মদের বার, পতিতালয়, অশ্লীলতা আর পশ্চিমা সংস্কৃতির সয়লাবে আধুনিক মিশর যখন ফেরাউনি সভ্যতাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল, ফেরাউনের প্রেতাত্মারা যখন ইসলামি সভ্যতার মহান স্তম্ভগুলো আঘাতের পর আঘাতের মাধ্যমে ঝাঁজরা করে দিচ্ছিল, আজান, নামাজ, তেলাওয়াত বন্ধ করার মধ্য দিয়ে ভূপৃষ্ঠ থেকে ইসলামের নাম-নিশানাটুকুও মুছে ফেলার সকল আয়োজন যখন সম্পন্ন করছিল তারা, তখনই উম্মাহর মুক্তি ও স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে ২২ বছর বয়সে হাজির হয়েছিলেন ইমাম শহীদ হাসানুল বান্না রাহিমাহুল্লাহ। ১৯২৮ সালে মাত্র ছয়জন সঙ্গী নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইখওয়ানুল মুসলিমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুড।
শায়েখ আল বান্না মানুষের বাড়িতে বাড়িতে, অফিসে, প্রতিষ্ঠানে, ফুটপাতে—এককথায় সবখানে দাওয়াতি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় এই সংগঠনটি মিশরের প্রভাবশালী একটি দলে পরিণত হয়। ইসমাইলিয়াতে প্রতিষ্ঠা করা হয় ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। পাশাপাশি নির্মাণ করা হয় একটি মসজিদ। কিছুদিন পর কেন্দ্রীয় এই কার্যালয় ঘিরে গড়ে তোলা হয় বালক ও বালিকাদের জন্য ধর্ম ও কর্ম শিক্ষার সমন্বিত সিলেবাসের পৃথক দুটি স্কুল। আরও কিছুদিন পর শরীরচর্চা আর নির্মল বিনোদনের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি ক্লাবঘর। বেকার ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের জন্য গড়ে তোলা হয় কুটির শিল্পপ্রতিষ্ঠান। পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠা করা হয় হাসপাতাল ও বিভিন্ন ধরনের কারখানা।
হাসানুল বান্নাহর নেতৃত্বে এভাবেই দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল ইখওয়ান। একপর্যায়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ফিলিস্তিন, বাহরাইন, ইরান, ইরাক, ইসরাইল, জর্ডান, সৌদিআরব, কুয়েত, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, আলজেরিয়া, লিবিয়া, মরক্কো, সোমালিয়া, সুদান, তিউনিসিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান, তাজাকিস্তান ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে ইখওয়ানের কমবেশি কার্যক্রম।
ইখওয়ানুল মুসলিমিনের এই অগ্রযাত্রাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি পশ্চিমা ও তাদের মদদপুষ্ট স্বৈরাচারী সরকার। প্রতিষ্ঠার মাত্র ২০ বছরে দুই হাজার সাংগঠনিক শাখা আর ২০ লাখ নেতাকর্মীর বিশাল জনশক্তি দেখে তাদের মাথা ঘুরছিল। উপায়ান্তর না দেখে শত্রুশক্তি আশ্রয় নিল অন্ধকার গলিপথে। ১৯৪৮ সালের ৮ ডিসেম্বর রাত এগারোটায় ইখওয়ানুল মুসলিমিনকে নিষিদ্ধের সংবাদ প্রচারিত হয় রেডিওতে। শায়েখ আল বান্না তখন সহকর্মীদের নিয়ে কায়রোতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বসে খবর শুনছিলেন। ঘোষণার পরপরই পুলিশ বাহিনী ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছুটে আসে। গ্রেপ্তার করে উপস্থিত সবাইকে। তবে হাসান আল-বান্নাকে ছেড়ে দেয়। এখানেই শেষ নয়, ইখওয়ানের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। তাদের পরিচালিত স্কুল, কলেজ, ক্লাবঘর, হাসপাতাল এবং কারখানাগুলোও বন্ধ করে দেয়া হয়।
সেই থেকে ইখওয়ানের নেতাকর্মীরা আর শান্তিতে ঘুমোতে পারেনি। শহর থেকে শহরতলি এমনকি গ্রামাঞ্চল থেকেও তাদের ধরে ধরে নিয়ে এসে ভরা হতো কারাগার। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চালানো হতো অকথ্য অত্যাচার। তখনও ইখওয়ানের ‘মুরশিদে আম’ শায়েখ আল বান্নাকে গ্রেফতার করেনি সরকার। কেন গ্রেপ্তার করেনি? এর উত্তরে শায়েখ বলতেন, ‘আমাকে গ্রেপ্তারর না করার অর্থ হচ্ছে যে আমার মৃত্যুপরোয়ানা জারি হয়েছে।’ সত্যিই দেখা গেল, মাত্র কিছুদিন পরে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।
মিশর সরকার আল বান্নার মতো সিংহকে জ্যান্ত রাখতে ভয় পাচ্ছিল। দুর্ভেদ্য প্রাচীরঘেরা কারাগারেও তাঁকে আটকে রাখার সাহস করতে পারছিল না। তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করল তারা। ১৯৪৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রক্তিম এক সন্ধ্যা। শুববানুল মুসলিমিনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বের হয়ে ট্যাক্সিতে উঠতে যাবেন তিনি, অমনি অদৃশ্য থেকে গুলি এসে তাঁর বুক ঝাঁজরা করে দেয়। রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় পিচঢালা পথ। মুহূর্তেই ভারী হয়ে যায় মিশরের আকাশ-বাতাস। মুসলিম বিশ্বে নেমে আসে শোকের ছায়া। কুফফার বিশ্ব তখন ফেটে পড়ছিল উল্লাসে। সহকর্মীরা তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেই তিনি শাহাদাতের অমিয় শরাব পান করে মাওলার সান্নিধ্যে পাড়ি জমান চিরকালের জন্য।
জ্যান্ত আল বান্নাকে যেমন ভয় করেছিল মিশরের তাগুত শাসকগোষ্ঠী, মৃত আল বান্নাকেও ভয় করেছিল তেমনি। বাসায় তাঁর লাশ পাঠিয়ে চারদিক ঘেরাও করে রেখেছিল পুলিশবাহিনী। নিকটাত্মীয় ছাড়া কাউকে তারা বাসায় প্রবেশ করে শেষবারের মতো দেখতেও দেয়নি। লক্ষ লক্ষ মানুষের বুক অশ্রুজলে ভেসে যাচ্ছিল, কিন্তু জানাজায় তাদের শরিক হতে দেয়নি। ট্যাংক আর সাঁজোয়া বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে তাঁর লাশ নিয়ে দাফন করা হয় কবরস্থানে। এভাবেই তারা উম্মাহর এক জাগ্রত সিংহকে মাটিচাপা দিয়ে কিছুদিনের জন্য ক্ষ্যান্ত হয়।
শায়েখ আল বান্নার মৃত্যু হলেও তাঁর মিশনের মৃত্যু হয়ে যায়নি। ইখওয়ানের হাজার হাজার কর্মী উম্মাহর মুক্তি ও স্বাধীনতার মিশনকে বুকে ধারণ করে আর খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেতনাকে লালন করে এগিয়ে যেতে থাকে। কেবল এজন্যই ইখওয়ান-নেতাকর্মীদের উপর নেমে আসে সীমাহীন জুলুম-অত্যাচার আর নির্যাতন-নিপীড়ন। যার পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কী হচ্ছিল, কে জানে! কত হাজার ইখওয়ানিকে নির্মমভাবে জবাই করেছিল জেলের অভ্যন্তরে, তার ইয়ত্তা নেই।
শহীদ আল বান্নার পরে ইখওয়ানুল মুসলিমিনকে যিনি আগলে রেখে আন্তরিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি সাইয়েদ কুতুব রাহিমাহুল্লাহ। সাইয়েদ কুতুবের উপর যেভাবে নির্যাতন করা হয়, তা শুনে অবিশ্বাস্যই মনে হয়।
সাইয়েদ কুতুব দুবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৫৪ সালে একবার, ১৯৬৫ সালে আরেকবার। ৫৪ থেকে ৬৫—এই ১১ বছরের মধ্যে তিনি মাত্র আট মাস ছিলেন জেলের বাইরে। সামান্য এই মুক্ত-জীবনে তিনি শুধু নির্মল হাওয়া খেয়ে কাটাননি। বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ ‘তাফসির ফি জিলালিল কুরআন’-সহ তাঁর বেশকিছু অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত করেন। জেল-জীবনে তিনি অনুধাবন করেন, যেনতেন কাজ দিয়ে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়—‘ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে সার্বিকভাবে প্রস্তুতিগ্রহণ করতে হবে। যেনতেন আন্দোলন দিয়ে কখনো ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।’ তাঁর অমর সৃষ্টিকর্ম তাফসিরগ্রন্থ এবং ‘আগামী বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ ইত্যাদি বইগুলো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনারই একেকটি অংশ। এগুলো পড়ে অনুধাবন করা যায়, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অলীক কল্পনামাত্র। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামি পদ্ধতিরই অনুসরণ প্রয়োজন। আব্রাহামিজমের ইসলামাইজেশন করে কস্মিনকালেও ‘খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়াহ’ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
সাইয়েদ কুতুব প্রথম যখন গ্রেপ্তার হন, তাঁকে প্রদান করা হয় ১৫ বছরের কারাদণ্ড। ১০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর ইরাকের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আবদুস সালামের সুপারিশে তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়। ১৯৬৫ সালের ৩০ জুলাই ইখওয়ানের আরেক উচ্চপদস্থ নেতা, সাইয়েদ কুতুবের ভাই মুহাম্মদ কুতুব গ্রেপ্তার হন। প্রতিবাদস্বরূপ তিনি একটি বুকলেট প্রকাশ করে ছড়িয়ে দেন। মিশরের পরিস্থিতি আবারও হয়ে যায় উত্তপ্ত। ইসলামি বিপ্লব-প্রত্যাশীরা চারদিক থেকে গর্জে ওঠে। সেই অপরাধে আগস্টের ৯ তারিখ দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার হন সাইয়েদ কুতুব। শুধু সাইয়েদ কুতুবই নন, তাঁর সাথে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁর আপন দুই বোন আমিনা কুতুব ও হামিদা কুতুব এবং ৭০০ মহিলাসহ ২০ হাজারেরও অধিক ইখওয়ান নেতাকর্মীকে।
অতঃপর ১৯৬৬ সালের ২১ আগস্ট জালিম শাহির মর্জিমাফিক ট্রাইব্যুনাল নামক নাট্যমঞ্চ থেকে রায় ঘোষিত হয়। এতে অভিযুক্ত দেখানো হয় ৪৩ জন নেতাকর্মীকে। তাঁদের মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করা হয় হয়। এঁরা হলেন—সাইয়েদ কুতুব, মুহাম্মদ ইউসুফ, আবদুল ফাত্তাহ ইসমাঈল, শবরি আরাফাহ, আহমদ আবদুল মজিদ, আবদুল আজিজ ও আলি উসমাভি।
তারপর ২৯ আগস্ট। গভীর রজনীতে উম্মাহর এই মহান সিংহকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয়। রাব্বে কারিম তাঁকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন। জান্নাতে দান করুন উচ্চ মর্যাদা।
ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠা ছিল হারানো খেলাফত উদ্ধার করার জন্য। যদিও তাদের অনুসৃত কর্মপন্থায় তা উদ্ধার হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান অনেকের সাথে এই আমিও। এই বিষয়টি একটু পরেই পরিষ্কার করি। তার আগে ইখওয়ানের অনুসৃত পন্থায় এগিয়ে যাওয়ার ওপর খানিকটা আলোকপাত করা যাক।
ইখওয়ান সরাসরি ভোটের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে আহমদ মাহেরের সময়। হাসানুল বান্না তখন ইসমাইলিয়ার নির্বাচনী এলাকা থেকে অংশগ্রহণ করেন এবং বিজয়ও লাভ করেন। কিন্তু এই নির্বাচনকে ইংরেজরা মেনে নিতে পারেনি। তারা খুব নারাজ হয়। তাদের খুশি করতে মিশর সরকার সাজানো একটা অভিযোগের ভিত্তিতে এই নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করে। দ্বিতীয়বার যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তখন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে এমন সব অপুৎপরতা চালানো হয় যে কারণে ইখওয়ানের একজন প্রার্থীও বিজয়ের মুখ দেখেননি।
জামাল আবদুন নাসের ছিলেন আরব জাতীয়তাবাদী নেতা। ইখওয়ান ছিল তাঁর প্রতি কিছুটা দুর্বল। সেজন্য নাসেরের বিপ্লবে ইখওয়ানের যথেষ্ট সমর্থন ছিল। নাসের যখন রাষ্ট্রপতি হন ইখওয়ান ছিল তাঁর পাশে। কিন্তু এই সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি, অতি দ্রুত ভেঙে যায়। রাষ্ট্রপতি জামাল নাসের ইখওয়ানের ওপর ক্ষেপে যান। ধরপাকড় চালান সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর। এরই মধ্যে জামাল নাসেরের ওপর কে বা কারা চালায় এক হত্যা-প্রচেষ্টা, দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয় ইখওয়ানের ওপর। এই অভিযোগের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ হয় ইখওয়ান। গ্রেপ্তার হয় হাজার হাজার নেতাকর্মী। গ্রেপ্তার অভিযান চলে প্রায় ১৫ বছর, ১৯৭০ সাল পর্যন্ত।
১৯৭১ সালে ক্ষমতায় আসেন আনোয়ার সাদাত। সাদাতের সাথে ইখওয়ানের সম্পর্ক ছিল বটে, তবে তা ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি সাদাত ইখওয়ান-নেতাকর্মীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন ঠিক, কিন্তু নিষিদ্ধ করে দেন ইখওয়ানুল মুসলিমিনকে। ইখওয়ান কিন্তু বসে থাকেনি। তারা তাদের কাজ নিজস্ব গতিতে চালিয়ে যায়। ১৯৭৯ সালে আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে ইখওয়ানের ঝগড়া লাগে তুমুল। কারণ, সাদাত চরম পর্যায়ের গাদ্দারি করেন। ফিলিস্তিন ও আরব মুসলিমদের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ইসরাইলের সঙ্গে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি-স্বাক্ষর করেন। যে চুক্তির ফলশ্রুতিতে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে জোরদখলের মাধ্যমে চেপে বসা ইহুদিরা মুক্তি-আনন্দে হেসে ওঠে। তারা তখন প্রথমবারের মতো একঘরে অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এই চুক্তির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মিশরের সেনাবাহিনী প্রতিবছরই পেু ১২০ কোটি ডলার ঘুষ।
তারপর ১৯৮১ সাল। চলছিল সামরিক কুচকাওয়াজ। টেলিভিশন ক্যামেরার চোখের সামনে প্রেসিডেন্ট সাদাতকে গুলি করে হত্যা করেন তরুণ সেনা কর্মকর্তা খালিদ ইস্তাম্বুলি। সেদিন থেকে অবসান ঘটে আনোওয়ার সাদাতের অত্যাচারময় যুগের। কিন্তু মোটামুটি এই শান্ত পরিবেশ খুব বেশিদিন থাকেনি।
১৯৮৪ সালে ক্ষমতায় আসেন হোসনি মুবারক। তিনি আবার ইখওয়ানুল মুসলিমিনকে একটি ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেন। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানান। ইখওয়ানের নেতারা বসে থাকেননি। তাঁরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইখওয়ান মিসরের পার্লামেন্টের এক পঞ্চমাংশ আসন লাভ করতে সক্ষম হয়। এসময় প্রথমবারের মতো ইখওয়ান রাজনৈতিক সফলতা লাভ করে।
২০০৫ সালের ভোটব্যাংকে সঞ্চিত পুঁজি নিয়ে ২০১০ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ইখওয়ান। প্রথম পর্যায়ে বিপুল ভোটে জয়ীও হন ইখওয়ানের প্রার্থীরা। কিন্তু ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে আর অংশ নেয়নি তারা।
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি। সহসাই শুরু হয় আরব বসন্তের গণআন্দোলন। আন্দোলনের একপর্যায়ে চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন স্বৈরশাসক হোসনি মুবারক। তিনি সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ইখওয়ানুল মুসলিমিন তখন কৌশলী অবস্থান নেয়। তারা এবার ইখওয়ানের রাজনৈতিক শাখার নাম দেয় ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি। এই ব্যানারে তারা চালিয়ে যায় রাজনৈতিক কার্যক্রম।
২০১২ সালের ৩০ জুন। মিশরের মাটিতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় অবাধ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন। ইখওয়ান সে নির্বাচনে ৫১.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়। মিশরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ইখওয়ান-নেতা প্রকৌশলী, প্রফেসর হাফিজ ড. মুহাম্মদ মুরসি।
মুরসি নির্বাচিত হয়ে এমন কিছু কাজ করতে লাগলেন, যা ছিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য হুমকি। তিনি মিশরকে সুগঠিত করতে যেমন হয়েছিলেন মনোযোগী তেমনি তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন মুসলিম উম্মাহর পক্ষেও। তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ফিলিস্তিনিদের একান্ত বন্ধু হিসেবে। ‘হিজারাতুস সিজ্জিল’ নামক ফিলিস্তিন-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর সপ্তাহান্তেই তিনি হুংকার ছুড়েছিলেন—‘মনে রেখো, ফিলাস্তিনিরা আর একা নয়।’ তিনি তাদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন রাফাহ সুড়ঙ্গ-পথ। তেল আবিব থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন মিশরীয় দূতাবাস। গাজায় পাঠিয়েছিলেন তাঁর প্রধানমন্ত্রী কিনদিলকে। তিনি হামাসের মুজাহিদদের স্পষ্ট সমর্থন জানিয়ে এসেছিলেন।
তিনি যেমন ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ছিলেন সরব ঠিক সেভাবে নীরবেও চলছিল তাঁর কার্যক্রম। সিনাই মরুভূমির ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ সেই নীরব যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিকল্পিত ‘ফাইরুজ মিলিয়ন সিটি’ এবং সিনাই উপ্যুকার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দু’টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে সিনাই মরুভূমি থেকে ইসরাইলের দখলদারিত্ব দুর্বল হয়ে যেত।
মুরসির নজর শুধু ফিলিস্তিনের দিকেই ছিল না, তিনি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সিরিয়ার দিকেও মনোযোগী হন। কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন সিরিয়ার সরকারের সাথে। সরিয়ে নিয়ে আসেন দামেস্ক থেকে মিশরীয় দূতাবাস। কায়রোস্থ সিরিয়ান দূতাবাসের কার্যক্রমও বন্ধ ঘোষণা করেন। সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমেরিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরামদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এটা ছিল কথিত সুপার পাওয়ার আমেরিকার জন্য চরম লজ্জার।
পশ্চিমাদের চোখে মুরসির ছিল আরেকটি ‘অপরাধ’। তিনি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় হাত দিয়েছিলেন। যে শিক্ষাব্যবস্থা এতদিন চলছিল মিশরের শিক্ষায়তনগুলোতে আর ক্রমশ তৈরি হচ্ছিল পশ্চিমানুগত একটি শিক্ষিত কেরানি জাতি, এ কারণে পাশ্চাত্য কারিকুলামের বিকল্প আরেকটি কারিকুলাম তৈরির রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি কুফফার সম্প্রদায়।
তবে যাই হোক, মুরসির যেই ‘অপরাধ’টি ছিল শয়তানি শক্তির চোখে সবচেয়ে বড়, তা হলো মিশরের সংবিধানের পরিবর্তন। শাসনতন্ত্রের পরিবর্তনে ফেরাউনের প্রেতাত্মাদের গায়ে জ্বালা শুরু হয়। তারা কামনা করেনি, মিশর থেকে ফেরাউনের প্রভাব দূরীভূত হয়ে যাক। তাই তারা মুরসি প্রণীত নতুন সংবিধান কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। কারণ, এই সংবিধান কুরআন-হাদিসের প্রতিবিম্ব ছিল।
এরূপ অপরাধ মেনে নিতে পারেনি আমেরিকা, ইসরাইলসহ সাম্রাজ্যবাদী ও মিশরের ফেরাউনি শক্তি। তারা শুরু করে ‘মুরসি হটাও প্রচেষ্টা’। তাদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার সাথে যুক্ত হয়েছিল সৌদির পেট্রোডলার আর দুবাইয়ের স্বর্ণভাণ্ডও। একপর্যায়ে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই ন্যাক্কারজনক এক সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। পদচ্যুত করা হয় প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে। ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি সেই বিশ্বাসঘাতক ঘৃণিত ব্যক্তি, যাঁকে এই মুরসিই প্রতিরক্ষামন্ত্রী বানিয়েছিলেন।
পদচ্যুত করার পর মুহাম্মদ মুরসিকে গৃহবন্দী করা হয়। শুরু হয় ইখওয়ানিদের ধরপাকড়। ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির প্রধান সাদ আল-কাতাতনি ও ইখওয়ানের উপপ্রধান রাশাদ বাইউমিসহ নেতাকর্মীদের দলে দলে ভরা হয় জেলখানায়। এভাবে একপর্যায়ে বন্দীদের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৪১ হাজার। সামরিক জান্তা জেনারেল সিসি মুরসিকে এতই ভয় পেু যে, সাউন্ডপ্রুফ কাঁচের খাঁচায় বন্দী করেও সবসময় থাকত উদ্বিগ্ন। সাউন্ডপ্রুফ আইডিয়াটি মিশরকে দিয়েছে ইহুদিরা। জার্মানির সেনাবাহিনীর কমান্ডার আইখম্যানকে পাকড়াওয়ের পর ইহুদিরা এভাবেই রেখেছিল।
মুরসির পদচ্যুতির মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে ইখওয়ানি শাসনের। ফের মিশরে শুরু হয় সেই জুলুমের শাসনামল। তবে ইখওয়ানের এই দুঃখজনক পুনের মধ্য দিয়ে সেই সত্যটি আবারও ভাস্বর হয় যে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামি খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অলীক কল্পনামাত্র।
পরিশিষ্ট
হায়, মুসলিম বিশ্ব যদি মিশরের ইখওয়ান থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারত। পশ্চিমাদের বস্তাপচা গণতন্ত্রের গোলকধাঁধায় শতাব্দীকাল ধরে আটকে না থেকে তারা যদি আঁকড়ে ধরতে পারত নববি পদ্ধতিকে। শিক্ষাগ্রহণ করতে পারত যদি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন আরবাকান থেকেও। যিনি ক্ষমতায় গিয়ে একবছরের মাথায় সেক্যুলার জেনারেলদের চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারা যদি আলজেরিয়ার ‘ইসলামিক সালভেশন পার্টি’ থেকেও শিক্ষাগ্রহণ করতে পারত। ১৯৯২ সালে যে ইসলামিক সালভেশন বিজয়ী হয়েও ক্ষমতায় যেতে পারেনি। উপরন্তু সেনাবাহিনীর নির্মম অভিযানে প্রাণ হারাতে হয় এক লাখেরও বেশি আলজেরিয়ানকে। মুসলিম বিশ্ব যদি মরক্কোর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ‘পিজেডি’ থেকেও শিক্ষাগ্রহণ করতে পারত। যে পিজেডি দুইবার ক্ষমতায় গিয়েও উল্লেখযোগ্য কিছুই করতে পারেনি। ফিলিস্তিন থেকেও করতে পারত অনেক অনেক শিক্ষাগ্রহণ। ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন ‘হামাস’ বিজয়লাভ করেও বের হয়ে আসতে পারেনি ইসরাইলি গোলকধাঁধা থেকে। তুরস্কের বর্তমান ‘একে পার্টি’ থেকেও শিক্ষাগ্রহণ করা যায়। দীর্ঘদিন দেশটির ক্ষমতায় থেকেও এরদোগান ইসলামি খিলাফাহর পথে এগোতে পারছেন না।
মুফতি তকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ বলেছেন, ‘পশ্চিমা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর কোনো দেশে যদি ইসলামের বিধিবিধান বাস্তবায়ন হয়েও যায়, তবুও তাদের জন্য গণতন্ত্র বৈধ হয়ে যাবে না। কারণ, সেখানে ইসলামের বিধানাবলি এ জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আদেশ শিরোধার্য; বরং এ জন্য হয়েছে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তা মেনে নিয়েছে। তাহলে বিধান প্রবর্তক আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে মানা হয়নি। মানা হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে। এছাড়া তা কিন্তু টেকসইও নয়। সময়ের ব্যবধানে যখন জনগণের চিন্তাভাবনা পাল্টে যাবে তখন আর ইসলামি আইনগুলো বহাল থাকবে না।’ [হাকিমুল উম্মত কে সিয়াসি আফকার]
চরম এই সত্যটি আমরা দৃশ্যমান দেখতে পাই মিশরে। কুরআন-হাদিসের প্রতিবিম্ব সংবিধানটি রেফারেন্ডামে জনগণের বিপুল ভোটের মাধ্যমেই অনুমোদিত হয়েছিল। কিন্তু মুহাম্মদ মুরসির পুনের মধ্য দিয়ে সেই সংবিধানটি ডাস্টবিনের একেবারে গভীরে নিক্ষেপ করা হলো। কালবিলম্ব না করেই ভেঙে দেওয়া হলো ইসলামপন্থীদের সংষদ।
দুঃখজনক হচ্ছে, পদচ্যুত প্রেসিডেন্ট হাফিজ ড. মুহাম্মদ মুরসি ইসা আল আয়াত রাহিমাহুল্লাহ দীর্ঘ ৬ বছর কারান্তরীণ অবস্থায় ছিলেন। গত ১৭ জুন মিশরের কোর্টে তাঁর বিরুদ্ধে আনা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার শুনানি চলাকালীন টানা ২৫ মিনিট ভাষণ দেন তিনি। আল্লাহর ইচ্ছায় একপর্যায়ে তিনি আদালতেই উল্টে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি পাড়ি জমান মাওলার দরবারে। অনুসন্ধানীরা ধারণা করেন, তাঁকে স্লো পয়জন দিয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করা হয়েছিল। যেভাবে করা হয়েছিল ইয়াসির আরাফাত আর সাদ্দাম হোসেনদের। ব্রিটিশ ডেলিগেশন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন গ্রুপের দাবি—মুরসিকে ২৩ ঘণ্টা সেলে আটক করে রাখা হতো। এজন্য তিনি দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন এবং ভাষণদান কালেই উল্টে পড়ে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ মুসলিম বিশ্বের মজলুম এই নেতাকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন।
ইচ্ছে ছিল, মিশরের ইসলামি রাজনীতির সাথে বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির একটা বোঝাপড়া করব। হিসাব-নিকাশ করে বের করব অর্ধশতাব্দীকালের সফলতা-ব্যর্থতা। কিন্তু তা আর হলো না। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশর, আলজেরিয়া, মরোক্কো ও তুরস্কসহ আধুনিক মুসলিম বিশ্বের কাছে একটিমাত্র প্রশ্ন রেখেই ইতি টানছি—হাসানুল বান্না থেকে প্রেসিডেন্ট মুরসি : জীবনের নজরানা আর কত?
লেখক : বিভাগীয় সম্পাদক, সিলেটের দৈনিক শুভ প্রতিদিন
জুলাই, ২০১৯

