রঙিন শৈশব

সংখ্যা:

 

গ্রামেই আমার বেড়ে ওঠা। শৈশবের রঙিন দিনগুলো কেটেছে গ্রামের নির্মল আলো-বাতাসে। আমার শৈশবজুড়ে মিশে আছে পুকুর, গোল্লাছুট, হারিকেনের আলোয় নিভু নিভু রাতের বাজার, মৃদু বাতাসে আন্দোলিত সোনালি ধানক্ষেত আর মায়ের স্নেহের আঁচলে জড়ানো স্বপ্নীল রাত।

আমার শৈশব-স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করে বিদ্যুৎহীন গ্রীষ্মের নির্ঘুম রাতগুলো। মায়ের গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়া আর মাঝরাতে জেগে উঠে বলা—‘বাতাস করো মা, গরম লাগছে।’ মা ঘুমাতেন না। তাঁর নকশা করা হাতপাখাটা সচল থাকতো। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মা বলতেন—‘দেখো বাবা, আকাশে কত তারা! মায়ের সঙ্গে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাতাম।

মায়ের হাত ধরে আকাশের তারা গুণতাম। মা বলতেন, ‘ওই যে বড় তারাটা দেখছো বাবা, ওটা হবে তুমি।’ অবাক বিস্ময়ে আমি বলতাম, ‘তাহলে আমি তারার দেশে চলে যাব মা?’ আমার অবুঝ প্রশ্ন শুনে মা হাসতেন। আমি নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকতাম বড় তারাটার দিকে। বলতাম, ‘তুমি ওটার চেয়েও সুন্দর মা!’

আমার কথা শুনে অপার্থিব কোনো আলোয় মায়ের মুখাবয়বটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। মা বলতেন, তার আজীবন লালিত স্বপ্নের কথা—‘যখন তুমি বড় হবে বাবা…’ রাত ফুরিয়ে যেত, মায়ের স্বপ্নকথা শেষ হতো না।

জানো মা, আজও আমি গভীর রজনীতে ওই জ্বলজ্বল করা তারাটার দিকে তাকিয়ে থাকি। হৃদয়ের আঙিনায় ভেসে ওঠে তোমার মায়াবী মুখচ্ছবিটি। তোমার সেই সোনাঝরা হাসি! খুব মনে পড়ে তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমানো নির্ঘুম রাতগুলোর কথা। জানো মা, আজও যখন মেঘেঢাকা বর্ষার আকাশটা দ্রিম দ্রিম করে উঠে, পৃথিবীতে গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে, ভয়ে আমি কুঁকড়ে যাই। কিন্তু মা, কারও আঁচলের নিচে লুকোতে পারি না। কিংবা যখন জোৎস্নারাতে চাঁদের অপার্থিব আলোয় পৃথিবীটা আলোঝলমলে হয়ে উঠে, আমি নিষ্পলক তাকিয়ে থাকি রূপার থালার মতো চাঁদটার দিকে আর দৌঁড়ে রুমে গিয়ে বলি—‘দেখো মা, আকাশে কত বড় চাঁদ উঠেছে!’

পরম বেদনার সঙ্গে তখন অনুভব করি মা, এখানে তুমি নেই। আজ আমি তোমার থেকে অনেক দূরে মা; তোমার আজীবন লালিত স্বপ্নগুলোর পূর্ণতা দেবার জন্যে। মা, আজও রাতের আকাশের দিকে তাকালে উজ্জ্বল বড় তারাটা দেখতে পাই, কিন্তু তোমার কোলে শুয়ে গল্পশোনা রাতগুলো আর ফিরে আসে না।

 

মোহাম্মদপুর, ঢাকা

 

ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১