উদ্দীপনার আরেক নাম নবধ্বনি। আমার কাছে অন্তত তা-ই মনে হয়। বর্তমানকে যেমন জিইয়ে রাখে এই নিটোল কাগজ, তারুণ্যকে তেমন শক্তি যোগায়, আর ছোটদেরকে দেয় অনিঃশেষ প্রেরণা।
প্রথম যেদিন নাম শুনেছি নবধ্বনির, নতুন এক উচ্ছ্বাসে হৃদয়-মন আন্দোলিত হয়েছিল। অদেখা নব’র ব্যাপৃত ঘ্রাণ যেন ভেতরের জগতটায় ছড়িয়ে পড়েছিল মুহূর্তেই। তারপর ভাবনায় পড়ে যাই; কাগজটি দেখতে কেমন, সাহিত্যমানই-বা কতটুকু—ইত্যাদি। শুনেছি রাজধানী-ঢাকা থেকে ম্যাগটি বের হয়। তাই ভেতরে উদ্দীপনা অতোটা কাজ করছিল না। কারণ অতো দূরের পথ মাড়িয়ে নবধ্বনি কীভাবে আমার হাত অবধি পৌঁছুবে? কিন্তু আমার সংশয়কে থোড়াই কেয়ার করে নবধ্বনি একদিন ঠিকই আমার হাতে আসল।
তখন সিলেটের জামেয়া রেঙ্গায় পড়তাম। মিজান জামাতে। আরবি শিক্ষাবর্ষের শেষদিকে ছাব্বিশে মার্চে ফেদায়ে মিল্লাত সাহিত্য ফোরাম লেখালেখি কর্মশালার একটি চমৎকার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কর্মশালার শেষদিকে প্রতিযোগী বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছিল। আমরা যারা অংশগ্রহণ করেছি, সবাই তন্ময়-চিত্তে উপভোগ করছিলাম পুরো অনুষ্ঠান। পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে—এমন সময় শরীফ ভাইয়ের হাতে থাকা একটি লিটলম্যাগ আমার ধ্যান কেড়ে নেয়। অবাক হয়ে আবারও তাকালাম। আরে এ তো দেখি আমার এতোদিনের সেই কাঙ্ক্ষিত পত্রিকা—নব…!
নবধ্বনি তখন আয়োজিত হয়েছিল শ্রীমঙ্গল নিয়ে। আমাকে তখন আর কিছু উৎফুল্ল করুক আর না-করুক প্রচ্ছদটা মন-প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। নবধ্বনি শরীফ ভাইয়ের হাতে দেখার পর থেকে ভেতরে ভেতরে উসখুস করতে লাগলাম। অবশেষে শরম ভেঙে আবদারটা করেই বসলাম, ‘নবটা একটু দেন না, প্লিজ!’
অনুরোধ করতে না করতেই শরীফ ভাই দিয়ে দিলেন। অবশ্যি এর আগে তাঁকে একবার বলেছিলাম, নব’র কাঙাল আমি! যাকগে, শরীফ ভাই হাতে দেওয়ার পর বেশ খানিক নেড়েচেড়ে নবকে দেখলাম। তৃপ্তি মিটিয়ে। সে এক অন্যরকম অনুভূতি।
এরপর থেকে আমি নব’র নিয়মিত পাঠক। আরও খোলাসা করে বললে, পুরোদমে একজন ভক্ত। রেঙ্গা থেকে প্রায়ই সিলেট শহরে যেতাম। এক রাতে আমি আর শহিদ ভাই বেরোলাম। নিয়ত, রাতের শহরে ঘোরাঘুরি করা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া, আনন্দ-ফুর্তি এবং শহরযাপন। এর চেয়ে বেশি কিছু না। আর হ্যাঁ, লাইব্রেরিগুলোতে ঘুরে নতুন সব ম্যাগাজিন সঙ্গে করে নিয়ে আসা। মোগলাবাজার থেকে লেগুনায় চড়ে আমরা সিলেট কদমতলী এসে নামলাম। এখান থেকে পুরান পোল পাড়ি দিয়ে যেতে হবে সিলেট শহরের নামকরা বইয়ের দোকানগুলোতে। রাতের সিলেট শহর তখন ছন্দময় পরিবেশ ধারণ করেছিল। রাস্তায় গাড়ির ধোঁয়াটে গরম হাওয়া। ল্যাম্পোস্টের নিয়ন আলো। চারিদিকে জন-মানুষের ছুটে চলা।
রাত তখন আটটা কি সাড়ে আটটা। শহুরে রাস্তাগুলোতে প্রতিদিনের মতো যানজট। তাছাড়া পুরান পোলের উপরে গাড়ি-মানুষ-রিকশা-অটোরিকশার যে গ্যাঞ্জাম তাতে দেহ-মনে ক্লান্তি চলে আসল। পুরান পোল পাড়ি দিয়েই হকারের দোকান, আবারও গাড়ি, মানুষ, রিকশার গিজগিজ।
এর ভেতর দিয়ে পুরান পোল পার হয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে আসলাম হাসান মার্কেটের সামনে। শহিদ ভাই হাত ধরে নিয়ে গেলেন করিমুল্লাহ মার্কেটে। করিমুল্লায় তাঁর কিছু কিছু কেনাকাটা সেরে আমরা চলে আসি শহরের নামকরা মাকতাবাগুলোতে। মাকতাবায় ঢুকে আমি যে জিনিসটা প্রথম দেখলাম এবং প্রথম কিনলাম সেটি হলো নব।
নব’র দিকে চোখ পড়তেই শহিদ ভাইকে পিছু টানতে লাগলাম এবং ইশারা করে দেখালাম, এই দেখো, নব এসে গেছে। দেখানো মাত্রই শহিদ ভাই পকেট থেকে গোছগাছ ক’টা টাকা বের করে পটাপট দু’তিনটে নব একসাথে কিনে ফেললেন। আমি তার অমন অবাক করা কেনাকাটা দেখে বললাম, তুমিও নব’র কাঙাল তাহলে? শহিদ ভাই মুচকি হেসে বলেছিল, তোমার চেয়েও বেশি।
লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়া গহরপুর, সিলেট
মার্চ 2018

