ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট মুরসি রাশিয়া, ভারত ও পাকিস্তান সফর করেছিলেন। তখন তিনি রাশিয়ার সাথে কিছু নিউক্লিয়ার চুক্তির ব্যাপারে সম্মত হন, যা মিশরের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে মিশর বিদ্যুৎ সংকট থেকে মুক্তি পেত।
মুরসির আমলে মিশর দুটি জার্মান সাবমেরিনের মালিক হয়েছিল। এ ব্যাপারে ইসরাইল তখন জার্মানিকে খবরদারি করে বলেছিল, মিশরকে এমন কোনো সাবমেরিন যাতে না দেওয়া হয়, যা কোনো যুদ্ধবিমানকে আক্রমণ করতে সক্ষম।
মুরসি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে বলেছিলেন মিশরের মিসাইল প্রয়োজন। রাশিয়া অফিসিয়ালি এই চুক্তিতে সাক্ষরও করেছিল, কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের ফলে এই চুক্তি অসম্পাদিত থেকে যায়।
মুরসির আমলে মিসরের অগ্রগতি সংক্রান্ত এ তথ্যগুলো দিয়েছেন পাকিস্তানের বিখ্যাত নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট ড. আবদুল কাদের খান। মিডল ইস্ট মনিটরকে তিনি বলেন, মিশরের স্বাধীনতা রক্ষায় এই পদক্ষেপগুলোর কারণে মুরসি সাম্রাজ্যবাদীদের বিরাগভাজনে পরিণত হয়েছিলেন।
ভৌগলিকভাবে মিশরের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার ফলে আমেরিকা ও ইসরাইল তাদের আরব মিত্রদের মাধ্যমে মিশরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। আরব রাজবংশের নেতারাও এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছে যে যদি মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের মাধ্যমে স্বৈরাচার-বিরোধী স্লোগানকে সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে তা রাজতন্ত্র ও আলে সাউদদের জন্য বিরাট হুমকি। যে কারণে আরবে পশ্চিমের মিত্ররা গণতন্ত্র ও জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশের মাধ্যমগুলোকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। সাংবাদিক জামাল খাশোগজি হত্যার মোটিভও এই সূত্রেই গাঁথা। যার ফলে মুরসির সময়ও বৃহত্তর স্বার্থে আরবনেতাদের দূরত্ব কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখেনি। কেননা বাস্তবতা ছিল পুরোপুরি এর বিপরীত।
মুরসি ক্ষমতায় আসার পর ইসরাইল ও আমেরিকার হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছিল সে কারণেই তাঁকে হটানোর জন্য আরবের ক্ষমতালোভী এবং মুসলিমদের স্বাধীনতাবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যে মধুর ঐক্য হয়ে গেল। আমেরিকা ও ইসরাইলের স্বার্থের বিপরীতে মুরসির আপোষহীন অবস্থান ছিল খুবই শক্তিশালী।
মুরসির ইন্তেকালের পর কাতারে তাঁর রুহের মাগফেরাতের জন্য আয়োজিত দোয়া মাহফিলে হামাস নেতা খালেদ মিশাল মুরসির বেশ কিছু কঠোর সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, যা তিনি দেশের স্বার্থ রক্ষায় গ্রহণ করেছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, কোনোরকম পূর্বঘোষণা ও আলোচনা ছাড়াই ইসরাইলকে কম দামে দেয়া তেলের চুক্তি বাতিল করা, বিপরীতে ফিলিস্তিনিদের সহায়তা, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর ঐক্য ও সহায়তার কাজ শুরু করা।
যদিও কৌশলগত কারণে আমেরিকা ও ইসরাইল প্রকাশ্যে মুরসির বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকতো কিন্তু তাদের হীন স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার ফলে পরোক্ষভাবে মদদ দিয়ে তারা মুরসিকে মিশরের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। ২০১৩ সালে সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ সিসির মাধ্যমে সংঘটিত অভ্যুত্থান তাদের চক্রান্তেরই ফলাফল।
মুরসির ইন্তেকালের পর মিশর সরকারের আচরণে খুব একটা পরবর্তন দেখা যায়নি। মিডিয়াগুলোতে মুরসির পক্ষে বলা তো দূরে থাক, তাঁর বিরুদ্ধে যা-তা শব্দ ব্যবহার করেছে কিছু উপস্থাপক। মুরসিকে তারা সিআইএর এজেন্ট, দেশ ও জাতির শত্রু এবং উগ্র জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করে। তাঁর মৃত্যুতে কোনো ধরনের শোক নয় বরং দেশ যে কলংকমুক্ত হয়েছে, এজন্য মিশরবাসীর আনন্দিত হওয়া উচিত—মিশরীয় মিডিয়া থেকে বারবার এ বার্তাই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মিশরের বাইরে জর্দান, তিউনিস ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুরসিকে হত্যার বিচার চেয়ে বিক্ষোভ হলেও মিশরে কোনো ধরনের বিক্ষোভের সুযোগ দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তা বাহিনী তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়। মুরসির গ্রামের লোকেরা তাঁর হত্যার বিচারের জন্য বিক্ষোভ মিছিল করলেও গণহারে গ্রেপ্তার ও মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে সেই গ্রামকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়।
তবে মিশরের সাধারণ জনগণের ভেতরে এই বোধটুকু বেঁচে আছে যে মুরসির সাথে যা করা হয়েছে, এটা জুলুম ছাড়া আর কিছুই না। ইখওয়ানের রাজনৈতিক পলিসি কি কট্টরপন্থা না উদারপন্থা—এ নিয়ে বামপন্থী ও ডানপন্থীদের তর্ক অব্যাহত থাকলেও এক মুরসি জীবন দিয়ে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর আপোষহীন লড়াইয়ের নমুনা রেখে গেছেন। এভাবেই মুরসিরা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।
লেখক : শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, মিশর
জুলাই, ২০১৯

