়িয়ে দেবার কোশেশ থাকলেও দিনশেষে ফুটে উঠবে হেরে যাবার একটি কৃত্রিম হাসি। অথচ বাহ্যত দৃষ্টিতে ইসলামি চিন্তার প্রয়োগ এখানে না হলেও তার সবটা জুড়ে কিন্তু ইসলামের মৌলিক শিক্ষাটাই দিয়ে দেয়া হয়েছে। অত্যন্ত চতুরতার পরিচয় দিয়ে লেখক এসব সামাল দিয়ে গেছেন—যা বিস্ময়কর ক্ষমতার অধিকারী একজন মানুষ বৈ সম্ভব নয়। আখেরে অপেক্ষার আক্ষেপ না ঝাড়লেই নয়। ‘দাদু আরেকটা গল্প বলো’ তবে আসছে কবে? এ অপেক্ষার সময়ক্ষণ অতিদীর্ঘ না হোক। খুব তাড়াতাড়িই খুলে বসুক দাদুর আরেকটি গল্পের দীপ জলসা।
লেখক : শিক্ষার্থী, মাদরাসাতুল কাউসার আল-ইসলামিয়া, ঢাকা
আগস্ট 2019

