সন্ত্রাস

সংখ্যা:

 

মুম্বাই, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রাত ০৩:৪৩

ধুপ ধুপ ধুপ…! দরজায় জোর আঘাতের শব্দে জেগে উঠল সাইফুল্লাহ। মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার। মোবাইলের আলো জ্বালতেই সময়টা চোখে পড়ল। অবাক হলো খানিকটা। মুম্বাইয়ের মতো ব্যস্ত শহরেও এই সময়টাকে গভীর রাত বলা হয়। পুরো শহর ঘুমপুরিতে পরিণত হয়েছে। সিনেমা হলের শেষ শো দেখা মানুষগুলোও বিছানায় পিঠ ঠেকিয়েছে। অবশ্য কিছু চায়ের দোকান এখনও খোলা আছে নির্ঘুম রাত কাটানো নিশাচরদের জন্য। সারা রাতই হয়তো খোলা থাকবে খদ্দেরের চাহিদা মেটাতে। সেরকম একটি চায়ের দোকানের টুংটাং শব্দ আসছে সাইফুল্লাহর তিন তলার এই রুমে।

ধুপ ধুপ ধুপ…! দরজায় আরও একবার শব্দ হলো। এবারের শব্দটা আগের বারের চাইতেও জোরে। অনাকাঙ্ক্ষিত এক আতঙ্ক ভর করল সাইফুল্লাহর মনে। সে কখনো ভাবতেও পারেনি, এরকম রাতও তার জীবনে আসবে।

ধুপ ধুপ ধুপ…! দরজায় আবার শব্দ হলো। হতেই থাকল। প্রথম দুবার একটা হাতেরই আঘাতের শব্দ হচ্ছিল। এখন একাধিক হাতের আঘাতের শব্দ আসছে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না মূলত কতগুলো হাতের আঘাত সহ্য করে যাচ্ছে তার রুমের বিশ্বস্ত দরজা। দ্রুত নাম্বার ডায়েল করে বন্ধু ধারমিন্দরকে কল দিল সাইফুল্লাহ। ওপাশ থেকে যান্ত্রিক নারী কণ্ঠটা বেজে উঠতেই সজোরে খিস্তি দিল সে। এই শীতেও পুরো শরীর ঘেমে উঠেছে তার।

ধুপ ধুপ ধুপ…! ‘নিকাল সালা! তেরে মা কি…! হামারা নিন্দ হারাম কারকে সুকুন সে সো রাহাহে? নিকাল!’ আতঙ্কিত চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে সাইফুল্লাহ। যে কোনো সময় ভেঙে যেতে পারে সেটা। ওপাশের গালিগুলো গায়ে মাখার পরিস্থিতি এখন নেই। তার মাথায় এখন শুধু একটা কথাই ঘুরছে। ‘পালাতে হবে।’

 

দিল্লি এক্সপ্রেস ট্রেন, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

রাতের ট্রেনে দিল্লি ছাড়ছে খাদিজা। একটা অফিসের রিসেপ্টারের চাকরি করত এখানে। হঠাৎ করেই চাকরিটা হারাল আজ। কেবিনে নিজের সিটে বসে অপেক্ষা করছে ট্রেন ছাড়ার। ‘আচ্ছা, বাকি দু’সিটেই কি পুরুষ যাত্রী?’ হঠাৎ করেই প্রশ্নটা মাথায় এলো খাদিজার। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই প্রশ্নের উত্তরটা পেয়ে গেল সে। হ্যাঁ, দুজনই পুরুষ। দুজনের মাথাতেই এক বিশেষ দলের পতাকা বাঁধা। আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠল খাদিজার। ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে ভালো করে মুখ ঢাকল সে। ট্রেন চলছে পুরোদমে। আচমকাই আরও দুজন প্রবেশ করল তাদের কেবিনে। সবার মাথায় একই পতাকা বাঁধা। এদের দেখে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল খাদিজার। কিছুই ভাবতে পারছে না ও। ঘুরেফিরে একটা চিন্তাই আসছে মাথায়—এদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে হবে।

 

কলকাতা, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রাত ১১:৪৭

‘জাহানারা, কী হলো? দ্রুত করো!’

স্ত্রীকে তাড়া দিয়ে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিলেন ডা. খালিদ হাসান। যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি থেকে বের হতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো ওরা এসে পড়বে।

‘তোমাকে সেই সকালেই বলে রেখেছি সবকিছু গুছিয়ে রাখতে। এখন রাত বারোটা বাজতে চলল। এতো কী নিচ্ছ ব্যাগে খোদাই জানেন।’ গলা চড়িয়ে স্ত্রীর ওপর বিরক্তি প্রকাশ করলেন খালিদ হাসান।

‘এই তো শেষ! চলো বের হই।’ বোরকার নেকাব বাঁধতে বাঁধতে স্বামীকে বললেন জাহানারা।

আবাসিক এলাকা। মধ্যরাতের সুনসান নিরবতা বিরাজ করছে চারদিকে। নাম না-জানা কোনো এক পাখি ডেকে উঠল অদূরে। হয়তো কোনো অশনি সংকেত দিতে চাইছে সে। বাড়ি থেকে বের হয়ে অনেকদূর চলে এসেছে ডাক্তার দম্পতি। এই পথটা বিশ বছরের চেনা ডা. খালিদ হাসানের। তাই অন্ধকারে পথ চলতে এতটুকু কষ্ট হয়নি তাঁর। একইভাবে পরিচিত এলাকাটাও। তবুও আজ কেন যেন বড্ড অপরিচিত লাগছে সব।

পেছনে ফিরে বাড়ির দিকে তাকালেন ডা. খালিদ। বাড়ির সামনের স্ট্রিট লাইটের আলোতে স্পষ্ট দেখতে পেলেন, তাকে না পেয়ে একদল লোক তার বাড়ির উপর আক্রোশ মেটাচ্ছে। একধ্যানে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন ডাক্তার সাহেব।

‘কী হলো, চলো! এভাবে দাঁড়িয়ে কী দেখছ?’ স্ত্রীর তাড়ায় ধ্যান ভাঙল খালিদ হাসানের। জবাবে ভাবলেশহীন কণ্ঠে বললেন, ‘এতদিন দেবী বিসর্জন দেখেছি, আজ নিজ বাড়ি বিসর্জন দেখছি!’

 

গুজরাট, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, সন্ধ্যা ০৭:০৫

সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অমি গৌতম। দেয়ালটা একটা কট্টরপন্থী হিন্দু রাজনৈতিক দলের অফিসের। দলের অফিসের সামনের খালি জায়গায় জাগরণী সমাবেশ হচ্ছে হিন্দু যুবকদের নিয়ে। অমির একদমই মত ছিল না এরকম দলের সমাবেশে আসার। কিন্তু তার বন্ধু এই দলের একজন উল্লেখযোগ্য নেতা। তার জন্যই এখানে আসা। গতকাল কাশ্মীর সীমান্তে আত্মঘাতী হামলার প্রতিবাদে আজ সারাদিন মিছিল-মিটিংয়েই সময়টা পার হয়ে গেছে অমির। ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরার পথ থেকে একরকম টেনে-হিঁচড়েই এখানে এনেছে তার বন্ধু। ক্লান্তিতে রাজ্যের ঘুম এসে নামছে অমির চোখে। তন্দ্রায় দুচোখের পাতা এক হতে যাচ্ছিল মাত্রই। কিন্তু মাইকে বেজে ওঠা একটা কথা কানে বাজতেই চোখটা টানটান হয়ে গেল তার।

‘আভি ওয়াক্ত জঙ্গ কা।’ কেন্দ্রীয় সরকারি দলের এক নেতা প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছেন। ‘যুদ্ধের সময় এসে পড়েছে। বাইরের শত্রুদের খতম করার আগে আমাদের মাতৃভূমিতে শান্তিতে বাসকরা শত্রুদের খতম করতে হবে।’ এই কথা শুনে সকলেই একসাথে ভারত মাতা কি জয়ের স্লোগান তুলল। শুধু অবাক হয়ে ভাবছে অমি, জন্মের পর থেকে কত মুসলিমই তার বন্ধু হয়েছে, একসাথে চলেছে, এমনকি আজকের বিক্ষোভ মিছিলেও ছিল, কোনো সময় খারাপ ব্যবহারটা পর্যন্ত করেনি। সেই তারাই বিনা অপরাধে শত্রু হয়ে যাবে? মুসলমানদের যেই জিহাদকে তারা সন্ত্রাস বলে, তার সাথে এই নেতার ‘জঙ্গ’-এর কোনো তফাৎ খুঁজে পায় না সে।

 

ঢাকা, বাংলাদেশ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, সকাল ০৮:২০

ছেলের বুঝ হওয়ার পর থেকেই নাস্তার টেবিলে তাকে নিয়ে পত্রিকা পড়েন বিশিষ্ট কলামিস্ট রুহুল আমিন। এখন তাঁর ছেলে ক্লাস নাইনে পড়ে। আজও তার রুটিনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। দুদিন ধরে পাক-ভারত উত্তেজনা চলায় নাস্তার টেবিলে পত্রিকা হাতে নিয়েই আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠা খুলে ছেলেকে শুনিয়ে শিরোনামগুলো পড়তে শুরু করলেন। ‘সন্ত্রাসের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই, হামলার খেসারত দিতে হবে পাকিস্তানকে : মোদি’। নিচেই আরেকটা হেডলাইনে লেখা, ‘ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের বাড়িতে হামলা, চলন্ত দিল্লি এক্সপ্রেস ট্রেনে এক মুসলিম নারী গণধর্ষণ’।

‘আচ্ছা বাবা! সন্ত্রাসের সংজ্ঞা কী?’ বাবার শিরোনাম পড়ার মাঝপথেই প্রশ্নটা করল রুহুল আমিন সাহেবের ছেলে সিয়াম।

‘এতদিন ধরে পত্রিকা পড়িস, বিভিন্ন বই পড়িস অথচ এটাই জানিস না?’ ছেলের প্রশ্নে যারপরনাই অবাক হয়ে বললেন রুহুল আমিন। এরপর উত্তরটা দিলেন, ‘বে-আইনিভাবে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর একা বা দলবল নিয়ে আক্রমণ বা হামলা করাই সন্ত্রাস।’

‘তাহলে ধর্ম বা দেশপ্রেমের আবেগে নিরপরাধ মুসলিমদের ওপর যেই হামলাগুলো হলো সেটাকে কেন জঙ্গি হামলা বলা হচ্ছে না? নাকি ‘জঙ্গি’ নামের পোস্টারটা শুধু মুসলমানদের পিঠেই লাগানোর নিয়ম?’

ছেলের এই প্রশ্ন শুনে কলামিস্ট রুহুল আমিন লা-জাওয়াব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ছেলের দিকে। এরপর বললেন, ‘তাড়াতাড়ি নাস্তা শেষ করো! ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে!’

 

এপ্রিল 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১