গত দশকের শেষ ও চলতি দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাদী ইসলামি অঙ্গনে, আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে, আমাদের কওমি ঘরানায় মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক পত্রিকা করার একটা হিড়িক পড়েছিল। কেউ বাস্তবতা ও স্বপ্নের সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্য রেখে, কেউ-বা এ দুটোর মধ্যখানে আসমান-জমিন তফাৎ রেখে পত্রিকা প্রকাশে নামতেন। দ্বিতীয় প্রকারের লোকজনই বেশি ছিলেন, তাই অধিকাংশ পত্রিকা অঙ্কুরেই মারা গেছে। আর বাকিগুলো দু-এক বছর চলার পর ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেছে। সে-সময়ের খুব কম পত্রিকাই আছে, যা নিয়মিত প্রকাশনা এখন অবধি ধরে রাখতে পেরেছে।
চলতি দশকে এসে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠল, প্রিন্ট পত্রিকা করার এ ঝোঁকটা ওয়েব পোর্টালের দিকে চলে আসে। শুরু হয় ‘টোয়েন্টিফোর ডটকম’ তৈরির প্রতিযোগিতা। অনেকে কেবল নিজের নামের সঙ্গে পত্রিকা-সম্পাদকের লকব লাগানোর খাহেশে খুলে বসেন এ ধরনের পোর্টাল। তাতে না থাকে কোনো পরিকল্পনা, না কোনো লক্ষ্য। এবং না থাকে নিজেদের বিশেষ কোনো কাজ। কেবল অন্য পত্রিকা থেকে কপি ও পেস্টের ওপরই থাকে তাদের যাবতীয় ভরসা। তবে এর বাইরে কিছু পত্রিকা আছে, যারা একটা লক্ষ্য নিয়ে দাঁড়িয়েছে এবং মোটামুটি ভালো কাজ আঞ্জাম দেওয়া ও পত্রিকাকে নিয়মিত রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে।
ইনসাফ
কওমি অঙ্গনে সর্বপ্রথম আয়োজন করে অনলাইন সংবাদমাধ্যম হিসেবে কাজ শুরু করেছে ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এমনটাই দাবি ইনসাফ কর্তৃপক্ষের। প্রথমে চট্টগ্রামে তাদের মূল অফিস থাকলেও পরে রাজধানীতে নিয়ে আসা হয়েছে। এ ধারার অন্যান্য ইসলামি সংবাদমাধ্যমগুলোর তুলনায় ইনসাফের অফিস বেশ গোছালো এবং অফিসিয়ালি কাজ-কর্মে তারা মোটামুটি পেশাদার। তবে গতানুগতিকতা ছাপিয়ে খুব নতুন কিছু তারা দিতে পারছে, বোদ্ধা পাঠকরা তা স্বীকার করতে প্রস্তুত নন। ইনসাফ-শো নামে মাঝে মাঝে বিভিন্ন আলেমের সাক্ষাৎকারধর্মী ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করা হয়, সেগুলোর মানও খুব একটা ভালো হয় না। উপস্থাপকের অপেশাদারিত্ব, কথা বলায় পারদর্শিতার অভাব—এসব দৃষ্টিকটু হয়ে ফুটে ওঠে প্রায় কন্টেন্টেই। তাছাড়া নিউজ রিরাইটের বাইরে নিয়মিত কোনো বিশেষ কাজও খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে মুসলিম ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন খবরাখবর অন্যান্য ইসলামি পোর্টালের তুলনায় ইনসাফেই বেশি ও সর্বাগ্রে পাওয়া যায়। পথচলার বেশ কয়েক বছর হয়ে যাওয়ায় পত্রিকাটির বড় একটি পাঠকগোষ্ঠীও তৈরি হয়েছে ইতিমধ্যে।
আওয়ার ইসলাম
আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম ইনসাফের পরে এলেও কওমি ঘরানায় মিডিয়া হিসেবে সমমনা অন্যসব পোর্টাল থেকে জনপ্রিয়তা পেয়েছে বেশি। কওমি-পড়ুয়া বা কওমি সংশ্লিষ্টদের কাছে বেশ কিছুদিন ‘নিজেদের’ মিডিয়া হিসেবে একমাত্র আওয়ার ইসলামই পরিচিত ছিল। এই পরিচিতি বাগিয়ে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ পত্রিকা-সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা। কওমি ঘরানার নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে তাঁরা একটা যোগাযোগ তৈরি করতে পেরেছেন, পাশাপাশি পত্রিকার ব্যানারে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সেমিনার করে কওমি-পড়ুয়া সাধারণ ছাত্রদের কাছেও পৌঁছে যেতে পেরেছেন। কওমি মাদরাসা, কওমি মাদরাসা ভিত্তিক রাজনীতি এবং কওমি মাদরাসা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতেই মূলত এ পত্রিকা কাজ করে। এবং কাজগুলো হয় কওমি মাদরাসা-স্বার্থের পক্ষে। কিন্তু কাজের মান ও ধরনে যথেষ্ট অপরিপক্কতা থাকার কারণে কওমি ঘরানারই অনেক পাঠকের বিরক্তি আছে পত্রিকাটির ওপর।
ফাতেহ
বছরের চেয়ে খানিকটা বেশি সময় হলো ফাতেহ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিষ্ঠার। বিশেষায়িত সংবাদমাধ্যম হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দেয় পত্রিকাটি। শুরুতে নির্দিষ্ট স্টাফ তৈরি করতে না পারার কারণে কাজে খানিকটা কমতি হলেও বেশ কয়েক মাস হলো আলাদা অফিস ও নতুন স্টাফ নিয়ে কাজ শুরু করেছে পত্রিকাটি। সমমনা অন্য পত্রিকার তুলনায় তাদের কাজ সুন্দর ও ব্যতিক্রমধর্মী। ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের ঐতিহ্য ও ইতিহাস বিষয়ে প্রায় নিয়মিতই আলাদা কাজ করে তারা। কওমি ঘরানার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতেও বিশেষ কাজ করে নিয়মিত। কাজগুলোর মান ও ধরনও খারাপ না। তবে ইতিহাস বিষয়ে পত্রিকাটির বিশেষ কাজগুলো খুব সংক্ষিপ্ত থাকে, ফলে পাঠকের অভিযোগ আছে এ নিয়ে। তাছাড়া সাধারণ নিউজের ক্ষেত্রে সমমনা অন্যান্যদের থেকে খানিকটা পিছিয়ে আছে পত্রিকাটি।
ইসলাম টাইমস
ইসলাম টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের পথচলার বেশিদিন হয়নি। মাস কয়েক হলো। অলিখিতভাবে মারকাযুদ দাওয়াহর পৃষ্ঠপোষকতা আর দক্ষ ও অভিজ্ঞ সম্পাদকের কারণে পত্রিকাটি ইতিমধ্যেই কওমি ঘরানার নজর কেড়েছে। বিশ্ব মুসলিম ও বাংলাদেশের ধর্মীয় ঘরানার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ইসলাম টাইমসের নিয়মিত কাজ থাকে। তবে স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অনেক সময় বাড়াবাড়ির শিকার হয়ে যায় তাদের কোনো কোনো কাজ—বোদ্ধা পাঠকের কারও কারও তরফ থেকে এমন অভিযোগ আছে।
পাবলিক ভয়েস
পাবলিক ভয়েস টোয়েন্টিফোর ডটকমেরও পথচলার বেশিদিন হয়নি। তবে এ কয়দিনে পত্রিকাটি যতটা না আলোচিত হয়েছে তারচেয়ে বেশি হয়েছে সমালোচনার শিকার। পত্রিকার মালিকপক্ষ ও স্টাফের কেউ কেউ বিশেষ একটি দলীয় পরিচয়ে পরিচিত হবার কারণে পত্রিকাটিকেও দলীয় পত্রিকা বলে মনে করেন অনেকে। তবে পত্রিকাটিকে যতটা দলীয় ভাবা হয়, আদতে ততটা না। দলীয় স্বার্থ রক্ষা করে যতটা নিরপেক্ষ থাকা যায়, ততটুকু তারা অবশ্যই থাকে। কওমি ঘরানার আভ্যন্তরীণ বিতর্কিত ইস্যুতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আগ্রহী পত্রিকাটি। যথেষ্ট পরিমাণ নিউজ তারা রিরাইট করে, কিন্তু রিরাইট করতে গিয়ে মাঝে মাঝেই অদক্ষতার পরিচয় দেয়। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার তীব্র সমালোচনারও মুখোমুখি হয়েছে তারা।
অন্যান্য
উল্লেখিত এ পাঁচ সংবাদমাধ্যমই মোটামুটি পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা অফিস ও নির্ধারিত স্টাফ আছে। এর বাইরে উম্মাহ, পাথেয়, যমযম, নুরবিডি, কওমিকণ্ঠ, যুবকণ্ঠ, ডেইলি ইসলাম ইত্যাদি নামে আরও বেশ অনেক নিউজ পোর্টাল আছে আমাদের অঙ্গনে, তবে তাদের কারোরই নিউজ রিরাইটের বাইরে সাধারণত বিশেষ কোনো কাজ পাওয়া যায় না। কেউ কেউ রিরাইট করতে গিয়ে হুবহু কপিই করে ফেলে, আবার কারও কারও তো নিউজ প্রকাশও অনিয়মিত। এদের মধ্যে পাথেয় টোয়েন্টি ফোর মূলত মাসিক পাথেয়-এর অনলাইন ভার্সন। পত্রিকাটি কওমি ঘরানার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইসলামি ব্যক্তিত্ব নিয়ে কটাক্ষমূলক প্রতিবেদন করার কারণে তুমুল সমালোচনা ও নিন্দার মুখোমুখি হয়েছে বেশ কয়েকবার।
প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে কতটা?
ইসলামি এই সংবাদমাধ্যমগুলোকে ঘিরে কওমিধারার সাংবাদিকতার একটা চর্চা শুরু হয়েছে। যা ধর্মপ্রাণ সচেতন জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের একটা প্রত্যাশা ছিল। তাছাড়া এ সংবাদমাধ্যমগুলোর কল্যাণে সংখ্যায় অল্প হলেও গতানুগতিকতার বাইরে এসে কওমিপড়ুয়াদের নতুন এক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনলাইন ভিত্তিক ইসলামি সংবাদমাধ্যমের এ দুটো দিক নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে যে সাংবাদিকতার চর্চা এখানে হচ্ছে, তাকে মূলধারা বা জাতীয় ধারার সাংবাদিকতা বলা যাবে না। বড়জোর কমিউনিটি সাংবাদিকতা বলা যেতে পারে। কারণ এখানে নির্দিষ্ট একটা কমিউনিটি বা ঘরানাকে কেন্দ্র করেই সাংবাদিকতার চর্চাটা করা হয়। জাতীয় কোনো ইস্যুতে তাদের সরব কোনো তৎপরতা খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। অথচ জাতীয় ধারার সাংবাদিকতায় না পৌঁছুতে পারলে আমাদের নিয়ে বর্তমান গণমাধ্যমের যে বিদ্বেষ ও প্রোপাগান্ডা, তা পুরোপুরিভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভবপর না। অবশ্যি আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলোর বর্তমান যে আঙ্গিক, ফান্ড এবং পরিসর, তাতে এরচেয়ে বেশি কিছু করা তাদের পক্ষে কতটা সম্ভবপর, তাও প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার।
তবে আমাদের আশা থাকবে, কমিউনিটি সাংবাদিকতার এ চর্চার মধ্য দিয়ে তারা একদিন জাতীয় ধারার সাংবাদিকতায় অবাধ মাত্রায় বিচরণ করবেন, সাংবাদিকতা-পেশায় নিয়ে আসবেন সততা ও আদর্শবাদিতার অনুপম কোনো দৃষ্টান্ত।
এপ্রিল 2019

