তখন রাত কি দিন, সন্ধ্যা, নাহয় সুবহে সাদিকের আলো ক্ষীণ, ঠিক এটা কোন প্রহর আমরা জানি না, কিন্তু আমরা এটা জানি যে, শতবর্ষের স্তব্ধতার এ রাজত্বে আজ আবার কোথাও বিকশিত হয়ে উঠতে চাচ্ছে মৃদু এক প্রাণ, শাহজালালের জ্বালিয়ে যাওয়া সেই টিমটিমে আলো পাচ্ছে একজন যোগ্য উত্তরাধিকার, মহাদ্রোহের অক্ত জানান দিচ্ছে তাঁর আগমনবার্তা, এ বাংলাদেশেরই কথা, উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ জেলায়।
তারুটিয়া গ্রামে বাস করে বাগদাদের আবদুল কাদির জিলানির বংশধারার যে পরিবার, তাঁরা এ দেশে আসা সেই সুফি-সাধকদের দল, আবহমান বাংলার পৌত্তলিকতার জড় বাতাসে যাঁরা ছড়িয়েছেন তওহিদের সৌরভ, সেই সৌরভের কাছে পাষাণ মূর্তির গন্ধময় অন্ধকার হয়েছে পরাজিত। ইতিহাসের ডামাডোলের বাইরে, যুগের ঘটনা ঘনঘটার আড়ালে থেকে নিভৃতে নীরবে যাঁরা এই শান্ত শীতল পাটির মতো মাটির দেশের জমিন নিসিক্ত করে গেছেন ইসলামের অক্লান্ত চাষে, সেই দরবেশের দলের সাথে মিশেই ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে বড়পীরের দেশ বাগদাদ হতে এ দেশে আসেন শাহ সৈয়দ দরবেশ মাহমুদ। তাদের আলেখ্য বিস্মৃত হয়েছে ছিন্ন তালপত্রের সাথে।
বড়পীর জিলানির বংশপরম্পরায় দরবেশ মাহমুদের সেই স্নিগ্ধ রক্তধারায় আমাদের কালের কলসে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি—আমাদের আলোচনায় আজকের নায়ক, জাগরণের ঘোষক, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ। শুধু আবদুর রশিদ, মওলানাও ঠিক, তর্কবাগীশ ব্যাপারটা কী? এই উপাধির গল্পটা আমরা জানব ধীরে ধীরে, আরেকটু পরে।
এটি ঊনিশ শূন্যে শূন্যে ঊনিশশো সাল, তাঁর জন্মবর্ষ, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায়, পরাধীন ভারতবর্ষে। সাতাইশে নভেম্বর, তখন কি শীত? কার্তিকের হিম জোৎস্নায় প্লাবিত হয় বাংলার মাঠঘাটবিহার? আর তাহাজ্জুদের পানির উষ্ণতায় প্রথম স্নান হয় এই নবজাতকের?
রক্তের মধ্যে তাঁর হার না-মানার অঙ্গীকার। আগামী দিনের বিপ্লবী নেতার নিদর্শন তাঁর প্রকাশ হয়ে পড়ছে সেই বাল্যেই, ঘুমিয়ে যেমন শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।
জমিদার মহাজনদের তো দিন তখন। বিশাল জমিদারি, রাজবাড়ি, নানান ধরনের ব্যবসা তাদের, আর লোক ঠকানোর ফন্দি তবু। রুপালি পয়সার চকমকানি গদিতে বসে গরিবদের ছেঁড়া পকেট আরও নিংড়ানো। আবদুর রশিদ দেখেন সব। গ্রামের অভাবী গোয়ালাদের কাছ থেকে কম মূল্যে দুধ সংগ্রহ করে বাইরে তারা বিকোচ্ছে চড়া দামে। তেরো বছর বয়সী এই বালক গোয়ালাদেরকে সংগঠিত করে রুখে দাঁড়ালেন, জুলুমের বিরুদ্ধে, তারা পেলো সংহত হবার মন্ত্র, দুধের ন্যায্যমূল্য আদায় করে নেয়া হলো মহাজনের সিন্দুক থেকে।
ঊনিশ শো ঊনিশ সালে, তখন তাঁর ঊনিশ বয়েস, অঘ্রাণে নতুন আমের বোলের মতো প্রথম তারুণ্যের ঘ্রাণ মাতোয়ারা করে রেখেছে তাঁর জীবনের উদ্যান, তখন জাতির ক্রান্তিকাল। খেলাফত আন্দোলন এবং অসহযোগ আন্দোলনের ঝড়ে উত্তাল দেশ, বিপ্লবের সক্রিয়তায় জড়িয়ে পড়লেন তিনি, জওয়ানির উদ্যমে। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় তাঁর আর বসা হলো না। সেই যে তুফান ভারি দিতে গিয়ে পারি ডুবন্ত নৌকার হালটি যে ধরলেন, জীবনভর তা বাইতে হলো।
পরবর্তীকালে তিনি ভারতের যুক্তপ্রদেশের বেরেলিতে ইশাআতুল উলুম মাদরাসা, মাজাহেরুল উলুম সাহারানপুর ও ইসলামি শিক্ষার পীঠস্থান দারুল উলুম দেওবন্দে অধ্যয়ন তপস্যা করেন। লাহোরের ইশাআতুল ইসলাম কলেজে অধ্যয়ন ও তর্কশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করে তর্বাগীশ উপাধিটি অর্জন করেন।
তর্কবাগীশ উপাধিটি—আমরা তথ্যভাণ্ডার ঘেঁটে জানি—মৌলিক উপাধি তাঁর নয়। তর্কবাগীশ উপাধিটি আরেকজনেরও ছিল প্রথমে, রামধন তর্কবাগীশ নামে একজনের, যিনি ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধের একজন কিংবদন্তি পুরাণ কথাকার ও সংস্কৃত পদাবলিকার। তিনিই প্রথম উদ্ভাবক—বিধিবদ্ধ পণ্ডিতের ভাষা ছেড়ে সাধারণ মানুষের লৌকিক ভাষায় সুললিত ভঙ্গিতে যিনি পুরাণের ধর্মকথা শোনাতেন।
‘মারবি? আয়, মার ব্যাটা, সাহসে কুলালে মার! তোর বাপেরও জন্মের আগে এই মাথা ব্রিটিশদের লাঠির আঘাতে ফেটে এসেছে!’
নব্বই দশকের উত্তাল সময়। সমগ্র বাংলাদেশের রাজপথ স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের হল্কা বাতাসে ঘামছে। ঢাকায়, দুপুর রোদের সূর্যের তলে দাঁড়িয়ে আমরা অশীতিপর এক বৃদ্ধ তরুণকে দেখি গর্জন করছেন লাঠি হাতে তেড়ে আসা পুলিশ জওয়ানটির দিকে তাকিয়ে, চোখের আগুনে ঝলসে দিয়ে। সমবেত জনতা পুলিশি বাহিনীর ধাওয়ায় যখন ছত্রভঙ্গ, সকলে পিছু হটছে ঊর্ধ্বশ্বাসে, জীবন সায়াহ্নে এই নেতা শতবর্ষী বনস্পতির মতো সাহসের শেকড় ছাড়িয়ে রুখে দাঁড়ালেন একা। ধেয়ে আসা বিরাট পুলিশদলের নড়াচড়া স্থানু হয়ে গেল এক লহমায়, পলায়মান জনতা অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, এক মুহূর্তে সব নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল, এই ঢাকা, এই শহর, এই ইট কাঠ, এই রাজপথ, এই চত্বও, এই ফুটপাত, এই জড়ো হওয়া মানুষ, এই উদ্ধত রাইফেল, এই সমস্ত সময় এবং এই যা কিছু—সবিস্ময়ে দেখতে লাগল তাঁরা এক সফেদ শুভ্র বৃদ্ধের অমিত তেজ, শৌর্যবানের সাহস।
কার দিকে লাঠিয়াল এসেছে তেড়ে, তারা কি জানে কতটা বৈরি বাতাসে সাঁতার কেটে এখানে দাঁড়িয়ে কে এই? মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ? তারা পাঠ্যবইয়ে পড়েনি এই নাম, তারা পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়ে না ইতিহাস, তারা জানে না তাঁর দীর্ঘ পথের গল্প—যা বিস্তারিত সেই ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে অধুনা বাংলাদেশের গণতন্ত্রবাদী আন্দোলন পর্যন্ত।
সাতচল্লিশের পাকিস্তান আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে নিয়ে আশির দশকের গণতন্ত্র মুক্তির আন্দোলন, প্রতিটি বৃহৎ জাতীয় আন্দোলনে, জাগরণে অগ্রগামী নায়ক, সক্রিয় নেতা। ইংরেজ শাসনামল থেকে নিয়ে স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন—বাঙালির সংগ্রামে সাধনায় প্রতিটি শ্বাস প্রবাহের সাক্ষী তিনি।
কেবল ধর্ম, ধর্মীয় ইস্যু নয়, শুধু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থে শ্রেণিসংগ্রামের সীমিত গণ্ডি ছেড়ে জাতীয় স্বার্থে সরব, জাতীয় সমস্ত ইস্যুতে আন্দোলনে মূলধারা থেকে মুখর এরকম আকাবের আলেম খুব কমই পেয়েছে বাংলাদেশের আলেম সমাজ। স্বাতন্ত্র্যের দোহাই নিয়ে জাতীয় স্রোতের বাইরে কোণঠাসা এ বিচ্ছিন্নতাবাদী যাত্রা আমাদের আর কতকাল…!
আরেক প্রান্তের গল্পে যাওয়া যাক। এ গল্প বিখ্যাত। ইতিহাসের গল্প। হিমালয় থেকে সুন্দরবন এবং বাংলাদেশ… সবখানে ছড়িয়ে যাওয়া বিদ্রোহের হাওয়া।
ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম। গোত্র জাতি ধর্ম দেশ প্রদেশ নির্বিশেষে আসমুদ্রহিমাচল ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত একটিই আওয়াজ, ভারত এবার ছাড়তে হবে।
উপমহাদেশের স্থবিরবুদ্ধি, দারিদ্র এবং অশিক্ষা-ক্লিষ্ট বিশাল জনগোষ্ঠীর রক্তে মগজে ঢুকে গেছে ততদিনে পরাধীনতার বোধ। দিকে দিকে দানা বাঁধছে বিদ্রোহ, নিরস্ত্র কি সশস্ত্র।
খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন। সমাজের প্রতিটি স্তরে বিলাতি পণ্য বয়কট করে ইংরেজ শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং দেশজ পণ্য উৎপাদন খাতকে শক্তিবান করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। ইতিহাস-করা বিখ্যাত অনেক আলেম এই স্বদেশী আন্দোলনের সাথে ছিলেন। গল্প আছে, হজরত হুসাইন আহমদ মাদানি কুদ্দিসা সিররুহু নাকি দেশী খদ্দেরের পাঞ্জাবি পরিধান করতেন সবসময় এবং কারও গায়ে বিলাতি কাপড়ের পাঞ্জাবি দেখলে ক্রুদ্ধ হতেন, অনেক সময় হয়েছে, কারও বিলেতি কাপড়ের পাঞ্জাবি দেখলে রাগে কলারের ফাঁড়াটা মুষ্ঠিতে ধরে পাঞ্জাবি পুরাটা ছিঁড়ে দুই ভাগ করে ফেলতেন একটানে।
সেই মাদানির, সেই দেওবন্দেরই আরেক সন্তান মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে কাটবার কোনো উপায় নেই যেইসব কারণে, তার অন্যতম সলঙ্গা বিদ্রোহ। মাত্র বাইশ বছর বয়সে তিনি এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে রাজরোষের কোপানলে পড়েন এবং উত্তুঙ্গ রাজনীতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যান।
সাল ১৯২২, সাতাশে জানুয়ারি। লাল শুক্রবার। সেদিনের পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার সলঙ্গা জনপদের ভোরের অধিবাসীরা, আজ শেষবিকেলের কান্না, তখনো তাদের অজানা।
সলঙ্গা হাট ছিল একটি ব্যবসায়িক জনপদ। বিরাট হাট জমত এখানে। সপ্তাহে দুই হাট। শুক্রবারে বড় হাট। দশদিক ছাপিয়ে লোকে ভিড় করত এ বাজারে। সহস্র সহস্র মানুষজন। নানাজাতের ব্যস্ততা।
সেইদিন সকাল থেকে একদল তরুণ-যুবা ছোট ছোট দলে সংঘবদ্ধ—তবলিগ জামাতের গাশতের মতো—দোকানে দোকানে গিয়ে জনে জনে দাঁড়িয়ে বোঝাতে চেষ্টা করছিল সমবেত জনতায়, তোমরা বিদেশি পণ্য বয়কট করো, বিলেতি দ্রব্য কেনাবেচা বন্ধ করো, দেশীয় পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ও প্রচার-প্রসার করো। ক্ষেত্রবিশেষে বাধাপ্রদানও চলছিল।
এই খবর চলে গেল বড় থানার দারোগার কাছে। পাবনা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আরএন দাস, জেলা পুলিশ সুপার ও সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রসাশক এসকে সিংহসহ ৪০ জন সশস্ত্র লাল পাগড়িওয়ালা ব্রিটিশ পুলিশের একটি দল আক্রমণোদ্যত হিংস্র কুকুরদলের মতো হাট ঘিরে ফেলে তড়িঘড়ি। সলঙ্গার গরুর হাটের ওদিকটায় ছিল এই বিপ্লবী স্বদেশীদের অফিস, কংগ্রেসের অফিস। গ্রেপ্তার করা হয় হাজার হাজার স্বদেশী ও কংগ্রেসীদের নেতা তরুণ মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশকে।
তারপর ঘটে অভাবিত কাণ্ড। অকস্মাৎ বাসা ভেঙে গেলে দলে দলে বের হয়ে আসা অভিভূত পিঁপড়ার মতো অসংখ্য লোক বের হয়ে আসতে লাগল সলঙ্গা জনপদের অন্তরণ থেকে।
থানা ঘেরাও করে ফেলল। দাবি একটাই, প্রাণপ্রিয় নেতার মুক্তি চাই। সমুদ্রের উচ্ছ্বাসের মতো ফুঁসে ওঠা দুর্বিনীত জনতার আক্রোশের ঢল রুখতে না পেরে শুরু হয় নির্বিচার অন্ধ গুলিবর্ষণ। লাশের ওপর লাশ, স্তুপ পড়তে থাকে, গলিত রক্তের কালিতে রচিত হতে থাকে ইতিহাসের পাতায় আরেকটি কালো অধ্যায়।
এ শান্ত শীতল মাটির দেশ, অঝোর কান্না তার বুক ভেঙে নামতে চায়।
সলঙ্গা বিদ্রোহ ও গণহত্যা দিবস নামে আজও যা মুক্তি ও সংগ্রামের আখ্যানে স্মরণীয়।
সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী সেদিন মৃত্যুবরণ করে সাড়ে চারহাজার মানুষ, আর লোকমুখ বলে দশ হাজার মানুষ মারা যায়। ইংরেজ রাজার অস্ত্রাগারে এত বুলেট-বারুদ মজুত ছিল তার প্রজাদের বুকে বিদ্ধ হওয়ার জন্য!
রহমতগঞ্জে হয় গণকবর। অনেক আহত অর্ধমৃত মানুষকেও ফেলে সেখানে মাটিচাপা দেয়া হয়। এই সলঙ্গা বিদ্রোহকে বলা হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক রক্তপিচ্ছিল সিঁড়ি।
বাংলায় গণতন্ত্রের মানসপুত্র যাকে বলা হয়, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী ছিলেন মওলানা আবদুর রশিদ। তাঁরা একসঙ্গে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বাংলা বিহার উড়িষ্যা আসাম-সহ মহাভারতের নানান রাজ্য প্রদেশ, নিজেকে নিবেদন করে সাংগঠনিক ব্যস্ততায়।
১৯৪৬ সালে তাঁকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত করা হয়। Member of the Legislative Assemblz-এর সদস্য হিসেবে অবিভক্ত বাংলার ব্যবস্থাপক পরিষদে তিনি বিনা বেতনে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ, নিঃশর্তে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি, মহিলাদের পতিতাবৃত্তি রোধ ইত্যাদি আইন করার প্রস্তাব করেন। তারপর তো সাতচল্লিশের দেশভাগ, ইংরেজশাসন-পর্ব থেকে তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা জড়িয়ে পড়ল পাকিস্তান যুগের লতায় পাতায়।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন
একটা প্রশ্ন জাগে যে, ভাষা আন্দোলনের সময়ে তৎকালীন মাদরাসাছাত্রদের ভূমিকা কী, কোনো সম্পৃক্ততা ছিল কি-না? সামগ্রিক অর্থে এই প্রশ্নটা করা যাবে না কারণ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটা প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক, সারা বাংলাদেশের সমস্ত স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি এটার সাথে সঙ্গত ও একত্রে সংহত ছিল কিনা এবং এটা যেমন জিজ্ঞাসার নয়, তেমনই জরুরি নয় সমস্ত মাদরাসা।
ঢাকায় একুশে ফেব্রুয়ারির দুনিয়া-কাঁপানো ত্রিশ মিনিটের এ মিছিলে তবু প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল মাদরাসার ছাত্রদের। ঢাকা আলিয়ার তৎকালীন অধ্যক্ষ, বাংলাভাষার সুসাহিত্যিক মওলানা মুস্তাফিজুর রহমানের সাহেবজাদা, সেই সময়ের ঢাকা আলিয়ার তুখোড় মেধাবী ছাত্র ও নেতা, বর্তমানে মাওলা ব্রাদার্সের প্রকাশক, আতিকুল মওলা, তাঁরা মাদরাসার ছাত্রদের কয়েকটি দল নিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে গিয়ে যোগ দেন।
আমাদের হাতে কলম ছিল না, আমাদের হয়তো নিজেদেরই ইতিহাস নিয়ে বসার অবসরও ছিল না, কুরআন-হাদিস-ফিকাহ-মানতেকের ইলম ছাড়া আরকিছুতে সওয়াবের আশাও হয়তো ছিল না, তাই আমরা আমাদের অনতি অতীতের হিরোকে চিত্রিত করতে পারিনি, তাঁর জীবন ও কর্মকে ধরতে পারিনি, অন্যেরাও গরজ অনুভব করেনি। তন্নতন্ন করে খুঁজেও পর্যাপ্ত আলেখ্য কোথাও পাওয়া যায় না।
আমাদের জানা উচিত, উর্দু চাপিয়ে দিতে চাওয়া পশ্চিম পাকিস্তানের মারি ও লাহোরের গণপরিষদে সর্বপ্রথম যিনি বাংলাভাষায় বক্তৃতা করে ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন, তিনি একজন সাহসী মওলানা, আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ, ১৯৫২ সালের ১২ আগস্ট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একুশে ফেব্রুয়ারির দিন রাস্তায় নেমে আসে কারফিউ ভঙ্গ করে, প্রাণের মায়া সাঙ্গ করে, মেডিক্যাল হোস্টেলের প্রধান ফটকের কাছে সবাই জমায়েত হয়। মেডিক্যাল হোস্টেলের নিকটেই জগন্নাথ হলের অডিটোরিয়াম; যেখানে পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সভা বসত। আন্দোলনকারী ছাত্রদের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববাংলা আইন পরিষদে যোগদানকারী সদস্যদের কাছে বাংলা ভাষার দাবির কথা পৌঁছে দেওয়া, যেন তাঁরা অধিবেশনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিষয়ে সুপারিশ গ্রহণ করেন।
ছাত্রদের ওপর পুলিশি হামলার খবর শুনে নেতা তর্কবাগীশ লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে গর্জে উঠে বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের বুকের মানিকদের রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে রাজপথ, শহিদের লাশ পড়ে থাকছে দুপুরের রোদে, সে সময়ে আবার কীসের এসেম্বলি!
এই ভাষাসৈনিক বেরিয়ে আসেন সদর্পে এবং ছাত্রদের মিছিলে প্রত্যক্ষভাবে যোগদান করেন ও একাত্মতা পোষণ করেন। সে-রাতেই তিনি মুসলিম লীগ ত্যাগ করেন। আপসহীন এই নেতা বলেন, ‘যে দলের সরকার বাংলাভাষার দাবি ভূলুণ্ঠিত করেছে, যারা বাঙালির বুকে গুলি চালিয়েছে, তাদের সঙ্গে এই তর্কবাগীশ থাকতে পারে না।
এইসমস্ত ইতিহাস চর্চিত থাকলে ইসলাম সংশ্লিষ্ট ঘরানাকে এই যে ঢালাওভাবে বাংলা ও বাঙালির প্রতিকূলে দেখাতে চাওয়া, এতো সহজে এ সাহস কারও হতো না, একটা তবে/কিন্তু রাখতেই হতো।
১৯৫২ সালের বাইশে ফেব্রুয়ারি তিনি প্রতিবাদে মুসলিম লীগ ত্যাগ করেন এবং নুরুল আমিন সরকারের প্রতি অনাস্থা ঘোষণা করে প্রাদেশিক পরিষদে একটি বিরোধীদল গঠন করেন। তার পরের দিনই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রয়াণের পর ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ সনের ফেব্রুয়ারি—টানা এগারো বছর তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। আওয়ামী লীগ তখন ছয়দফা-পন্থি ও পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টপন্থি এ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথমে ছয়দফা-পন্থী নয়, ১৯৬৭ সালে তিনি পিডিএম-পন্থি আওয়ামী লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি ছয়দফা-পন্থি আওয়ামী লীগে প্রত্যাবর্তন করেন। সত্তরের ইলেকশনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েই পাবনা-২ আসন থেকে পাকিস্তান সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-আন্দোলনের পটভূমি নির্মাণেও তাঁর কালজয়ী অবদান। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে কাজ করেন এই নেতা। মহান মুক্তিযুদ্ধের ২৪৩ দিন আত্মগোপনে থেকে নেতৃত্ব দেন তিনি। বহু তরুণ যুবক মওলানার প্রেরণায় ট্রেনিং-ক্যাম্পে যান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। হানাদার বাহিনী মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের বাড়িঘর সমস্ত পুড়িয়ে দেয়। সেখানে তাঁর সংগ্রহে থাকা অসংখ্য মূল্যবান ধর্মীয় কিতাব ও বইপত্র জ্বলে ছাই হয়ে যায়।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ।
স্বাধীনতার পর তথাকথিত সেক্যুলারদের প্রবল দৌরাত্ম্যের সময়টায়, যখন ক্ষমতা পেয়ে ইসলামের শেষ চিহ্নও এই মাটি থেকে মুছে দিতে কৌশলে বদ্ধপরিকর একটা গোষ্ঠী, শাসকদের কান ভারী করা হচ্ছে বাঙালি মুসলমানের আবহমান সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, সেই শিকারী সময়ে প্রখর রৌদ্রে চেতনার ছায়া ধরে রাখেন জাতির এই ছায়ানিবিড় মহিরুহেরা, মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশেরা।
তাঁর প্রচেষ্টায় অবদমিত মাদরাসাশিক্ষা পুনরায় চালু হয়। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রথম মাদরাসাশিক্ষাকে আধুনিকীকরণ ও একে বিজ্ঞানসম্মত রূপ দেন।
তিনি ঋণ সালিশী বোর্ড প্রবর্তন করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। বেতার ও টেলিভিশনে কোরআন তেলাওতের নিয়মও তিনি চালু করিয়ে যান।
পঁচাত্তরের পর স্বৈরাচার ও সামরিক শাসন শুরু হলে ১৯৭৬ সালে তিনি গণ আজাদী লীগ নামে একটি নতুন দল গঠন করেন।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সূচনাকালে ছিল মওলানার প্রাগ্রসর ভূমিকা। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় পনেরো দলীয় ঐক্যজোট। এই পনেরো দলীয় ঐক্যজোটই ছিল আন্দোলনের মূলধারা ও চালিকাশক্তি। এর ব্যানার ধরেই পরে চূড়ান্ত ও সফল একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয় এবং এরশাদ সরকারের পতন অনিবার্য হয়।
এই শতাব্দীর শুরুতে, ২০০০ সালে এই নিরলস সংগ্রামী জাতীয় নেতাকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে স্বর্ণোজ্জ্বল অবদানের জন্য দেয়া হয় মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক।
তিনি বাগ্মী ছিলেন, ছিলেন সুলেখকও। তাঁর রচনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—শেষ প্রেরিত নবী, সত্যার্থে ভ্রমণে, ইসলামের স্বর্ণযুগের ছিন্ন পৃষ্ঠা, সমকালীন জীবনবোধ, স্মৃতির সৈকতে আমি, ইসমাইল হোসেন সিরাজী ইত্যাদি। দুঃখ অনুতাপ আফসোস, এর মধ্যে একটি বইও এখন বাজারে পাওয়া যায় না। জাতির বইপুস্তকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ কি নাকের তৈলাক্ত তুলোর আরাম সরিয়ে জেগে এই দিকটায় অন্তত একটু দেখবেন? এবং লেখকেরাও।
তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও জনকল্যাণমুখী সংস্থা।
১৯৮৬ সালের বাইশে আগস্ট শেষ রাতে তেজোময় প্রদীপটি নিভে যায় চিরতরে, মৃত্যু-ফেরেশতার সুশীতল ডানার স্নিগ্ধ বাতাসে। বয়স তখন পঁচাশি। ঢাকা পিজি হাসপাতালে। অনন্ত সময়ের একটি বিন্দু থেকে পূর্ণচ্ছেদ পড়ে মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ অধ্যায়ে।
লেখক : নবীন গল্পসাহিত্যিক
ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

