এ যাবৎ কত গল্প বলে এলাম—শব্দে বাক্যে সত্য-মিথ্যার কত ফিরিস্তি পাড়া গেল—আজ একটু মুহাম্মদের গল্প বলি? এ যাবৎ যা লিখেছি তার মধ্যে নিশ্চয় এটি একটি শ্রেষ্ঠতম রচনা; রচয়িতার সামান্য সৃষ্টিগুণে নয়, যাঁকে নিয়ে রচনা তাঁর সুমহান মর্যাদার আবেদনে। যদি না-ই হয় তো বক্ষ্যমাণ লেখাটি লিখতে লিখতে এ অদ্ভুত সুবাস কোত্থেকে পাচ্ছি আমি? হৃদয়ের উদ্যানে কোত্থেকে ভেসে আসছে এ সুরভি?
শোনো মুহম্মদের কাহিনি!
কোনো এক গ্রীষ্মঋতুর দিনে, তিনি মসজিদে, তাঁর ধর্মবাণী প্রচারের বিশ্বকেন্দ্রে। মিম্বারে অধিষ্ঠিত মুহাম্মদ। উপবিষ্ট তাঁর বন্ধুরা, আদর্শিক পথচলার সনুজ সারথি যাঁরা। আরব উপত্যকা, গ্রামীণ এক পল্লী থেকে জনৈক এসেছেন মুহম্মদের শহরে। আল্লাহর বার্তাবাহক, তাঁর সাথে দেখা করতে। দূর-দূরব্যাপ্ত অন্ধকারের মধ্যে কোথাও আলোর পিদিম জ্বলতে থাকলে পথিক কেন সেখানে এসে দাঁড়াবে না? লোকটি এলেন, হাতে এক থোকা আঙুর। মুহম্মদের হাতে দিয়ে বললেন, ‘আপনি এবং আপনার সঙ্গীদের ভালোবাসায়, ইয়া রাসুলাল্লাহ, নিবেদন।’ মুহাম্মদ আলগোছে একটা আঙুর মুখে পুরলেন। কিছুক্ষণ কী ভেবে তারপর আরেকটা তারপর আরেকটা তারপর… সবগুলো আঙুর নিজেই একটার পর একটা খেয়ে শেষ করে ফেললেন। যেন অনুমান হচ্ছে খুব রসালো পুষ্ট এই ফল। অন্য কাউকে দিলেন না। সাধলেন না খেতে।
সঙ্গীরা কিছুটা আশ্চর্যবোধক চোখে লক্ষ করছিলেন। কখনো তাঁর দরবারে এমন চিত্র তো ঘটে না! কেউ কিছু নিয়ে এলে সাহাবি সবাইকে বিলিয়ে দেন। প্রায়ই সামান্য কিছুও রাখেন না নিজের জন্য। গ্রামের সরল সহজ লোক তো ভারি খুশি! তাঁর আনা আঙুর নবির এতো পছন্দ হয়েছে! বাহ বা! খুশিমনে তিি ন ফিরে গেলেন। রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
তাঁর প্রফুল্ল প্রস্থানের পর সাহাবিদেরকে তিনি যেটা জানালেন, এই আঙুরগুলো আসলে ছিল মারাত্মক টক। তোমরা মুখে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত, টকের ধাকে চোখমুখ বিকৃত করে ফেলতে, সেটা দেখে লোকটি বুঝে ফেলতো তার উপহারের খুঁত, মনে কষ্ট নিয়ে সে ফিরে যেত। তার আঙুর টক ছিলো, তার ইখলাস তো টক ছিল না!
আরেকদিন মুহাম্মদকে তাঁর একজন সাথি বললেন, ‘হে প্রত্যাদিষ্ট , আপনাকে আমি ভালোবাসি।’
‘সত্যিই কি আমাকে ভালোবাসো?’
‘অবশ্যই, ও নবি, আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক আমার জীবন।’
মুহাম্মদ স্মিত হাসেন। সে হাসি উজ্জ্বল মুক্তোর মতো দেখায়। বলেন—জলদ গম্ভীর মেঘের সুরে, যেন এক মহাকালের দিকে ফিরে ঘোষণা করছেন এই অলৌকিক মানুষ—‘আমাকে যারা ভালোবাসো তারা জেনে রেখো, তারা তৈরি থেকো, অন্যেরা লোভের যে তীব্রতায় সম্পদের দিকে ছুটে যায়, বৈষয়িক দারিদ্র্য তোমাদেরকে তারচেয়ে তীব্রবেগে গ্রাস করবে। অনাড়ম্বর জীবনকে ভালোবাসো। অল্পে সন্তুষ্টি তোমাদের সকল চাহিদাকে সুখে তৃপ্ত করুক। শপথ আল্লাহর! আমার শহরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টি ভরে স্বর্ণরৌপ্য চাকচিক্য আর ধনজৌলুসের স্তুপ আমি নিজের জন্য করে নিতে পারি। কখনো না, আমি গরিবদেরকে ভালোবাসি, গরিবদের মতো থাকতে ভালোবাসি, পুনরুত্থানের দিন আমি গরিবদের সাথেই থাকব।’
মুহাম্মদ বলেন, ‘প্রকৃত ধনী তো আত্মায় ধনী। হৃদয়ের বিশালতায় যে মৌনমহান, অন্তরের প্রাচুর্যে ভরপুর যে ফকির।’
এই যে মুহাম্মদ। এই তাঁর জীবনবেদ। এই তাঁর দর্শন। না মুসলিম, না হিন্দু, না খ্রিষ্টান, না ইহুদি—ধর্ম-অধর্ম, গোত্রবর্ণ—সকল কিছুর ওপরে এই মহান মানবীয় দর্শনকে আমরা কেন পৃথিবীর সেরা দর্শন বলে মান্য করব না? আজকের গতিপ্রগতি, অস্থির পৃথিবী, দিশেহারা বস্তুবাদী জগতের প্রধান সমস্যার আসল সমাধানের বীজটি কি এই দর্শনের ভেতরেই লুকিয়ে নেই? বলো, আমরা কেন এই দর্শন বুকে নিয়ে পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে যাব না?
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর ওপর দরুদ ও শান্তির হোক বর্ষিত বর্ষণ।
এপ্রিল ২০১৯

