একটি অবিস্মরণীয় ভ্রমণনামা

সংখ্যা:

 

ঘুম ভেঙে চোখের পাতা মেলে থাকাতেই মাথায় ভর করল অদেখা সৌন্দর্যের অভিনব জল্পনাকল্পনা। বিছানা ছেড়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি সকালের পিঠ বেয়ে টপ টপ করে ঝরে পড়ছে কুয়াশা। চারপাশে সাদা সাদা তুলোর ওড়াউড়ি যেন। উপচে পড়া সাদা কুয়াশা ভেদ করে হঠাৎ লাল সূর্যের আভা মধুরতা ছড়িয়ে দিল মনের কোণে।

আত্মার জন্য যেমন দরকার খাদ্য, প্রয়োজন মানসিক অক্সিজেন, চেতনার জন্য দরকার বিদ্যুৎ, তেম্নি মনের জন্য দরকার প্রেরণা ও প্রাণশক্তি। আত্মা, চেতনা ও হৃদয়ে আলোর দোলা লাগাতে প্রয়োজন প্রসারিত জীবনদৃষ্টি; উদ্যম ও উচ্ছ্বলতা। সীমানার পাচিল ও সীমাবদ্ধতার বেষ্টনির ভেতর সেই উদ্যম ও উচ্ছ্বলতার নদী শুকিয়ে যায়। জীবনকে তাই জগতের বিস্তৃত অঙ্গন থেকে নবশক্তিতে করতে হয় শক্তিমান।

সে লক্ষ্যেই পর্যটকরা বেরিয়ে পড়েন পর্যটনে, অভিযাত্রীরা অভিযানে। আজ আমরা পর্যটনে যাবো, ভাবতেই কেমন যেন ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো মৃদুহাসির আভা। সৃষ্টিকর্তার বিচিত্র সৃষ্টির মধ্যে ছড়ানো-ছিটানো অসংখ্য রহস্য, নিদর্শনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন, সৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে থাকা স্রষ্টার প্রজ্ঞা ও বিস্ময়কর বৈচিত্রকে আবিষ্কারের পর্যটন ছিল এটি। এ পর্যটনে যখন কেউ সফল হয়, তখন আল্লাহর কুদরতের নির্দশন অবলোকন করে। কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ঘোষণা করে—‘বিচিত্র সৃষ্টির মাঝে আমি আল্লাহকে দেখেছি।’

পুরোটা ভ্রমণ উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং আনন্দে টইটুম্বুর ছিল। শুরু হয়েছিল ভোরে; সিলেট উপশহর থেকে আমরা ক’জন মিলে একটি অত্যাধুনিক গাড়ি করে যথাসময়ে রওয়ানা হলাম। কাফেলার গন্তব্য ছিল বাংলাদেশের বিখ্যাত পর্যটনস্পট জাফলং। আমাদের গায়ে ছিল একই রঙের সাদা পোশাক। পোশাকের শুভ্রতা একটি পবিত্র আমেজ ছড়িয়ে দেয় মনের কুটিরে। ইসলামি সংগীত, মার্জিত ও রুচিশীল সাংস্কৃতিক উপস্থাপন যাত্রাপথে অন্যরকম এক অনভূতি এনে দেয়। দর্শনার্থীদের মধ্যে মুগ্ধতা ছড়িয়ে আমাদের কাফেলা ছুটে চলে গন্তব্যপানে। সূর্যাস্তে সাক্ষী হওয়া গাছগুলো ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে, বাতাসের পালক সরিয়ে, বাস নয়, যেন ছুটে চলল এক উড়োজাহাজ, রূপকথার পঙ্খিরাজ ঘোড়ার মতো। বাংলার চিরসবুজ সুন্দর মাঠ পেরিয়ে একসময় গাড়ি তার ঊর্ধ্বশ্বাসের পাখাগুলো থামিয়ে স্থির হয় জৈন্তাপুর বাজারে। তখন নতুন পরিবেশ ও প্রকৃতির সাথে খানিকটা বন্ধুত্ব জমে ওঠে। জীবন তো কেবল বাঁক ঘোরে নদীর মতো পৌঁছায় মোহনায়। বন্ধুরা মিলে সেন্টারফ্রেশ চিবোতে চিবোতে নির্দয়-পাষাণের মতো আবারো স্বপ্নাচ্ছন্ন গাড়িতে সওয়ার হয়ে ছুটে চলি গন্তব্যের দিকে, বিরল এক সৌন্দর্যের আহ্বানে।

নিসর্গের অপরূপ-রূপ চোখে মেখে মেখে আমরা নামলাম জাফলং বাসস্ট্যান্ডে। দাঁড়াতেই প্রকৃতির সৌন্দর্য এসে বাসা বাঁধলো চোখে। শুরু হয় অভিযান, প্রকৃতি পাঠের অভিযান। স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্বকে অনুধাবন করার অভিযান। যেন একদল চাতক পাখি বসে গেছে মেঘের তলে। সারিবদ্ধভাবে একই পোশাকে আমরা নেমে পড়ি সকলে, পাহাড়িয়া পথ ধরে। অগণিত মানুষের কোলাহলে মুখর পর্যটনস্পটে সৌন্দর্যের পসরা সাজানো, এক দিকে ভারত একদিকে বাংলাদেশ—যেন পরস্পরের সাথে হাত মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সারি সারি পাথর, অগণিত বৃক্ষ, টিলা, পাহাড়, ঘন সবুজের বিস্তার আর স্বচ্ছ নদীর জলস্রাত—সব মিলিয়ে ছবির মতো সবকিছু। দুঃখ শুধু, পর্যটন খাতকে সুপরিকল্পিতভাবে বিকশিত করার উদ্যোগের অভাব।

জাফলং দেখা হলো। জাফলং পর্ব সেরে রওয়ানা দিলাম পর্যটনস্পট জাকারিয়া সিটির উদ্দেশে। একসাথে পরিদর্শন করি পুরো পরিসর। অতঃপর সেখানকার মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করি আমরা। চোখে মুখে অফুরন্ত মুগ্ধতার আবহ নিয়ে প্রত্যাবর্তন করি নিজ আবাসের দিকে। পথে পথে রুচি ও প্রগতির সমন্বয়ে বিনোদনের অসাধারণ প্রদর্শনী হলো। এভাবে সেদিনকার ভ্রমণ হয়ে উঠল একটি উন্মুক্ত পাঠশালা। প্রেরণার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

 

জকিগঞ্জ, সিলেট

এপ্রিল 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১