ভ্রমণের পরিকল্পনা হয় একদম হঠাৎ করে। সেন্ট মার্টিন যাবার ইচ্ছে লুকিয়ে রেখেছিলাম অনেক দিন থেকেই। নানা কারণে সেই ইচ্ছে আর পূরণ হয়ে উঠছিল না। এবারে সুযোগ এসে গেল। একদল তরুণ তুর্কি, উঠোন পেরিয়ে দুই পা যাদের পড়েনি কোথাও, তাদের সঙ্গে কথা হলো। পরীক্ষার ছুটিতে তারা ভ্রমণে যেতে চায়। সঙ্গে একজন অভিজ্ঞ ভ্রমণসঙ্গী দরকার।
আমি অভিজ্ঞ কেউ নই। সেন্ট মার্টিনের পথ আমারও অচেনা। অবশ্য আমার দৌড় কক্সবাজার পর্যন্ত আছে। কয়েক মাস আগে ঘুরে এসেছি। তাই এই সুযোগ হাতছাড়া করিনি। আমাকে পেয়ে তরুণদল আটখানা। এই তরুণদলের সবাই মাদরাসার ছাত্র। সারাবছর বেড়াবার সুযোগ নেই। বছরে অল্প ক’দিন ছুটি পাওয়া যায়। সেই সময়টা পরিবার তাদের বেঁধে রাখে। একটু দম ফেলার জন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনোভাবে এবার তারা একটা ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছে। আমি তাদের সঙ্গী হয়েছি। আমারও একটি ছোট দলের দরকার ছিল ঘুরতে যাবার জন্য।
ট্রেনের টিকেট কাটা ছিল আগে থেকেই। রাতের বেলা স্টেশনে দেখা হলো সবার সঙ্গে। যথারীতি ট্রেনে উঠলাম। রাতের ট্রেনে মাঝে মাঝে ছিনতাই হয়। সে বিষয়ে সবাইকে আগে থেকে সাবধান করে দিলাম। ক্যামেরাওয়ালা এ কথা শুনে তাঁর ক্যামেরা লুকিয়ে জড়িয়ে বসে রইলেন। অক্টোবরের শেষ সময়। শীতের লেশমাত্র নেই। গরম যাই যাই করছে। ট্রেনে সামনের সিটে এক দম্পতি। সঙ্গে দুটি ফুটফুটে শিশু। তাদের জন্য জানালা বন্ধ রাখতে হলো। কিছুটা ঘেমে উঠলাম।
রাতের পৃথিবী অনেক বেশি কাব্যিক হয়ে ওঠে। অন্ধকার পেরিয়ে কখনো সোডিয়ামের আলো চোখে পড়ছিল। সেই আলোতে দেখা যাচ্ছিল ঘুমন্ত শহর। নিস্তব্ধ কল-কারখানা আর বাড়ি-ঘর। আমি ঢাকা শহরের দালান-কোঠা আর যানজটের মানুষ। সেই দৃশ্যে কী মুগ্ধতা খুঁজে পেয়েছিলাম বলে বুঝাতে পারব না।
ঘুম হয়নি সেই রাতে। ফজরের আজানের পর অজু করলাম। এর মধ্যে কত স্টেশনে ট্রেন থামল তার হিসাব রাখিনি। ঢাকা-চট্টগ্রামের ট্রেনে এবার প্রথম। পথ চিনবার চেষ্টাও করিনি। থাক না অচেনা হয়ে। এইটুক দেশ আমার।
নামাজের জায়গা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হলো। পঁচিশ বগি পার হয়ে যখন নামাজের জায়গা পেলাম না তখন একজন স্টাফ দেখিয়ে দিলেন আমার বগির পাশের বগিতেই নামাজের ঘর। ভেতরে ঢুকে দেখি বেশ ক’জন সেখানে ঘুমিয়ে আছেন। না ডেকে পারলাম না।
ভোরবেলার দৃশ্যের তুলনা হয় না। ট্রেনের জানালা দিয়ে বেশ কিছু টিলা চোখে পড়ল। মনে হলো দেশের বাইরে কোথাও এসেছি। ঢাকার মতো ঘিঞ্জি শহরে থাকলে এমন মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক না। টিলা আর গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পরশ বুলিয়ে দিল মুখে।
চট্টগ্রাম স্টেশনে থামার পর ভেবেছিলাম আরও স্টেশন বাকি আছে। ভোরবেলা ট্রেনে চড়তে ভালো লাগছিল। অবশেষে নামতে হলো।
গেট পার হয়ে বাইরে গেলাম। কোনো ভালো হোটেলে জম্পেশ নাস্তা করার ইচ্ছা ছিল। এত ভোরে কই যাব ভেবে পাচ্ছিলাম না। সোজা চলে গেলাম বাসস্ট্যান্ডে, কক্সবাজারের বাস ধরার জন্য।
বাসস্ট্যান্ডে নাস্তা শেষে বাসে ওঠার সময় ঘটল বিপত্তি। একসঙ্গে চার-পাঁচজন এসে টানাটানি শুরু করল তাদের বাসে ওঠানোর জন্য। এমন অযাচিত সমাদর পেয়ে আমরা রীতিমতো বিব্রত। তবে কারও ডাকে সাড়া না দিয়ে অন্য এক বাস কাউন্টারে গেলাম। বন্ধুদের কাছ থেকে আগেই জেনে নিয়েছিলাম সবচেয়ে ভালো বাসের নাম।
এই বাসের নাম খুব সুন্দর। মারসা। শুনেছি একজন পীর সাহেব এই বাসের নাম রেখেছেন। মারসা আরবি শব্দ। মানে বন্দর। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকা। নামটি যথার্থ হয়েছে।
কক্সবাজার যখন পৌঁছলাম তখন দুপুর প্রায় ১২টা। হোটেল ঠিক করা ছিল না। অটো দিয়ে খুঁজতে হলো। এক হোটেলের সামনে লেখা, আপনার মূল্যবান সামগ্রী নিজ দায়িত্বে রাখবেন। এমন সতর্কবাণী দেখেও যে এই হোটেলে আসবে তাকে সাহসীই বলতে হবে।
দুইরুমে আটজনের থাকার ব্যবস্থা হলো। জোহরের নামাজ পড়ে খেতে বের হলাম। ভাত-ভর্তা, সাথে কোরাল মাছ। সমুদ্রের পাড়ে এসে মাছ না খেয়ে থাকার মানে হয় না। তবে সেবার আমাদের ভাগ্য মন্দ ছিল। অক্টোবরের শেষ দশদিন মাছ ধরা বন্ধ ছিল। সেসময় তেমন মাছ পাওয়া যায়নি। যাও ছিল তা চড়া দামের।
খেয়েদেয়ে ঘুরতে বের হলাম। প্রথম গন্তব্য মেরিন ড্রাইভ এবং ইনানী সমুদ্র সৈকত।
ইনানী সমুদ্র সৈকতের আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। এই সৈকতে প্রচুর প্রবাল পাথর দেখা যায়। অবশ্য সেজন্য সময়মতো আসতে হয়। জোয়ার শুরু হলে পাথর তলিয়ে যায় পানির নিচে। ইনানী সৈকতের একপাশে পাহাড় আর আরেকপাশে সমুদ্র এক অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেরিন ড্রাইভ নামের নতুন রাস্তা। প্রায় টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাস্তা সরকার সম্প্রতি তৈরি করেছে। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখে পড়ে তাতে যে-কেউ অবাক হতে বাধ্য। একপাশে সমুদ্র আরেক পাশে পাহাড়। মাঝখান দিয়ে আকাবাঁকা রাস্তা।
কক্সবাজার থেকে ইনানী সমুদ্র সৈকতের দূরত্ব প্রায় ২৭ কিলোমিটার। চাঁদের গাড়ি নামে একধরনের পিকআপে করে যাওয়া যায়। এখন অটোবাইকও যায়। একবারে আপ-ডাউন ভাড়া করা হয়।
সূর্যাস্তের ঠিক আগে রওয়ানা হলাম ইনানী বিচের দিকে। দূরে লাল সূর্যটা দেখা যাচ্ছিল। ডুব দেয়ার অপেক্ষায় আছে। লম্বা পথে চলতে চলতে ফিরতি পথে ক্লান্তি এসে গেল। ঘুম এসে গেল কারও কারও। এমন যাত্রাপথে ভালো গান জানেন এমন কাউকে দরকার হয়। দুঃখের বিষয়, আটজনের মধ্যে গান গাইবার মতো কেউই ছিল না। অগত্যা ঘুমের কাছে হার মানতে হলো।
সন্ধ্যার পর হোটেলে এসে পৌঁছলাম। এশার পর রাতের বেলা গেলাম সুগন্ধা সমুদ্র সৈকতে। রাতের সমুদ্র অন্যরকম। শো শো শব্দ। অন্তহীন জলরাশি। অপরূপ ভয়ংকর সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্যে আকর্ষণ যেমন জাগে তেমন ভয়ও লাগে।
আকাশে চাঁদ ছিল। চাঁদের আলো মুগ্ধতা বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণে। সমুদ্রের পাড়ে বসার চেয়ার একটাও এই সময় খালি পাওয়া যায় না। নবদম্পতিদের জন্য এটা মধুর সময়।
আমার সঙ্গে থাকা ভ্রমণসঙ্গীদের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। জীবনে এই প্রথম শো শো শব্দ ও অন্ধকারে সাগরের পাড়ে দাঁড়ানোর অনুভূতি তারা ফোন করে শুনিয়েছেন অনেককে।
সৈকত থেকে মেইন রোডে যাবার যে রাস্তা তাতে মাছের দোকান। মাছ কিনলে ভেজে দেয়া হয়। আমার কাছে কক্সবাজার ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় এটা। তবে মনে হয় এখানে আরও কিছু ভালো দোকান হতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে সাগর-তীরে অনেক কিছুর দোকান থাকে। কক্সবাজারে এখনও এসব তৈরি হয়নি। শহরটিকে অনুন্নত বলা যায় না। বেশ ক’টি ফাইভ স্টারসহ অনেক নামী-দামী রিসোর্ট ইতিমধ্যে চালু হয়ে গেছে সেখানে।
ব্যাগ গুছিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। খুব ভোরে উঠতে হবে। গন্তব্য সেন্ট মার্টিন। ক্লান্তিতে চোখ বুজে এল খুব সহজেই।
ভোরে উঠে আবারও গেলাম সৈকতে। সকালের সমুদ্র অন্যরকম। সমুদ্রকে কেন যেন একেক সময় একেক রকম মনে হয়। কেমন শান্ত, স্নিগ্ধ।
বাস ঠিক করা ছিল আগ থেকে। প্রথম গন্তব্য টেকনাফ। সুদূর দূর্গম পথ। প্রায় ৫৬ কিলোমিটার।
গুগলের হিসাবে দু ঘণ্টার পথ। কিন্তু লক্কর ঝক্কর বাস দিয়ে যেতে প্রায় তিন ঘণ্টা লেগে যায়। ভোর ৭টায় রওয়ানা দিয়ে আসতে আসতে প্রায় সকাল ১০টা বেজে গেল।
টেকনাফ আসার পথে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প চোখে পড়ল। পাহাড়ের গায়ে থরে থরে সাজানো ঝুপড়ি। কোথাও কোথাও রাস্তার পাশে বাজার দেখলাম। সবগুলো মানুষ টুপিপরা। শরণার্থী ও অনুদান নিয়ে বেশ কিছু সুন্দর বাণী সম্বলিত বিলবোর্ড চোখে পড়ল। একটা বিলবোর্ডে লেখা ছিল, গ্রহীতার সম্মান রক্ষা করা দাতার কর্তব্য। খুব সুন্দর নীতি। কাউকে কিছু দেয়ার সময় তার সম্মান-মর্যাদা রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খুব কম মানুষই ভাবে। তাই তো জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি নিতে গিয়ে আমাদের দেশে প্রতি বছর বহু মানুষ মারা যায়।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পজুড়ে নানা দেশের নানা সংস্থার অফিস। প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে এখানে। দু পাশে পাহাড়ের ওপর তাদের ঝুপড়ি। একটু বেশি ঝড় বৃষ্টি হলে বাজে অবস্থার সৃষ্টি হবে। পাহাড় ধ্বসেও মানুষ মারা যেতে পারে।
টেকনাফ বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের উপজেলা। এখান থেকে সেন্ট মার্টিনের জাহাজ ছাড়ে। বছরে ৫-৬ মাস এই জাহাজ চালু থাকে। তা শুধু শহুরে পর্যটকদের জন্য। অন্যসময় স্থানীয়রা ট্রলারে যাতায়াত করে থাকেন। প্রায় ৪৬ কিলোমিটারের এই পথ পাড়ি দিতে আড়াই ঘণ্টারও বেশি লেগে যায়।
প্রতি বছর সাধারণত অক্টোবরের শুরু থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হয়। তবে এবার ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয়নি। তাই ট্রলারই ভরসা আমাদের।
ট্রলারে যাওয়া নিয়ে নানা মুখে নানা কথা শুনেছি। কেউ বলেন, না ওপথে যাওয়া যাবে না। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। আর দুর্ঘটনা না ঘটলেও উত্তাল সমুদ্র দেখে অনেকে অজ্ঞান হয়ে যায়। কেউ এসব উড়িয়ে দিয়ে বলেন, আরে কিছু না। ট্রলারে গেলে আরও মজা। তবে ট্রলার যাত্রার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, কিছুটা ঝুঁকি আছে। সমুদ্র শান্ত থাকলে এর চেয়ে আনন্দদায়ক ভ্রমণ আর নেই।
তবে স্থানীয় লোকজন বা কেউ চায় না পর্যটকরা এভাবে যাক। কারণ পথ নিরাপদ না। আমাদের বাসচালক উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন এ কথা জেনে। তবে হাসি ফুটেছিল ট্রলার মালিকের মুখে। কারণ একসঙ্গে প্রায় ৪০ জন পর্যটক তাঁর নৌকা ভাড়া করতে গিয়েছিলাম।
এই বিশাল দল দেখে তিনি ইচ্ছামতো ভাড়া হাঁকালেন। সেই ভাড়া কমিয়ে আনতে বেশ বেগ পেতে হলো। পর্যটক দলের বেশ ক’জন এগিয়ে গেলেন। এখানে মজার কথা বলে রাখি। কক্সবাজারের স্থানীয় ভাষা এখানে কাজে লেগেছিল। কয়েকজন পর্যটক কক্সবাজারের ভাষায় বকাবকি শুরু করতেই তিনি নরম হন।
অবশেষে ১০ হাজার টাকায় যেতে রাজি হলেন তিনি। মালবাহী ট্রলার। বসার জায়গা নেই। মাঝখানে মাল রাখার জায়গায় বসতে হলো। সরকারের আইন অনুযায়ী এসব নৌকায় লাইফ জ্যাকেট পরে থাকা বাধ্যতামূলক। তবে তাদের কাছে থাকা জ্যাকেটগুলোর অবস্থা শোচনীয়।
আকাবাঁকা নদী পেরিয়ে ট্রলার সাগরে পড়ল। দূরে পাহাড়ের সারি। ভারত-পাকিস্তান আলাদা করার সময় র্যাডক্লিফ পাহাড় দিয়ে সীমান্ত এঁকেছিলেন। তাই বেশিরভাগ পাহাড় বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে সব পাহাড় পড়েছে বাংলাদেশের বাইরে। নাফ নদীর ওপারে মায়ানমার। ৭-৮ কিলোমিটারের বেশি হবে না। মাঝে মাঝেই মোবাইলের সময় বদলে যাচ্ছিল। সেখানে বাংলাদেশের চেয়ে মায়ানমারের নেটওয়ার্কের সিগন্যাল বেশি। তবে নাফ নদীতে মোবাইলে ফোরজি পেয়েছি। অবাক হয়েছি কিছুটা। দেশ সত্যি এগিয়ে যাচ্ছে। এমন অভাবনীয় উন্নয়ন যদি সব ক্ষেত্রে হতো তাহলে কতই না ভালো হতো।
নাফ নদীর ওপর দিয়ে যেতে যেতে চোখ কিছুটা ভিজে এলো। ওপাড়ের মায়ানমারকে মনে হলো ঘৃণিত একটি ভূখণ্ড। এই একবিংশ শতাব্দীতে তারা এমন ঘটনা ঘটিয়েছে যা কল্পনাও করা যায় না। প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের এই দেশে স্বেচ্ছাচারী এক সেনাবাহিনী ও কিছু মানুষ কীভাবে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করল, লক্ষাধিক মানুষকে দেশছাড়া করল—ভাবলে দুঃস্বপ্নের মতো লাগে। ওই দেশে কি কোনো ভালো মানুষ নেই? মায়ানমারের প্রায় ৮৮ ভাগ জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বুদ্ধ কত দয়াবান একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর অনুসারীরা এমন ঘটনা কীভাবে ঘটায় ভাবলে অবাক লাগে।
আধুনিক পৃথিবীর বহু মন্দ দিক আছে। তবে কিছু কিছু ভালো দিক আছে যেগুলো মানব-ইতিহাসে আগে কখনো ছিল না। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সাহায্যসংস্থা। এই যে ১০ লাখের বেশি মানুষের সাহায্যে পুরো পৃথিবী এগিয়ে এসেছে, নাহলে আমরা কি পারতাম এতগুলো মানুষের ভার বহন করতে? তবে এখানে একটা ফাঁক আছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সাহায্য বা বিশ্বের যে কোনো মানবাধিকার সংস্থা, তারা অপরাধ হওয়ার আগে কোনো কাজ করে না। কারণ এতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হয়ে যায়। তবে তা করতে পারলে ভাল হতো। তাদের নীতি হচ্ছে এমন, তুমি মার খেয়ে আসো আমরা তোমার সেবায় নিবেদিত। কিন্তু যে তোমাকে মেরেছে তার বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারি না।
ট্রলারে বেশ লম্বা পথ। আড়াই ঘণ্টার মতো লেগে যায়। সমুদ্রে নৌযানে চড়া এই প্রথম। সাগর সেদিন বেশ শান্ত। একজন সহযাত্রী তো ভাবতেই পারেননি নদী পেরিয়ে আমরা সমুদ্রে এসে পড়েছি। তিনি খুব ঔৎসুক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সমুদ্রে কখন যাব?’
চলার পথে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা দুবার নৌকা চেক করলেন। কয়েকটি ব্যাগেও তল্লাশি চালালেন। মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে বলে কথা। অবশেষে দূর থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ দেখা গেল। দ্বীপ আমাদের দেখে যেন হাতছানি দিল।
সেন্ট মার্টিনের বাংলা নাম নারকেল জিঞ্জিরা। আরবি জাজিরা থেকে জিঞ্জিরা। আরবরা এর এই নাম দিয়েছিলেন। নারকেল শব্দটি যুক্ত হয়েছে প্রচুর নারকেল পাওয়া যায় বলে। পরে ব্রিটিশরা সাধু মার্টিনের নামে এর নামকরণ করে।
ট্রলার থেকে নামতেই একজন কোস্ট গার্ড সবাইকে চেক করলেন। পিপাসা পেয়ে গেছে ততক্ষণে। জেটি পার হতেই একজন ডাবওয়ালা পাওয়া গেল। চেহারায় কিছুটা রাখাইনদের ভাব আছে। কথায় কথায় জানালেন, সেন্ট মার্টিনে প্রথম ১৩টি পরিবার বসত গড়ে। তিনি সেই ১৩ পরিবারের এক পরিবারের বংশধর। সেন্ট মার্টিন আসার পর এই ডাব খাওয়া শুরু। কত ডাব খেয়েছিলাম দু দিনে তার হিসেব করিনি। মাছ না পেলেও ডাব পাওয়া গিয়েছিল বেশ কম মূল্যে।
ভাগ্যক্রমে ভালো একটা হোটেলে উঠলাম। একে হোটেল বললে ভুল হবে। মফস্বলের বাড়ির মতন। লম্বা বারান্দা। তার মাঝে মাঝে কক্ষ। দ্বিতীয় তলায় সামনে খোলা ছাদ। একেবারে সমুদ্রের কাছে। রুমে শুয়ে শো শো শব্দ শোনা যায়। সেন্ট মার্টিন এলে এমন জায়গায় না থাকলে পুরো ভ্রমণই বৃথা।
সেন্ট মার্টিনে বিদ্যুৎ নেই। জেনারেটর ছাড়া হয় দিনে কিছু সময়ের জন্য। রাতের বেলা বাতাস বয় অনেক জোরে। সেই বাতাসে শান্তিতে ঘুমানো যায়। সন্ধ্যার পর গাছে ঝোলানো দোলনায় শুয়ে ছিলাম। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের আলোতে এক স্বর্গীয় দৃশ্যের অবতারণা হয় সমুদ্র সৈকতে। তার কোনো তুলনা হয় না। আকাশ থেকে সাদা দুধের মতো জোছনার আলো ছড়িয়ে পরে সবখানে। সেই আলোতে সমুদ্রের পানিকে দুধের মতো মনে হয়। মনে হয় রূপকথার দুধ-সাগর।
সেই রাতে ক্লান্ত ছিলাম। জলদি ঘুম এসে গেল। পরদিন সকাল সকাল উঠে ছেঁড়া দ্বীপে যাত্রা করতে হবে।
তারপর আগামী সংখ্যায়…
ঈদসংখ্যা, মে ২০১৯

