মুহিব খান : কবি বনাম গায়ক

সংখ্যা:

 

গায়ক না কবি—কোন পরিচয়ে মুহিব খান বেশি জনপ্রিয়? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। গায়ক মুহিব খান যেভাবে মঞ্চ কাঁপাতে জানেন তেমনি কবিতার ছন্দে পাঠকদের বিমোহিত করতে পারে তাঁর কবিতার ছান্দসিক দ্যোতনা। তাছাড়া গায়ক মুহিব খানের মধ্যে কবিত্বের পরিচয়ও তীব্রভাবে ফুটে ওঠে। কারণ কবি মুহিব খানের লেখা গানগুলোই তো গায়ক মুহিব খান আমাদের শোনান।

তবে মনে হয়, ভক্তদের কাছে গায়ক মুহিব খানই বেশি প্রিয়। যদিও তিনি নিজেকে কবি বলে পরিচয় দিতে বেশি ভালোবাসেন। এছাড়া তাঁর আরও বহু পরিচয় আছে। সে ফিরিস্তি কম লম্বা নয়। লেখক, সম্পাদক, কবি, সাংবাদিক, ওয়ায়েজ—নানা পরিচয়ে মুহিব খান ভাস্বর আমাদের কাছে। তবে তাঁর অন্যসব পরিচয়ের চেয়ে গায়ক পরিচয়ই যে বেশি জনপ্রিয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

গায়ক মুহিব খানের যাত্রা শুরু হয় ২০০১ সালে ‘সীমান্ত খুলে দাও’ নামক সংগীত অ্যালবাম দিয়ে। প্রথম অ্যালবামে সম্পূর্ণ নিজরূপে আত্মপ্রকাশ করেন কবি। বাংলাদেশে তখন ইসলামি অঙ্গনে প্রচুর সংগীতচর্চা হতো। প্রায় প্রতি সপ্তাহে নতুন অ্যালবাম পাওয়া যেত বাজারে। মোবাইল তখনও সবার হাতে হাতে আসেনি। সিডির চেয়ে অডিও ক্যাসেটের সংখ্যাই ছিল বেশি।

সে সময়কার সংগীতগুলো হতো এক ধাঁচের। বেশিরভাগই জিহাদি সংগীত। হামদ ও নাতের পরিমাণ প্রতি অ্যালবামে দু-একটি। এছাড়া অন্য বিষয় নিয়েও যে ইসলামি সংগীত হতে পারে তা নিয়ে ধারণা ছিলো না কারও।

কবি মুহিব খান বাংলাদেশে ইসলামি সংগীতে বিপ্লব এনেছিলেন—এ কথা ইসলামি সংগীতের যে কোনো শ্রোতাই স্বীকার করবেন। গানের বিষয়, কথার ধরন, সুর—সবকিছুতে মুহিব খান ব্যতিক্রম এক ধারা প্রবর্তন করেন। ইসলামি সংগীতের জন্য যেখানে মানসম্মত কথা খুঁজে পাওয়া যায় না সেখানে মুহিবখানের গানের কথা ফুরোয় না।

গত দুই দশক ধরে ইসলামি গানে দেশের সেরা শিল্পীর আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন মুহিব খান। প্রথম অ্যালবাম ‘সীমান্ত খুলে দাও’-এর কিছু গানের কথা বলা যেতে পারে। ‘উত্তর হতে দক্ষিণ মেরু সীমান্ত খুলে দাও’, ‘মাদরাসা জিন্দা রাখো’, ‘এদেশে আল্লাহু আকবারের সুরে সূর্য ওঠে’ ইত্যাদি তাঁর এই অ্যালবামের সেরা গান। এর মধ্যে শেষোক্ত গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। স্বয়ং কবিরও এই গানটি খুব প্রিয়। বহু অনুষ্ঠানে নানা জনপ্রিয় গানের সাথে কবি এই গানটি গাইতে কখনো ভোলেন না।

দ্বিতীয় ‘অ্যালবাম দিন বদলের দিন এসেছে’ প্রকাশ হওয়ার পর কবির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে যায়। এই অ্যালবামের গানের কথা ও সুর খুবই উচ্চাঙ্গের ছিল। ‘হে যুবক তুমি’ এই গানের মতো কোনো কবিতা বা গান পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষায় লেখা হয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। তবে কবির মুসলিম ঐক্যের দর্শন সত্যিই অনন্য। এই অ্যালবামের ‘দিন বদলের দিন এসেছে’-এর মতো গানই হয়তো কবিকে ‘জাগ্রত কবি’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। তাছাড়া ‘এই ভারত’ ও ‘সীমান্তে ওই কেঠা’ এই দুটি গান বেশ চমৎকার। এরকম বিষয় নিয়ে সংগীত ইসলামি অঙ্গনে তো দূরের কথা, দেশের ভিন ধারার শিল্পীরাও কখনো ভাবেননি।

মুহিব খানের সংগীতগুলোতে সমসাময়িকতার উপস্থিতি বেশ ভালোভাবে লক্ষ করা যায়। এই অ্যালবামে ‘তোরা মার্কিনি সেই পণ্য কিনে হসনে গোনাহগার’ গানটি সমসাময়িক ঘটনার প্রেক্ষাপটে লেখা। মূলত সংগীত এমন হওয়া চাই। ইসলামি অঙ্গনের শিল্পীরা সার্বজনীন ধারার গানে অভ্যস্ত। কিন্তু মানুষের মনে রেখাপাতের জন্য সমসাময়িক ঘটনা বা বিষয়ে রচিত সঙ্গীতের গুরুত্ব অপরিসীম।

কবির তৃতীয় অ্যালবাম ‘ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি’। এই গানটি কবির গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। গানটিও পরে ভিন্ন সংগীতায়োজনের মাধ্যমে বিটিভিতেও প্রচারিত হয়। এ ছাড়া ‘আমেরিকা নাইন ইলেভেন’ গানটি ছিল চমৎকার। এই গানে আমেরিকা ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। গানটি খুব জনপ্রিয়ও হয়।

সে সময় দেশের নানা জায়গায় ইসলামি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। কবি এই গানটি প্রায় অনুষ্ঠানে গাইতেন। আর কেউ কোনো জিহাদি অনুপ্রেরণামূলক সংগীত এভাবে জনসম্মুখে গেয়েছে বলে শোনা যায়নি। বাংলাদেশে একটি জিহাদি গানকে এভাবে জনপ্রিয় করে তোলার কৃতিত্বও একমাত্র কবি মুহিব খানের।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি গানের কথা না বললেই নয়। কবির পঞ্চম অ্যালবাম ‘আবার যুদ্ধ হবে’-তে কবি আরেকটি গান গেয়েছেন জিহাদ নিয়ে। গানটির কথা এমন—‘জিহাদ সে তো ইবাদত, সন্ত্রাস কভু নয়। সন্ত্রাস সে তো সন্ত্রাস, জিহাদ কভু নয়।’ দুঃখের বিষয়, কবির নানা গানের এমন গভীর মর্মবাণী খুব কম শ্রোতাই হয়তো উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তাই কবির যতটুকু সমাদর আমাদের মাঝে পাবার কথা তার অনেক কম আমরা দেখতে পাই। কবির উচ্চাঙ্গের এই গানগুলো নিয়েও তেমন কোনো আলোচনা দেখা যায় না। কবির চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রেও সমর্থন খুব বেশি বলে আমার মনে হয় না। হয়তো গভীর কথার গভীরতা অনেকেই অনুধাবন করতে পারেন না। এটাই বুঝি পৃথিবীর নিয়ম যে, অযোগ্যরা ফুলের মালা পরবেন আর যোগ্যরা অবহেলায় থেকে যাবেন।

‘ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি’র পর ‘ইয়ে ম্যারা ওয়াতান’ নামে কবির আরেকটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। এই অ্যালবামে বাংলা ইংরেজি ও উর্দুতে একটি দেশাত্মবোধক গান কবি গেয়েছিলেন। উর্দুতে বাংলাদেশের জন্য গান কোনো কবি কি আগে লিখেছিলেন? এই অ্যালবামে একটি গানের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। গানটি মহান স্রষ্টার শানে রচিত। গানটির কথা এমন—‘চিনলি নারে মন তাহারে চিনলি নারে মন…’।

সারা জীবনে শোনা ও পড়া অসংখ্য হামদ ও কবিতার মধ্যে এই ধরনের কোনো হামদ পাইনি। কবি এখানে আল্লাহর জ্ঞানের বিশালত্বের কথা বলেছেন অনন্য ভঙ্গিমায়—‘কখন কোথায় কোন কারণে কে থাকে কার পাশে/ কোন কবরে কোন সে শিয়াল মুখ দিল কার লাশে..’ এমন নানা অভিনব কথা দিয়ে সাজানো এ গানটি।

কবির সর্বশেষ প্রকাশিত অ্যালবাম ‘আবার যুদ্ধ হবে’। এই অ্যালবামেও কবি স্বমহিমায় ভাস্বর। প্রতিটি গানই ভিন্ন ধাঁচের। ‘আবার যুদ্ধ হবে’ গানটির কথাও আলাদা করে বলতে হয়। এই গান দেশপ্রেমিক শ্রোতাদের ধমনীতে ঝড় তোলে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা গান রচিত হতো মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার প্রায় ৪০ বছর পর এই গান আমাদের এই প্রজন্মে সেই উত্তাল দিনগুলোর অনুভূতি এনে দেয়।

অ্যালবামের বাইরেও অনেক গান আছে কবির। আনসার ও ভিডিপির জন্য এবং নানা উপলক্ষে অনুরোধে গান লিখেছেন কবি। ইসলামিক টিভির জন্য লেখা ‘সুন্দর পৃথিবীর জন্য’ গানের কোনো তুলনা হয় না। এ ছাড়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কিছু ইসলামি গান নিয়ে ‘মরু সাহারা’ নামে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন। অ্যালবামটি কবির গায়ক জীবনের প্রথম দিকে প্রকাশিত।

এখন সময় বদলেছে। গানের অ্যালবাম আর কেউ করেন না। ইউটিউবে একটি একটি করে গান ছাড়া হয়। এর মাঝে কবিও অনেক বদলেছেন। মাঝে ‘সাপ্তাহিক লিখনী’ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সেসময় কবির কিছু কবিতা পাওয়া গেলেও কোনো সংগীত আমরা পাইনি। সম্প্রতি কবিও ইউটিউবে চ্যানেল খুলেছেন। নতুন কিছু গান সেখানে পাওয়া যাচ্ছে। তবে কবির সব গান ও কনসার্টের ভিডিও সম্বলিত একটি চ্যানেল অনেক আগেই তৈরি হওয়ার কথা। একজন ভক্ত হিসেবে প্রযুক্তির এই যুগে এভাবে কবির পিছিয়ে থাকার অনুযোগ আমরা করতেই পারি।

কবি ‘লিখনী’ ছেড়েছেন বহুদিন। আবার হয়তো সংগীতে মন দিয়েছেন। বাংলা ভাষায় আরও অনেক মুগ্ধকর সংগীত আমাদের উপহার দেবেন—এই প্রত্যাশা আমাদের।

 

লেখক : সহকারী সম্পাদক, মাসিক নবধ্বনি

মার্চ 2018

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১