জীবন প্রদীপের মতো নাকি প্রদীপ জীবনের মতো? প্রদীপ তো জ্বলে অনবরত, গলে। জ্বালায় নিজেকে, আলোকিত করে ঘর। জীবন তেমন পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিতে পারে স্বার্থ, কাম-কামনা, মায়া, মোহ, হিংসা-বিদ্বেষ, অহম সব। নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে উজাড় করতে পারে সবার মাঝে। জায়গা করে নিতে পারে উপকৃত মানুষের অন্তরে।
প্রদীপ নিজেকে জ্বালিয়ে লাখো শিশুর হৃদয়কে আলোকিত করে যায়। আঁধারের মাঝে আলোর মশাল নিয়ে বেঁচে থাকার সম্বল এ প্রদীপই। পড়ন্ত বিকেলে পূবাকাশে উদিত সূর্যটা যখন পশ্চিমাকাশে অস্তমিত হয়ে দিনের আলোকে বিদায় জানায়, ধীরে ধীরে সন্ধ্যার আবরণে ছেয়ে যায় সমস্ত নগরী, ক্রমান্বয়ে আঁধার গাঢ় হতে থাকে, ঘরে ঘরে জ্বলতে থাকে বিভিন্ন রকমের প্রদীপ।
কারও ঘরে মোমবাতি, কারও কুপি। এভাবেই আলোকিত হতে থাকে ঘর-বাড়ি। বাঁশ কেটে বানানো ঢেঁড়ার বেড়ার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে ক্ষীণ আলো। ঘরের ভেতর তরিঘরি করা হয় পড়তে বসার জন্য। পড়তে যারা বসবে, সন্ধ্যার পর তাদের জন্য বাড়ির বাইরে বেরোনো নিষেধ।
আঁধার-আলোর সংমিশ্রণে ভেসে আসে বাংলা স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, ইংরেজি শব্দমালা উচ্চারণের আওয়াজ। কিংবা মধুর স্বরে আলিফ, বা, তা। কী মধুর শুনতে! আত্মায় প্রশান্তি জোগায়। ধন্য হয় আলোকচ্ছটা। রাতের আঁধারের মাঝে একটা প্রদীপ নিজ অস্তিত্বকে বিলীন করে দিচ্ছে আঁধারকে আলোকিত করতে।
স্রষ্টা তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে একটা নিজস্ব গণ্ডিতে রেখে সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেকে প্রতেকের স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে চলতে থাকে অবিরাম। যখন তার সময় শেষ হয়ে যাবে তখন তার অস্তিত্বও ফুরিয়ে যাবে। জীবন এবং প্রদীপের মাঝে রয়েছে যোগসূত্র।
‘একটি প্রদীপ জ্বলবে অপরের মাধ্যমে, জ্বালবে নিজেকে, প্রজ্জ্বলিত করবে ঘরকে।’ বেঁচে থাকে আলো থেকে অর্জিত শত-শত সৎকর্মগুলো।
অপরদিকে একটি প্রাণ জন্মাবে অপর দু’য়ের মাধ্যমে। বাঁচবে নিজ পরিচয়ে, বাঁচাবে আত্মীয়তার সম্পর্ককে। একটি প্রদীপ গলে গলে হারিয়ে যাবে। আর একটি প্রাণ সময়ের পরিক্রমায় তার দৈহিক গঠনে, চিন্তা এবং মন-মস্তিস্কে উন্নতি ঘটবে। তারপর সময় ঘনিয়ে আসলে হারিয়ে যেতে হবে প্রকৃতির অমোঘ আহ্বানে সাড়া দিয়ে। বেঁচে থাকবে শুধু সৎকর্মগুলো।
গলে গলে নিঃশেষ হয়ে যায় না। থেকে যায় সামান্য ছিটেফোঁটাগুলো। খোদার নিপুণ হাতে গড়া এ জগত সংসারের মোহ ছেড়ে যেতে চায় না কেউ। জগতের প্রতি এক অপার মুগ্ধতা সবাইকে ঘিরে রাখে।
একটি মানবাত্মা কালের স্রোতে জীবনের হিসেব-নিকেশের ফলাফল শেষে পড়ন্তবেলার সূর্যের মতন বিদায় নেয় রিজিকের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে। সারাদিনের সূর্যের মতন যদি জীবনটা আলোকিত করে বিদায় নিতে পারে, তাহলে কবর হবে জোছনাময়ী, পূর্ণিমার রাত।
জীবনটা যাপন করার জন্য। কাটানোর জন্য নয়।
সিরাজদিখান, মুন্সিগঞ্জ
মার্চ 2018

