‘গাদ্দাফির সঙ্গে আমার জীবন’ নির্মল প্রতিশোধের ঠাস-বুনট

সংখ্যা:

 

আমার মনে আছে দুই হাজার এগারো’র পৃথিবীব্যাপী উত্তাল ওই ক্রান্তির মুহূর্তে আমাদের ছোট্ট ভাইটির যখন জন্ম হলো, বাবা আমাদেরকে সুন্দর একটি নাম ঠিক করবার তাগাদা দিলেন। প্রবল আগ্রহে আমরা বইপত্তর খুলে বসলাম। খুঁজতে থাকলাম সে সুন্দর নামটি। সব বেছে আমাদের সবচাইতে পছন্দ হলো সুন্দর মলাটে আবৃত একটি নাম; মুয়াম্মার। কিন্তু হৃদয়ে চূর্ণন তৈরি করবার মতো যে ঘটনাটি ঘটল, আব্বু এ নাম শুনে রীতিমতো ক্ষেপে উঠলেন। এক ঝটকায় নাকচ করে দিলেন আমাদের প্রস্তাব। বিড়বিড় করে একগাদা গালমন্দও ছুড়ে দিলেন কোথাও। চূড়ান্ত বিস্ময় নিয়ে আমরা সেদিন থেকেই খুঁজতে থাকলাম মুয়াম্মারের পেছনে লুকিয়ে থাকা রহস্যটি। সন্ধানী চিন্তায় লব্ধ হলো আমাদের মন-মগজ।

গণমাধ্যমের বিচিত্র দৃশ্যের মুখোমুখি হয়ে পূর্বসময় থেকেই আমাদের ধারণা মুয়াম্মার হলেন চতুর্মাত্রিক মহাবিশ্বে এক নতুন বিপ্লবের জন্মদাতা। গ্রিন বুকের পাতায় পাতায় যিনি স্বচ্ছ এক পৃথিবী তৈরির ইশতেহার দিয়ে গেছেন। যিনি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র চির প্রতিশ্রুত শপথে অনড় থেকে গেছেন আমৃত্যু। ভাবনার তর্জমা করতে গেলে আরও বলা যায় আমাদের চিন্তার এ পরিসরে মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফিপৃথিবীব্যাপী আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে এক মহান কায়েদ, যাঁর বক্তৃতার সেইসব শব্দমালায় বারবার কেঁপে কেঁপে উঠেছে ইসলাম ও মুসলমানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সব শক্তি।

ইসলামি চেতনায় বিশ্বাসী সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্যান-আরব গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকা এ গাদ্দাফিকে আমরা সত্যিই শ্রদ্ধার চোখে দেখতে শুরু করেছিলাম। দীর্ঘ ৪২টি বছর ক্ষমতার মসনদে থাকা আফ্রিকান এই লৌহমানব যেভাবে দারিদ্র্যের পদভারে পিষ্ট লিবিয়াকে তুলে এনেছিলেন সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে, এজন্যই কিনা আমাদের মগজে কেবলই এ চিন্তার উদয় হয়েছিল; শৈশবে ছাগল চড়ানো এ গাদ্দাফির চতুর্মুখী সফলতার কারণ অবশ্যই তাঁর সুস্থ মানসিকতা এবং সর্বোচ্চ ‘খুলুসিয়্যাত’।

কিন্তু পর্দার আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে থাকা কর্নেল গাদ্দাফির ছবিটি এতটা যে পবিত্র নয় তা কীভাবে বিশ্বাস করা যায়। আব্বুর তড়িঘড়ি ক্ষিপ্ততার বিস্ময়কর ওই কারণটাও চোখ থেকে কীভাবে আড়াল হয়ে থাকে, তাও জানা দুষ্কর হয়ে পড়তে চায় বারেবার। ভেতরের সেই গাদ্দাফিকে পাঠ করবার উদগ্র বাসনার বিপুল সম্মিলনে আমার হৃদয় হয়ে ওঠে তরঙ্গের অস্থির সাফিনা। অপ্রতিরোধ্য সেই ঢেউগুলো ভেদ করে সামনে এগিয়ে যাবার কালে সব জাল ছিন্ন হবার সেই যে সূত্র, তা নিয়েই আজকের আলাপ—যা চনমনে গন্ধের রঙিন মলাটে আবৃত; ‘গাদ্দাফির সঙ্গে আমার জীবন।’

‘গাদ্দাফির সঙ্গে আমার জীবন’ ইতিহাসের পাঠে সত্য-অসত্যের মাঝে বিস্তর ফারাক তৈরি করার সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হওয়া একটি জীবনঘনিষ্ঠ গ্রন্থ। ফরাসি সাংবাদিক অ্যানিক কোজেনের বাঙময় বর্ণনায় সদ্য মুক্তির বার্তা পাওয়া সুরাইয়ার জবানিতে বর্ণিত এ গ্রন্থ আশ্চর্যজনকভাবে আমার মননে মস্তিষ্কে প্রচণ্ড প্রভাব সৃষ্টি করে ফেলে। বাংলায় অনুবাদের সহযোগিতাও পাঠ আমন্ত্রণে যুক্ত করে নতুন মাত্রা। অনুবাদক যুবাঈর মাহমুদের এটি প্রথম অনুবাদগ্রন্থ হলেও আমার ভেতর যে বোধের সৃষ্টি হয়েছে, তরতরে সাবলীল গদ্যের এ ঝকমকে শৈলী অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। পাশাপাশি এও বলে রাখা ভালো, অনুবাদকমূল গ্রন্থের লেখকের সঙ্গে আদর্শিকভাবে একই ঘরানার হতে হবে, এমন শর্তের বেড়াজাল আমাদের এই সময়ে থাকলেও আমি এর চরম বিরোধী। কেননা যখন আদর্শ ও তথ্যসমৃদ্ধ করার প্রসঙ্গ প্রশ্ন উঠে আসবে, তখন অবশ্যই এর দায় মূল লেখকের ঘাড়েই বর্তায়। যার ফলে ‘গাদ্দাফির সঙ্গে আমার জীবন’ গ্রন্থের মৌলিক নীতিগত সিদ্ধান্তে আমার নানাক্ষেত্রে প্রশ্ন এবং অভিযোগের সৃষ্টি হলেও আমি এর দায় অনুবাদক, প্রকাশক এবং সম্পাদকের সঙ্গে মেলাতে চাইনা। বরং এর সামান্য প্রশংসা এ জন্যেও করতে চাই যে আদর্শিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মূল লেখা থেকে তা সাবলীল বর্ণনায় অনূদিত এবং সামান্য সংযোজন-বিয়োজন থেকেও বিরত থেকে বাংলায় তার পাঠ সহজলভ্য করা হয়েছে। সঠিক তথ্য-উপাত্ত বর্ণনায় এটি অকল্পনীয় ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো,ইতিহাসের সঠিক তথ্য যাচাইয়ে কেন এ গ্রন্থ এতটা গুরুত্বপূর্ণ? সভ্যতার মানদণ্ডে বিচার করা সে সময়ের গাদ্দাফি কি কেবলই একনায়কতন্ত্রের নৈরাজ্য সৃষ্টি করে গিয়েছেন, নাকি এর পেছনে নানা শ্রেণীর অধিকার হরণের গল্পটাও তাঁর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে? সবকিছুই যেন ঘোলাটে, অজানা এবং গণমানুষের কাছে এই লৌহমানব এক ধোয়া তুলসীপাতা।

বিশ্বব্যাপী প্রচারিত নারীমুক্তির প্রবাদপুরুষ মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফি অবশ্যই তাঁর বাহ্যিক অবয়বে সমীহ-জাগানিয়া এক আফ্রিকান ঘোড়া হয়ে থাকলেও তাঁর ভেতরের গল্পটা যে এতোটাই নোংরা এবং অসুস্থ মানসিকতা দিয়ে ভরপুর, তা ‘গাদ্দাফির সঙ্গে আমার জীবন’ পাঠ করবার আগে একটু-আধটুও অনুভব করা যাবেনা বলে আমার ধারণা। পৃথিবীখ্যাত বাব আল-আজিজিয়ার মতো রোমহষর্ক প্রাসাদ যে এ যুগেও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার দুঃসাহস নিয়ে অপকর্মের দীর্ঘ ফিরিস্তি রচনা করে গেছে, তা হয়তো আমাদের কল্পনারও অতীত। সভ্যতার বুলি আওড়ানোর আড়ালে সময়কে মধ্যযুগের প্রবল বর্বরতার দিকে টেনে নিয়ে সেখানে সত্যিই কায়েম হয়েছিল একনায়কতন্ত্র কিংবা স্বৈরতন্ত্র—যেখানে অনিরাপদ ছিল প্রতিটি নারী, পুরুষ এবং সুরাইয়ার মতো কোমলপ্রাণ কিশোরীরাও। গোপন হেরেমে আবদ্ধ শত শত শিশু গাদ্দাফির দানবীয় আক্রমণের কাছে ছিল নিতান্ত অসহায়। ক্ষুদ্র যৌবনলালসা আর নিতান্ত ভোগের উৎসবে তাঁর রোজকার মদের আসর আর ক্ষুধা মেটানোর এইসব উপকরণ সত্যিই কেমন অবিশ্বাস্য লাগে। এও কি ভাবা যায় চৌদ্দ’র গণ্ডি না পেরুনো কোনো শিশু—রোজ বিকেলে বন্ধুদের সাথে যার কৈশোরের সেই উচ্ছল দুরন্তপনার স্বাক্ষী হয়ে থাকবার কথা—সে কিনা আবদ্ধ হেরেমে যৌন ক্ষুধায় কাতর গাদ্দাফির অমানুষিক নির্যাতনের কবলে গুজরান করছে প্রতিটি মুহূর্ত!না রাত না দিন, সময়ে অসময়ে এমনকি রমজানের পবিত্র দিনগুলোতেও মিটতে চাচ্ছেনা তাঁর পশুত্বসুলভ ক্ষুধা—আরও চাই আরও চাই।

পৃথিবীর মানুষের কাছে পবিত্রতম এ মহান কায়েদের হেরেমখানায় যখন আমি সুরাইয়ার হাত ধরে প্রবেশ করতে থাকি, অসংখ্য সুরাইয়ার ধর্ষিত হবার আর্তচিৎকার আমার চোখে অশ্রুর বন্যা বইয়ে দেয়। কুৎসিত সত্যের এই জলজ্যান্ত বর্ণনা আমাকে নিয়ে যেতে চায় পাপাচারে টালমাটাল প্রাচীন মিশরের ফারাও যুগে। চার হাজার বছর আগের ক্রীতদাস বনে গিয়ে ষড়যন্ত্র, যৌনতা ও নিষ্ঠুরতার কাছে যারা ছিল একেবারে ক্ষমতাহীন, তাদের খুব কাছেই যেন আমাকে চলে যেতে হয়েছে বাব-আল-আজিজিয়ার পথটি ধরে। ক্রুদ্ধতার সকল মাংসল পিণ্ড উথলে উথলে ওঠে যখন আমার, দেখি দু’সন্তানের পিতাও এই নরপিশাচের খাদ্যে পরিণত হয়ে বলাৎকারের শিকার। কী কুরুচিপূর্ণ মানসিকতা, ছিহ!

এরপরও কি বলা সম্ভব পশুসুলভ চরিত্রের পোষাকধারী এ ব্যক্তিটিই প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছিল ইসলাম ও মুসলমানের? এর উত্তরটা সহজ করে দিতে চাইলে নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারি, গাদ্দাফির মৃত্যুপরবর্তী সময়ে কোটি প্রাণে যে বেজে উঠেছিল ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আর হাতে সূচিত হয়েছিল বিজয়ের চিহ্ন, এই তার উপযুক্ত জবাব। সবশেষে এই পিশাচসুলভ মানুষটির অনুপস্থিতি আর ক্রোধের আগুনে ঠাসা সুরাইয়ার সুচারু প্রতিশোধের ঠাস-বুনটের আনন্দ আমি অবশ্যই উপভোগ করতে চাই। এবং বিস্মৃত হতে থাকা এক সময়ের গল্পকে আমি সম্বোধিত করতে চাই এ বলে—এ তো এক রাজভোজ। একসময়ের দুর্বল কণ্ঠস্বরগুলো সুরাইয়ার মতোই জেগে উঠুক সময়ে সময়ে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, মাদরাসাতুল কাউসার আল-ইসলামিয়া, ঢাকা

 

আগস্ট 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১