মুহাম্মদ মুরসি : বিপ্লব যেখানে মুখ্য

সংখ্যা:

 

শৈশবের কুহেলি : যেভাবে গড়ে ওঠে অন্তরলোক

মুহাম্মদ ইসা আল-আইয়াত মুরসি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। উত্তর মিশরের আশ-শারকিয়্যাহ আল-আদওয়া গ্রামে ৮ আগস্ট ১৯৫১ সালে তাঁর প্রথম চোখ-উন্মীলন। বাবা কৃষি কাজ করতেন। মা ছিলেন গৃহিণী। তিন ভাই দুই বোনের পরিবার। শৈশবে মুরসি ঘোড়ার পিঠে করে স্কুলে যেতেন। কিন্তু মুরসির শৈশব আর সকল শিশুর মতো খুব সুখের ছিল না। দারিদ্রের কষাঘাত তাঁকে ব্যথিত করত। সমাজের ধনাঢ্য লোকদের রূঢ় আচরণ শৈশবেই তাঁকে বিনীত করেছিল দরিদ্র মানুষদের মায়ায়। মুরসি সেই থেকে স্বপ্ন ও গৃহহারা মানুষদের মায়ার তাড়িত হয়েছিলেন। জীবন-সংগ্রামের পাঠ চুকিয়েছিলেন সেই দুধ-শৈশবেই। বীজ বুনছিলেন সমতা ও মমতার পৃথিবী গড়ে তোলার। মেধাবি মুরসির হৃদয়ে তখনই বেজে উঠেছিল মানুষের প্রেমের সিম্ফনি।

 

ঊর্মিমুখর বাদল-মুখর দিন

প্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষা আল-আদওয়ার স্কুলে। সেখানকার গ্রামীণ পরিবেশের রোমাঞ্চ মুরসিকে টেনে ধরতে পারেনি তাঁর বালকবয়সে। দেশপ্রেম আর মানবতার হাহাকারে মুরসি নিভৃতে পরাভূত হতে থাকতেন। একান্তে একাত্ম হতেন মানবতা ও ইসলাম কায়েমের স্বপ্নে। সেই মোহ তাঁকে পেছনে ফিরে তাকানোর সময় দেয়নি কোনো দিন, তাঁকে সময় দেয়নি জালেমের চোখ দেখে ভয় পাবার।

 

স্বপ্নের পথে নিভৃতে হেঁটে চলা

বিশ্ববিখ্যাত কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সুযোগ হয়ে যায় মুরসির। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হন। প্রথম বর্ষেই ফার্স্ট হয়ে যান মুরসি। স্বপ্নের পথ যেন দীর্ঘ হয় শুধু। ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ হয়ে যায় তাঁর। স্বপ্ন বোনেন—এইবার তাহলে পথ আমাকে ছুড়বে না, পথ যেখানে যাও নিয়ে যাও তোমার নদী, তোমার আগত গন্তব্য। বিপ্লবের ঘ্রাণে ঘ্রাণে ছুটে চলেন মুরসি, ছুটে চলেন সূর্যের সাক্ষাতে। কথা হবে এইবার, মানুষের হাসি-বিষয়ক সূর্যালোকে আলাপানুষ্ঠান।

 

প্রেমের সতত দুয়ার

১৭ বছর বয়েসী চাচাতো বোন নাজলা মাহমুদকে বিয়ে করেন মুরসি। নাজলা অদ্ভুতরকম ভালোবাসতেন আইয়াত মুরসিকে। মুরসির ব্যক্তিত্ব ও সদাচরণ নাজলাকে অনুরণিত করেছিল মুরসির প্রতি। মুরসির ভালোবাসার স্বপ্নভুবনে হারিয়ে যাবার আকাঙ্ক্ষা নাজলাকে সঞ্চার করত রোমাঞ্চ। তাঁরা ঘর বাঁধেন। গড়ে ওঠে তিলে তিলে মোমগলিত প্রেমের পৃথিবী। হারিয়ে যান নাজলা ও মুরসি, তা দিনে দিনে আরও প্রাণসঞ্চারী হয়ে ওঠে। নাজলা বলেন, ‘মুরসির সবকিছুকে আমি ভালোবাসতাম। আমাদের ঝগড়া কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হতো না। ঘরের টুকিটাকি কাজ ও রান্নাবান্নায় মুরসি আমাকে সহায়তা করতেন।’ মিসরের এক টেলিভিশন চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে মুরসি বলেন, ‘নাজলাকে বিয়ে করা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।’ নাজলা ও মুরসির সফলতম সংসারে পাঁচ সন্তান জন্ম নেন, আহমাদ, শায়মা, উসামাহ, উমার ও আবদুল্লাহ।

 

উত্তাল হৃদয়ের হরতাল

স্বপ্নের নাকাড়া যেন বেজেই চলেছে। কিন্তু সব স্বপ্নই যে পথের জন্যে নয় তা বুঝেছিলেন জিনিয়াস মুরসি। এর জন্যেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে আবার ফিরে আসেন আপন চিন্তাযানে। মাস্টার্স সম্পন্ন করেন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। এরপর আবারও শৈশবের সমুদ্রে চোখ হারিয়ে যায় তাঁর। এখনই কি উঠে যাবেন রাজনীতির মঞ্চে, নাকি আরও পাহাড় দেখতে হবে তাঁর? হৃদয়ে তরঙ্গ দোলা দিয়ে যায়, ইনসাফের পৃথিবী গড়বার।

 

আরও এক কদম হাঁটা

ভর্তির সুযোগ হয়ে যায় বিশ্বখ্যাত ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে, তা সে বছরের সেরা স্কলারশিপ নিয়ে। আমেরিকার সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির সেরা ছাত্রদের তালিকায় স্থান পাওয়া মুরসি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফেরেন স্বপ্নের তাগাদায়, জনবিস্ফোরণের ফানুস হওয়ার চুম্বক-টানে।

 

যখন বিশ্বখ্যাত অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী

কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন মুরসি। অধ্যাপনা-জীবনের শুরু হলো ঐতিহ্যবাহী এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরে আরও বড় সুযোগ এসে যায়, অর্থাৎ শিক্ষক হয়ে যান বিশ্বনন্দিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের। এছাড়াও বিশেষত আমেরিকা এবং পৃথিবীর স্বনামধন্য একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। অবশেষে মিশরের জাক্কাজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ধাতু প্রকৌশল বিভাগের প্রধান হয়ে অধ্যাপনা-জীবনের ইতি টানেন। বিজ্ঞানী-জীবনে নাসায় কাজ করেছেন। ‘স্পেস শ্যাটল ইঞ্জিন’ উন্নয়নে সফলতম ভূমিকা রাখায় বিজ্ঞান-দুনিয়ায় দ্রুত তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। সুযোগ পান বিভিন্ন বিজ্ঞান-সেমিনারে অংশগ্রহণের। বড় বড় বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ ছাপবার অনুরোধ আসতে থাকে। তাঁর রচিত প্রবন্ধ ও তাঁর সুচিন্তক-বক্তব্য বিজ্ঞানী-দুনিয়ায় অনুকরণীয় হয়ে আছে এখনও।

 

নতুন দিগন্তের সন্ধান

ইখওয়ানুল মুসলিমিন আরব ও বিশ্ব-রাজনীতির আলোচিত একটি নাম। পশ্চিমামুখী মুরসি যখন পশ্চিমি ত্রাসের রাজনীতি বুঝে গেলেন, তখন তাঁর জন্য গুরুত্ববহ ছিল একটি বলয়। ইখওয়ানকেই তিনি সেই হকের ওপর দাঁড়ানো হিসেবে শনাক্ত করেছেন। যোগ দিলেন ১৯৭৭ সালে ইখওয়ানে। ইখওয়ানের আন্দোলন তাঁর সপ্রতিভ ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় দ্রুতই আরববিশ্বে প্রভাব ফেলতে লাগল। আরবের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক প্রভাবের মুখে ইখওয়ান নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল ইজরায়েল ও পশ্চিমাশক্তি। এরই ধারাবাহিকতায় ষড়যন্ত্রের একপর্যায়ে পশ্চিমা মিডিয়া ইখওয়ানকে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়ে ফেলল। কিন্তু আরববিশ্বে এখন পর্যন্ত অগোচরে ইখওয়ানের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। ব্যাপক জনপ্রিয় মুরসি ২০০৫-এ সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পরও তাঁর বিরোধী প্রার্থীকে জয়ী দেখানো হয়। ১৯৯৫ ও ২০০০ সালেও ইখওয়ানের এমপি নির্বাচিত হয়ে সংসদে নেতৃত্ব দেন মুরসি।

 

মার্কিন শয়তানি যেভাবে প্রতিফলিত হয়

আরব বসন্ত মূলত মার্কিন প্রকল্প। বুআজিজি নামক তিউনিসীয় ফেরিওয়ালার নিজ গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়াকে কেন্দ্র করে যে ক্ষোভ আর দ্রোহের জন্ম নেয় আরব জন-মানসে, তারই সুযোগ নেয় পশ্চিমাগোষ্ঠী। পশ্চিমা-লালিত মিডিয়া এর নাম দেয় ‘আরব বসন্ত’। আরবের মানুষ আশায় উদ্বেলিত হয়েছিল, জাগরণের মশাল উদ্দীপিু করেছিল তাদের, কিন্তু পশ্চিমাশক্তি মূলত নিজস্ব দালালদের ক্ষমতায় বসাতেই আরব বসন্তের নামে উস্কে দিয়েছিল আরবের শান্তিকামী জনতাকে।

অবশেষে আরব-বসন্ত রূপ নিলতাদেরই পরিকল্পিত রূপে। অস্থির অশান্ত হয়ে উঠল আরবের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। তিউনিসিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন ও সিরিয়াও জ্বলতে লাগল রাষ্ট্রীয় অস্বস্তির দাবানলে। এরই ফলশ্রুতিতে মিশরেও ধাক্কা লাগল বড়সড়। অশান্তির আগুনে পুড়তে থাকল মিশরও। মুরসি তখন আরবভূমির দাবদাহ-মৃত্তিকায় পানি ঢাললেন যেন, মিশরকে নিয়ে আসলেন শান্ত নদীর ভূমিকায়। সর্বদলীয় মোর্চা ‘ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস’ গঠন করে ইখওয়ানকে নিয়ে আসেন সংসদে, আর এটাই ইখওয়ানের জয় হয়ে যায় বৈশ্বিকভাবে।

 

নতুন মিশর

২০১২ সালে অনেক ষড়যন্ত্রের পরও অবশেষে নির্বাচন কমিশন তাঁর বিজয় ঘোষণা করতে বাধ্য হলো। নিয়মানুযায়ী তিনি ব্রাদারহুড ও ফ্রিডম পার্টি থেকে পদত্যাগ করলেন। শুরু হলো নতুন মিশরের পথচলা। রাশিয়া, চীন, ইরান, তুরস্কসহ বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্যে পরামর্শ করলেন মুরসি, কিন্তু আমেরিকায় গেলেন না। মিশরকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণসহ শিক্ষা ও সামগ্রিক উন্নয়নে ঈর্ষান্বিত স্থানে নিয়ে যান। বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেন শান্তিকামী নেতার ভূমিকায়। এরদোগানকে নিয়ে ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার সমস্যা দূরীকরণে শক্ত হতে থাকেন। এতে ইসরায়েল ভয় পেয়ে গেল। ক্ষোভে দগ্ধ হতে লাগল আমেরিকা। সৌদ-পরিবার আরবের নেতৃত্ব হারাবার ভয়ে আঁটতে লাগল ফন্দি। তাঁরই নিয়োগকৃত সেনাপ্রধান দালাল আবদেল ফাত্তাহ সিসিই তাঁকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করল। শুরু হলো নব্য-ফেরাউনি-শাসন।

 

ভিন্নতা ও অনন্যতা

মুরসি তো পণ্ডিত মানুষ ছিলেন, চাইলেই সম্ভব ছিল বিপুল ঐশ্বর্য আর সৌখিন জীবনযাপন করার। দুনিয়ার আর সব বিজ্ঞানীদের মতো তাঁর জীবনও হতো রাষ্ট্রীয় মায়ায় প্লাবিত। সুখ আর ধনে আয়েশি মখমল দিন হতো তাঁর। চিরায়ত অগ্নিবিপক্ষ জীবনযাপন করে যেতে পারতেন তিনি। কিন্তু মুরসি পথ বেছে নিলেন সংগ্রামের। রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছড়িয়ে দিলেন ঈমানের সদা প্রোজ্জ্বল দাবানল, হাসানুল বান্নার ইশতিহার। মিছিলে মিছিলে রক্ত রঙে স্নাত হলো তাহরির স্কয়ার। মিশর দেখল সূর্যের রঙ তার মাথার ওপর ছড়িয়ে, সূর্য মিশরের আকাশ ছাপিয়ে আলো ফেলল সুদূর সিরিয়ায়। সিরিয়া চেয়ে আছে, মিশর হাসছে, জ্বলে শেষ ইসরাইল, জ্বলে শেষ বীভৎস দুনিয়ার সূতিকাগার আমেরিকা। শুরু হলো কুমন্ত্রণার ঢেউ, স্রোতপ্লাবনে জনজীবন ধোঁকা খেল। যে মানুষেরা স্বপ্নের মিশরের জনক দেখেছিল মুহাম্মদ মুরসিকে, তাদের একটি অংশকেই আবার ক্ষিপ্র করা হলো তাঁর ওপর। আর তারপরই মরল মিশর, আর অগ্রযাত্রা নাই তার।

 

বিপ্লব যেখামে নবোদ্যমে জেগে ওঠে

প্রায় ছয় বছর নির্জন কারাবাস শেষে ২০১৬ সালে তাঁকে কায়রোর কুখ্যাত তোরা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। গত ১৭ জুন আদালতে বিচার শুনানির ফাঁকে কারাকক্ষের খাঁচার চত্বরে পড়ে যান মুরসি। পরে হাসপাতালে নেয়া হলে মিসরের সর্বোচ্চ জনপ্রিয় ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসির মৃত্যু ঘটে। কিন্তু তাঁকে পূর্বেই অমানবিক নির্যাতন ও ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে শেষ করে দেয়া হয়, শুধু আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটানো হয় আদালতে এনে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় রাষ্ট্রদ্রোহিতার। কিন্তু জনতার কাছে মুরসি নতুন করে জ্বলে উঠলেন। সারা বিশ্বে তাঁকে নিয়ে যে আলোড়ন, তাঁর প্রয়াণে যে শোকাবহ বিরাজ করছে তা তাঁর অসম্পাদিত নতুন বিপ্লব বাস্তবায়নেরই আগাম-বার্তা।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা, সিলেট

জুলাই, ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১